সূরা আল ওয়াক্বিয়াহ্-র বঙ্গানুবাদ

593 0

•✦✨﷽ ✨✦•

(বলো! আমি) আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যিনি রহমান (পরম করুণাময় সকল সৃষ্টির জন্যে), যিনি রহিম (অসীম দয়াবান কিছু বিশেষ ব্যক্তির জন্যে)।

যখন মহা ঘটনা (ক্বিয়ামত) সংঘটিত হবে(০১)

তখন সেই মহা ঘটনা অস্বীকার করার কেউ থাকবে না।(০২)

এ ঘটনা কাউকে করবে নীচ, কাউকে করবে সমুন্নত।(০৩)

যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে ভুমন্ডল(০৪)

এবং পবর্তমালা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়বে।(০৫)

ফলে তা বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে।(০৬)

আর তোমরা (সে সময়ে) তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে।(০৭)

(প্রথম দল) সৌভাগ্যবানদের দল! কতই না সৌভাগ্যবান তারা।(০৮)

এবং (দ্বিতীয় দল) হতভাগাদের দল! কতই না হতভাগা তারা!(০৯)

আর (তৃতীয় দল) অগ্রবর্তীরা, (তারা) অগ্রবর্তী।(১০)

তারা (আল্লাহর) নৈকট্য প্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ(১১)

(তারা) নেয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে অবস্থান করবে।(১২)

(সেই জান্নাতে) বহু সংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে,(১৩)

এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।(১৪)

(আল্লাহর ঐ নৈকট্য প্রাপ্ত ব্যক্তিরা সেই জান্নাতে) সারীবদ্ধভাবে সজ্জিত আসনসমূহে অবস্থান গ্রহণ করবে,(১৫)

তারা পরস্পর মুখোমুখী হয়ে হেলান দিয়ে বসবে।(১৬)

তাদের চতুর্দিকে চির কিশোরেরা প্রদক্ষিণ করবে(১৭)

পান-পাত্র, জগ ও পবিত্র পানীয়পূর্ণ পেয়ালা নিয়ে,(১৮)

যে পানীয় পানে তাদের মাথা ব্যাথা হবে না এবং মাতালও হবে না(১৯)

এবং এমন ফলমূল নিয়ে যা (আল্লাহর ঐ নৈকট্য প্রাপ্ত ব্যক্তিরা) নিজেরাই বাছাই করে নিবে,(২০)

আর (আল্লাহর ঐ নৈকট্য প্রাপ্ত ব্যক্তিদের) ঈস্পিত পাখীর গোশত নিয়ে (প্রদক্ষিণ করবে)।(২১)

আর (আল্লাহর ঐ নৈকট্য প্রাপ্ত ব্যক্তিদের) জন্যে থাকবে ডাগরচোখা হুর,(২২)

মনে হবে যেন ঝিনুকের ভিতর মুক্তা সাজানো।(২৩)

এগুলো তাদের [=আল্লাহর ঐ নৈকট্য প্রাপ্ত ব্যক্তিদের] কৃত কর্মের পুরস্কার স্বরূপ।(২৪)

সেখানে [=সেই জান্নাতে] তারা [=আল্লাহর ঐ নৈকট্য প্রাপ্ত ব্যক্তিরা] শুনবে না কোন অসার ও অনর্থক কথা অথবা কোন পাপময় বাক্য,(২৫)

‘সালাম’ আর ‘সালাম’ বাণী ব্যতীত।(২৬)

আর সৌভাগ্যবানদের দল! কতই না ভাগ্যবান তাঁরা!(২৭)

তারা অবস্থান করবে কন্টক বিহীন সিদর বৃক্ষের ছায়াতলে(২৮)

এবং অবস্থান করবে ত্বলহ নামক বৃক্ষের ছায়াতলে,(২৯)

আর সেখানে থাকবে বিস্তৃত ছায়া(৩০)

এবং সদ্য প্রবাহমান জলধারা(৩১)

ও প্রচুর ফলফলাদি,(৩২)

যা শেষ হবে না এবং নিষিদ্ধও হবে না।(৩৩)

আর তাঁদের জন্যে থাকবে সুউচ্চ মর্যাদাপূর্ণ শয্যাসঙ্গী।(৩৪)

আমরা তাদেরকে বিশেষভাবে সৃষ্টি করেছি।(৩৫)

আমরা তাদেরকে কুমারী হিসেবে নির্ধারণ করেছি,(৩৬)

তাদের প্রেম হবে শুধু তাদের স্বামীদের জন্যে এবং তারা হবে তাদের স্বামীদের সমবয়স্কা।(৩৭)

(এতসব নেয়ামত) শুধু ঐ সৌভাগ্যবান দলের জন্য।(৩৮)

তাদের [=সৌভাগ্যবান দলের] অনেকেই হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে(৩৯)

এবং অনেকেই হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে।(৪০)

আর হতভাগাদের দল, কতই না হতভাগা তারা!(৪১)

তারা থাকবে অত্যুষ্ণ বায়ু ও উত্তপ্ত পানিতে,(৪২)

প্রচন্ড ধোঁয়ায় তৈরী কালো ছায়ার নিচে,(৪৩)

যা শীতলও নয়, আরামদায়কও নয়।(৪৪)

নিশ্চয় তারা ইতোপূর্বে [=দুনিয়াতে] ভোগ বিলাসিতায় মগ্ন ছিল(৪৫)

এবং তারা অবিরাম লিপ্ত ছিল ঘোরতর পাপ কর্মে। (৪৬)

তারা সর্বদা বলতো, যখন মৃত্যুর পর অস্থি ও মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাবো, এবপরও কি আমরা পুনরুত্থিত হবো?(৪৭)

আর আমাদের পূর্বপুরুষরাও (পুনরুত্থিত হবে)?(৪৮)

(হে নবী) বলে দাও, নিঃসন্দেহে পূর্ববতী ও পরবর্তীদের(৪৯)

সকলকে একত্রিত করা হবে এক নির্ধারিত স্থানে নির্দ্দিষ্ট সময়ে।(৫০)

অতঃপর তোমরা! হে পথভ্রষ্ট মিথ্যাচারীরা!(৫১)

তোমরা (জাহান্নামে) অবশ্যই যাক্কুম (নামক নিকৃষ্ট ও দূর্গন্ধময়) বৃক্ষ থেকে আহার করবে।(৫২)

অতঃপর তা দিয়ে তোমরা উদর ভর্তি করবে,(৫৩)

আর তার উপর আরো পান করবে অতিমাত্রায় উত্তপ্ত জল,(৫৪)

আর তা পান করবে তৃষ্ণার্ত উষ্ট্রের ন্যায়।(৫৫)

এই হবে প্রতিদান দিবসে তাদের [=পথভ্রষ্ট মিথ্যাচারীদের] প্রতি আপ্যায়ন!!(৫৬)

(হে পথভ্রষ্ট মিথ্যাচারীরা!) আমরাই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাহলে কেন তোমরা (মৃত্যুর পর পুনরায় তোমাদের সৃষ্টির বিষয়টিকে) সত্য বলে বিশ্বাস করছো না?(৫৭)

তোমরা কি ভেবে দেখেছো (নারী গর্ভে পতিত) তোমাদের বীর্য (-এর বিভিন্ন রকম পরিবর্তন) সম্বন্ধে?(৫৮)

তোমরা কি তা [=ভ্রুণের অভ্যন্তরে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মাধ্যমে] সৃষ্টি করো, নাকি আমরা তার সৃষ্টিকর্তা?(৫৯)

(হে মানুষ!) আমরা তোমাদের মাঝে মৃত্যু নির্ধারণ করেছি। আর (এ কাজে) আমাদের চেয়ে অন্যেরা কেউ এগিয়ে থাকতে পারবে না। (৬০)

(জ্বী হ্যাঁ, মৃত্যুকে নির্ধারণ করেছি) যেন আমরা তোমাদের মত অন্যদেরকে তোমাদের স্থলে স্থান দিতে এবং তোমাদেরকে (অন্য জগতে) নতুনভাবে এমন এক সৃষ্টিতে পরিণত করতে পারি, যা তোমরা জানো না।(৬১)

আচ্ছা, তোমরা [=পথভ্রষ্ট মিথ্যাচারীরা!] তো (তোমাদের) প্রথম সৃষ্টি [=বর্তমান জীবন] সম্বন্ধে অবগত হয়েছো, তাহলে তোমরা (মৃত্যুর পর পুনরায় তোমাদের সৃষ্টির বিষয়টিকে) অনুধাবন করো না কেন?(৬২)

তোমরা কি ভেবে দেখেছো যে, তোমরা (মাটির বুকে) কী রোপন করছো?(৬৩)

তোমরা কি তা অঙ্কুরোদগম করো, নাকি আমরা তা অঙ্কুরিত করি?(৬৪)

(জেনে রাখো!) আমরা ইচ্ছা করলে তা [=তোমাদের রোপিত শষ্য] খড়-কুটায় পরিণত করে দিতে পারতাম, তখন তোমরা পরিতাপের সাথে শুধু হতবাক হয়ে যেতে। (৬৫)

(আর তখন বলতে,) নিশ্চয় আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে গেলাম!(৬৬)

বরং (বলতে,) আমরা বঞ্চিত হয়ে গেলাম!!(৬৭)

তোমরা যে পানি পান করো তা সম্পর্কে কখনো ভেবে দেখেছো কি?!(৬৮)

তোমরা কি মেঘ হতে তা [=পানীয় জল] অবতীর্ণ করেছো নাকি আমরা তা অবতীর্ণ করে থাকি?(৬৯)

আমরা ইচ্ছা করলে তা [=পানীয় মিষ্টি জল] লবণাক্ত ও তিতো করে দিতে পারতাম, এরপরও কি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?(৭০)

(আচ্ছা,) তোমরা যে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করো সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছো কি?(৭১)

তোমরাই কি (আগুন জ্বালানোর জন্যে প্রয়োজনীয়) বৃক্ষরাজী সৃষ্টি করেছো, নাকি আমরা তা সৃষ্টি করে দিই?(৭২)

আমরা এ বিষয়টিকে [=গাছপালা সৃষ্টির বিষয়টিকে] (সকলের জন্যে) স্মরণীয় বিষয় হিসেবে তুলি ধরেছি এবং মরুচারীদের জন্যে উপস্থাপন করেছি পণ্য দ্রব্য রূপে।(৭৩)

সুতরাং (হে মানুষ!) তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।(৭৪)

আমি শপথ করছি নক্ষত্ররাজির অবস্থানের (এবং যেখানে উদিত হয় ও অস্ত যায়)!(৭৫)

(হে মানুষ!) নিশ্চয় তা এক মহাশপথ, যদি তোমরা তা জানতে!(৭৬)

নিশ্চয়ই তা [=আয়াতসমূহ] এক মহাসম্মানিত কুরআন,(৭৭)

যা একটি সুরক্ষিত কিতাবে নিহিত আছে,(৭৮)

যার কাছে পুতঃ পবিত্ররা ব্যতীত অন্যরা পৌছুতে পারবে না।(৭৯)

যা জগতসমূহের প্রতিপালকের কাছ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে।(৮০)

(হে মানুষ! এর পরও) কী তোমরা এই বাণীগুলোকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে?(৮১)

এবং তোমরা তোমাদের জীবিকাকে মিথ্যারোপের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করে নিবে?!(৮২)

সুতরাং কেন (মৃতপ্রায় ব্যক্তির) প্রাণ যখন কন্ঠাগত হয় (তখন তোমরা জীবিতরা তা পূর্ব অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে অপারগতা পোষণ করো?!),(৮৩)

এবং তখন তোমাদের (মত জীবিত ব্যক্তিদের) তাকিয়ে থাকা ছাড়া অন্য কিছুই করার থাকে না!?,(৮৪)

আর আমরা তার [=মৃতমুখী ব্যক্তির] কাছে তোমাদের (মত জীবিতরা, যারা শয্যাশায়ী মানুষটির পাশে অবস্থান নিয়েছো) অপেক্ষা অনেক বেশী নিকটবর্তি, কিন্তু তোমরা তা দেখতে পাও না।(৮৫)

অতএব, তোমরা যদি কর্তৃত্বশালী হও(৮৬)

তাহলে তা [=কন্ঠাগত প্রাণটি] (মৃতমুখী ব্যক্তির দেহে) ফিরিয়ে আনছো না কেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো?!(৮৭)

সে যাই হোক, যদি সেই (মৃতপ্রায়) ব্যক্তি (আল্লাহর) নৈকট্য প্রাপ্তদের মধ্যে গণ্য হয়,(৮৮)

তাহলে তার জন্য রয়েছে আরাম, প্রশান্তি ও নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত;(৮৯)

আর যদি সেই ব্যক্তি সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হয়,(৯০)

তাহলে (তাকে বলা হবেঃ) সৌভাগ্যবানদের পক্ষ থেকে তোমাকে সালাম।(৯১)

কিন্তু সে যদি পথভ্রষ্ট মিথ্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়,(৯২)

তাহলে (তার জন্যে রয়েছে) উত্তপ্ত পানির আপ্যায়ন,(৯৩)

এবং জাহিম (নামক জাহান্নামের) আগুন ।(৯৪)

(উপরোক্ত তিনটি দল সমন্ধে যা বলা হলো) তা ধ্রুব সত্য।(৯৫)

সুতরাং (হে মানুষ!) তুমি তোমার মহান প্রতিপালকের নামে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।

(সমাপ্ত)
অনুবাদক – ড. নূরে আলম মোহাম্মদী।

Related Post

সূরা আবাসা-র অনুবাদ

Posted by - September 16, 2019 0
(আমি) আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যিনি রাহমান [=পরম করুণাময় সকল সৃষ্টির জন্যে], যিনি রাহিম [=অসীম দয়াবান কিছু বিশেষ ব্যক্তিদের জন্যে]।…

সূরা আল-কাফিরুন-এর বঙ্গানুবাদ

Posted by - August 15, 2019 0
(আমি) আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যিনি রাহমান (পরম করুণাময় সকল সৃষ্টির জন্যে), যিনি রাহিম (অসীম দয়াবান কিছু বিশেষ ব্যক্তিদের জন্যে)।…

হযরত ফাতিমা আয্ যাহরা (সাঃ আঃ)-এর শাহাদাত বার্ষিকী-(১৪৪১হিঃ) উদযাপন অনুষ্ঠান পালন

Posted by - January 31, 2020 0
হযরত ফাতিমা আয্ যাহরা (সাঃ আঃ)-এর শাহাদাত বার্ষিকী- (১৪৪১হিঃ) শোক পালন অনুষ্ঠানে মূল্যবান বক্তব্য রাখছেন মুর্শিদ কেবলা – আল্লামা ড.…

সূরা আল হুমাযাহ-এর অনুবাদ

Posted by - February 27, 2020 0
 بِسْمِ الّٰلهِ الرَّحْمٰنِ الرَحِيْمِ   (বলো! আমি) আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যিনি রহমান (পরম করুণাময় সকল সৃষ্টির জন্যে), যিনি রহিম (অসীম…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »