ইসলামী মাযহাব ও তার বৈশিষ্ট্য

1138 0

ইত্যপূর্বেকার আলোচনা থেকে এটা দিব্যলোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, নবী (সা.) কর্তৃক মনোনীত খলিফা ব্যতীত মানুষের নির্বাচিত খলিফাদের অনুসরণ কোনক্রমেই সুন্নতের অনুসরণ বলে গন্য হতে পারে না ।

অতএব নবী (সা.) এর সুন্নতের অনুসারী সাহাবা, তাবেয়ীন ও তাবেয় তাবেয়ীন এবং তাদের পরবর্তীকালের জনগন আহলে বাইতের অনুসারী ছিলেন । আর বর্তমান যুগের ইমাম, আহলে বাইতের বার ইমামের সর্বশেষ মহাপুরুষ । বার ইমামের অনুসারী হওয়ার জন্য নবী (সা.)এরই তাগিদ রয়েছে । তাদের কর্মপন্থা, রীতিনীতি ও জীবন –চরিত সকল কিছুই ছিল নবী (সা.) এর সুন্নাতের-ই চরম পরাকাষ্ঠা । তারা ছিলেন নবীজির সুন্নতের বহিঃপ্রকাশ ।

কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ আমরা মুসলমানরা আজ বিভিন্ন মাযহাবে বিক্ষিপ্ত । মুসলমান জাতি আজ শিয়া সুন্নীতে দ্বিধা বিভক্ত । আবার সুন্নীদের রয়েছে চার মাযহাব । আসলে আমরা কি কখনো খুটিয়ে দেখেছি এ সুন্নী মাযহাবসমূহের আবির্ভাব কিভাবে হয়েছে ? এ বিষয়ে ইমামিয়া মাযহাবের কোন গ্রন্থের উদ্ধৃতি না টেনে বাংলাদেশের বহুল পরিচিত ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশনের’ প্রকাশিত একটি পুস্তক থেকে উদ্ধৃতি প্রদান-ই যথাযথ মনে করছি । সেখানে এভাবে বলা হয়েছেঃ

“আব্বাসীয় আমলটা ছিল নানা দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ । এই আমলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন মতবাদ রূপ লাভ করে । সুফী ও শরীয়তের ইমামগন আত্মপ্রকাশ করতে থাকেন । বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুবাদ হয় আরবীতে, গ্রীক দর্শন ইসলামী চিন্তার উপর গভীর ও সূদুর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করে । এই সময়ের মধ্যেই ইসলামী সমাজ, রাষ্ট্র ও চিন্তা যে রূপ পরিগ্রহ করে, তাকে অনুসরন করেই শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে মুসলমান গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে চলে । সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও নিচে আমরা সে সব অবস্থার রূপ ও পরিনতি কি হয়েছিলো তা দেখতে প্রয়াস পাব ।

দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা মানসুরের সময় ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইসলাসের অবিকৃত রূপ ও তার সমাজ ব্যাবস্থার পরিবর্তনের উপর মত প্রকাশ করেন । আবু হানিফার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব দেখে মনসুর তাকে কুক্ষিগত করার প্রয়াসে বাগদাদের প্রধান বিচারপতির পদ প্রদান করেন । আবু হানিফা (রহ.) এই প্রস্তাব অস্বীকার করায় মনসুর তাকে কারারুদ্ধ করেন, কারাগারেই আবু হানিফার মৃত্যু হয় । সুন্নী মতবাদের আরেক জন প্রচারক ইমাম মালেক (রহ.) কেও বেত্রাঘাতে জর্জরিত করে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় । এই ভাবে কুরআন ও রাসুলুল্লাহর অনুসারী দু’জন শরীয়তের ইমামের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয় । এই সময় মদীনায় খাটি ইসলামী চিন্তার দার্শনিক ও মর্মগত দিক ব্যাখ্যা করে বলেছেন ইমাম জা’ফর সাদেক (আ.) । হযরত আলীর (আ.) প্রপৌত্রের এমন ধর্ম ব্যাখ্যা মনসুরকে বিচলিত করল । মনসুর ইমাম জা’ফর সাদেকের রাজসভায় আহব্বান করে তাকে হত্যা করার সংকল্প করলেন । কিন্তু ইমাম জাফর সাদেকের সঙ্গে কথা বলে খলিফা যখন বুঝতে পারল যে, সাধকের প্রচেষ্টা প্রধানত সমাজ নয়, ব্যক্তিগত ও আত্মিক উৎকর্ষেরই তিনি প্রচারক, তখন ইমাম জা’ফর সাদেককে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়াই তার কাছে যুক্তিযুক্ত বলে বিবেচিত হয় । তবে মনসুর সেই সঙ্গে এ কথাও বুঝতে পারলেন যে, তার রাজবংশের স্থায়িত্বের জন্যে প্রয়োজন এক সুদৃঢ় মতবাদের । সেই মতবাদ কুরআন ও সুন্নাহকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করবে যা তার স্বার্থের প্রতিকুল নয় । তেমন মতবাদ তিনি তার অনুগত আইনজ্ঞদের দ্বারা করিয়ে নিলেন ও সেই মতবাদের নাম দিলেন সুন্নী মতবাদ । এই মতবাদের মধ্যে নবী বংশের দাবীর কথা যেমন নেই, তেমনই রাসূলু্ল্লাহর (সা.) ও তার অব্যবহিত দুই খলিফার সময়কার সমাজ ব্যবস্থার কথাও নেই । পরবর্তীকালে খলিফা হারুনুর রশীদের সময়ে সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতি আবু ইউসুফের নেতৃত্বে এক আইনজ্ঞ দলের সহায়তায় ইমাম আবু হানিফার নাম দিয়ে হানাফী মাযহাবের ধর্মীয় বিধি সুস্পষ্ট আকার ধারন করতে থাকে । তাতেও ব্যক্তিগত আচার অনুষ্ঠান ও এমন সামাজিক সমস্যা প্রাধান্য লাভ করে যাতে রাজবংশের স্থায়িত্ব ও সমাজের সামন্তবাদী প্রকৃতির পরিবর্তন করার কোন প্রচেষ্টার ইঙ্গিতমাত্র নেই । পরবর্তী মাযহাবগুলোকেও এমনি ভাবে রাজতন্ত্রের ও সমাজতন্ত্রের পরিপোষক রূপে ছাটাই করে ছাড়পত্র দেওয় হয় ।৭৯

এখন দেখুন সুন্নী মাযহাবগুলো এমন সব জালেম রাজা বাদশাহরা তৈরী করেছেন যাদের কালো হাত রঞ্জিত হয়েছে ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিকের ন্যায় আরো বহু জ্ঞানী গুনী ইসলামী ব্যক্তিদের রক্ত লালীমায় । আর আমরা গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে চলছি আর দাবী করছি নবীর সুন্নতের অনুসারী হিসেবে । তাই আজকে আমাদেরকে আহলে বাইতের তরীতে আরোহন করে ইহকাল ও পরকালের নাযাতের ব্যবস্থা করা একান্ত প্রয়োজন ।

Related Post

খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি

Posted by - November 25, 2019 0
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরলোকগমণের পর সাহাবীগণ কর্তৃক প্রথম খলিফা হিসাবে হযরত আবু বকরের নিয়োগ এবং তার পক্ষে…

আহলে বাইত

Posted by - June 2, 2020 0
নবী করিম (সা.)-এর আহলে বাইতকে ভালবাসার ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই । তবে আহলে বাইত কারা– এ ব্যাপারে যথেষ্ট…

মানব জীবনে নেতার গুরুত্ব

Posted by - November 25, 2019 0
পবিত্র আল কোরআনে আল্লাহ বলেন, يَوْمَ نَدْعُو كُلَّ أُنَاسٍ بِإِمَامِهِمْ অর্থাৎঃ-“ক্বিয়ামতের দিবসে প্রত্যেক জনগোষ্ঠিকে তাদের ইমামদের সাথে ডাকা হবে ।”১…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »