নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) পর্ব-পাঁচ

347

নূরনবী মোস্তফা (সাঃ)

(৫ম পর্ব)

🌷🌹[চাচা আবু তালেব, হযরত মুহাম্মাদ  (সা.)-কে হযরত খাদীজার ব্যবসায়িক সফরে যাবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ঐ প্রস্তাব ভেবে দেখার জন্যে চাচার কাছ থেকে সময় চেয়ে নেন। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) শেষ পর্যন্ত সফরে যাবার জন্যে মনস্থির  করলেন। তিনি ব্যবসার জন্যে দেওয়া হযরত খাদীজার প্রস্তাবে রাজি হলেন। হযরত খাদীজা এই বাণিজ্য কাফেলায় হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর সাথে তাঁর নিজের গোলাম মেইসারা-কেও দিলেন। গোলামকে বলে দিলেন মুহাম্মাদের সকল আদেশ যেন মেনে চলে এবং তাঁর সিদ্ধান্তের সাথে যেন কোনো রকম বিরোধীতা না করে। একইভাবে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কেও তিনি বললেন যেন মেইসারাকে তাঁর সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ মেইসারা ব্যবসায়িক কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সচেতন লোক।

হযরত মুহাম্মাদ (সা.), মেইসারা এবং অন্যান্য গোলামদের সহযোগিতা নিয়ে ব্যবসায়িক মালামাল প্রস্তুত করলেন। এইসব মালামালের মধ্যে ছিল তায়েফের চামড়া, মক্কার বনৌষধী অর্থাৎ আধুনিক কালের হার্বাল ঐষুধের বিচিত্র উপাদান, ভারতীয় ইস্পাতের তৈরী তলোয়ার, চমৎকার চমৎকার কার্পেট, রঙ-বেরঙের সিল্কের কাপড়, চীনের মেশক এবং বাহরাইনের মুক্তা। এছাড়াও ছিল ফ্রান্স এবং পারস্যের স্বর্ণ-রূপায় পূর্ণ কয়েকটি ব্যাগ। সকালে কাফেলা রওয়ানা দেওয়ার জন্যে প্রস্তুত হলো। হযরত আবু তালেবের চেহারায় পূর্বরাত থেকেই কেমন যেন উদ্বেগের ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। হযরত মুহাম্মাদ(সা.)ও ব্যাপারটা অনুভব করলেন এবং চাচাকে বললেন: “চাচাজান! আপনি এত উদ্বিগ্ন কেন?” চাচা বললেন: “তুমি দূরে চলে যাচ্ছো, কেন জানি আমি মেনে নিতে পারছি না। তোমার জীবনের ভয়ও হচ্ছে। তোমার মনে আছে, যখন তোমার বয়স বারো ছিল, তখন খ্রিষ্টান পাদ্রী বুহাইরা কী বলেছিল? বুহাইরার কথার পর এখন তের বছর অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। তুমি এখন পরিপূর্ণ যৌবনের অধিকারী। তারপরও আমার মন কেন জানি মানছে না। কেননা, তুমি অপরিচিত জায়গায় যাচ্ছো, সেখানে অসৎ, ভন্ড-প্রতারকের অভাব নেই। তুমি একটু সাবধানে থেকো।”

হযরত মুহাম্মাদ (সা.),হযরত আবু তালিবকে সহানুভূতি জানালেন। তারপর চাচী ফাতেমা বিনতে আসাদের দিকে তাকালেন, যিনি মায়ের মত আদর-স্নেহ দিয়ে, মায়া-মমতা দিয়ে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে তদারকি করেছেন। ফাতেমাও ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন যেন তাঁর নিজের স্নেহের সন্তান সফরে যাচ্ছে। তবে তিনি এমন কোন দৃশ্যের অবতারণা করেননি, যাতে হযরত মুহাম্মাদ(সা.) পথে ঐ দৃশ্যের কথা চিন্তা করে মনে কষ্ট পান। তাই, তিনি অম্লান চেহারায় খুশিমনে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে বিদায় জানান। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) চাচার ঘরের ছোট্ট কাঠের দরজা থেকে রাস্তায় পা রাখেন এবং আল্লাহর দরবারে এই বলে দোয়া করেনঃ “হে আল্লাহ! তোমার উপর নির্ভর করে সফরে যাচ্ছি। তোমার রহমতের কাছে আশ্রয় নিচ্ছি। সকল আশা, সকল ভরসা একমাত্র তোমার উপরই। হে আল্লাহ! আমাকে সকল প্রকার জটিলতা বা কাঠিন্য থেকে রক্ষা করো এবং সফরের জন্যে নেওয়া আমার রসদপত্রগুলোকে পবিত্রতা দান করো! আমাকে গুনাহ থেকে মুক্ত রাখো এবং যেদিকেই দু’চোখ যায়, সেদিকেই নেকীর ব্যবস্থা করে দাও!”

বাণিজ্য কাফেলা সামনের দিকে অগ্রসর হয়ে চললো। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) একটি দ্রুতগামী উটের পিঠে চড়ে সবার আগে আগে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝেই তিনি সামনের দিকে এবং পেছনে তাঁর কাফেলার দিকে সচেতন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন। একটা সময় কাফেলা ধীরে ধীরে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু পথ ধরে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এমন সময় মেইসারা সামনে এলো। আবহাওয়া ছিল ভীষণ গরম। তার কালো চেহারার উপর ঘাম জমে বড় বড় বিচির মত দাগ দেখা যাচ্ছিলো। অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে সহাস্য কণ্ঠে সে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দিকে তাকিয়ে বললোঃ “বাতাস ভীষণ গরম!” হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তার কথা স্বীকার করলেন এবং আগের সফরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বললেনঃ “এখানে পলির প্রাচুর্য থেকে মনে হচ্ছে এই এলাকায় বন্যা বেশী হয়। ফলে এখানে যাত্রাবিরতি না করাই ভাল।” মেইসারা বিনয়ী কণ্ঠে বললোঃ “কিন্তু এই পার্বত্য পথ বেশ দীর্ঘ, সহজে শেষ হবে না। রাত্রিও প্রায় ঘনিয়ে এসেছে।” হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ “কালো মেঘ থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, দ্রুত বৃষ্টি হবে।” মেইসারাও জানতো যে, যেখানেই বাতাস গরম হয়, সেখানেই বৃষ্টি-বাদলে বন্যার আশঙ্কাটা বেশী থাকে। আর এই পার্বত্য পথ নিরাপদ জায়গা নয়। তারপরও সন্তুষ্টির ভাব দেখিয়ে বললোঃ “আপনার আদেশ! হে নেতা! আপনি যা বলবেন, তা-ই হবে!” হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বললেনঃ “এখন তো থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাই, নিরাপদ কোনো উঁচু জায়গায় গিয়ে অবতরণ করা উচিত।”

কাফেলা তুলনামূলক একটা উপযুক্ত স্থানে গিয়ে যাত্রা বিরতি করে। কাফেলার লোকজন কালো তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নেয়। আর হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কাফেলার মাল-সামানা থেকে খানিকটা দূরের উঁচু জায়গায় একটা পাথরের উপরে গিয়ে বসলেন। কাফেলার লোকজন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে গেল। রাতের মৃদু বাতাস হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর চেহারা মোবারককে কোমল পরশ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি যথারীতি রাতের আকাশের বিস্ময়কর সৌন্দর্য আর এই পৃথিবীর রহস্যময়তার ভিতর ডুবে গেলেন।

ঐ রাতে প্রচন্ড বৃষ্টিপাত হলো। কাফেলার লোকজন যে যেভাবে পেরেছে বন্যার বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করেছে। পরদিন ব্যবসায়িক পণ্যগুলোকে শুকিয়ে পুনরায় যাত্রা শুরু করলো। কিন্তু অল্পপরেই ছিল পারাপারের একটা সঙ্কীর্ণ পথ। ঐ পথে ছিল পানির প্রবাহ। গর্তটা কতোটা গভীর ছিল, তা কারো জানা ছিল না। মেইসারা হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর কাছে গিয়ে বললোঃ “এখন কী উপায়!” হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বললেনঃ “কাফেলাকে বলো যাত্রার প্রস্তুতি নিতে।” তিনি নিজেও উটের পিঠে সওয়ার হলেন। আল্লাহর নাম নিয়ে সিরিয়া অভিমুখে রওয়ানা হলেন। উমার হেশাম নামের কাফেলার একজন, হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর ঔদ্ধত্য দেখে ঠাট্টা করে বললোঃ “নৌচালনার সরঞ্জাম আছে তো হে আব্দুল্লাহর ছেলে!” কিন্ত হযরত মুহাম্মাদ(সা.) তাকে কিছুই বললেন না। মেইসারা উদ্বেগের সাথে হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দিকে তাকিয়ে বললোঃ “দেখছো তো বন্যার পানিতে রাস্তা বন্ধ হয়ে আছে!” মুহাম্মাদ (সা.) মেইসারার দিকে তাকালেন। মেইসারা এই তাকানোর মধ্যে পরিপূর্ণ নির্ভরতা, আশা এবং সাহসিকতা দেখতে পেলো। সে যখনি হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দিকে তাকাতো, তখনই একটা বিশেষ প্রশান্তি পেতো। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মিষ্টি হাসি হেঁসে বললেন: “মেইসারা! তোমার অন্তরে সাহস সঞ্চার করো! দয়াময় মহান আল্লাহ তাঁর অনুসারী ও অনুরক্তদেরকে নিঃসঙ্গ কিংবা নিরাশ্রিত রাখেন না।” এই বলে সামনে অগ্রসর হয়ে পানি পার হয়ে গেলেন।

উট নিয়ে তিনি নিরাপদে পানি পার হয়ে গেছেন দেখে কাফেলার অন্যান্য উটও তাঁর পিছু পিছু এলো এবং নিরাপদেই পানি পার হয়ে গেল। কাফেলার মাঝে এবার আনন্দের কোলাহল দেখা দিল। হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর আত্মবিশ্বাস এবং সাহসিকতা অন্যদের মাঝে এত পরিমাণ প্রভাব ফেললো যে, এই গল্প তাদের মাঝে বেশ কিছুদিন ধরে চললো। হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর জন্যে এটা ছিল বেশ সফল ও সুখকর এক অভিজ্ঞতা।দীর্ঘ এই সফরে পথিমধ্যে বাণিজ্য কাফেলার অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যাত্রাবিরতি দিয়ে অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। মেইসারা হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-কে বললোঃ “আমরা যদি দেরী করে পৌঁছি তাহলে মক্কার অন্যান্য ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল বিক্রি করবে, আর আমরা তাদের তুলনায় পিছে পড়ে যাবো।” কিন্তু হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর দয়ালু অন্তর মানেনি। তিঁনি চিন্তা করেছেন দ্রুত পৌঁছাতে গেলে অসুস্থদের অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে পড়বে। তাঁর এই মানবতা প্রীতির কারণে কাফেলা দুই দিন দেরী করে সিরিয়ায় পৌঁছেছিল। সূর্য সকালের শীতলতা শহরের বুক থেকে ধীরে ধীরে দূর করে দিচ্ছিল। সিরিয়ার বিশাল বাজার হেজাজের বাণিজ্য কাফেলার আগমনে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার জন্যে আসা-যাওয়া করতে লাগলো। মেইসারা দামেশকের যে ক’জন ব্যবসায়ীর সাথে লেনদেন করতো তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলো। কিন্তু তারা ইতোমধ্যেই তাদের প্রয়োজনীয় কেনা-কাটা সেরে ফেলেছে। মক্কার অনেক ব্যবসায়ী পরোক্ষভাবে খাদীজাকে তিরস্কারের ভাষায় বলতে লাগলোঃ “এতো বড় একটা কাফেলাকে অদক্ষ আর নরম মনের এক যুবকের হাতে সোপর্দ করেছে।” মেইসারা তার কানে একথা পৌঁছার সাথে সাথে ভীষণ কষ্ট পেলো। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লো। কিন্ত হযরত মুহাম্মাদ (সা.) অস্থির হলেন না। তিনি আল্লাহর সাহায্যের কথা বলে মেইসারাকে সহানুভূতি জানালেন।বিকেলের দিকে বাজারের অপর প্রান্ত থেকে একটা কোলাহলের শব্দ ভেসে এলো। সবাই সেদিকে তাকালো। ফিলিস্তিনের একটা বড় কাফেলা সিরিয়ায় এসেছে। তারা বাজারের দিকে যাচ্ছিল। ফিলিস্তিনের এই যাত্রীদলের মধ্যে মক্কার জিনিসপত্র কেনার জন্যে ভালো ক্রেতা ছিল। তারা মক্কার ব্যবসায়ীদের খুঁজছিল। কিন্ত সেখানে একমাত্র হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর বাণিজ্য কাফেলা ছাড়া তাদেরকে মালামাল দেওয়ার মত আর কেউ ছিল না। মেইসারার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবার শেষ হলো। হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর যোগ্যতা এবং উপযুক্ততায় এবার সে গর্ব করে বলতে লাগলোঃ “আমরা আজি প্রথম সিরিয়ায় পৌঁছেছি, অথচ আমাদের সকল মালামাল বিক্রি হয়ে গেছে, বিক্রির জন্যে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আমাদের ভাগ্য কতো সুপ্রসন্ন।”]

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »