হযরত আলী (আ.): মহানবীর (সা.) প্রিয়তম শ্রেষ্ঠ অনুসারী

900

বিসমিল্লাহিররাহমানির রাহিম।

আজ চন্দ্রবর্ষের পবিত্র রজব মাসের তের তারিখ। এ দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মহাকালের মহাপুরুষ, সিংহমানব, লৌহপুরুষ, একেশ্বরবাদীদের অগ্রপথিক, মুমিনদের আমির, কাফেরদের বিনাশকারী, মিথ্যাবাদী ও মুনাফিকদের আতংক, প্রিয় নবীর দুনিয়া ও আখেরাতের ভাই, জুলফিক্বারের অধিকারী, ওহুদ, খন্দক ও খয়বর বিজয়ী, নবীজীর জ্ঞান ও আদর্শের উত্তরসূরী, ইবাদতকারীদের মডেল, মুসলিম উম্মাহ-র প্রথম ইমাম ও নেতা হযরত ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব আল মুরতাজা আলাইহিমাস সালাম। আর এ মহাঘটনাটি সংঘটিত হয় মহানবী (সা.আ.)-এর হিজরতের ২৩ বছর পূর্বে রোজ শুক্রবারে। [আল ইরশাদ, লেখকঃ হযরত আল্লামা শেইখ মুফিদ (রহ.), পৃঃ নং ৩]। এ ঐতিহাসিক দিনটি এমন একজন মহামানবের জন্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যিনি ছিলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম এর সবচেয়ে প্রিয়, গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ব্যক্তি, যার উপর নির্ভর করেছিল ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও আদর্শের প্রসার ও প্রতিষ্ঠা। নবীর(সা.) ঐশী আদর্শ ও শিক্ষা যদি ইমাম আলী সালামুল্লাহি আলাইহি-এর পবিত্র ও ঐশী জবান ও আমল দিয়ে নির্গত না হতো আর তা তাঁর পবিত্র ও মুতাহহার সন্তানদের মাধ্যমে প্রচার না হতো তাহলে আজকে ইসলামের সঠিক রূপটি ইতিহাসের সুগভীর মারপ্যাচে হারিয়ে যেতো। সেই জন্যে মহানবীর(সা.) আদর্শের মূল্যায়ন হযরত ইমাম আলীকে(সা.আ.) ছাড়া কোনমতেই সম্ভব নয়। আজ সেই মহামানবের পবিত্র জন্মবার্ষিকী। তিনি ছিলেন নবীজীর আত্মা, চোখ শীতলকারী ও বিপদের বন্ধু। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন নবীজীর আদরে আদরে। তিনি শিক্ষা-দীক্ষা শুরু করেছিলেন নবীজীর ঘরে। অনেক বছর ধরে তাঁর জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও ইবাদতের চর্চা চলেছিল মহানবীর(সা.) তত্ত্বাবধানে। ইসলাম প্রচার ও প্রসারে যিনি সর্বাধিক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং ইসলামের ক্রান্তিকালে বিপদমুক্ত করেছেন যে মহামানবটি, তিনি হলেন শেরে খোদা আসাদুল্লাহিল গ্বালিব হযরত ইমাম আলী(সা.আ.)। তিনি হলেন অলীকুলের সম্রাট, আধ্যাত্মবাদের শিরমনি, ইরফানী জগতের সর্বশ্রেষ্ট মহামানব এবং মহানবী হযরত মুহাম্মাদের(সা.) আদর্শিক অবিকল প্রতিচ্ছবি।

ক্বাবার অভ্যন্তরে ইমাম আমিরুল মুমেনীন হযরত আলী (আ.)-এর জন্ম এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ ঘটনা যার বর্ণনা সকল ইসলামী ফের্কার আলেম এবং আনসাব শাস্ত্রের পন্ডিতরা সবিস্তারে তাদের স্ব স্ব কিতাবসমূহে বর্ণনা করেছেন। আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অনেক বিশিষ্ট আলেম ও চিন্তাবিদরা এ সত্য ঘটনাটির বর্ণনা সরাসরী পেশ করেছেন এবং তা ইমাম আলীর একটি বিশেষ মর্যাদা বলে অখ্যায়িত করেছেন।
ইমাম মুহাম্মাদ আল মালেকী (রহ.) বর্ণনা করেছেন যে,

«وُلِدَ بِمکَّةَ الْمُشَرّفَةَ داخِلَ بَیْتِ الْحَرامِ فی یَوْمِ الْجُمعَةِ الثَّالِثَ عَشَرَ مِنْ شَهْرِاللّه ِ رَجَبِ سَنَةِ ثَلاثینَ مِنْ عامِ الْفیلِ… وَلَمْ یُولَدْ فِی الْبَیْتِ الْحَرامِ قَبْلَهُ اَحَدٌ سِواهُ، وَهِیَ فَضیلَةٌ خَصَّهُ اللّه تَعالی بِها اِجْلالاً لَهُ وَاِعْلاءً لَمَرْتَبَتِهِ وَاِظْهارا لِکَرامَتِهِ

অর্থঃ “আলী মক্কায় অবস্থিত আল্লাহর ঘর ক্বাবার অভ্যন্তরে রোজ শুক্রবার আম্মুল ফিলের ত্রিশতম বছরে তের-ই রজব দুনিয়াতে আগমন করেছেন… তাঁর পূর্বে কেউ আল্লাহর ঘরের অভ্যন্তরে ভুমিষ্ট হয়নি এবং এই জন্ম এমন একটি মর্যাদা যা আল্লাহ্ আলীকে সম্মান প্রদান করার জন্যে এটি নির্দিষ্ট করেছেন।”
(আল ফুসুলুল মুহিম্মা, পৃঃ নং ১২-১৩; বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩৫, পৃঃ নং ৮)।

অন্যত্র ইমাম আল হাকেম নিশাবুরী (রহ.) বলেনঃ
“ক্বাবা ঘরের অভ্যন্তরে আলীর জন্মের বিষয়টি বিশ্বস্থ ও বহু বর্ণনাকারীর মাধ্যমে আমাদের কাছে পৌছেছে।”
(আল মুসতাদরাক লি হাকেম নিশাবুরী, খন্ড ৩, পৃ ৪৮৩)।

আর ইমাম আলীর মাতার প্রসব ঘটনা সম্পর্কে বহু প্রসিদ্ধ হাদিসের মধ্যে একটি হচ্ছে এরকমঃ
[হযরত সাঈদ ইবনে জুবাইর, ইয়াযিদ ইবনে ক্বানআব থেকে বর্ণনা করেছেনঃ “আমি আব্দুল উযযা-এর কয়েকজন সন্তান ও আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিবের সাথে আল্লাহর ঘরের সামনে বসে ছিলাম। হঠাৎ আলীর মা ফাতেমা বিনতে আসাদ এসে উপস্থিত হলেন, ‍যিনি প্রসব বেদনার অবস্থায় ছিলেন।” তখন ফাতেমা বলেনঃ

«فَقالَتْ رَبِّ اِنّی مُؤمِنَةٌ بِکَ وَبِما جاءَ مِنْ عِنْدِکَ مِنْ رُسُلٍ وَکُتُبٍ، وَاِنّی مُصَدّقَةٌ بِکَلامِ جَدّی اِبْراهِیْمَ الخَلیلِ، وَاِنّهُ بَنی الْبَیْتَ العَتیقَ فَبِحَقِّ الّذی بَنی هذَا الْبَیْتَ وَبِحَقِّ الْمَوْلُودِ الَّذی فِی بَطْنی لمّا یَسَّرْتَ عَلَیَّ وِلادَتی
অর্থঃ “হে প্রতিপালক! আমি তোমার প্রতি, তোমার নবী ও রাসূলদের প্র্রতি এবং তাদের উপর নাযিলকৃত সকল আসমানী কিতাবের প্রতি ঈমান রাখি। আর আমার পিতামহ (হযরত) ইব্রাহিম খালিল (আ.) –এর প্রতিও ঈমান এনেছি। তিনি এ সম্মানিত ঘরকে নির্মান করেছেন। সুতরাং এই ঘরের নির্মানকারী ও আমার গর্ভের সন্তানের উসিলায় এই শিশুর জন্মকে সহজ করে দাও।”

ইয়াযিদ ইবনে ক্বানআব বলেনঃ “আমরা দেখলাম ক্বাবার একটা পেছনের অংশ (মুস্তাজার-এর স্থান) ফেঁটে গেলো এবং ফাতেমা গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। আমরা আর তাকে দেখতে পাইনি। দেয়াল পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে গেলো। আমরা চিন্তা করছিলাম যে, ক্বাবার তালা খুলে ফেলি। কিন্তু চেষ্টা করেও খুলতে পারিনি।

فَعَلِمْنا اَنَّ ذلِکَ اَمْرٌ مِنَ اَمْرِ اللّه ِ عَزّوجَلّ
আমরা বুঝতে পারলাম যে, এই ঘটনাটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সংঘটিত হয়েছে।”
(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩৫, পৃঃ নং ৮, হাদিস নং ১১; খাসায়িস আমিরিল মুমেনিন লি শারীফ রাযি, পৃঃ নং ৩৯; আল গ্বাদীর লি আল্লামা আমিনী, খন্ড ৬, পৃঃ নং ২২)।

যখন ক্বাবা ঘর থেকে তিনদিন পর বেরিয়ে আসলেন, তখন ফাতেমা বিনতে আসাদ বলেছিলেনঃ
اِنّی فُضِّلْتُ عَلی مَنْ تَقَدَّمَنی مِنَ النِّساءِ لِاَنَّ آسِیَةَ بِنْتَ مُزاحِمٍ عَبَدَتِ اللّه َ عَزَّوَجَلَّ سِرّا فِی مَوْضِعٍ لایُحِبُّ اَنْ یَعْبُدَاللّه َ فِیهِ اِلاّ اضْطِرارا، وَاِنَّ مَرْیَمَ بِنْتَ عِمْران هَزَّتِ النَّخْلَةَ الْیابِسَةَ بِیَدِها حَتّی اَکَلَتْ مِنْها رُطَبا جَنیّا، وَاِنّی دَخَلْتُ بَیْتَ اللّه ِ الْحَرامَ فَاَکَلْتُ مِنْ ثِمارِ اَلجَنَّةِ وَاَوْراقِها[ارزاقها]
অর্থঃ “আমি আমার পূর্বের নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছি। কেননা, মুযাহিম-এর কণ্যা আসিয়া (ফেরউনের স্ত্রী) গোপনে আল্লাহর ইবাদত করতো। নিরূপায় না হলে তিনি ফেরউনের প্রাসাদে ইবাদত করতে পছন্দ করতেন না। ইমরানের কণ্যা মারইয়াম খোরমার শুষ্ক গাছ নেড়ে পতিত খেজুর খেতো। আর আমি আল্লাহর ঘর ক্বাবার ভিতরে প্রবেশ করলাম এবং বেহেস্তের ফল ফলাদি খেয়ে অতিবাহিত করলাম।”
(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩৫, পৃঃ নং ৮; ই’লানুর উরা, পৃঃ নং ৩; আল ইরশাদ লি শেইখ মুফিদ, পৃঃ নং ৩)।

বর্ণিত আছেঃ “হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ যখন ক্বাবার অভ্যন্তরে ছিলেন তখন সাদা রেশমী কাপড় পরিহিত ও মৃগনাভী কস্তুরীর চেয়েও বেশী সুগন্ধী সম্পন্ন পাঁচ জন রমনী আসেন। তারা হলেন, হযরত হাওয়া (আ.), হযরত সারা (আ.), হযরত মুসা ইবনে ইমরান (আ,)-এর মা ও হযরত ঈসা (আ.)-এর মা হযরত মারইয়াম (আ.)। তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে আলীর জন্মের সময় সাহায্য করার জন্যে আসেন। কেননা, কোন অপবিত্র নারী এই পবিত্র শিশুর জন্মের সময় ক্বাবার ভিতর অবস্থান করতে পারেন না। তাঁরা হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ-কে সালাম দিলেনঃ
«السلام عليكِ ولية الله»
“হে আল্লাহর অলী! আপনাকে সালাম।”
হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ তাদের সালামের জবাব দেন। এই বেহেস্তী রমনীরা প্রত্যেকে তাঁর সামনে সুগন্ধি ভরা রূপার পাত্র হাতে নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন।”
(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৩৫, পৃঃ নং ১৩)।

আমরা এই মহামানবের জন্মদিনে অত্যন্ত আনন্দিত কন্ঠে তাঁর প্রতি জানাই শত-কোটি দরুদ ও সালাম এবং সকল রাসূল প্রেমিক ও আধ্যাত্মবাদের অনুসারীদেরকে জানাই আন্তরিক মোবারকবাদ ও অভিনন্দন। সাথে সাথে ইমামিয়া পাক দরবার শরীফের সকল ভক্ত, আশেক্বান ও মুরীদানকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা। এই দিনে জন্ম নেয়া এ মহামানবের পদাংক অনুসরণ করে আজ নবীজীর সঠিক আদর্শ বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যাক- এ কামনা করছি।

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »