নূরনবী হযরত মোস্তফা (সা.) পর্ব-পনের

349

নূরনবী মোস্তফা (সা.)

[ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে আপনারা যারা খোঁজ-খবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে, সপ্তম হিজরীতে কুরাইশ প্রতিনিধিবৃন্দ এবং রাসূলে খোদার মাঝে হুদাইবিয়া নামক শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই শর্তে যে, কোনো পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে জড়াবে না। চুক্তিপত্র অনুযায়ী না মুসলমানরা কুরাইশ বা তাদের আত্মীয়-স্বজনদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন চালাবে, না কুরাইশরা মুসলমান বা তাদের স্বজনদের ওপর আক্রমণ করবে। কিন্তু কুরাইশরা এই চুক্তি লঙ্ঘন করে। তারা তাদের মিত্র একটি গোত্রকে মুসলমানদের ওপর হামলা করতে লেলিয়ে দেয়। তাদের হামলায় বিশজন নিহত হয়েছিলো। অবশ্য এ কাজের জন্যে কুরাইশরা ঐ গোত্রটিকে প্রচুর টাকা-পয়সা দিয়েছিলো। কাপুরুষোচিত এই হামলার পর রাসূল (সা.) তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে, পতাকা উড়িয়ে মক্কার উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চারদিকের প্রবেশদ্বার দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। রাসূলে খোদা (সা.) সূরায়ে ফাত্‌হ তেলাওয়াত করছিলেন। তেলাওয়াত করতে করতে সোজা মাসজিদুল হারাম তাওয়াফ করলেন। কুরাইশ জনগণ এবং মক্কার উদ্ধত নেতারাও ভীত ও কম্পমান হৃদয়ে সারিবদ্ধ হলো এবং তাদের ভাগ্যে যে কী ঘটতে যাচ্ছে তা জানার অপেক্ষায় ছিল। এই লোকেরা অতীতে বহু অপরাধ করেছিল। রাসূলে পাক (সা.) এবং তাঁর সাহাবীদের ওপর অনেক অত্যাচার করেছিল। যুদ্ধের আগুন জ্বালানো, ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি, খুন-খারাবি করা প্রভৃতি কাজে তারা লিপ্ত ছিল। সেজন্যে তারা নিজেরাও জানতো যে, নবী করিম (সা.) যদি তাদের অত্যাচারের কঠিন প্রতিশোধও নেন, তাহলেও তা অন্যায় কিছু হবে না। তারা যখন এই ধরনের চিন্তা-ভাবনা করছিলো, তখন রাসূলে খোদা (সা.) তাঁর সাহাবীদের ঘোষণা দিতে বললেন, যারা মসজিদুল হারাম অথবা আবু সুফিয়ানের বাসায় আশ্রয় নিবে তারা সবাই নিরাপদ। দয়ার নবী যখন কুরাইশদের উদ্বিগ্ন চেহারা দেখলেন, তখন তাদের বললেন, “তোমাদের কোনো ভয় নেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমাশীল। আমি তোমাদেরকে মুক্ত করে দিলাম!”

মক্কা বিজয়ের ঘটনায় এই শহরের প্রায় দুই হাজার লোক ইসলাম গ্রহণ করে। অথচ রাসূল (সা.) এদের কাউকেই ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করেননি। আসলে মক্কা বিজয়ের ঘটনায় সমগ্র আরবে ইসলাম বিকাশের ধারা বেগবান হয়েছিল। রক্তপাতহীন এই বিজয় ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রমাণ। বর্তমান বিশ্বে সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইসলাম অন্যতম প্রভাব বিস্তারকারী একটি ধর্ম হিসেবে শান্তি ও রহমত এবং সহিংসতা বিরোধী বার্তা প্রচার করছে। নবীজীর কর্মপদ্ধতি বিশেষ করে মক্কা বিজয়ের ক্ষেত্রে তাঁর যে কর্মতৎপরতা, তা মিথ্যা ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপপ্রচারণাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

হযরত মুহাম্মাদ (সা.) অত্যন্ত কৌশলের সাথে এবং সুন্দর বাচনভঙ্গির মাধ্যমে জনগণকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। রাসূলে মাকবুলের সৈন্য-সামন্ত এবং অধিনায়কগণও এই আদর্শেরই অনুসারী ছিলেন। তবে খালেদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যাঁকে রাসূল (সা.) বনী জাজিমা গোত্রের লোকজনকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসূলের আদর্শ বা পদ্ধতি অনুসরণ না করে তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে কয়েকজন যুদ্ধবন্দিকেও হত্যা করে। রাসূল (সা.) এই ঘটনা জানতে পেরে খালেদের ওপর ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি ইমাম আলীকে ঐ গোত্রে পাঠালেন তাদের ক্ষতিপূরণ এবং নিহতদের রক্তমূল্য দেওয়ার জন্যে।

মানবেতিহাসের প্রাচীন দিনগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো যে, মানুষের মাঝে বিভিন্ন রূপে এবং ব্যাপকভাবেই মত-পার্থক্য বিরাজমান ছিল। এই মতপার্থক্য উত্থিত হিংসা-বিদ্বেষের কারণে সমাজের সুস্থতার জন্যে অনিবার্য শান্তি ও নীরবতা বিঘ্নিত হয় এবং সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী মহল এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অন্যদের ওপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উচ্চাভিলাষী এবং জনগণের ওপর অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও জিহাদের বিধান দিয়ে বলেছেন: “তোমাদের সাথে যারা অন্যায়ভাবে যুদ্ধ করতে চায় তাদের সাথে তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো, তবে সীমালঙ্ঘন করো না। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” ( সূরা বাকারা: ১৯০)।

একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) যে যুদ্ধ করেছেন তা ছিল একদিকে নির্যাতিত ও মজলুম অসহায়দের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার, অপরদিকে পুঁজিপতিদের করালগ্রাস থেকে অত্যাচারিতদের রক্ষা করার উপায় এবং সমাজে নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিত করার মাধ্যম। হিজরতের প্রথম দশ বছরে যেসব দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেখা দিয়েছিল, তাদের অধিকাংশই ছিল আত্মরক্ষামূলক। রাসূলে খোদার সকল যুদ্ধই ছিল আত্মরক্ষামূলক, এর মানে এই নয় যে, রাসূল (সা.) সকল যুদ্ধেই তাঁর ওপর হামলার অপেক্ষায় বসেছিলেন। নবী করীম (সা.) যদি সশস্ত্র প্রস্তুতি গ্রহণ না করতেন এবং শত্রুদের মোকাবেলায় তাঁর সকল শক্তি-সামর্থকে কাজে লাগিয়ে খোদার দুশমনদের ভীত সন্ত্রন্ত না করতেন, তাহলে ইসলামের শত্রুরা সেদিনই ইসলাম, কোরআন এবং ইসলামী সমাজকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিতো। সেজন্যেই রাসূল (সা.) যুদ্ধ করতে এবং যুদ্ধের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

যুদ্ধে যাবার আগে রাসূল (সা.) তাঁর লোকজনকে উপদেশ দিয়ে বলতেন: “নারী ও শিশুদের ব্যাপারে তারা যেন সদয় হয় আর শত্রু সৈন্যদের সাথে যৌবনদীপ্ত অর্থাৎ সাহসিকতাপূর্ণ আচরণ করে। শত্রুদের খাদ্য এবং পানি সরবরাহে যেন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা না হয়। কেউ যদি আত্মসমর্পন করে তাকে যেন বরণ করা হয়। ঘোরতর যুদ্ধের মাঝেও যদি কেউ ইসলাম গ্রহণ করার ঘোষণা দেয়, তাকে যেন বিশ্বাস করা হয় এবং তার ঈমান আনার বিষয়টিকেও যেন মেনে নেওয়া হয়। রাসূলের এই মানবিকতাপূর্ণ ও সদয় আদর্শগুলোই প্রমাণ করে যে, তিনি ছিলেন সকল প্রকার প্রতিহিংসা ও সহিংসতার উর্ধ্বে। আনাস ইবনে মালেক বলেন: “খায়বার যুদ্ধের সময় রাসূলে খোদা রাতে রণাঙ্গনে গিয়েছিলেন। তিনি কখনোই শত্রুদের ওপর অতর্কিতভাবে নৈশ হামলা চালাননি। পরদিন সকালে ইহুদিরা ফলের ঝুড়ি আর বেলচা নিয়ে তাদের দূর্গ থেকে বেরিয়ে এসে যখন জানতে পারলো যে, ইসলামের নবী রাতে সেখানে ছিলেন, অথচ হামলা করেননি, তখন তারা বলে উঠলো এটা নিঃসন্দেহে নবীসুলভ আচরণ।”

আসলে যেসব কাফের রাসূলের কাছে যেত এবং রাসূলের পূত-পবিত্র চেহারা খুব কাছ থেকে দেখতে পেতো, তারা রাসূলের ভালবাসা ও হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহারে লজ্জিত হয়ে যেতো। রাসূল (সা.) তাঁর বিনীত ও সৌহার্দপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণের অন্তর জয় করে নিতেন। তিনি এই ভদ্র আচরণের মাধ্যমে জনগণের মাঝ থেকে এমন একটি ঐক্যবদ্ধ দল গঠন করে দিতেন, যারা যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবেলায় বিজয় ছিনিয়ে আনতেন। এ ছাড়া তাঁর আচার ব্যবহারগত সৌন্দর্যের কারণেও বহু লোক ইসলাম গ্রহণ করে।

অবশেষে যুদ্ধ-সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু যুদ্ধের অভিজ্ঞতাগুলো থেকে যায়। বিভিন্ন জাতির জন্যে সেইসব অভিজ্ঞতা এখন দৃষ্টান্তমূলক ও শিক্ষণীয় ঘটনা আর সমগ্র মানবতার জন্যে তা পথ-নির্দেশক। ইসলামী সভ্যতার সোনালী দিনের সেই বীরত্ব, রাসূলের দয়া ও ক্ষমাশীলতা এবং যুদ্ধের ময়দানে পর্যন্ত তাঁর সদাচারের স্মৃতির কথা বিভিন্ন প্রজন্মের সামনে প্রতিভাত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বেও যুদ্ধের লেলিহান শিখা, হত্যা-লুণ্ঠন এবং স্বৈরাচারী শাসকদের আস্ফালন চলছে। এটা নিশ্চিত যে, বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের ওপর যে নরকীয় অত্যাচার চলছে, ভবিষ্যতে তার বিচার অবশ্যই হবে। সেদিন নবীজীর আদর্শের সেই আলো, তাঁর সেই দয়া ও ভালবাসার মহিমা কালত্তীর্ণ উজ্জ্বলতায় জ্বলজ্বল করবে।]

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »