মহররমের শোক-কথা (৩য় পর্ব)

86

ইমাম হুসাইন যখন নিজের সঙ্গী সাথীদেরকে বলেছিলেন, “তোমরা সবাই চলে যাও অন্যথায় আগামীকাল কতল হয়ে যাবে।” তখন যদি ইমাম হুসাইনের সঙ্গী-সাথীদের মনে জান্নাত পাওয়ার বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ থাকতো তাহলে তারা ইমাম হুসাইনকে ছেড়ে চলে যেতেন। কিন্তু তারা দেখলেন যে হুসাইনের পদতলে প্রাণ দিলেই জান্নাতের চাবি হস্তগত হবে, আমরা চাবি ফেলে কোথায় যাব?
ইমাম হুসাইন বললেন, “চলে যাও।”
তারা বললেন, “না যাব না।”
ইমাম বললেন, “তাহলে কতল হয়ে যাবে।”
তারা বললেন, “হে মাওলা! মরে যাব কিন্তু আপনাকে ছেড়ে এক পাও নড়ব না।”
যারা আশুরার রাতে ইমাম হুসাইনকে বলেছিল যে, “মাওলা! আপনার পদতলে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে দেবো কিন্তু আপনাকে ছেড়ে যাবো না।” তারা তাদের অঙীকার পুরন করেছিলেন। আশুরার সকাল থেকে শুরু করে আশুরার দুপুর পর্যন্ত ইমাম হোসাইনের প্রত্যেকটি সঙ্গী শহীদ হলেন অর্থাৎ তারা অঙ্গীকার পূরণ করলেন। কিন্তু আশুরার দিন আসরের পরে ইমাম হুসাইনের পরিবার-পরিজন বন্দী হলেন। চিন্তা করুন তারা কত বড় অঙ্গীকার করেছিলেন? অর্থাৎ হযরত হাবিব ইবনে মোজাহের অঙ্গীকার করেছিলেন যে, ইমাম হুসাইনের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে দেব। হযরত জুবায়ের অঙ্গীকার করেছিলেন যে,ইমাম হুসাইনের জন্য জান দিয়ে দেব। হযরত আলী আকবর অঙ্গীকার করেছিলেন যে, বাবা ইমাম হুসাইনের জন্য প্রাণ দিয়ে দেব। হযরত আব্বাস আলামদার অঙ্গীকার করেছিলেন যে, আঁকা হোসাইনের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করে দেব। হযরত আলী আজগর অঙ্গীকার করেছিলেন যে, বাবার কোলেই গলায় তীরবিদ্ধ হব। হযরত সকিনা অঙ্গীকার করেছিলেন যে, “বাবা তোমার মাথা কর্তন হওয়ার পর, তাঁবুগুলোতে আগুন ধরানোর পর, মা-বোনদের চাদর কেড়ে নেওয়ার পর, আমি গদিবিহীন উটে চড়ে কারবালা থেকে কুফা, কুফা থেকে দামেস্কে পর্যন্ত যাব, মুয়াবিয়ার কয়েদখানায় বন্দি থাকবো, ইয়াজিদের দরবারে যাব, সিরিয়ার বাজারে বাজারে যাব।”
ইমাম হুসাইনের কথামতো যেমনিভাবে কোন শহীদই তার সঙ্গ ত্যাগ করেনি, ঠিক তেমনি কোনো বন্দীও কারবালা থেকে শুরু করে বন্দীখানা পর্যন্ত এমন কথা বলেননি যে, “আমরা আর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না, এবার আমরা ইমাম হুসাইনের সঙ্গ ত্যাগ করছি।”
বরং হযরত সকিনা বন্দিশালাতেই প্রাণ উৎসর্গ করে দিলেন, কিন্তু ভাই ইমাম জয়নুল আবেদীনকে কখনো বলেননি যে, “ভাইয়া এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।”

আশুরার দিন আসরের সময় শহীদদের পরীক্ষা সমাপ্ত হলো। শহীদগণ তাদের অঙ্গীকার পালন করে সফলকাম হলেন। এবার বন্দিদের পরিক্ষা শুরু হলো। ১১ই মুহররমের রাত অনেক অস্থিরতার মধ্যে অতিবাহিত হলো। তাবুগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা পানি পানি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সৈয়্যেদে সাজ্জাদ ইমাম জয়নুল আবেদীন সিজদারত ছিলেন, হযরত জয়নাব পুরো কাফেলার দেখাশুনা করছিলেন। সবাই দেখতে পেল উমর সাদের পুত্র নিজেদের নিহত সেনাদের লাশ একে একে দাফন করছে। কিন্তু ইমাম হুসাইনের কাফেলার শহীদদের একটি লাশও দাফন করেনি। ১১ই মহররম কারবালা থেকে ইয়াজিদের লস্কর রওনা দেয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলো। বন্দী নবীপরিবারের মহিলারা দেখলেন যে, শিমার মালাউন গদিবিহীন কিছু উট নিয়ে সেদিকে যাচ্ছে, যে দিককার কিছু তাবু পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়ে ছিল। সেখানে ইমাম হুসাইনের অভিভাবকহীন মহিলারা বসেছিলেন। শিমার এসে বলল, “হে হুসাইনের আহলে বাইত! তোমরা আমাদের বন্দী। আমাদের বাহিনী এবার এখন থেকে রওয়ানা দেবে। তোমাদেরকে উটে সাওয়ার হতে হবে। ওহে বন্দীরা ওঠো! তোমাদেরকে সাওয়ার করিয়ে দিই। হযরত ফাতিমা যাহরার সন্মানিত কন্যা হযরত জায়নব দাড়িয়ে বললেন, হে শিমার! তুই সরে দাড়া, আমরা সৈয়্যেদজাদি, আমরা রাসুলের নাতনি, আমরা না-মাহরাম। তুই আমাদের সাওয়ার করাতে পারবি না, আমরা নিজেরাই সাওয়ার হতে পারবো।” এক এক করে সবাইকে সাওয়ার করালেন, শেষে মা ফাতিমার দাসী ফিজ্জাকে ডাকলেন, যাকে রাসুল (সাঃ) মা ফাতিমাকে উপহার দিয়েছিলেন। ফিজ্জা বললেন, “হে শাহজাদী! আমি নিজেই সাওয়ার হতে পারবো।” হযরত জায়নব বললেন, “না, ফিজ্জা না, তোমাকে আমার মা ফাতিমার হকের কসম, আজ আমাকে সাওয়ার করাতে দাও।” সবাই সাওয়ার হওয়ার পর হযরত জায়নব একা থেকে গেলেন। হযরত জায়নবকে সাওয়ার করানোর জন্য কেউ ছিল না। একবার ফোরাত নদীর দিকে তাকিয়ে ডাক দিলেন, আব্বাস! আব্বাস! তারপর কারবালার রণক্ষেত্রের দিকে ঘুরে তাকিয়ে ডাক দিলেন, “হে কাসিম! হে আওন! হে মুহাম্মদ! ওঠো, দেখো, জনসন্মুখে জায়নব বিনা চাদরে উন্মুক্ত মাথায় দাড়িয়ে আছে, উটের পিঠে সাওয়ার করানোর জন্য কেউ নেই।” হায়! এখন কিন্তু আর কেউ জীবিত ছিল না যে এসে হযরত জায়নবকে সাওয়ার করাবে। অনেক কষ্টে তিনি সাওয়ার হলেন। বন্দী কাফেলা কারবালার কতলগাহের উপর দিয়ে রওয়ানা হলো। “রিয়াজুল কুদসের” লেখক লিখেছেন যে, কতলগাহ থেকে কাফেলাটি মাত্র অল্প দুরেই গিয়েছিল, এমন সময় পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী শিমার মালাউন এবং তার কিছু সহযোদ্ধারা বন্দীদের উটগুলোর দিকে ছুটে এল, এসে জিজ্ঞাসা করল, “আমরা শুনেছি, এ বন্দি দলের মধ্যে হুসাইনের একটি শিশু কন্যাও আছে, যাকে হুসাইন চরম ভালোবাসত। আমরা আরও শুনেছি, ঐ মেয়ে হুসাইনের বুকের উপর ঘুমাত। বলো! কে সেই মেয়েটি?” জালিমদের একজন দেখিয়ে বলল, ঐ যে, মা ও ফুফুর কোলের মধ্যে যে পাচ বছরের মেয়েটি বসে আছে সে-ই হচ্ছে হুসাইনের মেয়ে সকিনা। শিমার বললো, “প্রতিটি উটে ২/৩ জন কয়েদী বসতে পারবে, কিন্তু যেহেতু সকিনাকে হুসাইন অনেক ভালোবাসত সেহেতু আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, সকিনা একাই একটি উটে বসে যাত্রা করবে। শত্রুরা অগ্রসর হয়ে মা ও ফুফুর কাছ থেকে সকিনাকে কেড়ে নিয়ে একা একটা উটের উপর বসিয়ে দিল। হযরত সকিনা ছটফট করতে থাকলেন, কিন্তু জালিমরা কর্ণপাত করল না। হযরত সকিনা হাত প্রসারিত করে ডাকলেন, ” ভাইয়া!, আমাকে সাহায্য করো, মা! আমাকে নামিয়ে দাও।”
উঠ যখন উঠে দাড়ালো, হযরত সকিনা তখন ঘাবড়ে গেলেন এবং ডাক দিলেন, “হে ভাইয়া! হে চাচা, হে ফুফু আম্মা, ওমা!”
কিন্তু ততক্ষণে একজন জালিম উটের উপর বসিয়ে তার ছোট্ট ছোট্ট হাত দুটি বেধে ফেলেছে এবং বলছে, “এবার ডাকো ভাইকে, দেখি এবার কেমন করে চাচা বলে ডাকবে, ফুফু বলে ডাকবে।” হযরত সকিনা ছটফট করতেই থাকলেন। বন্দিদের একজন বলে উঠলো, “ছেড়ে দাও মেয়েটিকে, ও একা বসতে পারবে না।” কিন্তু হায়! শিমার মালাউন উটটিকে আবারও বসালো এবং তার পিঠে হযরত সকিনাকে উপুড় করে শুইয়ে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেধে ফেলল। উট রওয়ানা দিল, গদিবিহীন উটের পিঠের ঘর্ষণের ফলে হযরত সকিনার কচি চামড়া ছুলে গিয়ে রক্ত ঝরতে লাগলো। উটের পিঠ রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেলো। হযরত সকিনা কাদতে কাদতে বলছিলেন, ”হে বাবা! তুমি তো তোমার বুকের উপর অনেক যত্ন সহকারে আমাকে ঘুম পাড়াতে, দেখে যাও! তোমার সকিনার বুক ক্ষত-বিক্ষত। তোমার বিদায়ের পর কেউ আমার প্রতি দয়া করছে না।”
– লা’নাতুল্লাহি আলাল কাওমিজ্জজালিমীন।

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »