নৈতিক জ্ঞান ও নৈতিক কর্মের মধ্যকার ব্যবধান

195

☆একটি দার্শনিক আলোচনা☆

নৈতিক জ্ঞান এবং নৈতিক কর্ম বলে দু’টো কথা চালু আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে কোন ফারাক নেই। এটা জনাব সক্রেটিসের মতামত ছিল যে, তিনি বলতেন, “যে ব্যক্তি জানে যে তার মিথ্যা বলা উচিত নয়, সে মিথ্যা বলবে না। আর যদি সে মিথ্যা বলে তাহলে সে জানে না যে, তার মিথ্যা বলা উচিত নয়, তিনি হয়তো ভেবেছিলেন যে, তার মিথ্যা বলা উচিত নয়।” আজও গ্রেগরি ব্লাসুথের মতো একজন সক্রেটিস বিশেষজ্ঞ সক্রেটিক রিফ্লেকশনস নামক একটি খুব মজার বইয়ে সক্রেটিসের উপরোক্ত মতামতকে খুব জোড়ালোভাবে সমর্থন করেছেন।
নৈতিক জ্ঞান ও নৈতিক কর্ম- বিষয় দু’টো বিদ্যমান রয়েছে ঠিকই, তবে তাদের মধ্যে অবশ্যই ব্যবধান রয়েছে, আর এই ব্যবধানটি নৈতিক জ্ঞানের জন্যই শুধু নির্দিষ্ট নয়। বরং এই ব্যবধান বাকি জ্ঞানতত্ত্বগুলোর (معرفت) মধ্যেও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যারাই জানে যে, পানি একশ ডিগ্রিতে ফুটে, তারা সবাই কী তাদের জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করে থাকে?
সক্রিটিস পরবর্তী সকল উক্তিকারকরা বিশ্বাস করেন যে, নৈতিক জ্ঞান ও নৈতিক কর্ম এবং তাদের মধ্যকার ব্যবধানের বিষয়টি বর্তমান রয়েছে। আর এই ব্যবধানটি কেবল নৈতিক জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে এসব উক্তিগুলোর মধ্যকার মতানৈক্যের মূল বিষয়টি হচ্ছে এখানে যে, নৈতিক জ্ঞান ও নৈতিক কর্মের মধ্যকার ব্যবধানটি কোথা থেকে উৎপত্তি হয়েছে?
জনাব এরিস্টটলের মতামত হচ্ছে, এই ব্যবধান ও দুরত্ব ইচ্ছাশক্তির দুর্বলতার কারণে ঘটে থাকে। আর এ জন্যেই একে নৈতিক দুর্বলতাও বলা হয়ে থাকে।
ধোঁকা ও প্রতারণা এই ব্যবধান ও দূরত্বের মূল কারণ আখ্যায়িত করা যায়। আব্রাহামিক ধর্মগুলো সাধারণত এই তত্ত্বের উপর নির্ভর করে চলে এবং প্রতারক হিসাবে বিভিন্ন কারণকে বিবেচনায় আনে। আর সেই কারণগুলোকে তারা নফস বা খাহেশ বা শয়তান বা দুনিয়া বলে চিহ্নিত করেছেন।
এই উক্তির ন্যায় প্রাচ্যের ধর্মগুলোতেও একটি কথা বলা হয়ে থাকে। তারা বলে না যে, কোন সত্ত্বা মানুষকে প্রতারিত করে। বরং তারা বলে যে, মানুষ মায়ার অধীন, অর্থাৎ, সর্বজনীন মহাবিভ্রম। অবশ্য পাশ্চাত্যের ধর্মগুলো এই মতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। তারা বলছে, মানুষ কোন প্রতারকের মাধ্যমে প্রতারিত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। কিন্তু এই বিভ্রম থেকে পরিত্রাণ নেই। তবে এই বিভ্রম মানুষের মধ্যে যতটা কম থাকবে ততই মানুষ নৈতিকভাবে বেঁচে থাকতে পারবে।
এটা নিশ্চিত যে, উপরোক্ত দুটি তত্ত্বের উৎপত্তিস্থল হচ্ছে ধর্মীয় চেতনাবোধ। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন দার্শনিককে উপরোক্ত দুটি তত্ত্বের পক্ষে কথা বলতে দেখা যায়নি।
হতে পারে নৈতিক জ্ঞান ও নৈতিক কর্মের মধ্যকার এই ব্যবধানের মূল কারণ আত্মপ্রতারণা। নৈতিক মনোবিজ্ঞানে এই আত্মপ্রবঞ্চণা একটি অত্যন্ত গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে আত্ম-প্রতারণা মানে নিজেকে ধোঁকা দেয়া নয়, বরং নিজের মাধ্যমে প্রতারিত হওয়া বুঝায়, যা অনেক নৈতিক মনোবিজ্ঞানী এই তত্ত্বে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন।
মূলতঃ মানুষের মানসিক গঠন একক কাঠামোতে নয় বলেই এই ব্যবধান। কিয়েরকেগোর দর্শনের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো হৃদয়ের বিশুদ্ধতা, যা তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের শিরোনাম। কিয়েরকেগোর বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের গঠন এমন যে, সে কেবল একটি জিনিস চায় না, তার একটি মাথা আর হাজার হাজার সওদা। কিন্তু তিনি বলতেন, একটি নির্দিষ্ট নৈতিক সেইর ও সুলুকের মাধ্যমে একটি ঐক্যের দিকে গমন করা যেতে পারে, তবে এই হালত খুব কমই অর্জিত হয়ে থাকে।
মানুষ যে জিনিসগুলি খোঁজে তার মধ্যে অন্যতম হলো নির্দোষতা, অর্থাৎ নৈতিক ত্রুটি না করা। কিন্তু এই নির্দোষতা মানুষের অন্যান্য আকাঙ্ক্ষার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাড়ায়। আর যেহেতু মানুষ একমনা নয়, তাই তাকে অবশ্যই একটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা দুর্ভাগ্যবশত বেশীরভাগ সময় অন্যান্য খাহেশকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
অবশ্য, অনেকে কিয়েরকেগোর মতামতকে গ্রহণ করেননি। তবে তারা মেনে নিয়েছেন যে, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠন এমন যে, সে বিভিন্ন রকম আকাঙ্ক্ষা খোঁজে। আর নৈতিকভাবে জীবনযাপন তাদের পাশেই অবস্থান করছে। সুতরাং এভাবেই দ্বন্দ্ব দেখা দেয় এবং মানুষ অন্যান্য আকাঙ্ক্ষার সাথে এভাবেই লড়াই করে এবং সাধারণত তারা ব্যর্থও হয়।
মনোবিজ্ঞানে একটি তত্ত্ব আছে যা বলে যে, মানুষ সত্যিই একা এবং প্রতারিত হয় যখন তারা একাকী বোধ করে না। এখানে আকর্ষণীয় একটি আলোচনা বিদ্যমান রয়েছে, তা শিল্প জগতে অবস্থানকারীদের মধ্য থেকেই হোক অথবা কোন দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানীর কাছ থেকেই হোক। তারা এই তত্ত্বটিতে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন যে, মানুষ যদি জীবনের সমস্ত দিকে তার একাকিত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতো তাহলে সে সর্বদা নৈতিকভাবে জীবন যাপন করতে পারতো।
সুতরাং নৈতিকতার পথ মানুষের গভীর ও অদম্য নিঃসঙ্গতায় প্রকট রূপ ধারন করে। এ বিষয়টি একজন বিখ্যাত সামাজিক মনোবিজ্ঞানী Reisman এর একটি বিখ্যাত বইয়ের শিরোনাম, যার নাম Loneliness Crowd।
প্রাচীনকাল থেকে কিছু নৈতিক দার্শনিক বিশ্বাস করতেন যে, একজন ব্যক্তি যদি নিজের সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করে, তাহলে সে দেখতে পাবে যে, সে এ কারণে একটি অনৈতিক কর্ম করেছে যে, সে অনুভব করেছিল যে, তাকে সমর্থন করার জন্য একজন বা ততোধিক ব্যক্তি রয়েছে।
অবশেষে এটা বলা যায় যে, নৈতিক জ্ঞান ও নৈতিক কর্মের এ ব্যবধানটি মানুষের অনিবার্য স্ব-নির্বাচনের কারণেই হয়ে থাকে। তাই, এই স্ব-নির্বাচনকে যত বেশী কমানো যায় তত বেশী নৈতিকভাবে জীবন যাপন করা সম্ভবপর হবে।

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »