নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) পর্ব-তিন

396

নূরনবী মোস্তফা (সাঃ)

(৩য় পর্ব)

হযরত মুহাম্মাদ(সা.) তরুণ বয়সে পৌঁছুলেন। তাঁর বিশেষ যেসব বৈশিষ্ট্য ছিল, সে সবের জন্যে তিনি তাঁর সমবয়সীদের মাঝে ছিলেন স্বতন্ত্র। প্রায়ই তিনি চিন্তার সাগরে নিমজ্জিত হয়ে যেতেন। পিতা-মাতা এবং দাদা মারা যাবার পর চাচা আবু তালেব পরম আদর যত্নে তাঁকে লালন পালন করেন। হযরত আবু তালেব হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে ভীষণ ভালবাসতেন। তাঁর হৃদয় মাখা ভালোবাসার কারণে এতিম এই বালকটির স্বজন হারানোর কষ্ট অনেকটাই লাঘব হয়েছিল। হযরত আবু তালেব ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একদিন তরুন মুহাম্মাদ শুনতে পেলেন যে, চাচা সিরিয়া সফরে যাচ্ছেন, তার মানে তাঁর চাচা কিছুদিন তাঁর কাছ থেকে দূরে থাকবেন। একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন হযরত মুহাম্মাদ(সা.)। মনে মনে বললেন, চাচা যদি আমাকেও তাঁর সফরসঙ্গী করতেন। ছয় বছর হয়ে গেছে মক্কার বাইরে যাননি মুহাম্মাদ। তাঁর মন ছিল ভীষণ কৌতূহলী। অজানাকে জানার জন্যে তাঁর মন সব সময় সফরে যেতে চাইতো। কারণ সফর তাঁর এই কৌতূহলী মনের চাহিদা কিছুটা মেটাতো। সিরিয়া সফরের জন্যে তাঁর ব্যাকুলতা এতোই ছিল যে, তিনি তাঁর চাচার কাছে গিয়ে কাফেলার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন। কাফেলা সফর শুরু করার জন্যে প্রস্তত ছিলো। হযরত আবু তালিব উটের পিঠে বসা ছিলেন আর কাফেলার দিকে বিভিন্ন মাল- সামগ্রী দিচ্ছিলেন।  হযরত মুহাম্মাদ(সা.) একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে চাচার উটের লাগামটা হাতে নিলেন এবং বললেন: “চাচাজান ! এমনও কী হতে পারে যে, আপনি  আমাকে আপনার সাথে নিয়ে যাবেন!” হযরত মুহাম্মাদ(মা.)-এর চেহারা দেখে হযরত আবু তালিবের মনে ঝড় বয়ে গেল। তিনি উটের পিঠ থেকে নেমে পড়লেন এবং হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে জড়িয়ে ধরে বললেন: “মুহাম্মাদ! প্রিয় আমার! তুমি কি জানো, তোমার ভারাক্রান্ত চেহারা দেখাটা আমার জন্যে কতটা কষ্টের! এই বলে হযরত আবু তালিব তাঁর স্নেহভরা দু’হাত দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে আদর করে দিলেন এবং সফরের কষ্টের কথা চিন্তা না করেই সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁকে সাথে নিয়ে যাবেন। এই খবর শুনে হযরত মুহাম্মাদ(সা.) ভীষণ খুশি হয়ে গেলেন।

কাফেলা মক্কার উত্তরের পাহাড়গুলোকে পেছনে ফেলে চলে গেল। মক্কার সুপরিচিত শহর ধীরে ধীরে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল। তিনি তাঁর আশেপাশের সবকিছু দেখতে লাগলেন। বিস্তৃত মাঠ-প্রান্তর, প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখে তিনি বেশ উৎফুল্ল বোধ করতে লাগলেন। এ সময় হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর বয়স ছিল বারো বৎসর। তরুণ বয়সের সফর বলে তাঁর কাছে এটি ছিল সুখকর ও স্মৃতিমধুর। হযরত মুহাম্মাদ(সা.) নীরবতা এবং একাকীত্ব ভীষণ ভালবাসতেন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিনি বেশ অভিভূত হতেন। কাফেলা অনেক দূর পেরিয়ে সামুদ জাতির বসবাসের উপভোগ্য আবহাওয়াময় অঞ্চলে গিয়ে পৌঁছলো। হযরত আবু তালিব তখন আল্লাহর নাফরমানীর কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐ ধনী সম্প্রদায়টির গল্প হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে শোনালেন। বিচিত্র এলাকা, শহর, মানুষ, আইন-কানুন, বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি, পাহাড়ের পর পাহাড়, উপত্যকা আর তারাভরা মরুভূমির আকাশ দেখে আনন্দিত যেমন হলেন, তেমনি তাঁর জন্যে শিক্ষণীয়ও ছিল অনেক কিছু। কয়েক দিনের মধ্যেই কাফেলা সিরিয়ায় গিয়ে পৌঁছুলো।

হযরত মুহাম্মাদ(সা.) কৌতূহলী ও সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে সবকিছু দেখতে লাগলেন। তিনি সব কিছুকে মূল্যায়ন করতে এবং স্মৃতিভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে লাগলেন। এইসব মিষ্টি অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর সফরের ক্লান্তি যেন অনুভূতই হলো না। তাছাড়া চাচাজানের সঙ্গে থাকার কারণে অন্যরকম মজা পাচ্ছিলেন। অনেকটা পথ পাড়ি দেবার পর কাফেলার মাঝে ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁরা বসরা নামক এলাকায় পৌঁছলেন। হযরত মুহাম্মাদ(সা.) উটের পিঠে বসে ছিলেন। হযরত আবু তালিবের আদেশে কাফেলার সবাই একটি টিলার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। টিলার চূড়ায় ছিল একটা গির্জা। এটা ছিল বুহাইরার গির্জা। এই গির্জাটি সে সময় খুব নামকরা ছিল। বুহাইরা ছিল বেশ জ্ঞানী ও পন্ডিত ব্যক্তি। তাওরাত-ইঞ্জিলসহ আগের সকল আসমানী কিতাবের জ্ঞান তার ছিল। সে জন্যে দূরের ও কাছের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু লোক বুহাইরাকে দেখতে তার গির্জায় আসতো। যাই হোক, কিছু সময় পর এই বুহাইরার দূত কাফেলার নেতার কাছে এলো। হযরত আবু তালিবের কাছে গিয়ে সে বললো: বুহাইরা আপনাদেরকে মধ্যাহ্ন ভোজের দাওয়াত দিয়েছেন। হযরত আবুতালিব এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এই খবর শুনে বেশ বিস্মিত হলেন। তাঁদের একজন বলে উঠলেনঃ “বছরের পর বছর এই এলাকা অতিক্রম করেছি, অথচ এই প্রথমবারের মতো বুহাইরা আমাদেরকে এভাবে দাওয়াত করলেন।” হযরত আবু তালিব বুহাইরার দাওয়াত গ্রহণ করলেন এবং সিদ্ধান্ত হলো যে, হযরত মুহাম্মাদ(সা.) কাফেলার জিনিসপত্র দেখা-শোনার দায়িত্বে থাকবেন আর বাকি সবাই বুহাইরার আমন্ত্রণে যাবেন।

গির্জায় বিচিত্র খাবারের আয়োজন করা হলো। বুহাইরা মেহমানদের অভ্যর্থনা জানালেন আর গভীরভাবে মেহমানদের চেহারাগুলো লক্ষ্য করে বললেন: “তোমরা মনে হয় তোমাদের একজন সাথীকে সঙ্গে আনোনি।” তাঁরা বললো: “হ্যাঁ, একটা শিশুকে আমরা আমাদের মালামাল দেখাশোনা করার জন্যে রেখে এসেছি।” বুহাইরা বললো: “তাকেও নিয়ে আসো।” তরুন মুহাম্মাদ(সা.) যখন গির্জায় এলেন, বুহাইরা তখন গভীর দৃষ্টিতে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে দেখতে লাগলেন এবং নিজের পাশে বসিয়ে ভীষণ আদর-যত্ন করতে লাগলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর ঘণ্টা খানেক বিশ্রাম নিয়ে কাফেলার লোকজন যেতে উদ্যত হলো। বুহাইরা হযরত মুহাম্মাদ(সা.) এবং হযরত আবু তালিবকে রেখে অন্য সবাইকে যেতে দিলো। সবাই চলে যাবার পর বুহাইরা নিরিবিলি হযরত আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করলেনঃ “তোমার সাথে এই যুবকের কি কোনো সম্পর্ক আছে?” আবু তালিব বললেনঃ “ও আমার সন্তান।” বুহাইরা বললো: “না, তার তো বাবা-মা থাকার কথা নয়। অল্পবয়সেই সে তার বাবা-মাকে হারিয়েছে।” হযরত আবু তালেব বললোঃ “হ্যাঁ, আমি তার চাচা এবং তার অভিভাবক।” বুহাইরা হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দিকে তাকিয়ে তার নাম জিজ্ঞেস করলো। তরুন মুহাম্মাদ তাঁর নাম বললেন। বুহাইরা জবাব দিলো: “হ্যাঁ, এরকমই তো। মুহাম্মাদ অথবা আহমাদ। হে আমার সন্তান! তোমাকে লাত-ওযযার শপথ দিচ্ছি।” হযরত মুহাম্মাদ(সা.) সাথে সাথে বললেন: “লাত-ওয্যা নিয়ে আমার সাথে কোনো কথা বলবেন না। এই পৃথিবীর বুকে তাদের চেয়ে ঘৃণিত আর কোনো বস্তু আমার কাছে নেই।” বুহাইরা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললোঃ “তোমাকে তোমার খোদার শপথ দিয়ে বলছি, আমার প্রশ্নগুলোর সঠিক জবাব দাও!”

হযরত আবু তালিব তখন বললেনঃ “নিশ্চিত থাকুন, হে পাদ্রী মহাদয়! আজ পর্যন্ত তার কাছ থেকে কেউ সত্য ব্যতীত অন্য কিছু শোনেনি।” বুহাইরা আনন্দের সাথে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে জিজ্ঞেস করলো: “হে মুহাম্মাদ! আমাকে বলো, কোন জিনিস তুমি বেশী পছন্দ করো?” মুহাম্মাদ বললেন: “একাকীত্ব।” বুহাইরা আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ “একাকী কী চিন্তা করো, কী নিয়ে ভাবো?” হযরত মুহাম্মাদ(সা.) বললেনঃ “স্রষ্টা ও সৃষ্টিজগত নিয়ে, জন্ম-মৃত্যু নিয়ে, সত্ত্বা নিয়ে, অন্য ভূবন নিয়ে।” বুহাইরা জানতে চাইলোঃ “বিশ্বে যা কিছু দেখ, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী পছন্দ করো কোন জিনিস?” হযরত মুহাম্মাদ(সা.) বললো: “প্রকৃতি, আর প্রকৃতির মধ্যে আকাশ এবং তারকারাজি বেশী পছন্দ করি।” বুহাইরা জানতে চাইলো: “তুমি কি স্বপ্ন বেশি দেখো?” জবাবে হযরত মুহাম্মাদ(সা.) বললেন: “হ্যাঁ! এবং তারপর সেগুলোকে বাস্তবেও লক্ষ্য করি।” বুহাইরার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। বিস্ময়ের সাথে হযরত আবু তালেবের কাছে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর কাঁধ দুটি দেখতে চাইলো। হযরত আবু তালেব হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দিকে তাকিয়ে অসম্মতি জানাবার মতো কোন লক্ষণ  দেখলেন না। তাই দেখালেন। বুহাইরা হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দুই কাঁধের মাঝখানে তিল দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেললো। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।

পেরেশান হয়ে সে বললো:  “ঐশীগ্রন্থ এবং পূর্ববর্তীগণ যেরকম বলে গেছেন হুবহু সব মিলে যাচ্ছে। সে মুহাম্মাদ এবং আহমাদ। তোমার ওপর দরুদ হে ঐশী গ্রন্থসমূহের রহস্য! তোমার ওপর দরুদ! হে খোদার অনুগ্রহের প্রকাশস্থল। তুমি তো সে-ই, তাওরাত ও ইঞ্জিলে যাঁর আগমনের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে এবং পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ যাঁর লক্ষণগুলো বর্ণনা করে গেছেন।” বুহাইরা হযরত  আবু তালিবের দিকে তাকিয়ে বললো: “তোমার ভাতিজার মাধ্যমে বিশাল বিশাল ঘটনা ঘটবে। সে মূর্তিগুলোকে নিশ্চিহ্ন করবে। মানুষের চোখের সামনে থেকে শেরক ও কুফুরির পর্দা ছিন্ন করবে। সে সর্বশ্রেষ্ঠ আদম সন্তান এবং সর্বশেষ ঐশীদূত। এই শিশুর ভবিষ্যত উজ্জ্বল। তাঁর ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থেকো। আমি বিভিন্ন গ্রন্থে পড়েছিলাম যে, একদিন সে এই ভূখন্ড অতিক্রম করবে।” এই বলে বুহাইরা উঠে গেলো। আকাশের দিকে তাকালো। তারপর হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর পবিত্র চেহারার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো: “আহা! আমার জীবনটা যদি এতটুকু দীর্ঘ হতো যে, তোমার দাওয়াতী কাজের জমজমাট অবস্থাটা দেখে যেতে পারতাম!”

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

একনজরে

"ইমামিয়া পাক দরবার শরীফ" হলো শুধুমাত্র আহলে বাইতের প্রেমিকদের মিলন কেন্দ্র। বাংলার যমিনে আহলে বাইতের আদর্শ প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠা করাই হলো ইমামিয়া পাক দরবার শরীফের একমাত্র উদ্দেশ্য।

আমাদের সাথে থাকুন

Translate »