আশুরার ঘটনা বর্ণনার উৎস

1345

আহলে সুন্নত কর্তৃক স্বীকৃত আশুরার ঘটনা বর্ণনার উৎসসমূহঃ

কারবালা বিপ্লব এমন একটি ঐতিহাসিক ও মর্মান্তিক ঘটনা যা হিজরী ৬১ সনের মহররম মাসে সংঘটিত হয়। এটি এমন একটি ঘটনা যা হযরত হুসাইন ইবনে আলীর নেতৃত্বে তৎকালীন শাষক ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার বিরোদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল, যার ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে, বিশেষভাবে ইতিহাসবেত্তা ও ঘটনা লেখকদের মধ্যে বিভিন্ন প্রকার মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। এভাবে বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারী ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময়ে তাদের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এ ঘটনার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, যা সার্বিকতার আলোকে দু’টি দৃষ্টিভঙ্গি তথা শিয়া ও সুন্নী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত করা যায়।

অবিস্মরণীয় এই একক ও অতুলনীয় ঘটনার স্মরণ মুক্তি আন্দোলনসমূহের বিরত্বপূর্ণ কাহিনী সৃষ্টি এবং ইতিহাসের পথরেখায় বিভিন্ন ন্যায়, সাম্য ও ঐক্য সৃষ্টির সংগ্রামে যে নজিরবিহীন প্রভাব রেখেছিল তার বিশ্লেষণ উপরোক্ত দুটি দুষ্টিভঙ্গিকেও ছাড়িয়ে যায়। এমনকি অনেক সময় ঐসকল আন্দোলনকে বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় বিভক্ত করা সমিচীন মনে হয়। এ কারণে গবেষকরা কখনো তাদের স্ব স্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নিজ উদ্দেশ্যে পৌছার নিমিত্তে অথবা তাদের বিশ্লেষণের উপযুক্ত ব্যাখ্যা পেশ করার লক্ষ্যে, অথবা তাদের স্বীয় মনস্তাত্বিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে অর্জিত ফলাফলের কারণসমূহ বর্ণনায় উক্ত ঘটনার পেক্ষাপট, কারণসমূহ ও মূল ঘটনার অন্তর্নিহিত বিভিন্ন সুক্ষ্মাতিসুক্ষ বিষয়াবলীর উপর বিশেষভাবে দৃষ্টি প্রদান করে থাকেন। আবার কখনো তারা অতীতের মূল ও প্রকৃত ঘটনাটি সাজিয়ে অথবা কাটসাট করে উপস্থাপন করে থাকেন।

সর্বোপরী আহলে সুন্নাতও ইসলামের এ মহাঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাপারে কোন একক পথ অতিক্রম করেনি, বরং তারা বিভিন্নমূখী ও বিভিন্ন প্রকার মতামত আবার কখনো বিপরীতমূখী রায় প্রদান করেছেন। কেউ কেউ ইমাম হুসাইনের বিদ্রোহের সত্যনিষ্ঠতা এবং তার অসহায়ত্ব বরণ ও বিভিন্ন প্রকার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি ও প্রদানে তার বিপ্লবের উপযুক্ততা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা ইমামের এ বিপ্লবকে সম্মানিত শেষ নবি ও রাসূলের রেসালতের পথধারায় এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের সিরাতের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেছেন। আবার অনেকে বিভিন্ন প্রমাণাদি অথবা মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনের ভিত্তিতে উক্ত ঘটনার ব্যাপারে তাদের হৃদয়ের সমবেদনা প্রকাশ করেই ক্ষ্যান্ত হয়েছেন অথবা এ ঘটনাকে একটি ব্যতিক্রমী বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন যা সকল সাপকাঠি ও মানদন্ডের উর্দ্ধে। এ ধরনের ব্যক্তিরা ইয়াযিদের শাষনকে বৈধ বলেছেন এবং সকল শরীয়তি বৈধতা এ খেলাফতের মধ্যে বিদ্যমান ছিল বলে মনে করেন। ফলে তারা মূলত: এ ধরনের খেলাফতের বিরোদ্ধে সব ধরনের বিদ্রোহকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার আরেকটু বাড়িয়ে বলেছেন। তারা ইমাম হুসাইনের পবিত্র শাহাদাতের বিষয়ে ইয়াযিদকে নির্দোষ প্রমাণ করার ব্যাপারে কলমের কালি অকাতরে ব্যয় করেছেন। তারা তাদের এ দাবির পক্ষে কখনো ইয়াযিদের ইজতিহাদ আবার কখনো আশুরার সংগ্রামে ইমাম হুসাইনের বিরোধীদের ইজতিহাদের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। এমনকি কখনো তারা ইমাম হুসাইনকে হত্যার ব্যাপারে ইয়াযিদের কোন নির্দেশ ছিল না বলে উল্লেখ করেছেন বরং তারা ইবনে যিয়াদের ন্যায় ইয়াযিদের সেনাপতি ও কুফাবাসীদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছেন। এ ধরনের লেখকদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মুসলমানদের খেলাফত ও আরব সভ্যতা যেন সব ধরনের দোষ-ত্রূটি থেকে মুক্ত থাকে এবং তথাকথিত ইসলামী খেলাফত ও মুসলমানদের অতিত রাজনৈতিক ইতিহাসের উপর সব ধরনের আপত্তি ও সমালোচনার পথ সব সময়ের জন্যে রুদ্ধ হয়ে যায়।

কতিপয় মৌলিক প্রশ্নঃ

উপরোল্লেখিত আলোচনার ভিত্তিতে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে- আমাদের উপস্থিত গবেষনা যেগুলোর উত্তর দানে ব্যয় হবে, সেই প্রশ্নগুলো হচ্ছে:

ক) ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার শাসন ব্যবস্থা কী ইসলামী শাসন ছিল এবং এ ধরনের শাসন ব্যবস্থার প্রচলন ও চলতে থাকার পেছনে কী কোন দ্বীনি মৌলিক শরীয়তী পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে?

খ) ইয়াযিদের কী খেলাফত ও মুসলমানদের নেতৃত্ব গ্রহণের কোন ধরনের যোগ্যতা ছিল?

গ)আশুরা বিপ্লব ও ইয়াযিদের শক্তি- এ দু’টির মুখোমুখীতা কী দ্বীনের ব্যাপারে দুই প্রকার ব্যাখ্যা এবং দুই প্রকার দ্বীনি ইজতিহাদের বিষয়টি প্রমাণ করে? কারবালার বিপ্লবের বিরোধীরা কী কোন দ্বীনি শক্তিশালী চিন্তা ও সুত্র থেকে উপকৃত হয়েছে?

ঘ) ইমাম হুসাইনের হত্যার ব্যাপারে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার কি ধরনের ভুমিকা ছিল? ইয়াযিদকে কী এ ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া যায় আর কারবালার অপরাধযজ্ঞের পরবর্তি ঘটনাসমূহের দায়ভার শুধুমাত্র ইবনে যিয়াদ এবং সিরিয়া ও কুফার সেনাবাহিনীর উপর চাপিয়ে দেয়া যায়?

ঙ) আহলে সুন্নাতের সমাজে সাধারণ জনগণ ও তাদের তাত্তি¡ক নেতৃবৃন্দ কারবালা বিপ্লবের  প্রতি কিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করেন এবং তারা এ ব্যাপারে কি ধরনের বিশ্বাস ও বাস্তব ফলাফলে পৌছেছেন?

আহলে সুন্নাত কর্তৃক স্বীকৃত আশুরার উৎসসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাতঃ

উৎস পরিচিতি, প্রকৃতপক্ষে এবং বিশেষ করে ইতিহাস ও ইতিহাসের ন্যায় বিষয়সমূহের গবেষনার জন্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে কোন ধরনের গবেষনা- তা বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ হোক অথবা তার পর্যালোচনা ও কারণসমূহ উৎঘাটনে তৎপর হোক, উৎসসমূহ থেকে উপকৃত হওয়া এবং সেগুলোর পরিশোধন ছাড়া একজন গবেষকের জন্যে অন্য কোন উপায় থাকে না। এর কারণ হলো, মূল, জ্ঞানগতভাবে মূল্যবান ও সত্য উৎঘাটনকারী সুত্র ও উৎসসমূহের উপর যেনো ভরসা করা যায়। আর সাথে সাথে মূলহীন ও ত্রুটিপূর্ণ উৎসসমূহ- যা প্রকৃত সত্য উন্মোচন না করে এবং সত্য কেন্দ্রীক না হয়ে বাহ্যিক লাভ, সত্যকে উল্টোভাবে উপস্থাপন ও গোমরাহের দিকে গুরুত্ব আরোপ করে, সেগুলোকে যেনো ত্যাগ করা সম্ভব হয়।

আশুরার ব্যাপারে আহলু সুন্নাতিল জামায়াতের দৃষ্টিকোন থেকেও এ বিষয়টি তার উৎসসমূহের উপর বিশ্বাস ও পরিচয় লাভের উপর নির্ভরশীল। তারা অন্যান্য ফের্কার অনুসারীদের ন্যায় আশুরার ঐ সমস্ত উৎসের উপর ভিত্তি করে হুসাইনী বিপ্লবকে উপলব্ধি, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষন করে থাকেন যেসব উৎস তাদের কাছে সর্বজন স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়। এ কারণে উক্ত উৎসসমূহের পদ্ধতিগত ও নিগূঢ় মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা, আশুরা সংক্রান্ত বিষয়ে আহলে সুন্নাতের ধারনা লাভ এবং এ বৃহৎ আন্দোলনের ব্যাপারে তাদের ভাবধারার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচু মাপের ভুমিকা পালন করে। সাথে সাথে এ মাযহাবের অনুসারীদের মাঝে বিভিন্ন দল ও উপদলের পরিচয় লাভেও সহায়ক হয়।

এটাই স্বাভাবিক যে, এখানে যেসব উৎস মূল্যায়ন, ভালভাবে যাচাই ও চিহ্নিত করা হবে, তা আহলে সুন্নাতের মাঝে গৃহীত ও স্বীকৃত হতে হবে অথবা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে গ্রহণ করা হবে। এমনিভাবে, এ সকল উৎসের বর্ণনাকারী, ঐতিহাসিক ও জ্ঞানগত বিশেষত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে সকল গবেষক গবেষনার গৃহীত নিয়ম ও জ্ঞানের মাপকাঠিতে সেগুলোকে যাচাই এবং শক্তিশালী ও দূর্বল দিকগুলো প্রকাশ করতে পারবে।

এটার অর্থ এই নয় যে, আমাদের আলোচিত উৎসসমূহ শুধুমাত্র আহলে সুন্নাতের সাথে সম্পর্কীত অথবা সনদসমূহে বিদ্যমান সম্ভাব্য দূর্বল দিকগুলো বা সেসব সনদসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী শুধুমাত্র আহলে সুন্নাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ, আর ইসমাঈলী ও যাইদীর ন্যায় অন্যান্য মুসলিম ফের্কাসহ অন্যান্য অমুসলমানরা সে সকল উৎসের উপর নির্ভরশীল নন।

উৎসসমূহের শ্রেণীবিন্যাসঃ

সামগ্রিক শেণীবিন্যাসের দৃষ্টিতে আশুরার উৎসসমূহ দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। কিছু উৎস আছে যা সরাসরী প্রথমবারের মত আশুরার মহাঘটনা বর্ণনা এবং সে সম্পর্কে বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয় লিপিবদ্ধ করেছে। দ্বিতীয় প্রকার উৎস এমন উৎস যা অসরাসরীভাবে এ ঘটনা বর্ণনা করেছে। আমরা এ সম্পর্কে অধ্যায়সমূহের ধারাবাহিকতায় আলোচনা করবো।

এটাই স্বাভাবিক যে, প্রথম শ্রেণীর উৎসসমূহে ঘটনা বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে আলোচনা করা হবে, যারা খোদ একষষ্টি হিজরীর আশুরার ময়দানে উপস্থিত ছিল এবং স্বয়ং তারা বিভিন্ন বিষয়  শ্রবন ও দর্শন করেছিল। এ ধরনের উৎসে- যদিও বর্ণনাকারীদের ভ্রান্তি, উদ্দেশ্যমূলক উক্তি, পক্ষপাতিত্ব, বিষ্মৃতি, অবহেলা ও আরো অন্যান্য বিষয় সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়, তারপরো সামগ্রিকভাবে এ সকল উৎসের বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায় যে, আশুরার ঘটনাবলীর পরিচয় লাভে এ সকল উৎসের নির্ভুলতা ও ত্রæটিহীনতার পরিমান সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম পর্যায়ে। দু:খের সাথে বলতে হয় যে, যে সকল বর্ণনাকারী সরাসরী আশুরার ঘটনা এবং তার বিভিন্ন কারণ ও প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলী বর্ণনা করেছেন তাদের অধিকাংশ লেখনী অবদান ¤øান হয়ে গেছে। অবশ্য সৌভাগ্যজনকভাবে তাদের কিছু লেখনী তাদের পরের প্রজন্মের কিছু ঐতিহাসিক- যারা ঐ সকল লেখা হাতে পেয়েছিলেন ও অধ্যয়ন করেছিলেন, তারা তাদের লেখনীর মাঝে সেসব কিছু অবদান উল্লেখ করেছেন। প্রথম শ্রেণীর উৎস বলতে আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ঐসকল বিষয় ও বর্ণনা যা বিদ্যমান ইতিহাস ও অ-ইতিহাসের উৎসসমূহে ঘটনাবলীর বর্ণনাকারীদের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং আমাদের হাতের নাগালে রয়েছে।

এটা সত্য যে, আশুরার ঘটনা বিভিন্ন প্রকার মানুষের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে এবং ইতিহাস লেখকগণ, নাসাবশাস্ত্রবিদগণ, রিজাল শাস্ত্রের পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন হাদিস বিশারদগণ বর্ণনা ও লিপিবদ্ধ করেছেন। জ্ঞানগত নিয়ম-কানুনের মাপকাঠিতে বর্ণনাকারী ও তাদের বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা এবং সেগুলোকে পরিশোধিত করে সহি শুদ্ধ সংবাদ বর্ণনা আর দূর্বল ও নড়বড়ে বর্ণনা ও সংবাদসমূহের মধ্য থেকে দৃঢ় ও সহি বর্ণনা প্রকাশ করা এ পুস্তকের একটি কাজ যা গবেষনার পাশাপাশি সম্পাদন করা হবে।

ঐতিহাসিক উৎসসমূহঃ

যেমনিভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দু:খজনকভাবে আশুরার করুন কাহিনী বর্ণনা সম্বলিত লেখনী স্বাধীনভাবে আর অবশিষ্ট নেই। এ কারণে বাধ্য হয়েই আমাদেরকে ইতিহাসের উৎসের শরনাপন্ন হতে হবে। সেখানে আমরা দেখবো ইসলামী ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত আশুরার জাগরণ সৃষ্টিকারী ঘটনা ও তার মরমী শাহাদাতসমূহ সম্পর্কে সে সকল লেখক কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।

ঐতিহাসিক অবদান ও উৎসসমূহ সামগ্রিকতার আলোকে দুইভাবে আশুরার সংবাদ সরবরাহ করেছে। তাদের কিছু সংখ্যক ইমাম হুসাইনের মাক্বতাল জাতীয় গ্রন্থসমূহের উপর নির্ভর করেছেন এবং কিছু সংখ্যক ইতিহাসের লেখনী ঐসব মাক্বতাল থেকে খুটিনাটি বিষয়াবলীসহ অনেক কিছুই বর্ণনা করেছে। আবার অন্য এক প্রকার ইতিহাস লেখনী আছে যা আশুরা সম্পর্কে পূর্বের মাক্বতালসমূহকে সংক্ষিপ্তাকারে অথবা উপসংহার হিসেবে অথবা মূল কথাগুলোকে উপস্থাপন করেছে মাত্র। এক্ষনে প্রত্যেকটি উৎসের আরো বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়াস চালাবো।

আবু মেখনাফ রচিত মাক্বতাল গ্রন্থঃ

সর্বপ্রথম প্রাচীন লিখিত প্রতিবেদনটি হচ্ছে আবু মেখনাফ রচিত মাক্বতাল গ্রন্থ যা ইতিহাসের মূল উৎসসমূহের নিকট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিয়মান হয়েছে এবং আমাদের সমসাময়িক কাল পর্যন্ত পৌছেছে। উক্ত গ্রন্থটি লুত ইবনে আবি ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ ইবনে মেখনাফ ইবনে সালিম আযদী কুফি(৯০-১৫৭হি.) হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দিতে সংকলন ও লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দির একজন বিখ্যাত আলেম ও ইতিহাস লেখক। সাক্বিফা, রাদ্দা, শুরা, জামাল, সিফফিন, হার্রা, মক্কা নগরীতে আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইরের অবরুদ্ধতা, কা’বা ঘর জালিয়ে দিতে ইয়াযিদী বাহিনীর উদ্যোগ এবং তার পূর্বের ঘটনাবলী যেমন হুজর ইবনে আদি-এর হত্যার ইতিহাস(মাক্বতাল), মুয়াবিয়ার মৃত্যু ও আরো অন্যান্য একক ঘটনার মত বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কলম চালিয়েছিলেন যা দু:খজনকভাবে আজকে আমাদের মাঝে বর্তমান নেই। এ লেখকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তার একমাত্র অবশিষ্ট লিখনী নিদর্শন মাক্বতালুল হুসাইন নামে আমাদের কাছে মওজুদ আছে যা থেকে আশুরার তথ্য ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

যদিও আবু মেখনাফের মাযহাব সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতনৈক্য আছে, তারপরো তার অবশিষ্ট মাক্বতালুল হুসাইন গ্রন্থের প্রতি সকল ইতিহাস লেখক এবং বিভিন্ন মাযহাব ও বিভিন্ন মতের গবেষকদের বিশেষ করে আহলে সুন্নাতের  বিশ্বাস স্থাপন ও দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে।  তারা যখন ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার খেলাফত প্রসঙ্গ বিশেষত: কারবালা প্রাঙ্গনে তার অপরাধ ও ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের বিষয় অবগত হলেন তখন নিরূপায় হয়ে সেই গ্রন্থ থেকে একটি বিরাট অংশ বর্ণনা করেছেন অথবা আবার কখনো সেখান থেকে কিছু অংশ সংক্ষিপ্তাকারে অথবা স্বীয় মনগড়া নির্বাচিত কিছু অংশ বর্ণনা করেছেন।

আহলে সুন্নাতের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ইতিহাসবেত্তা মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারী(মৃত্যু ৩১০হি.) আবু মেখনাফের এই গ্রন্থ মাক্বতালুল হুসাইন থেকে কারবালার এই মহাপ্রলয়ংকারী ঘটনা বর্ণনায় সচেষ্ট হয়েছেন। তিনি তার নিজ গ্রন্থে উক্ত মাক্বতালের গ্রন্থ থেকে ৯৭ টি রেওয়াইয়াত তথা বর্নণা সনদসহ উল্লেখ করেছেন। এটা ইমাম হুসাইনের হত্যাকান্ড তথা মাক্বতাল সম্পর্কিত সবচেয়ে বিস্তারিত বর্ণনা যা আমাদের পর্যন্ত পৌছেছে।

আবু মেখনাফ আশুরা ও তার পারিপার্শিক ঘটনাবলী বর্ণনায় নিরপেক্ষতা ও জ্ঞানগত মানদন্ডের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন। তিনি একটি মাধ্যম দিয়ে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আশুরার প্রতিটি ঘটনায় সবচেয়ে বেশী জ্ঞাত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন। আবু মেখনাফের বর্ণনাসমূহে একজন অন্যতম রাভী বা বর্ণনাকারী হচ্ছেন ইমাম হুসাইনের স্ত্রী রুবাবের ক্রৃতদাস উক্ববাতু ইবনে সামআন, যিনি মদিনা থেকে ইমামের শাহাদাত পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তিনি সাইয়্যেদুশ শুহাদার এমন অল্প কিছু সংখ্যক সাথীদের মধ্যে গণ্য যারা সর্বদা তাঁর সাথে থেকেছেন। তিনি কারবালার ময়দানে ইয়াযিদী বাহিনীর হাতে বন্দী হন এবং পরবর্তি সময়ে জেলখানা থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।

আবু মেখনাফ মদিনার ঘটনাবলী একটি মাধ্যম দিয়ে উক্ববাতু ইবনে সামআন থেকে বর্ণনা করেছেন। কুফার ঘটনাবলী ও কুফা নগরীতে মুসলিম ইবনে আক্বিলের উপস্থিতির সময়কালের ঘটনাবলী অত:পর তাঁর শাহাদাত পরবর্তি ঘটনাবলী বারজন রাভীর কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন, যারা কুফা শহরে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে গণ্য। এ ক’জন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এবং তারা তাদের প্রত্যক্ষ দেখা ও জানা বিষয়াগুলো বর্ণনা করেছেন।

আবু মেখনাফ ইমাম হুসাইনের যাত্রা ও বিভিন্ন এলাকায় তার কর্ম তৎপরতা সম্বলিত ঘটনাবলী নিবিড় মনযোগ ও নিখুত জ্ঞানগত ও নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি মক্কার ঘটনাবলী ছয় জন ব্যক্তির কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যারা ইমামের সাথে সেখানে ছিলেন। তেমনিভাবে মক্কা ও কারবালার মাঝখানের ঘটনাগুলো বারজন রাভির নিকট থেকে নিয়েছেন, যারা ইমামের কাফেলায় উপস্থিত ছিলেন। আবু মেখনাফ রচিত মাক্বতালুল হুসাইন-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি হচ্ছে আশুরার দিনের ঘটনা ও কারবালায় সংঘটিত বিভিন্ন হৃদয়স্পর্শী বিষয়, যা সর্বমোট ২৮ জন ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি শ্রবন এবং লিপিবদ্ধ করেছেন। এ সংখ্যক বর্ণনাকারীদের মধ্যে ২৪ জন ব্যক্তি ওমর ইবনে সা’দের বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল আর অন্যান্য বর্ণনা ইমাম যাইনুল আবেদীন ও ইমাম বাক্বির এর কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে।

উমার ইবনে সাদ আশুরার দিবসেই ইমাম হুসাইনের মস্তক মুবারক তার এক দাসের মাধ্যমে কুফায় প্রেরণ করে। ইবনে সাদ সেই দাসের সাথে তার আরেক জন নিকটতম ব্যক্তি হুমাইদ ইবনে মুসলিমকে কুফায় প্রেরণ করে যেনো তার নিরাপদ অবস্থা ও ইমামের শেষ পরিণতির সংবাদ তার পরিবারের নিকট পৌছাতে সক্ষম হয়। হুমাইদ ইবনে মুসলিম ইবনে সা’দের অত্যন্ত বিশ্বস্থজন এবং আবু মেখনাফ রচিত মাক্বতালুল হুসাইন  গ্রন্থে বর্ণিত মূল বর্ণনাকারীদের একজন। নিবিড় মনযোগ ও নিখুত বর্ণনা এবং পর্যাপ্ত তথ্য ধারন ও ঘটনার সকল খুটিনাটি বিষয় উল্লেখের ক্ষেত্রে হুমাইদকে উক্ববা ইবনে সামআনের সাথে তুলনা করা যায়, যিনি ইমামের বাহিনীতে ছিলেন।

১। আবু মেখনাফ রচিত মাক্বতাল এর লক্ষণীয় বৈশিষ্টসমূহঃ

আবু মেখনাফের মাক্বতাল বিভিন্ন দিক থেকে মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার দাবী রাখে। সর্বোপরী এটা বলা যায় যে, জ্ঞানগত মাপকাঠি এবং ইতিহাস গবেষনা ও ঘটনা বিবরণীতে প্রচলিত মানদন্ডের ভিত্তি অনুযায়ী উক্ত গ্রন্থ বিভিন্ন লক্ষণীয় ও উচু মানের অধিকারী। আর এ কারণে, জ্ঞানগত বৈশিষ্ট্য এবং বর্ণনা ও সনদের লক্ষণীয় মানের জন্যে পরবর্তি ইতিহাস গবেষক ও ইতিহাসবেত্তগণ উক্ত গ্রন্থ থেকে উপকৃত হয়েছেন এবং তাদের স্ব স্ব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন আর বিভিন্ন মাযহাব ও বিভিন্ন মতের ব্যক্তিবর্গ এ ব্যাপারটিকে স্বাগত জানিয়েছেন।  তন্মোধ্য কয়েকটি বৈশিষ্ট নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

১-১. পক্ষপাতিত্বহীন সাহিত্য

আবু মেখনাফের মাক্বতাল গ্রন্থ সাধারণত: বর্ণনাকারীদের রিপোর্ট ও সংবাদদাতাদের বক্তব্যের উপর নির্ভরশীল। তিনি উভয় পক্ষের সংবাদদাতাদের কাছ থেকেই সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, যারা পরস্পর শত্রæতা পোষন করতো এবং আমাদের এই নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর পরিপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল। লেখক বর্ণনাকারীদের সংবাদ ও বর্ণনার ব্যাপারে সামান্যতম রায় ও ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য প্রকাশ করেননি। আবু মেখনাফ আশুরার ন্যায় একটি বৃহৎ ঐতিহাসিক ঘটনায় সংঘর্ষময় দুই পক্ষের কোন ব্যক্তি সম্পর্কে কোন প্রশংসা বা তিরস্কার করেননি। তিনি যা শুনেছেন এবং যেসব ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন তা বর্ণনা করেছেন আর মধ্যস্থতা, প্রশংসা ও তিরস্কারের বিষয়টি পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। যেমনি করে উক্ত মাক্বতাল গ্রন্থে ব্যবহৃত প্রতিবেদন ও লেখনীর ধরন কখনো পক্ষপাতিত্ব বা তিরস্কারকে প্রকাশ করে না।

১-২. আমানতদারীতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষা

স্বভাবত: কোন একটি ঘটনা প্রসঙ্গে বিভিন্ন প্রকার প্রতিবেদন ও বর্ণনা আবার কখনো বিপরীতমূখী বর্ণনাও হয়ে থাকে। আবু মেখনাফ শুধুমাত্র একটি রিপোর্ট অথবা একটিমাত্র নির্বাচিত বর্ণনার দিকে মনোনিবেশ করেননি। বরং তিনি বিভিন্ন প্রকার সংবাদ বর্ণনা করেছেন, এমনকি তিনি একটি বর্ণনাকে আরেকটির উপর প্রাধান্য দেননি। এ ধরনের নীতির কারণে তার মাযহাবের ব্যাপারে সকলে সংশয়ের সাথে কথা বলেছেন। তাই কেউ তাকে শিয়া আবার কেউ সংশয়ের সাথে তাকে আহলে সুন্নাতের মধ্যে গণ্য করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, উভয় মাযহাব, বর্ণনার ক্ষেত্রে তাকে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, তিনি ইমাম হুসাইনের তিনটি প্রস্তাব সম্বলিত যে পত্রটি ইবনে সাদের পক্ষ থেকে ইবনে যিয়াদের নিকট প্রেরীত হয়েছিল তার হুবহু উল্লেখ করেন। সে পত্রে ইমাম হুসাইনের তিনটি প্রস্তাব ছিল এরকম, এক: হিজাজে ফিরে যাবে। দুই: ইয়াযিদের কাছে গিয়ে হাতে হাত রেখে বাইয়াত করবে। তিন: মুসলিম বিশ্বের কোন এক প্রান্তে চলে যাবে। অত:পর আবু মেখনাফ উপরোক্ত বিষয়ে দ্বিতীয় বর্ণনাটি নিম্নরূপে পেশ করেন:

আব্দুর রহমান ইবনে জুনদাব, উক্ববাতু ইবনে সামআন থেকে বর্ণনা করছেন যে, তিনি বলেছেন, “আমি হুসাইনের সাথে ছিলাম, যখন তিনি মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন, আবার সেখান থেকে যখন তিনি কারবালা পৌছেছেন। আমি তার নিহত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কখনো তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলাম না।  সে সময় পর্যন্ত তিনি এমন কোন কথা বলেননি যা আমি শুনিনি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, যা জনগণ বলে থাকে অথবা মনে করে থাকে যে, হুসাইন বলেছিলেন আমি ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত হতে চাই অথবা আমাকে মুসলিম সাম্রাজ্যের কোন এক প্রান্তে চলে যেতে দাও, এসব কথা সঠিক নয়। হ্যাঁ, তিনি বলেছিলেন, এই বিশাল সাম্রাজ্যের কোথাও আমি চলে যেতে চাই। আমি দেখতে চাই, পরিশেষে জনগণ কি সিদ্ধান্ত নেয়।”

তাছাড়াও আবু মেখনাফের মাক্বতালে এমন কিছু পরিদর্শন হয় যা দেখে একজন গবেষক বিপরীতধর্মী বর্ণনা মনে করতে পারে অথবা এটাকে কোন জাল বর্ণনা হিসেবে ধরে নিতে পারে। তারপরো আবু মেখনাফ আমানত রক্ষা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে সব কয়টা বর্ণনাই উল্লেখ করেছেন।

১-৩. বিশেষ পারদর্শিতার পদ্ধতি গ্রহণ

যদিও আবু মেখনাফ ইরাকের ইতিহাস লেখকদের মধ্যে গণ্য এবং অত্র এলাকার বিষয়াবলী সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ, তারপরো তিনি কারবালার ঘটনার ব্যাপারে আশুরার দিনে কারবালার ময়দানে উপস্থিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাদের বক্তব্য নিয়েই ক্ষ্যান্ত হননি বরং এই বৃহৎ ঘটনাকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে প্রতিটি ব্যাপারে প্রত্যক্ষদর্শী ও সর্বোচ্চ মানের অবগত ব্যক্তিদের উপর নির্ভর করেছেন আর তাদের বক্তব্য থেকে উপকৃত হয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কুফা নগরীতে মুসলিম ইবনে আক্বীলের অবস্থানকালের ঘটনাবলী তার সঙ্গী-সাথীদের কাছ থেকে, ওমর ইবনে সা’দের বাহিনীর তৎপরতা ও প্রতিক্রিয়া এবং তার বক্তৃতা, পত্রাবলী, আলোচনা ও পদক্ষেপের ব্যাপারে যারা তার সাথে থেকে পরিদর্শন করেছিল তাদের কাছ থেকে, আবার সাইয়্যেদুশ শুহাদার পদক্ষেপ, ভুমিকা ও বক্তৃতামালা তার সর্ব নিকটতম পরিদর্শক ও সংবাদ পরিবেশকের কাছ থেকে গ্রহণ করে গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন।

১-৪. যথেষ্ট অনুসন্ধান

আবু মেখনাফের মাক্বতালে একটি অন্যতম লক্ষণীয় বিষয় হলো তিনি আশুরার ঘটনার ব্যাপারে গভীর উপলব্ধি রাখতেন। তিনি ভাল করে ও নিগূড়ভাবে অবহিত ছিলেন যে, কারবালার বিপ্লব ইসলামের ইতিহাসে বিশাল ক্ষেত্র ও বিষ্ময়কর সম্মানের স্থান দখল করবে। তাই, তিনি কোন ধরনের পক্ষাবলম্বন ব্যাতিরকেই এ ব্যাপারে সুক্ষাতিসুক্ষ সকল বিষয় লিপিবদ্ধ করতে কুন্ঠাবোধ করেননি। এ দৃষ্টিকোন থেকে তার মাক্বতাল গ্রন্থ উপরোক্ত বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবী রাখে। তিনি এ মহা ঘটনার ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েছেন এবং যথেষ্ট প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করেছেন যা তার গ্রন্থে অন্যতম লক্ষণীয় বিষয়। আবু মেখনাফ এক বা ততোধিক ও বিভিন্ন প্রকার বর্ণনা শ্রবন ও লিপিবদ্ধকরণ অথবা সংক্ষিপ্তকরণ ও প্রমাণহীন বর্ণনা প্রকাশে মনোনিবেশ করেননি। বরং তিনি খুটিনাটি সব বিষয়ে বিস্তারিত লিখার চেষ্টা করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ও বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত কোন কিছুই তার কলমের খোঁচা থেকে বাদ পড়েনি।

১-৫. ইতিহাস লিপির বিধিমালা মেনে চলা

হুসাইনী বিপ্লবের বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা ও কথা বিদ্যমান এবং লেখকবৃন্দ ও বক্তাগণ এ বিষয়ে বহু গ্রন্থ, প্রবন্ধ ও গবেষনা রচনা করেছেন। যাদের মধ্যে অনেকেই এ বিষয়টিকে ইরফান শাস্ত্র অথবা কালাম শাস্ত্রের বিষয়াদি বর্ণনার ক্ষেত্র হিসেবে ধরে নিয়েছেন এবং সেগুলোকে ইতিহাস লিখনীর খাপে ফেলে লিপিবদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছেন, এমন ব্যাক্তিদের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। অনেকেই আবার আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিষয়গুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। সেসব আলোচনার মধ্যে অনেক কিছুই আবার আলে মুহাম্মাদ(সা.) এর মর্যাদার সাথে অসামঞ্জস্য ও কুসংস্কারের আওতায় পড়ে যায়।

আবু মেখনাফের মাক্বতাল গ্রন্থের একটি অন্যতম বিশেষত্ব: হলো ইতিহাস লিপির মধ্যে জ্ঞানগর্ভ পদ্ধতি গ্রহণ এবং বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনায় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ। এটা এমনভাবে করা হয়েছে যে, বিস্তারিত বিবরণ প্রদান সত্তে¡ও বর্ণনার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও অস্বাভাবিক ও বুদ্ধি বহির্ভুত বিষয় লক্ষ্য করা যাবে না। তবে উক্ত বিষয়টির অর্থ অলৌকিকতাপূর্ণ বিষয়াবলীর বর্ণনা থেকে বিরত থাকা নয়। তাই আবু মেখনাফ ইমাম হুসাইনের কিরামত বা অলৌকিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বর্ণনা পেশ করেছেন।

দৃষ্টান্তস্বরূপ আব্দুল্লাহ ইবনে হাওযা তামিমির মৃত্যু সম্পর্কে লিখেছেন যে, সে আশুরার দিনে ইমাম হুসাইনকে অবমাননা করার পর ইমামের অভিশাপের মুখে পড়ে এবং সেই মহুর্তেই তার ঘোড়ার অবাধ্যতার রোষানলে পড়ে মারা যায়। কিন্তু এ বর্ণনাসমূহ- যা বিভিন্ন বর্ণনাকারী থেকে এবং বাহ্যিকভাবে পৃথক পৃথক বর্ণনার মাধ্যমে পেশ করা হয়েছে, কোনক্রমে বিবেক ও বুদ্ধিগত মানদন্ড থেকে দূরে নয়। লেখক সকল ধরনের বর্ননা ও স্বচক্ষে অবলোকনকৃত বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ করেছেন। সর্বোপরি এ বর্ণনাগুলোর সাথে তার পরবর্তি শিয়া ও সুন্নি ঐতিহাসিকদের আশুরার কিছু অস্বাভাবিক ঘটনাবলীর বর্ণনার এক বৃহৎ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

১-৬. ঘটনার কাছাকাছি সময়ে

আবু মেখনাফ নব্বই থেকে এক শত সাতান্ন হিজরী সন পর্যন্ত জীবন যাপন করেছেন যা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার সময়কাল(একষট্টি হিজরী সন) থেকে বেশী সময়ের ব্যবধান নয়। প্রকৃতপক্ষে লেখক ঘটনার অনেক প্রত্যক্ষদর্শী, এমনকি যারা এ মর্মান্তিক ঘটনাতে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন অনেকের সমসাময়িক ছিলেন। কারবালার ঘটনার হাতেগণা এমন কিছু প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনার ময়দানে উপস্থিত এমন কিছু লোক তখনো জীবিত ছিল যাদের কাছ থেকে লেখক আশুরার ঘটনাবহুল বিবরণ মাক্বতালুল হুসাইন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন যা তার এ গবেষনার কাজকে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত করেছে।

১-৭. সর্বমূখী জ্ঞান ও পারিবারিক ভদ্রতা

যে বিষয়টি আবু মেখনাফের মাক্বতালুল হুসাইন-এর বৈশিষ্ট্য নিরূপনে প্রভাবমুক্ত নয় তা হচ্ছে তার সর্বমূখী জ্ঞান ও বংশগত মহত্ব। লেখক হাদিস গবেষনার জগতে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তাই তাকে কুফা নগরীর সেরা মুহাদ্দিস(শাইখুল মুহাদ্দিসিন) বলে আখ্যা দেয়া হয়েছিল। আবার অনেকে আবু মেখনাফকে হিজরী দি¦তীয় শতাব্দির ফকিহ বলে জানতেন। তারা সকলে তার পারিবারিক মহত্বের প্রশংসা করেছেন। তার পিতামহ আল্লাহর রাসূল(সা.) ও আমিরুল মুমিনিন আলী বিন আবি তালিবের সঙ্গী(সাহাবী) হিসেবে পরিগণিত হতেন এবং কিছুদিন ইস্ফাহান এলাকার শাষনকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তার সময়ে তার গোত্র আযুদ-এর অধিকর্তা ছিলেন। নি:সন্দেহে এ সকল বৈশিষ্ট্য তার লেখার দৃঢ়তা, গভীর পর্যবেক্ষনতা ও জ্ঞানগত সমর্থনের পেছনে প্রভাবমুক্ত হতে পারে না।

ইতিহাস লেখকবৃন্দ ও আবু মেখনাফের মাক্বতাল

যেমনিভাবে পূর্বেও ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে যে, আবু মেখনাফের মাক্বতাল গ্রন্থের মূল পান্ডুলিপি পৃথকভাবে অন্যান্য আরো অনেক জ্ঞানগর্ভ পুস্তকের ন্যায় বিনাশ হয়ে গেছে এবং আমাদের হাতে পৌছেনি। তবে মুহাম্মাদ ইবনে জারির তাবারী রচিত বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক-এর ন্যায় মেখনাফের পরবর্তি সময়ের ইতিহাস লেখকদের লেখনিতে মাক্বতাল গ্রন্থের বহু বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে।

বলাবাহুল্য যে, আবু মেখনাফের মাক্বতাল একমাত্র গ্রন্থ নয় যার উপর তাবারী আশুরার মহা ঘটনা বর্ণনায় নির্ভর করেছেন। তিনি কারবালার বিদ্রোহের পরিচয়ের জন্যে বিভিন্ন বর্ণনাকারী ও অন্যান্য আরো বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন। এ ধরনের একটি বর্ণনা হচ্ছে আম্মার দাহানী থেকে বর্ণিত বিবরণ, যা আবু মেখনাফের বর্ণনার পূর্বে তাবারীর লেখনিতে স্থান পেয়েছে। আবু মেখনাফের বর্ণনায় শ্যামে সংঘটিত ঘটনার বিবরণ সংক্ষিপ্তাকারে এসেছে। কিন্তু তাবারী তার গ্রন্থে হিশাম থেকে কয়েকটি বর্ণনাসহ এ ক্বিয়ামের বিভিন্নমূখী ঘটনার বিবরণ প্রায় পরিপূর্ণভাবে পূণ:আলোচনা করেছেন।

আবু মেখনাফের মাক্বতাল থেকে আহলে সুন্নাতের বিখ্যাত ইতিহাস লেখক মুহাম্মাদ ইবনে জারীর তাবারীর বর্ণনার মাধ্যমে আশুরার ঘটনা বর্ণনায় মাক্বতাল¬-এর দৃঢ় অবস্থানের সুস্পষ্টতা প্রমাণ হয়। যদিও সঠিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি যে, তাবারী যা বর্ণনা করেছেন তা কী মাক্বতাল-এর সবটুকু, নাকি তিনি তার নিজস্ব, স্বভাবগত ভাবধারা ও নির্বচিতকরণ পদ্ধতি অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করেছেন, নাকি সম্ভবত: তিনি সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করেছেন।

আবু হানিফা দিনাভারী(মৃত্যু:২৮২হি.) হচ্ছেন আহলে সুন্নাতের অন্যতম ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদ, যিনি হুসাইনী আন্দোলনের ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ করেছেন। তিনি তাঁর আখবারুত ত্বাওয়াল গ্রন্থে ইমাম হুসাইনের শাহাদাত প্রসঙ্গে যা উল্লেখ করেছেন তার সাথে আবু মেখনাফের মাক্বতালের তেমন কোন পার্থক্য নেই। যদিও বসরা নগরীর জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রেরীত ইমামের পত্রের বিষয়ে বর্ণনা, পহেলা মহররম রোজ বুধবার কারবালাতে হযরতের পদার্পন, কারবালাতে তৃতীয় মহররমে উমার ইবনে সা’দের প্রবেশ ছাড়াও ইমামের কাছে মুসলিম ইবনে আক্বীলের পত্র হস্তান্তর ও তাঁর যাত্রার বিষয়গুলোতে আবু মেখনাফের রিপোর্টের সাথে সামান্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তদ্রæপ তিনি আসরের সালাতের পর পূর্বের বক্তব্যসমূহের ন্যায় হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহীর সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যে ইমামের বক্তৃতার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

ঐতিহাসিক দ্বিতীয় ধারা ও আবু মেখনাফের সাথে সঙ্গতিঃ

আশুরা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক উৎসসমূহের দ্বিতীয় সিঁড়ি যা আহলে সুন্নাতের বিশ্বস্ত এবং তথ্যসমূহ গ্রহণের ক্ষেত্রে যেদিকে রুজু করা হয় এমনসব উৎস যেখানে সরাসরী অথবা অসরাসরীভাবে বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ আবু মেখনাফের নাম সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।  যদিও পর্যবেক্ষনীয় সামান্য একটু দৃষ্টিই বলে দেয় যে, সার্বিকভাবে বর্ণনাগুলো সংক্ষিপ্তাকারে ও সামান্য হস্তক্ষেপসহ পেশ করা হয়েছে, যেখানে আবু মেখনাফ ও আশুরার ঘটনার অন্যান্য প্রথামিককালের বর্ণনাকারীদের কাছ থেকে উপকৃত হয়েছেন এবং এক ধরনের সংক্ষিপ্তকরণের মাধ্যমে আশুরার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

এ পর্যায়ের উৎসসমূহের রিপোর্ট আবু মেখনাফের নিরপেক্ষ ও প্রামাণিক রিপোর্টের সাথে কোন প্রকার বিরোধীতা রাখে না এবং মনযোগের সাথে পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে এসকল রিপোর্টের বিভিন্নমুখী বিষয়াবলীর মাঝে বিস্তারিত ও সংক্ষিপ্তকরণ অথবা পরিপূর্ণতা দানের লক্ষ্যে কোন একটি বিষয়ে কিছু লুকায়িত বিষয়ের অবতারণা এবং কোন একটি বিষয়ের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্বারোপ প্রদান ব্যাতিত তেমন কোন পার্থক্য তাদের মাঝে দৃষ্টিগোচর হয় না।

এটাই শেষ নয়, দিনাভারীর  গ্রন্থের উপর আরেকটি আপত্তি হচ্ছে যে, মক্কা থেকে কুফা ও কারবালার পথে ইমামের বক্তৃতাসমূহ বর্ণনা থেকে বিরত থাকা। তাছাড়া, এ গ্রন্থে ইমাম হুসাইনের একজন পুত্রের নাম ভুলক্রমে উমার ইবনে হুসাইন উল্লেখ করা হয়েছে। সম্ভবত: সে নামটি উমার ইবনে হাসান হবে। তদ্রæপ সাইয়্যেদুশ শুহাদার শাহাদাতের পরবর্তি ঘটনাসমূহ অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করা হয়েছে। দিনাভারী তাঁর গ্রন্থে উদ্ধৃত বিষয়ের উৎস বর্ণনা করেননি। সম্ভবত: আবু মেখনাফের কাছ থেকে গুরুত্বহীনতার সাথে ও ভাবধারা গ্রহণ করে তার বর্ণনা করেছেন। যদিও লেখকের হাতে আবু মেখনাফ ব্যতিত অন্যান্য উৎসের অস্তিত্বের উপস্থিতিকে পরিপূর্ণভাবে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

ইবনে ক্বুতাইবা দিনাভারী(২২৩-২৭৬হি.) এর একটি গ্রন্থের নাম আল ইমামাহ্ ওয়াস সিয়াসাহ্।  লেখক এ গ্রন্থে ইমাম হুসাইনের ক্বিয়ামের পটভুমিসমূহ ও আশুরার দিনের ঘটনাসমূহ বর্ণনা করেছেন। তবে তার গ্রন্থে প্রচুর ত্রæটি ও বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয় এবং আশুরার দিনের অধিকাংশ ঘটনা স্থান পরিবর্তন করে বর্ণনা করা হয়েছে অথবা স্পষ্ট ভুল তথ্য পেশ করা হয়েছে যা আবু মেখনাফের ন্যায় বিশ্বস্থ উৎসসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাতের মাধ্যমে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে উঠে।

আহমাদ ইবনে ইয়াহইয়া বালাযুরী(মৃত্যু:২৭৯হি.) হচ্ছেন একজন অন্যতম ইতিহাসবিদ- যিনি তার গ্রন্থের মাঝে “হুসাইন ইবনে আলীর জীবনী” নামক অধ্যায়ে ইমামের বিদ্রোহ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। উল্লেখিত রিপোর্টের অধ্যয়ন ও পর্যালোচনাও পরিস্কার করে দেয় যে, তিনি তার রিপোর্টসমূহ ও বর্ণনাগুলোর ক্ষেত্রে আবু মেখনাফের রিপোর্টের উপর নির্ভর করেছেন। যদিও দেখা যায় তার রিপোর্টের কিছু বিষয় আবু মেখনাফের রিপোর্ট থেকে গ্রহণ করা হয়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার নির্দেশে ইবনে যিয়াদের মাধ্যমে কুফার জনগণের বেতনভাতা শতকরা একশত ভাগ বৃদ্ধি,  নুখাইলাহ্ নামক এলাকায় জনগণকে জমায়েত করে তাদেরকে সৈন্যশিবিরে প্রেরণ প্রভৃতি বিষয়সমূহের অবতারণা উক্ত গ্রন্থে করা হয়েছে যা মূল বিষয়কে আঘাতপ্রাপ্ত করে না। পরিশেষে এটাই বলা যায় যে, বালাযুরী তার আল আনসাব আল আশরাফ গ্রন্থে আবু মেখনাফের বর্ণনার উপর নির্ভর করেছেন এবং তার মাক্বতাল থেকে বিভিন্ন বিষয় বর্ণনা করেছেন। তবে কুফার দিকে ইমামের যাত্রা করার ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে উমারের নিষেধ সংক্রান্ত বর্ণনাটি তার গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে, যা থেকে প্রমাণ হয় যে, লেখকের কাছে আবু মেখনাফের মাক্বতাল ছাড়াও অন্য কোন উৎসগ্রন্থ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু পরিমান ও বৈশিষ্ট্যতার দিক থেকে আবু মেখনাফের মাক্বতালের সাথে কোন তুলনাই চলে না।

আহমাদ ইবনে আবি ইয়াক্বুব ইয়াক্বুবি(মৃত্যু:২৮৪হি.)

ইয়াক্বুবির ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ তারিখে ইয়াক্বুবি নামে খ্যাত। তিনি ঐ গ্রন্থে অত্যন্ত সংক্ষিপ্তাকারে ইমাম হুসাইনের বিদ্রোহ ও তাঁর শাহাদাত সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করেছেন। শুধুমাত্র যে একটা বিষয়ে এ গ্রন্থ আবু মেখনাফের গ্রন্থ থেকে সতন্ত্র করে তোলে তা হচ্ছে কুফা নগরীতে ইমাম সাজ্জাদের ভাষন। এ বক্তব্যে সরাসরীভাবে কুফার জনগণের প্রতি তিরস্কার করা হয়েছে: “এ যে তারা আমাদের জন্যে ক্রন্দন ও বিলাপ করছে, কারা আমাদেরকে হত্যা করেছে?” এ বিষয়টি আবু মেখনাফের মাক্বতালে নেই, যা ইয়াক্বুবি অবতারণা করেছে। ইয়াক্বুবির গ্রন্থে উপরোক্ত বিষয়টি ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে আবু মেখনাফ কর্তৃক রচিত বিষয়াবলীর সাথে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় না।

উপসংহারঃ

আবু মেখনাফ এবং তাবারী, ইয়াক্বুবি, মাসউদি, দিনাভারী ও মাসউদির ন্যায় পরবর্তি ইতিহাসবিদগণের আলোচিত বিষয় পর্যালোচনা ও পারস্পরিক তুলনামূলক গবেষনার দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, এসকল সুত্রসমূহ পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর আশুরার ঘটনা বিবরণে এসব উৎসসমূহের মধ্যে তেমন কোন তারতম্য বিদ্যমান নেই। যে সকল ঘটনার বর্ণনা উক্ত সুত্রসমূহে উল্লেখিত হয়েছে যা আবু মেখনাফের মাক্বতালে নেই তা আবু মেখনাফের রিপোর্ট ও তার তথ্য প্রকাশের বিধিমালার সাথে তেমন একটা পার্থক্য নেই। যদিও আবু মেখনাফের পরের ইতিহাস লেখকদের রিপোর্ট প্রকৃত ও সার্বিকতার আলোকে আবু মেখনাফের মাক্বতালের উপরই নির্ভরশীল। দৃষ্টান্তস্বরূপ অন্যান্য ইতিহাস লেখকদের ন্যায় ইযযুদ্দিন ইবনে আসির, তাবারী ও তার ইতিহাস গ্রন্থের অনুকরণে আল কামেল ফি আত্ তারিখ সংকলন ও রচনা করেছেন। তেমনিভাবে তাবারীও আপাতত: দৃষ্টিতে পরিপূর্ণভাবে আবু মেখনাফের মাক্বতাল গ্রন্থ থেকে কারবালার ঘটনা বর্ণনায় উপকৃত হয়েছেন। কেননা, তাবারীর সময়কাল অবধি আবু মেখনাফের মাক্বতাল গ্রন্থ অবশিষ্ট ছিল। এর কারণ হচ্ছে, তাবারী ঐ একই খন্ডে ৩৮নং পৃষ্ঠায় উপরোক্ত বিষয় বর্ণনার শেষে “মাক্বতালের শেষে” বাক্যটি উল্লেখ করেছেন যা থেকে প্রমাণিত হয় যে, তিনি মাক্বতাল গ্রন্থের মূল পান্ডুলিপি ব্যবহার করেছেন। তদ্রæপ এ বিষয়ে ইবনে খাল্লাকান, তাবারীর সম্পূর্ণ রিপোর্টটি আবু মেখনাফের সুত্র থেকে কোন রকম পরিবর্তন ব্যাতিরকেই বর্ণনা করেছেন।  তাবারীর রচনা সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছে: “তার তারিখ নামক গ্রন্থ প্রথম থেকেই সর্বসাধারণের জন্যে গ্রহণযোগ্য হয়।” এ ধরনের গ্রহণযোগ্যতা আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে সংক্ষিপ্ততা, বর্ণনার সুত্র ও ভারসম্যতার দৃষ্টিকোন থেকে তার গ্রন্থের  বৈশিষ্টতার প্রতিই দিক নির্দেশ করে। এ গ্রহণযোগ্যতার কারণে পরবর্তি ইতিহাস লেখনিসমূহ তাবারীর রচনার উপর নির্ভর করেছে এবং কখনো তাদের লেখনিতে সংক্ষিপ্তাকাওে তা সংকলিতও হয়েছে। ইবনে মিসকাভেই, ইবনে আসির ও ইবনে কাসির এ ধরনের কাজের অবতারণা করেছেন।   কারবালার বিপ্লবের বিষয়ে আবু মেখনাফের মাক্বতাল গ্রন্থ থেকে অন্যান্য সুত্রসমূহও উপকৃত হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ আবুল ফারাজ ইসফাহানীর মাক্বাতিলুত ত্বালিবিন, ইবনে আ’সাম কুফির আল ফুতুহ ও অন্যান্য সুত্রসমূহ। আহলে সুন্নাতের পক্ষ থেকে তাদের উপর শিয়াপন্থি হিসেবে অপবাদের কারণে আমরা তাদের বর্ণনা থেকে বিরত থাকছি।

আম্মার দাহনীর জাল রিপোর্ট এর উপর সামান্য বিশ্লেষন

যে সকল সন্দেহজনক ও জালকৃত রিপোর্ট বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎসমসূহে অনুপ্রবেশ করেছে এবং এর কারণে বিভিন্ন উৎসে আশুরার ব্যাপারে নেতিবাচক ধারনা ও বৈপরীত্যের সৃষ্টি হয়েছে তাদের মধ্যে আম্মার দাহনীর প্রতিবেদন অন্যতম।  তাবারী এ রিপোর্টটি ইমাম হুসাইনের শাহাদাত ও আশুরার ঘটনা সম্পর্কে তার বর্ণিত রেওয়্যাত ও বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় স্থান দিয়েছেন। জ্বী, এক স্থানে নয়, বরং বিক্ষিপ্তভাবে তিনি সেই তথ্যের বিভিন্ন অংশ বর্ণনা করেছেন, যা আশুরার ঘটনা অনুধাবনে বিপরীতমূখী বোধগম্যতা ও ভুল উপলব্ধিতে উৎসাহিত করেছে।

এ বর্ণনাটি যদিও ইমার বাক্বির- যিনি কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার অবশিষ্ট ব্যক্তি ও সাক্ষীদের অন্যতম ছিলেন, তাঁর সুত্রে বর্ণিত হয়েছে, তারপরো এতে অনেক আপত্তিকর বিষয় রয়েছে। আম্মার দাহনী ইমামের কাছ থেকে এমনভাবে আশুরার রিপোর্ট পেতে চায় যেমনিভাবে তিনি সেখানে উপস্থিত থেকে বর্ণনা করছেন। তাবারীও সেটা ইমামের মূখ থেকে ৬১হিজরীর ঘটনাসমূহের অধ্যায়ে প্রায় চার পৃষ্ঠায় এবং দু’টি অংশে বর্ণনা করেছেন।  যেমনিভাবে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, এ রিপোর্টটির অভ্যন্তরে বিদ্যমান আপত্তিকর বিষয় প্রচুর, যার কারণে ইমাম বাক্বেরের সূত্রে বর্ণিত হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহজনক করে তোলে। আর এ জন্যেই সেই তথ্যের উপর বিশ্বাস করা যায় না এবং আশুরার ঘটনাসমূহ ও এ মহাবিপ্লবের পটভ‚মি ও কারণসমূহ সম্পর্কে অবগত হতে তা উপকারী প্রমাণ হতে পারে না। কেননা:

ক) মদিনার গভর্নরের কাছে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার পত্র- যেখানে ইমাম হুসাইনের বাইয়াত গ্রহণের ব্যাপারে বিশেষ জোড় দেয়া হয়েছিল এবং ইতিহাসের বিভিন্ন সুত্রে তা নিশ্চিত করা হয়েছে, সে সমন্ধে উক্ত বর্ণনায় কোন উল্লেখই করা হয়নি।

খ) হুর ইবনে ইয়াযিদ আর রিয়াহী যিনি ইবনে যিয়াদের পক্ষ থেকে এক হাজার সৈন্যসহ হুসাইনী কাফেলাকে অবরুদ্ধ করেছিল এবং কুফা শহরে প্রবেশে বাধা দিয়েছিল, তার ব্যাপারে এমন রিপোর্ট দেয়া হয়েছে যেখানে না তাকে একজন সেনাপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে- যিনি ইমাম হুসাইনের বিরোদ্ধে এক বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছিলেন, না তার সাথীদেরকে একশত সশস্ত্র সৈন্য ও হুসাইনী কাফেলার নিয়ন্ত্রনকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যে বিষয়টি ইতিহাস লেখনীতে জোড় তাগিদের সাথে বর্ণিত হয়েছে।

গ) আম্মার দাহনীর প্রতিবেদনে যে সকল কথা হুর ইবনে ইয়াযিদ আর রিহায়ী সম্পর্কে বলা হয়েছে তা অন্যান্য বর্ণনাকারীদের রিপোর্টে বনি আকরামার ঐ মুসাফির সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কুফা থেকে আগমন করেছিল। দাহনী সে রিপোর্টে বলেছে: “(হুর ইবনে ইয়াযিদ রিয়াহী) ইমামের সাথে সাক্ষাতের পর বলেছে, ফিরে যান, কুফা নগরীতে আপনার মঙ্গল লক্ষ্য করা যাচ্ছে না…”। দাহনীর বর্ণনাকে বিশ্বাস করলে এ চিত্র ফুটে উঠে যে, হুর ইবনে ইয়াযিদ উল্লেখিত ব্যক্তির ন্যায় একজন মুসাফির ছিল অথবা কবি ফারাযদাক্বের ন্যায় ঘটনাক্রমে ইমামের কাফেলার যাত্রাপথে সাক্ষাত ঘটেছিল। অত:পর কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি ইমামকে উপদেশ দিয়েছেন।

ঘ) দাহনীর রিপোর্টে হুরের সাথে সাক্ষাতের পর ইমাম হুসাইন উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখী হন। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে এ ঘটনার কারণে ইমাম হুসাইন কুফার পরিবর্তে কারবালার দিকে যাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অথচ আশুরার ইতিহাসের একটি নিশ্চিত বিষয় হলো যে, হুর ও তার সৈন্যবাহিনীর কারণে ইমাম এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ঙ) দাহনীর বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম বাক্বেরের রিপোর্টও আপত্তির সমুক্ষীন ও প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং এ ধরনের রিপোর্টকে ইমাম বাক্বেরের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে জানা এবং তার সুত্রে বর্ণনার বিষয়টি অসম্ভব করে তোলে।

আবু মেখনাফ রচিত মাক্বতালুল হুসাইন এর ধারাবাহিকতায়ঃ

আহলে সুন্নাতের মাঝে কারবালার বিপ্লবের তথ্য সরবরাহের বিষয়ে অন্য একটি ইতিহাসের ধারা ও প্রভাবশীল লেখনী কাতেবে ওয়াক্বেদী বলে খ্যাত মুহাম্মাদ ইবনে সাদ এর রচনাতে নিহিত রয়েছে। আপাতত দৃষ্টিতে এটাই মনে হয় যে, আশুরার ঘটনা সম্পর্কে ইবনে সা’দের রিপোর্টটি তার শিক্ষক ওয়াক্বেদীর বর্ণনা এবং লেখকের নিজস্ব ভাবধারা ও উপলব্ধির সম্মিলন ও সংমিশ্রন হতে পারে। ইবনে সা’দ রচিত আত্ তাবাক্বাতুল কুবরা নামে যে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে সেখানে উক্ত বিষয়টির কোন অবতারণা করা হয়নি এবং বইয়ের বাজারে বিদ্যমান আত্ তাবাক্বাত গ্রন্থটি এ অংশটি ব্যাতিরকেই মুদ্রায়িত করা হয়েছে। তবে মরহুম গবেষক আব্দুল আযিয তাবাতাবায়ী উক্ত গ্রন্থটির মূল ও পুরাতন হস্তলিপি খুজে পেয়েছেন, যেখানে একটি অধ্যায় মাক্বতালুল হুসাইন নামে লিপিবদ্ধ ছিল। সম্মানিত গবেষক এ অধ্যায়টিকে একটি পৃথক গ্রন্থাকারে উক্ত নামেই প্রকাশ করেছেন যা সর্বসাধারণের হাতের নাগালেই বিদ্যমান আছে।

আমরা আগামীতে বলবো, যে সকল আহলে সুন্নাতের অনুসারী ইমাম হুসাইনের বিদ্রোহ ও তাঁর পবিত্র শাহাদাতকে বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন অথবা উক্ত ঘটনার সাথে সম্পর্কীত বিভিন্ন বিষয়কে তাহরীফ করেছেন তারা মুহাম্মাদ ইবনে সা’দের এ তাবাক্বাত গ্রন্থকে পুজি করেছেন অথবা ইবনে সা’দের বর্ণনায় প্রভাবিত ঐতিহাসিকদের লেখনী থেকে উপকৃত হয়েছেন। এ কারণে ইবনে সাদের রিপোর্টের বিভিন্ন বিষয় অবতারণা এবং পর্যালোচনা  যুক্তিযুক্ত মনে করছি।

মুহাম্মাদ ইবনে সাদের লিখন পদ্ধতিঃ

ইবনে সাদ তার বিখ্যাত গ্রন্থ আত্ তাবাক্বাতুল কুবরাতে একজন জীবনী লেখক হিসেবে প্রকাশিত হয়েছেন। উক্ত গ্রন্থটিতে রাসূলের সাহাবীগণ, তাবিয়ীন ও খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবনী পর্যায়ক্রমে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং লেখক জীবনী লেখনীর দৃষ্টিতে বিভিন্ন ঘটনার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন যার অন্যতম হচ্ছে আশুরার ঘটনা। তিনি বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনায় পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করার অধিকার প্রয়োগ করেছেন। যদিও এ বিষয়টি সত্য উপলব্ধি ও আমানত রক্ষার সাথে সামঞ্জস্য নয়।

আর এ কারণেই ইবনে সা’দের দৃষ্টিভঙ্গি ও রিপোর্ট তাদের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে যারা তাদের রচনাসমূহে উপরোক্ত দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করেছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ ইবনে আসাকের-এর তারিখে দামেস্ক, ইবনে কাসির-এর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে হাজার-এর আল ইসাবা, যাহাবী-এর তারিখুল ইসলাম ও সিয়ারু আ’লামিন নুবালা গ্রন্থদ্বয়, ইবনে হাজার-এর তাহযীবুত তাহযীব, মাযি-এর তাহযীবুল কামাল উল্লেখযোগ্য।

ইবনে সাদের প্রতিবেদন ও তার উপর আরোপিত আপত্তিসমূহের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপঃ

আশুরার ঘটনা ও তার পরবর্তি ঘটনা বর্ণনায় ইবনে সাদের সম্পূর্ণ প্রতিবেদনে- যা মাক্বতালুল হুসাইন নামে বিদ্যমান, তাতে অনেক আপত্তিমূলক বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে, যার অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করছি:

১। অনবগত বর্ণনাকারীদের উপর নির্ভরতা

আবু মেখনাফ ও তাবারীর বিপরীতে ইবনে সা’দ তার বর্ণনার সুত্রসমূহ অনুল্লেখিত রেখেছেন এবং তিনি নির্ণয় করেননি যে, এ মহা ঘটনা সম্পর্কে উক্ত বর্ণনা কোন ব্যক্তি ও কয়জনের মাধ্যম দিয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি তার গ্রন্থের শুরুতে তার শ্রবনকৃত বর্ণনাকারীদের নাম ও তার শিক্ষক ওয়াক্বেদীর নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি সামগ্রিকভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইমাম হুসাইন ও আশুরার মহা ঘটনা উক্ত ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে শ্রবন করেছেন।

উল্লেখিত বর্ণনাকারীদের জীবন বৃত্তান্তের উপর সামান্য দৃষ্টিপাত করলেই পরিস্কার হয়ে যায় যে, তাদের মধ্যে কেউ আশুরা সংক্রান্ত ঘটনাসমূহ যেমন মুসলিম ইবনে আক্বিলের শাহাদাত, কারবালায় ইমাম হুসাইনের প্রবেশ, হুর ইবনে ইয়াযিদ আর রিয়াহীর বাহিনীর মুখোমুখী অবস্থান এবং কারবালাতে ইমাম হুসাইনের কাফেলার প্রবেশের পর বিভিন্ন ঘটনা- বিশেষ করে আশুরার দিন এবং ইমাম হুসাইন ও তার সঙ্গীদের শাহাদাত, আর ইমামের কাফেলার অবশিষ্ট ব্যক্তিদের বন্দিত্বের ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন না এবং এ ধরনের কোন বিষয়ের সাক্ষী তারা ছিলেন না। আশুরার ঘটনার ব্যাপারে ইবনে সা’দের অধিকাংশ বর্ণনাকারীদের এহেন পরিদর্শনহীনতা তাদের সঠিক তথ্য প্রদান ও নিখুত রিপোর্ট এর বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এ সকল কিছু অন্য কোন কারণ ও বিষয় ব্যাতিরকেই আবু মেখনাফের বিপরীতে এ ধরনের বর্ণনাসমূহকে ক্ষতিগ্রস্থ ও বিশ্বাসহীন করে দেয়।

২। আভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য

ইবনে সাদের রিপোর্ট, বর্ণনাকারীদের কোন প্রকার সত্যতা অথবা মিথ্যাবদিতা এবং উমাইয়্যা শাষকদের দরবারের সাথে সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত ছাড়াই বিভিন্ন বিষয়ে আভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য ও প্রকাশ্য বিষয়ভিত্তিক দৈন্যতার সমুক্ষীন। এ বৈশিষ্ট তাদের অবস্থান নিচে নামিয়ে এনেছে এবং বর্ণনাসমূহ ভেজাল ও অবিশ্বস্থতার মুখে স্থাপন করেছে:

ক) ইয়াযিদের আপোষ মনোভাব নাকি দু:সাহসিকতা?

ইবনে সা’দের বর্ণনায় এসেছে যে, ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া মদীনার গভর্নর ওয়ালিদকে হুসাইনের সাথে ভাল ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন; কেননা আমিরুল মুমিনিন মুয়াবিয়া এরকমটিই করতে বলেছেন আর ওয়ালিদ-ই হুসাইনের সাথে কড়া আচরণ করেছে। অথচ অন্যদিকে ইবনে সা’দ তার গ্রন্থের অন্যত্র স্বীকার করেছেন যে, ইয়াযিদ নির্দেশ দিয়েছিল কোন রকম ছাড় ব্যাতিরকেই ইমাম হুসাইনের কাছ থেকে তার পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ শুরু করতে এবং ইমামের বিষয়টা শেষ করার পর আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবাইর ও আবদুল্লাহ্ ইবনে উমারের ন্যায় অন্যান্য বিরোধীদের দিকে মনযোগ প্রদান করতে।

খ) মারওয়ান ইবনে হাকামের কাহিনী

মারওয়ান ইবনে হাকাম ছিল সব সময়ের জন্যে আহলে বাইতের একজন অন্যতম শত্রæ। আর ইবনে সাদও এ বিষয়টি স্বীকার করেছেন। হুসাইন ইবনে আলীর কাছ থেকে মদীনার গভর্নর ওয়ালিদের বাইয়াত প্রার্থনার ঘটনায়- যেখানে ওয়ালিদ ইমামের স্পষ্ট প্রতিবাদের সমুক্ষীন হয়েছিল, সেখানে এই মারওয়ানই ছিল- যে ব্যক্তি কোন প্রকার ধৈর্য্য ও বিবেচনা ব্যাতিরকে ইমাম হুসাইনকে হত্যার বিষয়টি উচ্চারণ করেছিল আর সেখানেই মারওয়ান ইমাম হুসাইনের জীবন ইয়াযিদের হুকমতের জন্যে হুমকী হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

এহেন অবস্থায়ও ইবনে সাদ বিবরণী পেশ করছেন যে, মারওয়ান ইবনে হাকাম ও আমর ইবনে সাঈদ, ইবনে যিয়াদকে পত্র লিখেছিলেন যেনো ইমাম হুসাইনের সাথে ভাল ব্যবহার করা হয়!! এ বিষয়টি ঐ বিষয়টির সাথে সাংঘর্ষিক যা মদীনাতে ওয়ালিদের গভর্নরের প্রসাদে করা হয়েছিল। অথচ অন্য কোন ঐতিহাসিক উৎসে এ ধরনের ভাল ব্যবহার ও মারওয়ানের পত্রালাপের বিবরণ লক্ষ্য করা যায় না।

৩। ইতিহাসের সুনিশ্চিত বিষয়ের বিরোধীতা

ইবনে সা’দের প্রতিবেদনে এমনসব বিষয় ও আলোচনা স্থান পেয়েছে যা আশুরা সমন্ধে অন্যান্য শিয়া-সুন্নী প্রতিবেদনসমূহ তো সমর্থন করেই না, বরং সেগুলো ইবনে সা’দের ঐ সকল প্রতিবেদনের বিরোধীতা করে, যা ঐতিহাসিক সুনিশ্চিত বিষয়াবলী ও সন্দেহাতীত বর্ণনাসমূহের সাথে সাংঘর্ষিক। সেসব প্রতিবেদনসমূহের খুটিনাটি বিষয় এবং ইতিহাসের সুনিশ্চিত বিষয়াবলীর সাথে বিরোধীতার প্রমাণসমূহ উপস্থাপন উপস্থিত সময়ের চেয়ে আরো বেশী সুযোগের প্রয়োজন। তবে এ পর্যায়ে কিছু বিষয়ের অবগতির জন্যে কয়েকটি দৃষ্টিান্তের উপস্থাপনই যথেষ্ট মনে করছি:

ক) মক্কায় আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমারের উপস্থিতি

বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎসসমূহে রিপোর্ট প্রদান করা হয়েছে যে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার ইবনুল খাত্তাব ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া ও তার খেলাফতের বিরোধীদের অন্যতম ছিল এবং যখন বাইয়াত গ্রহণের বিষয়ে ইয়াযিদের পত্র ওয়ালিদের কাছে পৌছে তখন ইবনে উমার ও অন্যান্য বিরোধী ব্যক্তিবর্গ মদীনাতেই অবস্থান করছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে সা’দ তার প্রতিবেদনে লিখেছেন যে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং তিনি শুধুমাত্র ইয়াযিদের খেলাফতের সমর্থকই ছিলেন না এবং শুধুমাত্র খেলাফতের জন্যে ইয়াযিদকে যোগ্যই মনে করতেন না বরং ইসলামে একটি নতুন পদ্ধতি সৃষ্টিতে মুয়াবিয়া কর্তৃক বেদয়াতের প্রতি তার পূর্ণ সমর্থন ছিল -যা খেলাফতকে বংশীয়করণ এবং ইয়াযিদের ন্যায় ব্যক্তিকে পরবর্তি খলিফা হিসেবে নিয়োগ দান করেছে। এ কারণে মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তনের পর মদীনার পথে “আবওয়া” নামক স্থানে ইমাম হুসাইনের সাথে- যিনি মক্কা পানে যাত্রা করেছিলেন, সাক্ষাৎ ঘটে। সেখানে তিনি ইমাম হুসাইনকে ইয়াযিদের বিরোদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে নিষেধ করেন এবং বলেন: “আপনি আল্লাহর রাসূলের সন্তান। তিনি আখেরাতকে দুনিয়ার উপরে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আর এ কারণেই আপনি [তাঁর পন্থা বিবর্জিত পথে পদক্ষেপ নিবেন না। ইরাকের দিকে আপনার যাত্রা দুনিয়া লাভের জন্য, আর এ জন্যে] দুনিয়া অর্জন করতে পারবেন না।” ইবনে উমার ইমাম হুসাইনের কাছে আবেদন করেছিলেন যেনো ইরাকের দিকে যাত্রা না করেন। পরিশেষে  ইবনে উমার ইমামের কাছ থেকে সিক্ত নয়নে বিদায় নিলেন।

খ) জনাব যুহাইর-এর কৃতদাসের হাতে ইমাম হুসাইনের পবিত্র মৃতদেহ সমাধিস্থকরণ!

ইবনে সাদ তার প্রতিবেদনে এভাবে লিখছেন যে, যুহাইর-এর স্ত্রী তার কৃতদাসকে বল্লো:“যাও! তোমার মনিবের লাশ দাফন করে আসো। দাস যখন কারবালায় পৌছে তখন সে দেখতে পায় যে, ইমাম হুসাইনের লাশ কোন কাফন ব্যাতিরকেই মাটির উপরে পড়ে আছে। সে নিজেকে প্রশ্ন করলো, ইমাম হুসাইনের পবিত্র দেহ সমাধিস্থ না কওে আমি আমার মনিবের লাশ দাফন করবো? না, কখনোই না।” আর এ জন্যে দাস ফিরে গেলো। যুহাইরের স্ত্রী খুশি হয়ে আরেকটি কাফনের কাপড় তার হাতে তুলে দিলো। দাস চলে গেলো এবং দুটি লাশকেই কাফন পড়ালো এবং সমাধিস্থ করলো।

এ রিপোর্টটি অন্য কোন ইতিহাসের উৎসে উল্লেখ হয়নি এবং সকল উৎসসমূহ একমত যে, বনি আসাদ গোত্র- যারা ফোরাত নদীর উপক‚লে বসবাস করতেন, তারা এসে কারবালার শহীদদের লাশ দাফন করেছেন। যিনি কুফা থেকে কারবালায় পৌছেছেন এবং সাইয়্যেদুশ শুহাদার পবিত্র দেহ দর্শনে কুফাতে ফিরে যায় আর পুনরায় কারবালা এসে নতুন আরেকটি কাফনের মাধ্যমে ইমামকে দাফন করেছেন, তিনি যুহাইর-এর গোলাম নন। উক্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা বিরাজমান যা প্রতিবেদনের সঠিকত্বকে সন্দেহযুক্ত করে তোলে।  তার একটি হচ্ছে: কেনো এ কৃতদাস অন্য শহীদান সম্পর্কে কোন তথ্য সরবরাহ করছেন না এবং তাদের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ অন্তত:পক্ষে কথায় ও আবেগের বশবতী হয়েও কোন কিছু প্রদর্শন করছেন না? তিনি কিভাবে শহীদ ইমাম হুসাইকে চিহ্নিত করলেন, তখন তো ইমামের গায়ে কোন পোশাক ছিল না আর ইমাদের দেহের সাথে মাথাও ছিল না? কেনো ইবনে সা’দ ব্যতিত অন্য সব ইতিহাস লেখক, জীবনী লেখক, কাহিনী লেখক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, ইমাম হুসাইনের পরিবার পরিজনের কাছে যুহাইরের কৃতদাসের বিষয়টি গোপন রইলো? আর কোন হাদিস, রেওয়্যাত ও যিয়ারতনামাগুলোতে তাদের ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত এবং মা’সুম ইমামদের কাছ থেকে কোন প্রকার প্রশংসামূলক বক্তব্য আসলো না কেনো?

গ) আম্মার দাহনী ও কাবুল আহবার-এর পক্ষ থেকে প্রমাণ উপস্থাপন

ইবনে সাদ অধম্মার দাহনী আর তিনি কাবুল আহবারের নিকট থেকে বর্ণনা করছেন যে একদা আলী যখন একদল লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন কা’বুল আহবার তাদের মাঝে ছিল। কাব আলীকে দেখে বল্লো: এ লোকের এক সন্তান তার সঙ্গীদেরসহ নিহত হবে এমনভাবে যে তাঁর ঘোড়াগুলোর ঘাম শুকানোর আগেই মুহাম্মাদ(সা.) এর কাছে পৌছে যাবে। অত:পর হাসান তাদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করলেন। কা’বকে প্রশ্ন করা হলো, সে-ই ব্যক্তি কী এ লোকটি? কা’ব উত্তরে বল্লো: না, উনি নন। কিছুক্ষন পর হুসাইন অতিক্রম করলো। কা’বের কাছে পূর্বের প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, জ্বী, উনিই সেই ব্যক্তি।

ইবনে সাদের এ প্রতিবেদনে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিদ্যমান যা কারবালার ঘটনার বিষয়ে ভবিষ্যতবাণীর বর্ণনা তার অমনযোগ, অসততা ও কপটতারই বহি:প্রকাশ:

১. কাব কিভাবে এ তথ্য আবিস্কার করেছিলো, তিনি কী অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞানী ছিলেন এবং ভবিষ্যতের খবর জানতেন?

২. কাব ৩২ হিজরীতে এবং ওসমানের খেলাফতকালে ইহলোক ত্যাগ করেন এবং আম্মার দাহনী হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জীবন যাপন করতেন। সুতরাং তাদের দুই জনের মাঝে প্রায় একশত বছর দুরত্ব ছিল। কিভাবে কাবের কাছ থেকে দাহনী বর্ণনা করতে পারে? আর মারফু(যে বর্ণনাতে মূল বর্ণনাকারী ছাড়া মাঝখানের বর্ণনাকারীদের নাম উল্লেখ করা হয় না) পদ্ধতির বর্ণনা কোন দলীল হিসেবে গণ্য হয় না।

৩. কাব ইমাম আলীর বিরোধী ও শত্রæদের মধ্যে গণ্য ছিল, আর সাধারণত: জাল হাদিস তার কাছ থেকেই বর্ণিত হয়ে এসেছে। তাই তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা যায় না।

ইবনে সাদের সমপথের প্রতিবেদনসমূহঃ

আহলে সুন্নাতের লেখকবৃন্দ ইবনে সাদের মাধ্যমে প্ররোচিত ও প্রভাবিত হয়ে এবং তার বর্ণনাসমূহকে ব্যবহার করে এক দিকে ইমাম হুসাইন ও তার পবিত্র বিদ্রোহ সম্পর্কে অবহিত ও পরিচিত হয়েছেন আর অন্যদিকে হুসাইনী সংগ্রামের ব্যাপারে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া ও তার কর্মকান্ডের প্রশংসায় ব্যস্ত হয়েছেন।

ক) যে সকল ঐতিহাসিক ইবনে সাদের  বিখ্যাত গ্রন্থ তাবাক্বাতুল কুবরা-তে বিদ্যমান প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে আশুরার আন্দোলনকে চেনার চেষ্টা করেছেন এবং সেই দৃষ্টিকোন থেকে হুসাইনী ক্বিয়ামের প্রতিবেদনের প্রতি আর সর্বশেষে সাইয়্যেদুশ শুহাদার পরিচয় লাভের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন, তাদের মধ্যে ইবনে আসাকের দামেশকী অন্যতম। তিনি তার তারিখে দামেশক গ্রন্থে বিভিন্ন মুসলিম স্মরণীয় ব্যক্তিদের পরিচয় প্রদানে সচেষ্ট হয়েছেন এবং যখন ইমাম হুসাইন-এর জীবনী বর্ণনার পালা আসে তখন আহলে সুন্নাত কর্তৃক বিবৃত প্রায় সকল হাদিস ইমামের ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিকের পরিচয়ের ক্ষেত্রে বর্ণনা করেছেন আর কখনো ঐসকল বর্ণনার জন্যে বিভিন্ন প্রকার সনদ তুলে ধরেছেন। তবে সর্বোপরি ইমাম হুসাইনের ব্যাপারে আর বিশেষ করে কারবালার ক্বিয়ামের বিষয়ে ইবনে আসাকেরের বর্ণনার দূর্বলতার কয়েকটি দিক নি¤œরূপে পেশ করা যেতে পারে:

১. তিনি শুধুমাত্র ইবনে সা’দের বর্ণনার উপর নির্ভর করেছেন এবং আশুরার সংগ্রামকে একমাত্র ইবনে সাদ ও তার রুচিবোধ ও চিন্তা-ভাবনার আলোকে বিশ্লেষন করেছেন, যদিও ইবনে আসাকেরের আমলে আবু মেখনাফের মত প্রথম পর্যায়ের উৎস তার হাতের নাগালেই ছিল।

২. ইবনে আসাকের এ অজুহাতে যে তিনি ইতিহাস লেখেন নি বরং জীবনী লেখেছেন, প্রকাশ্যে জাল ও তাহরীফে হাত বাড়িয়েছেন এবং এমন সব রেওয়্যাত পেশ করেছেন যা এমনকি ইবনে সাদের তাবাক্বাত-এর গ্রন্থেও খুজে পাওয়া যাবে না আর তার পূর্বের কোন ঐতিহাসিক উৎসেও এমন কোন বর্ণনা বিবৃত হয়নি। সে ধরনের বর্ণনাসমূহের মধ্যে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার সেনাপতিত্বে ইস্তাম্বুলের দিকে সেনা অভিযানে হুসাইন ইবনে আলীর অংশগ্রহণ, মুয়াবিয়ার নিকট হাসান ও হুসাইনের উপস্থিতি এবং উক্ত দুই ইমামকে হিন্দের পুত্রের প্রচুর পরিমানে সাহায্য প্রদান, মুয়াবিয়ার নিকট ইমাম হুসাইনের প্রবেশ এবং মুমিনদের মামা হিসেবে মুয়াবিয়ার প্রশংসা অন্যতম। এ ধরনের আরো কয়েক ডজন জাল বিষয় ইবনে আসাকেরর গ্রন্থে বিদ্যমান যা অন্য কোন উৎসে উল্লেখিত হয়নি। এভাবে ইবনে আসাকের সে সব বর্ণনা ইমাম হুসাইন ও বনি সুফিয়ানের মাঝে সুসম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে উল্লেখ করেছেন যেনো বনি সুফিয়ানের রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা প্রদান ও উক্ত রাজবংশের রাজত্ব শরীয়তসম্মত ও দ্বীনমুখী হওয়ার ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ না থাকে।

৩. সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে যে, আশুরা প্রসঙ্গে ইবনে আসাকের-এর বর্ণনাসমূহের অর্থ ও সুত্রের নিবিড় পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষন এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান ও ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার পক্ষে তার প্রকাশ্য সমর্থন এর বিষয়ে পর্যালোচনা আরো বেশী সুযোগ ও পৃথকভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন। সর্বোপরি তার উল্লেখিত ও লিপিবদ্ধ রিপোর্টে সহজেই প্রচুর বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যেতে পারে। কেননা, একদিকে তিনি প্রচুর হাদিস ও রেওয়্যাতে ইমাম হুসাইনের মর্যাদা ও তার কর্ম তৎপরতা পরিপূর্ণভাবে অস্বীকার করতে পারেননি অপরদিকে বিভিন্ন জাল ও মূলহীন বর্ণনা- যার কিছু নমুনা পূর্বে পেশ করা হয়েছে, তা বনি সুফিয়ানের অপবিত্রতা দূর করা ও তাদেরকে নির্দোষ প্রমাণের লক্ষ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে যা বৈপরীত্যেরই প্রমাণ বহন করে।

খ) ইবনে আসাকের ছাড়াও আহলে সুন্নাতের আরো অনেকে সাধারণত: জীবনী লেখক ছিলেন। তাদের কাজের তাগিদেই তারা জাল বর্ণনা ও কল্পকাহিনীর প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করেন। এ দলটি আশুরা অথবা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার কারণসমূহ ও তার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে ইবনে সা’দের বর্ণনাসমূহ উপযুক্ত মনে করেছেন আর তাই সেদিকে ধাবিত হয়েছেন। এ ধরনের ব্যক্তিদের মধ্যে শামসুদ্দীন মুহাম্মাদ যাহবী(৬৭৩হি.-৭৪৮হি.)-এর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি তার তারিখুল ইসলাম  ও সিয়ারু আ’লামুন নুবালা গ্রন্থদ্বয়ে প্রধানত: ইবনে সা’দ ও  অন্যান্য সমমতের বর্ণনাসমূহ উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের রেওয়্যাতগুলোর মধ্যে আম্মার দাহনীর সুত্রে বর্ণিত রেওয়্যাতগুলো উল্লেখযোগ্য। এ সকল বর্ণনাগুলো ইয়াযিদের সকল পদক্ষেপের সমর্থন ও ব্যাখ্যা করেছে এবং ইমাম হুসাইনের প্রতি কিছু সাহাবীর উপদেশ সম্বলিত বর্ণনাগুলো অত্যন্ত বড় ও বাড়াবাড়ি করে প্রতিবেদন আকারে সাজানো হয়েছে। হ্যাঁ, দাহনী ইামাম হুসাইনের বক্তৃতাসমূহ- যেখানে সুস্পষ্টভাবে তাঁর সময়কালের পরিস্থিতি ও সামাজিক অবস্থা, ক্বিয়ামের কারণসমূহ, শত্রæদের আসল পরিচিতি ও তাঁর সমসাময়িক কালের সরকার ও সরকার প্রধানদের বৈশিষ্টসমূহ বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো বর্ণনা থেকে বিরত থেকেছে।

গ) জামাল উদ্দীন ইফসুফ আল মিযযী রচিত তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে ইবনে সাদ কর্তৃক বর্ণিত রেওয়্যাতসমূহের প্রথম অংশ অর্থাৎ মদীনা থেকে ইমামের যাত্রা ও মক্কা থেকে প্রস্থানের প্রতিবেদন, আল্লাহর রাসূলের(সা.) মূখে ইমামের শাহাদাতের সংবাদ সরবরাহ, তদ্রƒপ ইরাকের দিকে না যাওয়ার জন্যে হুসাইন ইবনে আলীকে কিছু সাহাবীদের উপদেশ সম্বলিত বর্ণনা উল্লেখিত হয়েছে। মিযযী এমনকি ইমাম হুসাইনের সাথে সদাচরণ সম্বলিত ওয়ালিদের প্রতি মারওয়ান ইবনে হাকাম ও আমর ইবনে সাঈদের পত্র পরিপূর্ণভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে মক্কা থেকে ইমামের যাত্রার পরের সব ঘটনার ব্যাপারে আম্মার দাহনীর প্রতিবেদনকে অতি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছেন যা স্বয়ং সচেতনার সাথে প্রতারণা ও ইমাম হুসাইনের বিদ্রোহের বিষয়ে প্রকাশ্য তাহরীফ বা বিকৃতি এবং আম্মার দাহনীর প্রতিবেদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল।

ঘ) ইবনে হাজার আসক্বালানীও তার বিখ্যাত গ্রন্থ তাহযিবুত তাহযিব-এ মিযযি ও ইমাম হুসাইনের ক্বিয়াম সমন্ধে আহলে সুন্নাতের অন্যান্য জীবনী লেখকদের পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন এবং আশুরা ও তার প্রেক্ষাপট আর এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির ক্ষেত্রে ইবনে সা’দের প্রতিবেদনকে তার মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তদ্রƒপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আম্মার দাহনীর মূলহীন প্রতিবেদনের সাহায্য নিয়েছেন এবং প্রকৃতপক্ষে এভাবে আশুরার দিনের ঘটনা বর্ণনা না করে পক্ষপাতিত্বের মাধ্যমে তাকে নতুনভাবে সাজিয়েছেন। তিনি তার অন্য এক গ্রন্থ আল ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা-এ একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন যা আশুরার ইতিহাস বিকৃতিতে সাহায্য করেছে।

ঙ) ইবনে কাসির দামেশকী(৭০১-৭৭৪হি.) আশুরার বৃহৎ ঘটনা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও বিকৃতিমূলক প্রতিবেদন পেশ করেছেন। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তে কারবালার বিপ্লব সমন্ধে এক বিস্তারিত বিবরণ ও প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ করেছেন এবং কোন রকম রাগ-ঢাক ও গোপনীয়তা  ব্যতিরকে সরাসরী উল্লেখ করেন: “ وَ سَاْقَ مُحَمَّدٌ بْنِ سَعْدٍ كَاْتِبِ اْلْوَاْقِدِيْ هَذَاْ سِيَاْقًاْ حَسَنًاْ مَبْسُوْطًاْ”

অর্থাৎ “মুহাম্মাদ ইবনে সা’দ এ ব্যাপারে  খুব সুন্দরভাবে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করেছেন।” এভাবে ইবনে কাসির এতসব রিপোর্টগুলোর মধ্যে আশুরার ঘটনার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী ঝুকিপূর্ণ ও বিকৃতিমূলক প্রতিবেদনকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাছাই করেছেন এবং এ ধরনের রিপোর্টকে সবচেয়ে সুন্দর প্রতিবেদন বলে উল্লেখ করেছেন।

ইবনে কাসির এর উপরোল্লেখিত এতসব গাঁজাখুরী ও মাহাত্ম্য বর্ণনার পরও তিনি যেনো ইবনে সা’দের অন্ধ ও নিরংকুশ অনুকরণে অভিযুক্ত না হন এবং আশুরার ঘটনা বর্ণনাতে তার প্রতিবেদনকে জ্ঞানগর্ভ পদ্ধতি ও নিরপেক্ষতার মোড়কে উপস্থাপন করতে পারে সে কারণে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বর্ণনাকারী এমনকি আবু মেখনাফ-এর নিকট থেকে রেওয়্যাত পেশ করেছেন। তবে সার্বিকভাবে তার প্রতিবেদন ইবনে সাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্ণনার উপর নির্ভরশীল। আর অন্যান্য প্রতিবেদনগুলোকে ইবনে সা’দের প্রতিবেদন ও দৃষ্টিভঙ্গিকে ঢেলে সাজানোর জন্যে উপস্থাপন করেছেন। ইবনে কাসির যিনি তার উপরোক্ত পুস্তকে তার শিক্ষক ইবনে তাইমিয়ার অনুকরণে শিয়া বিদ্বেষী ও গোঁড়ামীমূলক মনোভাব ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে ইয়াযিদের অন্যান্য সমর্থক ও অনুসারীদেরকেও পিছনে ফেলে দিয়েছেন আর কিছু ক্ষেত্রে ইবনে আসাকের ও অন্যান্যদের সমালোচনায় পঞ্চমুখ হয়েছেন এবং ইমাম হুসাইনকে শহীদ করার পেছনে ইয়াযিদের হস্তক্ষেপ সম্বলিত ইবনে আসাকেরের প্রতিবেদনসমূহকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন!! ইবনে কাসির যেমনিভাবে কোন প্রকার দলীল প্রমাণ ছাড়াই কোন কোন ক্ষেত্রে ইবনে আসাকেরের উপর চড়াও হয়েছেন তেমনিভাবে আবু মেখনাফের বিরোদ্ধেও আক্রমন চালিয়েছেন এবং কোন দলীল ও সনদ ছাড়াই তাকে অনেক মিথ্যা কথার মূল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

স্বাভাবিকভাবেই ইবনে কাসির সব ক’টি জাল হাদিস ও প্রতিবেদন এমনকি কিছু স্বনির্মিত রেওয়্যাতও ইয়াযিদের পক্ষে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। তিনি মুয়াবিয়ার আমলে রোমে মুসলমানদের সেনা অভিযানে ইমাম হুসাইনের অংশগ্রহণের বিষয়টি আবারো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন আর এতে তিনি কোন সনদ পেশ করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। তিনি ইবনে আসাকেরের চেয়েও আরেক ধাপ উপরে উঠে বনি উমাইয়্যা ও বিশেষ করে মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ানের নির্দোষ সাব্যস্থতা ও পবিত্রতা রক্ষার্থে এবং ইমাম হুসাইনের ভাই ইমাম হাসান মুজতাবার শাহাদাতের পর প্রতি বছর সিরিয়া ভ্রমন, আরো ভাল করে বলতে হয়, মুয়াবিয়ার দরবারে ইমামের আসন গ্রহণ সম্পর্কিত রেওয়্যাত ও তাঁর প্রতি মুয়াবিয়ার সম্মান প্রদর্শন সম্বলিত বিষয়গুলোর উদ্ধৃতি পেশ করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি এই উদ্ধৃতিটি ইবনে আসাকেরের ন্যায় তার প্রতিবেদনের শুরুতেই উল্লেখ করেছেন এবং এভাবে তিনি মুয়াবিয়া ও তার পুত্র ইয়াযিদের পক্ষে তার সমর্থন ঘোষনা করেছেন। এ কারণে, যে কোন ধরনের সত্য অন্বেষন ও নিরপেক্ষতা যা নিয়মতান্ত্রিক ও জ্ঞানগত পন্থায় ইতিহাস লেখনী ও ঐতিহাসিক প্রতিবেদনসমূহের জন্যে একটি অতি জরুরী বিষয়, তা ইবনে কাসিরের পক্ষ থেকে দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

ইবনে কাসির এমন এক ব্যক্তি যিনি ইয়াযিদকে নির্দোষ প্রমাণের লক্ষ্যে নবীর আহলে বাইত ও ইমাম হুসাইনের মস্তক মুবারকের সিরিয়াতে স্থানান্তরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এবং সব সময়ের মত এবারো তিনি ঐতিহাসিক নি:সন্দেহ সত্যকে এমনকি আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিকোন থেকে সন্দেহমুক্ত সত্যকেও কোন প্রকার দলীল ও সনদ ব্যতিরকেই রদ করেছেন।  যদিও তিনি স্বয়ং কোন কোন ক্ষেত্রে সত্য অস্বীকার করতে অপারগ হয়ে যান এবং যখন আন্যান্য লেখকদের প্রতিবেদন বর্ণনা করেন তখন সেখানে ইমামের পবিত্র মস্তক প্রেরণের বিষয়টি উল্লেখ করেন যা স্পষ্ট বৈপরীত্যের শামিল। অবশেষে তিনি সিরিয়ার দিকে সাইয়্যেদুশ শুহাদার পবিত্র মস্তক প্রেরণের বিষয়টিতে বিদ্বান ব্যক্তিরা দুই ভাগে বিভক্ত বলে মনে করেন। আর এভাবে তিনি কোন ঐতিহাসিক দলীল প্রমাণ ও সনদ (নির্ভরযোগ্য হোক বা অনির্ভরযোগ্য) উল্লেখ ছাড়াই নিজেকে দায়মুক্ত করেছেন!!!

তিনি আশুরা সম্পর্কে সুসংগঠিত ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন পেশ করার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধারনা ও স্ব-ঘোষিত ইজতেহাদের আশ্রয় নিয়েছেন, এমনকি তিনি ইমাম হুসাইনের কতলের ব্যাপারে ইয়াযিদের সন্তুষ্টির বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন: “আমার ধারনামতে যা সত্যের কাছাকাছি তা হচ্ছে, ইয়াযিদ যদি হুসাইনকে ধরতে পারতো তাহলে তাকে ক্ষমা করে দিতো, যেমনি করে তার বাবা মুয়াবিয়া অসিয়ত করেছিল, যেমনি করে ইয়াযিদ নিজেই পরে উচ্চারণ করেছিল এবং ইবনে যিয়াদকে এ কাজের জন্যে লানত ও গালি দিয়েছিল। এত কিছুর পরো ইয়াযিদ ইবনে যিয়াদকে তার পদ থেকে বহিস্কার করেনি এবং তাকে শাস্তিও প্রদান করেনি। আর যে দূতকে ইবনে যিয়াদের তিরস্কারের জন্যে পাঠানোর কথা ছিল তাকে প্রেরণ করেনি। আল্লাহ্ বেশী ভাল জানেন।”

ইবনে কাসিরের বক্তব্যের এ অংশে ইমাম হুসাইনের হত্যার ব্যাপারে ইয়াযিদের অসন্তুষ্টি ও ইমাম হুসাইনের সাথে সদাচরণের ব্যাপারে ইয়াযিদের প্রতি মুয়াবিয়ার অসিয়ত সম্পর্কে দু’টি জাল রেওয়্যাত পরিলক্ষিত হয়। তদ্রƒপ ইয়াযিদকে নির্দোষ প্রমাণে তার বক্তেব্যের উপর যে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল সে পরিপ্রেক্ষীতে তার বিস্ময়বিমূঢ়তা ও অস্থিরতা দেখার মতো। তিনি কোন মতামতকে ভুল বা সত্য থেকে দূরে রয়েছে বলে মতামত ব্যক্ত করার পরিবর্তে আর সমালোচনার পরিপ্রেক্ষীতে উত্তর প্রদান না করেই “আল্লাহ্ বেশী ভাল জানেন” বাক্যটি ব্যক্ত করে সমাধান দিয়েছেন।

যাই হোক, যেসব লেখক ইয়াযিদের সমর্থনে ও কায়েমী স্বার্থবাদীদের পক্ষে কলমের খোঁচায় সত্য অপলেপন করার চেষ্টা চালিয়েছেন, যারা ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ ও অনস্বীকার্য সত্যকে অস্বীকার করে বনি উমাইয়্যার পক্ষে লেখনি ব্যবহার করেছেন এবং ইমাম হুসাইন ও তাঁর কারবালার সাথীদের আত্মত্যাগকে একটি আত্মপক্ষ সমর্থনের অযোগ্য এবং শান্তি ও ধৈর্যের বিরোধী কর্মধারা হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যারা ইয়াযিদের পক্ষে ঐতিহাসিক উৎস বহির্ভুত বক্তব্য পেশ করেছেন, ইবনে কাসির তাদের চেয়েও বেশী উগ্র ও বিবেচনাহীন। নিম্নে ইবনে কাসির কর্তৃক উত্থাপিত কিছু মিথ্যা ও মাপকাঠি বহির্ভুত বিষয় উল্লেখ করা হলো:

১. তিনি ইয়াযিদকে চাতুর্যতা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং তার বিভিন্ন বোকামী যার কারণে বনি সুফিয়ানের রাজত্ব নষ্ট হয়েছিল তাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে অবলোকন করেছেন।

২. ইবনে কাসির অনবরত ইমাম হুসাইনকে উপদেশ দানকারীদের উপদেশ মেনে না চলার কারণে তিরস্কার করেন। তবে তিনি বলেননি এ উপদেশদাতাগণ ইয়াযিদ ও ইবনে যিয়াদের প্রতিক্রিয়া ও নির্দয়তা ব্যতিরকে আর কোন বিষয়টির ব্যাপারে ভীতসন্ত্রস্থ ছিলেন? তারা ইয়াযিদের রাজত্বের পক্ষে কী কোন শরয়ী বৈধতা উল্লেখ করেছিলেন, যে কারণে ইমাম হুসাইন সংগ্রাম থেকে ফিরে  আসবেন? ইবনে কাসির কোরআন, হাদিস ও ইতিহাসের কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ না দেখেই তাড়াহুড়া ও ক্ষমতা লিপ্সা এমনকি কপটতা ও ভন্ডামীর ন্যায় বিষয়গুলোকে ইমাম হুসাইনের ব্যাপারে ব্যক্ত করেছেন।

৩. কুফার দিকে যাত্রার প্রাক্কালে ইবনে যিয়াদের বাগ্মী বক্তব্য তুলে ধরা, অপরদিকে ইমাম হুসাইনের বক্তব্যগুলো কঠিনভাবে সেন্সর করা ইবনে কাসির-এর আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত। সর্বোপরি তিনি ইয়াযিদ ও তার কার্যক্রমকে শক্তিশালী আর কারবালার বিপ্লবের ইতিহাসকে বিকৃতি করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন।

৪. ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের বিষয়টি অন্য কোন কারণ ও প্রেক্ষাপট ছাড়াই বীরত্বপূর্ণ, অনুভ‚তিপ্রবন, তাৎপর্য সংশ্লিষ্ট ও আধ্যাত্মিক। তাই এ সকল দৃষ্টিকোন থেকে ইমাম হুসাইন ও তাঁর সঙ্গীদের সত্যতা ও ন্যায়ানুগতা প্রকাশিত হয় এবং ইয়াযিদ, ইবনে যিয়াদ ও তার সৈন্যবাহিনীর আদর্শ বাতিল বলে প্রমাণিত হয়। ইবনে কাসির ইমামের শাহাদাতের বিষয়টিকে “কিছু মহান ব্যক্তি” শিরোনামে আবু মেখনাফের প্রতিবেদনের পাশাপাশি এমন সব বিষয়ের অবতারণা করেছেন যেনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইমামের শাহাদাতের প্রভাব হ্রাস এবং ইয়াযিদ তিরস্কার ও আক্রমন থেকে মুক্তি পায়। তিনি আবু মেখনাফের উপর অনবরত আক্রমনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে তার বিরোধীদের বর্ণনা যা বর্ণনাকারীদের চেইন ছিন্ন রেওয়্যাত ও অচেনা বর্ণনাকারীর উপস্থিতিপূর্ণ বর্ণনাতে ভরপূর, সে সমস্ত বর্ণনাগুলোকে শক্তিশালী করে দিতে চান এবং সত্য বলা ও সত্যপন্থি হওয়ার পরিবর্তে তিনি তার নব ইতিহাস নির্মান ও প্রতারণা দ্বারা সেটাকে পূরণ করতে ইচ্ছুক।

তিনি আশুরার ঘটনাসমূহের বিবরণের প্রতিটি পদে পদে শিয়াদের তিরস্কারের পথ ধরেছেন এবং তাশাইয়ু বা শিয়াবাদের অস্বীকার ও অন্ধভাবে নিক্ষেপ এবং কারবালার বিপ্লব সম্পর্কে বিদ্যমান রিপোর্টসমূহের ব্যাপারে -যার কিছু বিষয়ে শিয়াদের সমর্থন আছে, যদিও সেগুলো আহলে সুন্নাতের অনেক লেখক বর্ণনা করে থাকেন, সেসব বিষয়ে  কোনরকম চিন্তা-ভাবনা না করা নিজের একমাত্র দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করেছেন।

চ) আরো অন্যান্য উৎস যা হিজরী সপ্তম শতাব্দির পর লেখা হয়েছে সেগুলো তাদের পূর্বের উৎসসমূহের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। আমরা এ লেখার বিভিন্ন পর্যায়ে সেগুলো পর্যলোচনা করবো।

সমসাময়িক কালের সুন্নী গবেষকগণ সাধারণত: আশুরার ব্যাপারে ইতিবাচক ধারনা দেখিয়েছেন এবং ইতিহাসগত সত্যতা জ্ঞানগত ও নিয়মমাফিক গবেষনার সাধ্যমে অর্জন করেছেন। তারা কারবালার বিপ্লবের বিভিন্ন দিক সুস্পষ্ট করেছেন এবং জনগণকে সেদিকে অনুসরণ করার আহŸান জানিয়ে আশুরার বৃহৎ চলমানতাকে মুক্তি সনদ হিসেবে অখ্যায়িত করেছেন।

তারপরো সমকালীন গবেষকদের মধ্যে অল্প সংখ্যক হলেও একদল ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাসির-এর ন্যায় তার ছাত্রদের সমর্থনে উঠে দাড়িয়েছেন যার মূল ইবনে সা’দের তাবাক্বাত গ্রন্থে নিহিত। আর এর উপরেই তারা বিভিন্ন নামে যেমন ইসলামী সভ্যতার প্রতিরক্ষা অথবা আক্বিদা বিশ্বাস ও আবেগ ব্যতিত ইতিহাসের পর্যালোচনা ইত্যাদি নামে গুরুত্বারোপ করে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে শেখ খিযরীবেগ মিশরীর লেখা তারিখুল উমামিল ইসলামিয়্যা, তারিখ আদ্ দাওলাতিল উমাভিয়্যা, তারিখ আদ্ দাওলাতিল আব্বাসিয়্যা ও তার অন্যান্য ইতিহাসকর্ম উল্লেখযোগ্য। এ. ডি. মুহাম্মাদ ইব্রাহীম-এর লেখা বারাআতু ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া মিন দামিল হুসাইন, ড. ইব্রহিম শুউত-এর লেখা আবাতিল ইজিব আন তাহমী মিনাত তারিখ-এর ন্যায় আরো অন্যান্য গ্রন্থ ওহাবী মতবাদের অনুসারীরা ইয়াযিদ ও উমাইয়্যাদের সমর্থনে লিখেছেন যা আহলে সুন্নাতের কয়েক ডজন গবেষনা কর্মের মোকাবেলায় কোন গণনায় আসে না। উক্ত দলটি তাদের দাবী ও বিভিন্ন প্রকার ব্যাখ্যার বিপরীতে ইতিহাস ও সত্যকে ফের্কা নির্মাতা বা ফের্কা নির্মাতাদের হুকুমতগুলোর দয়া-দাক্ষিন্য ও দলীয় সুবিধার কাছে উৎসর্গ করে দিয়েছেন এবং আশুরার চিন্তাধারা ও কারবালার বিপ্লবের বর্ণনার ময়দানে জ্ঞানগত ইতিহাস লেখনির পর্যালোচনা ও বিশ্লেষনে বাধাগ্রস্থ করেছেন।

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »