ইয়াজিদ কি চেয়েছিল?

122

মহররমের শোক-কথা (পর্ব-এক)

সে তো সব কিছুই নিতে চেয়েছিল। ‘তাজ’ অর্থাৎ মুকুট পাওয়ার পর সে বলল, “এবার সিংহাসন চাই।” সিংহাসন পাওয়ার পর বলল, “এবার সেনাবাহিনী চাই।” সেনাবাহিনী পাওয়ার পর বলল, “এবার শাসন ক্ষমতা চাই।” শাসন ক্ষমতা পেয়ে বলল, “এবার আমার খেয়াল খুশিমতো ক্ষমতা ব্যবহার করার স্বাধীনতা চাই।” সেটাও যখন পেয়ে গেল, তখন বলল, “এবার হুসাইনের বায়াত চাই, যেন আমার খেয়াল খুশিমতো কোনো কাজ করতে কেউ বাধা দিতে না পারে।”

বলাবাহুল্য, ইয়াজিদ ব্যাক্তি পর্যায়ের অপকর্ম থেকে সামাজিক পর্যায়ের অপকর্ম এবং সকল অপকর্মের প্রচার ও বিস্তার ঘটানোর জন্য ইমাম হুসাইনের ‘বায়াত’ তথা সত্যায়ন চেয়েছিল। বায়াতের মাধ্যমে ইমাম হুসাইনের কাছ থেকে অপকর্ম করার লাইসেন্স বা সনদ পেতে চেয়েছিল এবং ইমাম হুসাইনের কাছ থেকে বায়াত গ্রহণের দাবিও সেই নেয়ার প্রবল অনুভূতির কারণেই হয়েছিল।
সবকিছু জুলুমের মাধ্যমে গ্রাস করে নেয়ার নাম হলো ‘ইয়াজিদিয়াত’। আর প্রত্যেক সংকটময় মুহূর্তে কুরবানী দেয়া ও প্রাণ উৎসর্গ করে দেয়ার নাম হলো ‘হুসাইনিয়াত’।
আজ কেবল একটি বাক্য বলতে চাই যে, আশুরার রাতে ইমাম হুসাইন আলো নিভিয়ে নিজের সঙ্গী সাথিদেরকে বললেন, “তোমরা সবাই চলে যাও।” ইমাম হুসাইন কিন্তু তার সঙ্গী সাথিদেরকে শুধু চলে যেতেই বলছেন না, বরং মৃত্যু যখন তাদের দ্বারপ্রান্তে এসে ডাক দিচ্ছে, ঠিক সেই চরম মুহুর্তেই ইমাম হুসাইন তার সঙ্গী সাথি এবং আত্নীয় স্বজনদের জীবনকে তাদের কাছেই ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন এবং বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন যে, “ইসলাম দেয়ার অনুভূতিকেই জাগ্রত করে থাকে, নেয়ার অনুভুতিকে নয়।” যে জীবনগুলো আগামীকাল আশুরার দিনে নিঃশেষ হয়ে যাবে, ইমাম হুসাইন সেই জীবন গুলোকে শত্রুদের মুঠো থেকে কেড়ে নিয়ে তার সঙ্গী-সাথি ও আত্নীয় স্বজনদেরকে ফেরত দিচ্ছিলেন। এটাই ছিল “হুসাইনী ইসলাম দর্শন।”

ইমাম হুসাইনের সঙ্গী-সাথি ও আত্নীয় স্বজনরা উঠে দাড়ালেন। তারা ইমাম হুসাইনের কাছ থেকে পাওয়া জীবনটাকে গ্রহণ করে নেয়ার জন্য উঠেননি। বরং ঐ জীবনকে ইমাম হুসাইনের পদতলে উৎসর্গ করে দেয়ার জন্য দাড়িয়ে ছিলেন। সঙ্গী সাথিদেরকে জীবনদান করার অনুভূতি ছিল ইমাম হুসাইনের সেই “দেয়ার অনুভূতি”৷ জীবন পেয়েও জীবন দেয়ার অনুভূতিটাও কেবল ইমাম হুসাইনের সঙ্গী সাথিদেরই ছিল। এর এটাই হলো সেই প্রকৃতি “নেয়ার পরিবর্তে দেয়ার অনুভূতি।” এটাই ছিল সেই ‘মুহাম্মদী ইসলাম’, ইমাম হুসাইন ও তার সঙ্গী-সাথিরা কারবালা প্রান্তে যা রক্ষা করে দেখিয়েছিলেন।
আর ওটা ছিল ‘ইয়াজিদের ইসলাম’, যা উপস্থাপন করা হচ্ছিল, দুনিয়াতে জুলুম ও অত্যাচারের রাজত্ব কায়েক করার জন্য। এ-ও উদ্দেশ্য ছিল যে, মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপস্থাপিত ইসলামের কোনো চিহ্ন যেন দুনিয়াতে অবশিষ্ট না থাকে। ইমাম হুসাইন নিজেকে কুরবানি দিয়ে ঐ ইসলামকে বাচিয়েছেন, যে ইসলামের জন্য ১ লক্ষ ২৪ হাজার নবীর মূল্যবান জীবন ও সময়, এমনকি প্রচুর অর্থ-সম্পদও ব্যয় হয়েছে। অতএব আমরা ইমাম হুসাইনের এই মজলিসে যা কিছু খরচ করি না কেন তাতে ইমাম হুসেইনের প্রতি কোনো ‘এহসান’ বা করুণা করা হয় না। এতে কারো কোনো ক্ষতিও নেই।

কারবালার মজলুমদের স্মরণে মাতমকারী এবং শোক পালনকারীদের উদ্দেশ্য করে বলছি। কারবালার ঘটনার পর আল্লাহ পাক ইমাম হুসাইনকে কত অধিকার দিয়েছেন, সে বিষয়ে আমরা কল্পনাও করতে পারব না। কারণ ইমাম হুসাইনের কাছে যা-কিছু ছিল তিনি সবটুকুই কারবালাতে দিয়ে দিয়েছেন, একমাত্র আল্লাহর নামে। ‘বান্দা’ হয়ে ইমাম হুসাইন যখন কিছুই বাচিয়ে রাখেননি, তখন ‘খালিক’ হয়ে আল্লাহ ইমাম হুসাইনকে যতটুকু দেন না কেন, তা কমই হবে। কারণ তার ভান্ডার অফুরন্ত। তিনি তাকে কত কিছু দিয়েছেন, তা অনুমান করা সম্ভব নয়। আল্লাহপাক কারবালার মজলুমকে কতই-না ক্ষমতা দিয়েছেন। সুতরাং হে আমার বন্ধুগন! হে মা ও বোনেরা! আমাদের যত সামান্য সময় ও অর্থ এই মজলিসে ব্যয় হয়ে যায়, তাতে কোনো ক্ষতি নেই বরং সেগুলো সংরক্ষিত থাকবে। এর বিনিময়ে কিয়ামতের দিন আরও উত্তম প্রতিদান পাওয়া যাবে।

চিন্তা করার বিষয় যে, একজন জিয়ারত পাঠকারীকে যখন তার মৃত্যুর পর দাফন করা হয়, তখন ইমাম হুসাইন কারবালাতে তার রওজার মধ্যে স্থীর থাকতে পারেন না। কবরবাসীর নিকটে এসে বলেন যে, “যেহেতু তুমি আমার জিয়ারত পাঠ করতে সেহেতু আজ আমি তোমার জিয়ারত করতে এসেছি।” আমার মন চায় যে, ডাক দিয়ে বলি, হে আমার মাওলা! সেই মূহুর্তেও যদি উপস্থিত হয়ে যেতেন, যখন তাবুগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল। তখনও যদি হাজির হিয়ে যেতেন, যখন ছোট্ট শিশু সখীনার গালে চড় মারা হচ্ছিল। হে আমার মাওলা! তখনও এসে খোঁজ নিতেন, যখন অসুস্থ সৈয়্যদে সাজ্জাদ ইমাম জয়নুল আবেদিনের হাতে হাতকড়া পরানো হচ্ছিল।
কিন্তু ইমাম হুসাইন আমার ডাকের জবাবে বলবেন, “ঐ মূহুর্তগুলোতে আসা সম্ভব ছিল না। কারণ ঐ সময়টি ছিল পরীক্ষার সময়, পরীক্ষা দেয়ার পালা চলছিল। সাহায্য করার সুযোগ ছিল না।

আজ ঐ চাঁদ আকাশে দেখা দিয়েছে যাকে মুহাররমের চাঁদ বলা হয়, আমার মন বলছে, ইমাম হুসাইনের জন্মলগ্নে তার শাহাদাতের খবর শোনার পর থেকে তার মা নারীকূলের শিরোমণি সাইয়্যেদাতুন নিসা হযরত ফাতিমা যাহরা যখনই মুহাররমের চাঁদ দেখা দিত তখনই তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে হয়তো বলতেন, ” একদিন এই চাঁদ যখনই বেরুবে, তখন আমার প্রাণের চাঁদ চন্দ্রগ্রহণের আওতায় চলে আসবে।” কোথায় থেকে আনব সেই ভাষা, যার মাধ্যমে বলতে পারি, বুঝতে পারি যে, মা ফাতিমা কেমন বুকভরা বেদনায় সিক্ত নয়নে মুহাররমের চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। এই চাঁদকে না-জানি কতবার ‘কারবালার সম্রাজ্ঞী’ হযরত যয়নাবও কারবালার ঘটনার পূর্বে দেখেছেন। নতুন চাঁদ দেখে তো লোকেরা মুনাজাত করে। হয়তো মদিনাতে ঐ চাঁদ দেখার পর মা ফাতিমাও নিজের পরিবার পরিজনদের মঙ্গল কামনা করে মুনাজাত করেছেন। কিন্তু তিনি কি জানতেন যে, এই চাঁদ তো আবারও দেখতে পাওয়া যাবে কিন্তু কারবালার মুসাফিরদেরকে ফিরে পাওয়া যাবে না।
কারবালার ঘটনার পর উম্মে রোবাব এই চাঁদকে দেখে নিশ্চয়ই নিজের কলিজার টুকরা মাসুম শিশু আলী আসগরকে স্মরণ করতেন, আর হয়তো বলতেন, হে চাঁদ! তুমি তো আবারও ফিরে এলে, কিন্তু আমার চাঁদ তো ফিরে এল না।” দুঃখ, কষ্ট ও সমস্ত বেদনার ওয়ারিশ হযরত যয়নবও যখন এই মুহাররমের চাঁদকে দেখতেন তখন নিশ্চয়ই তিনিও তার হৃদয় আঁকড়ে ধরে বলতেন, “হায়, এই চাঁদ উঠার পরপরই আমরা কারবালাপ্রান্তরে উপস্থিত হয়েছিলাম, যখন পৌছে ছিলাম তখন সবাই জীবিত ছিল, আহ! আজ আমরা আছি, কিন্তু হায় আফসোস! আমাদের সঙ্গী সাথিরা কেউ নেই। আহ! আজ আবার সেই চাঁদ উঠেছে, কিন্তু আমার প্রিয় আত্নীয় স্বজনরা নেই। আজ যয়নবও তার ভাইয়ের পাশে নেই।”

মুহাররমের নতুন চাঁদ যখন উঠে তখন নবী পরিবারের প্রতি অনুগত পূর্ণ প্রেমিক ভক্তবৃন্দের চোখ দিয়ে অশ্রু বেরিয়ে পড়ে।
কারণ এই চাঁদ হলো ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্তদের চাঁদ,এচাঁদ হলো মজলুম ও নির্যাতিতদের চাঁদ,এচাঁদ হলো ফুরাতকূলের মুসাফিরদের চাঁদ,এচাঁদ হলো গৃহহারাদের চাঁদ।
আজ এমন একটি ঘর নেই, যেখানে শোক পালন হচ্ছে না।আজ এমন একটি অন্তর নেই, যে অন্তরটি দুঃখ-ভারাক্রান্ত নয়।আ এমন একটি শোকার্ত নেই যে পানিবিহীন মাছের মতো ছটফট করছে না। কারণ সেদিন কারবালার অসহায়দের জন্য ছটফট করারও অনুমতি ছিল না।

হায়! হায়! ফাতিমার ঘর লুন্ঠিত হলো।
মুসাফিররা বিদেশে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত অবস্থাতেই শহীদ হয়ে গেলেন।
বিনা কাফনে, বিনা দাফনে পড়ে থাকলেন।
পবিত্র নবীপরিবারের মহিলাদেরকে চাদরবিহীন অবস্থায় বাজারে এবং শহরের অলি-গলিতে ঘুরানো হলো।
মহিলাদের উপর দয়া তারা করল না।
অন্তত নিষ্পাপ দুধের শিশুদের উপরও যদি তাদের দয়া হতো! কিন্তু হায়! জালিমেরা অবুঝ শিশুদেরও রক্ষা করেনি।

ইয়াজিদের দরবার।
পিতার কর্তিত মস্তক সামনে পাত্রের উপর রাখা আছে।
শিশু সকিনা তাকিয়ে দেখছে।
অন্তর ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে।
হায় বাবা! জালিমেরা তোমাকে হত্যা করল।
আমাকে চড় মারল।
বাবা! আমিও যদি মরে যেতাম…..
আমার প্রাণপ্রিয় বাবা! একটু আমাকে দেখে যাও।
চাচা আব্বাসও আজ সঙ্গে নেই।
ভাইয়াও আমাকে ভুলে গেছে।
মা যদিও বুকে টেনে নেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
ফুফু আম্মাও বুকে জাপটে ধরে কাদতে থাকেন, তারও অশ্রু থামে না।
মাসুম শিশু সখিনা এ সমস্ত ধ্যানেই মগ্ন থেকে তৃষ্ণাকেও ভুলে যায়…….

—লা’নাতুল্লাহি আলাল কাওমিজ্জজালিমীন

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »