নূরনবী হযরত মোস্তফা (সা.) পর্ব-সাত

381

নূরনবী মোস্তফা (সা.):

(৭ম পর্ব)

📗[হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর বয়স যতই বাড়তে লাগলো, তাঁর চেহারায় নূরের ঔজ্জ্বল্যও ততই বৃদ্ধি পেতে লাগলো। হযরত ইব্রাহীম (আ.) প্রবর্তিত বিধি-বিধানের একটা ম্লান রূপ ইতিহাসের পাতায় তখনো অবশিষ্ট ছিল। হযরত ঈসা (আ.)- এর জন্মের কয়েক শতাব্দী কেটে গেল। তাঁর শিক্ষার আলোও নিষ্প্রাণ হয়ে গেল। পাশ্চাত্যে নির্দয় রোমান সভ্যতা সর্বত্র ছায়া বিস্তার করেছিল। পারস্যে রাজার শক্তি ছিল অসীম, জনগণ তার কাছে প্রজা হিসেবে গণ্য ছিল। এই দুই সাম্রাজ্য অর্থাৎ রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যে তখন ঈসা (আ.) ও যরাথুস্ত্র- এর জয় জয়কার ছিল ঠিকই কিন্ত তাঁদের প্রবর্তিত বিধি-বিধানের সাথে দূরত্ব ছিল প্রচুর। এই দুই সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে অধিকাংশ গ্রাম, শহর ও বন্দর বহু মানুষের রক্তে সয়লাব হয়ে গিয়েছিল। রোমে গোলাম বা দাসদেরকে কঠিন কাজে ব্যবহার করা হত। যেমনঃ প্রাসাদ ও প্রার্থনালয় তৈরীর কাজে তাদেরকে ব্যবহার করা হত। দাসেরা যদি ছোটোখাট কোন প্রতিবাদও জানাতো, তাহলে তাদেরকে দেওয়াল বা পিলারের ফাঁকে জীবিত সমাহিত করা হতো। যুদ্ধ, নিষ্ঠুরতা এবং হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি প্লেগ আর দুর্ভিক্ষও সমানভাবে বিরাজ করছিল। অন্যদিকে জঙ্গলাকীর্ণ দক্ষিণ আফ্রিকায় তখনো সভ্যতার কোন ছোঁয়াই লাগেনি। সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের তীরভূমি কিংবা আমেরিকার হারানো উপমহাদেশ সম্পর্কে কারো কোন ধারণাই ছিল না। ফলে বলা যায়, রোমান সভ্যতার ওপর দিয়ে খ্রিস্টান ধর্মের সুশীতল বায়ুপ্রবাহ যদি বয়ে না যেত, তাহলে পাশ্চাত্য ভূমিতে কারো মনেই খোদার প্রতি প্রেম- ভালবাসার অনুভূতিই জাগতো না। যাই হোক, তৎকালীন বিশ্ব, জুলুম-অত্যাচার আর অজ্ঞতার আঁধারে একেবারে ছেয়ে গিয়েছিল।
হযরতের নবুয়্যত লাভ করার আগে অর্থাৎ ঈমান ও জ্ঞানের আলো বিকিরিত হবার আগে চিন্তা ও যুক্তি থেকে মানুষ বহুদূরে অবস্থান করতো। তবে চন্দ্র, সূর্যের মত নানা জড়বস্তুর পূজা-অর্চনা, বলখে অবস্থিত বৃহৎ নওবাহার মন্দির এবং পারস্যে অসংখ্য অগ্নিমন্ডপ ও বিশাল বৌদ্ধ মন্দিরের অবস্থান প্রমাণ বহন করে যে, সৃষ্টিকর্তা বা উপাসকের অন্বেষন মানুষের সহজাত প্রবণতা এবং এই প্রবণতা সার্বজনীন ও সর্বকালীন। ফলে মানুষ কোন না কোন কিছুর পূজা-অর্চনা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। এই প্রবণতা বা প্রয়োজনীয়তার কারণেই ঐশী গ্রন্থগুলোও মানুষের অনুচিত হস্তক্ষেপ থেকে রেহাই পায়নি। যেমন, তৌরাতে আল্লাহর অস্তিত্ব মানুষের দৈহিক গঠনের মত রূপ নেয়। এমনকি তৌরাতে মানবরূপী এই খোদা মানুষের সাথে কুস্তি খেলে হেরে যায়। আরবের বিভিন্ন গোত্রের লোকজন বছরের ৩৬০ দিনে তিন শত ষাট দেবতা বা মূর্তির পূজা করতো। তারা লাত-মানাত-ওয্যার মতো বড় বড় মূর্তিগুলোকে খোদার মেয়ে বলে মনে করত। রোমেও এ ধরনের খোদাদের বাজার বেশ ভালই জমেছিল।

এসবই রাসূলের নবুয়্যত লাভের পূর্বেকার ঘটনা। সে সময় মানুষ বিচিত্র ধারণা-কল্পনা আর কুসংস্কারে নিমজ্জিত ছিল। কোন ঘটনা বা পরিস্থিতিকে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। মার্কিন ইতিহাসবিদ বিল ডুরান্টের ভাষ্য অনুযায়ী, তখনকার দিনে মানুষ হরিণের হাঁড় আর কচ্ছপ পুড়িয়ে ভবিষ্যত বাণী করতো।

অন্যভাবে বলা যায়, রাসূলের নবুয়্যত লাভের আগে সমাজে মানুষের প্রকৃত কোন অবস্থান জানা ছিল না। অন্যদের ওপর নিজস্ব মালিকানা সত্ত্ব এতটাই প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, একজন পিতা ইচ্ছে করলেই পরিবারের সবাইকে বিক্রি করে ফেলতে পারত কিংবা পরিবারের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারত। এই মালিকানা অধিকার একজন পিতার ছিল। স্ত্রীর প্রতিও পুরুষদের একই রকম আচরণ ছিল। আরবে নারীরা অন্যান্য মালামালের মত লুট হত। পুরুষরা অন্য কোন পুরুষকে মেরে তার স্ত্রীকে অধিকার করতে পারত। জাপানী পরিবারে বাবা তার নিজের সন্তানদেরকে গোলাম হিসেবে যেমন বিক্রি করতে পারতো, তেমনি ইচ্ছে করলে পতিতালয়েও বিক্রি করতে পারতো।

জাহেলী যুগের সমাজে সর্বপ্রকার নোংরামী আর নিষ্ঠুরতা বিরাজ করছিল। রুক্ষ ও নির্দয় মানুষগুলোর অন্তর ছিল পাথরের মতো কঠিন। বংশে-বংশে, গোত্রে-গোত্রে মারামারি-হানাহানি আর রক্তপাত ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। রক্তপাত কে কত বেশী ঘটাতে পারলো, তা নিয়ে গর্ব অহঙ্কার করতো তারা। আরব ভূখণ্ডে তখন জাহেলী চিন্তা আর অবৈধ কর্মকান্ড মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। এ সম্পর্কে ইমাম আলী (সালামুল্লাহি আলাইহি) বলেন:
“হে আরব জাতি! তোমরা সর্ব নিকৃষ্ট ধর্ম ও আচার-কুসংস্কারের অনুসারী ছিলে! সর্ব নিকৃষ্ট পরিবেশের মধ্যে দিনযাপন করছিলে! তোমরা প্রস্তর আর কঙ্করময় ভূমিতে বিষাক্ত সাপের মাঝে-যেসব সাপ কোন শব্দকেই ভয় করত না- সে রকম পরিবেশে বসবাস করছিলে। তোমরা দূষিত পানি পান করতে এবং রুক্ষ ও শুষ্ক সব খাবার-দাবার খেতে। তোমরা পরস্পরের রক্ত ঝরাতে এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। তোমরা মূর্তিকে খোদা বলে দাবী করতে এবং তোমাদের মাঝে অন্যায়-পাপাচার ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার।” এসব বিশৃঙ্খল ঘটনা দেখে রাসূলের পবিত্র অন্তর ভীষণভাবে আহত হত। তিনি বন্দীত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ কোন ব্যক্তির দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না, এই জুলুমপূর্ণ পরিবেশ তিনি মেনে নিতে পারতেন না। নিরুপায় হয়ে শহর থেকে দূরে প্রাকৃতিক কোন পরিবেশ কিংবা মরুভূমিতে গিয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চিন্তায় মগ্ন হয়ে যেতেন। একদিন হযরত মুহাম্মাদ (সা.) একদল লোককে মক্কার বাজারে দেখতে পেলেন। তিনি দেখলেন, একজন আরব জুয়া খেলতে খেলতে তার ঘর, উট সব হারিয়ে বিজয়ী ব্যক্তির অধীনে দশ বছরের জন্যে বন্দী হয়ে গেল। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ঐদিন অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশী দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে মরুভূমির দিকে চলে গেলেন। মক্কার আশেপাশের পাহাড়গুলোতে অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বেশী সময় কাটালেন এবং রাতে বেশ দেরী করে বাসায় ফিরলেন।

তবে জাহেলী যুগের সবচেয়ে নোংরা আচার-প্রথাগুলো দেখা যেত তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে। দেবতাদের উদ্দেশ্যে মন্দিরের বলিকাষ্ঠে সাহসী সন্তানদেরকে জবাই করা হত। বলি দেওয়া সন্তানের রক্তমাখা মাটিতে তারা গড়াগড়ি খেতো। অপরদিকে আরবরা কন্যা সন্তান থাকায় অপমানিত বোধ করে কিংবা ক্ষুধার্ত হবার ভয়ে নিজেদের কন্যা সন্তানগুলোকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিত। অনেক সময় দেখা যেত, অবুঝ ঐ কন্যা সন্তানটি তার জন্যে কবর খোঁড়ার কাজে বাবাকে সহযোগিতা করছে। আবার এমনও দেখা গেছে, বাবা তার কন্যা সন্তানটির সারা গায়ে লেগে থাকা ধূলোবালি পরিস্কার করে, ঘণ্টাখানেক পর নিজেই তাকে জীবিত কবর দিয়ে এসেছে।

ইসলামের সর্বশেষ নবীর নবুয়্যত প্রাপ্তির আগে বর্ণ ও শ্রেণী বৈষম্য ছিল মারাত্মক। একটা শ্রেণী ছিল সম্পদশালী, আর আরেকটি শ্রেণী ছিল গরীব। ধনীরা গরীবদের শোষণ করতো। অপরের কাছ থেকে অধিকার আদায় করে নেওয়ার শক্তি কারো ছিল না। অবস্থা এমন বেগতিক ছিল যে, হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কতিপয় যুবককে নিয়ে একটি সেবামূলক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হন। সংগঠনভুক্ত সবাই শপথ নেন যে, তাঁরা মজলুম ও বঞ্চিতদের অধিকার রক্ষায় সকল প্রকার চেষ্টা চালাবেন।

সে সময় দাস বেচা-কেনাও একটা লাভজনক ব্যবসা ছিল। যে দাসদের বেচা-কেনা করা হত, তারা সাধারণত: আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ছিল অথবা ছিল যুদ্ধবন্দী। একদিন হযরত খাদীজার ভাতিজা হাকীম সিরিয়া থেকে বেশ ক’জন দাসকে হযরত খাদীজার কাছে নিয়ে এলো। তাদের মাঝে বনু কেলাব গোত্রের একটি শিশুও ছিল। শিশুটির নাম ছিল যায়েদ। হযরত খাদীজা ঐ শিশুটিকে কিনে নিলেন। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ঐ শিশুটিকে দেখে অন্তরে খুব ব্যথা পেলেন। তাঁর চেহারা ম্লান হয়ে গেল। হযরত খাদীজা ঐ শিশুটিকে তাঁর স্বামীর খেদমতে হাজির করলেন। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) দ্রুত শিশুটিকে মুক্ত করে দিলেন। তারপর এই নিরাশ্রয় শিশুকে নিজেদের পরিবারের সন্তান হিসেবে বরণ করে নিলেন। অত্যাচার আর অজ্ঞানতার বিস্তৃতি যতই বৃদ্ধি পেতে লাগলো, বিশ্ব একটা বিপ্লব বা বিশাল পরিবর্তনের জন্যে ততই প্রস্তুত হতে লাগলো। ঐ নিঝুম অন্ধকারের মাঝেও হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি দেখা দিল। সত্য সুনির্মল এক জ্যোতি হযরত মুহাম্মাদ (সা.)- এর অন্তরকে আয়নার মতো আলোকোজ্জ্বল ও স্বচ্ছ করে দিল। উজ্জ্বল ঐ আলো অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকিত করে তুললো।]

চলবে…….

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »