ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর শাহাদাতের ইতিহাস

443

হযরত রাসূল(সা.) কর্তৃক অভিশাপপ্রাপ্ত ও পরিত্যাক্ত তথাকথিত আমির মুআবিয়া তার ঘৃণিত মৃত্যুর পূর্বেই পুত্র ইয়াযিদকে ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দে খিলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনীত করে গিয়েছিল। ইয়াযিদের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে মদিনায় পূর্ব হতেই মতবিরোধ চলছিল। সিংহাসনে আরোহণ করে ইয়াযিদ তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে অস্বীকৃত ব্যক্তিদের নিকট আনুগত্যের দাবি জানিয়ে পত্র প্রেরণ করে। কিন্তু খিলাফতের অন্যতম দাবিদার আবদুল্লাহ বিন-যুবাইর মদিনা থেকে মক্কা পালিয়ে যায়। আর কুখ্যাত ইয়াযিদ মদিনার গভর্ণর ওয়ালিদের কাছে মহানবীর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হাসানের ভ্রাতা ইমাম হুসাইনের জন্যে হুমকিপূর্ণ ও শিরচ্ছেদ সম্বলিত পত্র প্রেরণ করে। ইমাম হুসাইন আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি ন্যায়বিচার, সততা, বীরত্ব, উদারতা ও ধর্ম নিষ্ঠার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ইন্দ্রিয়পরায়ণ, নীতিজ্ঞানহীন ও পাপাসক্ত ইয়াযিদের নিকট তিনি (ইমাম হুসাইন) জীবনের বিনিময়ে হলেও মাথা অবনত করতে রাজি ছিলেন না। মুআবিয়া গনতন্ত্রকে হত্যা করে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করেছিল যা আরব বিশ্ব এবং নবীর দেশে এখনো প্রতিষ্ঠিত আছে। তাই নীতিগত কারণেই ইমাম হুসাইন ইয়াযিদের আনুগত্য অস্বীকার করেছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কারবালার শোকাবহ ঘটনা সংগঠিত হয়। উমাইয়া শাসকদের প্রতি মক্কা ও মদিনার ধর্মপ্রান মুসলমানগন সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাদের অনৈসলামিক রীতিনীতি বহির্ভুত ও পাপাচারপূর্ন জীবন ধর্মভীরু মুসলমানদের মনে গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ইয়াযিদের ব্যক্তিগত চরিত্র নানা পাপাচার ও দুর্নীতিতে কলংকিত ছিল। এই জন্য ধর্মপ্রান মুসলমানরা মহানবীর দৌহিত্র ইমাম হুসাইনকে সমর্থন করেছিলেন। তারা উমাইয়া শাসনের অভিশাপ হতে মুক্তি লাভের জন্য ইমাম হুসাইনের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন এবং ইমাম হুসাইনকে সকল প্রকার সাহায্য সহযোগীতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাই ইমাম হুসাইন মুসলিম ইবনে আক্বিলকে বাস্তব পরিস্থিতি বুঝার জন্য কুফায় প্রেরণ করেন। জনাব মুসলিম কুফায় গিয়ে অবস্থা অনুকূল বুঝতে পেরে ইমাম হুসাইনকে কুফায় আসার অনুরোধ জানিয়ে পত্র লিখেন। এরি মধ্যে ইয়াযিদ ইমাম হুসাইনের অগ্রগতি রুদ্ধ করা ও তাঁকে হত্যা করার জন্যে তৎকালীন বসরার গভর্ণর উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে তার স্বীয় পদে বহাল রেখেই কুফার গভর্ণরের পদ দান করে। এর কিছু দিন পর হযরত মুসলিম ইবনে আক্বিল, কুখ্যাত উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ কর্তৃক শাহাদাত বরণ করেন। হযরত মুসলিমের পত্র পেয়ে ইমাম হুসাইন পরিবার পরিজন ও কিছু সঙ্গী নিয়ে কুফার দিকে রওয়ানা হন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলো, যাত্রাপথে ইমাম হুসাইন পাপিষ্ট উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ কর্তৃক মুসলিমকে হত্যার সংবাদ পেলেন। এতে ইমাম হুসাইন বিব্রত হলেন, কিন্তু সফর বিরত কিংবা স্থগিত করলেন না। অনেকের মতে এসময় ইমাম হুসাইনের সাথে মাত্র ৪০ টি অশ্ব ও ২০০ জন মানুষ ছিল। কিছুদূর না যেতেই তিনি শত্রু কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়ে কারবালায় তাবু স্থাপন করেন। এ সময় উবাইদুল্লাহ ইমাম হুসাইনকে বিনাশর্তে আত্মসমর্পনের জন্য দাবী জানালো এবং তাকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করার জন্য উমর বিন সা’দকে ফোরাত নদীর তীর অবরোধ করার জন্য আদেশ দিলো। ইমাম হুসাইন যুদ্ধ ও রক্তপাত বন্ধ করার জন্য নিম্নলিখিত প্রস্তাব দিলেনঃ
“আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে ফিরে যেতে দাও। নতুবা আমাকে দুরে কোথাও চলে যেতে দাও যে অঞ্চল ইয়াযিদের শাসন ক্ষমতার বাইরে।”
কিন্তু কোন প্রস্তাবই শত্রু পক্ষ মানল না। বিনা শর্তে আত্মসমর্পন না করলে উবাইদুল্লাহ সীমারকে অবিলম্বে ইমাম হুসাইনকে মৃত অথবা জীবিত অবস্থায় কুফায় নিয়ে যেতে আদেশ দিলো। অত:পর ইমাম হুসাইন- এর শিবির অবরুদ্ধ হলো। ৯ মহররম শত্রু পক্ষ নদীপথ বন্ধ করলে পানির অভাবে শিবিরে হাহাকার উঠল। ইমাম হুসাইন অসহায় ও নিস্পাপ শিশু এবং মহিলাদের প্রতি সদয় হতে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু শত্রু পক্ষ এ মানবিক আচরণের প্রতিও কোন সদয় হলো না। তখন যুদ্ধ ছাড়া ইমাম হুসাইন আর কোন উপায় না দেখে পরিবার পরিজনকে মক্কায় পাঠিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু কেউ তার সঙ্গ ত্যাগ করতে রাজি হলো না। ইমাম হুসাইনের ছয় মাসের শিশু পুত্র আলী আসগার তখন খুবই পীড়িত। তার শুষ্ক ওষ্ঠদ্বয় ভিজানোর জন্য এক বিন্দু পানিও জুটল না। নারী-শিশুর হাহাকার এবং ভীতির মধ্যে একটি বিভীষিকাময় রাত অতিক্রান্ত হলো।
১০ মহররম। ভোরে নারী ও শিশুদের আর্তচিৎকার ও হাহাকারের মধ্যে দুই অসম সেনাদলের যুদ্ধ শুরু হলো। ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর হুসাইনের ভ্রাতুস্পুত্র হযরত কাসিম সর্বপ্রথম শাহাদাত বরণ করেন। এভাবে ইমাম হুসাইনের পরিবারের সকলেই একে একে শহীদ হলেন। অবশেষে তৃষ্ণার্ত ইমাম হুসাইন শিশু পুত্রকে কোলে নিয়ে ফোরাত নদীর দিকে অগ্রসর হলেন। কিন্তু তিনি শত্রুপক্ষের তীরের আঘাতে ফিরতে বাধ্য হলেন। তীরের আঘাতে পুত্র পিতার বাহু বন্ধনে শহীদ হলো। নির্মম শত্রুর হামলা সামলাতে না পেরে ইমাম হুসাইন তাবুর সামনে বসে পড়লেন। তখন শত্রুর বর্শা তার বুকে বিদ্ধ হলো। রক্তপাতে দুর্বল হয়ে ইমাম হুসাইন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন এবং খুনি দুশমন দল মরনোন্মুখ ঝাপিঁয়ে পড়ল। তারা ইমামের মস্তক মোবারক কর্তন করল, শরীর মোবারক দলিত করল এবং বর্বর হিংস্রতা সহকারে পবিত্র দেহকে সর্বপ্রকারে অপমানিত করল। মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্রের রক্ত রঞ্জিত মস্তক মোবারক উবাইদুল্লাহর নিকট উপস্থিত করলে জনতার মধ্যে ভীতির মনোভাব দেখা দিল।
কি এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যে বিগলিত হলো মানুষ। ঐতিহাসিক গীবন বলেন, সে সুদূর যুগেও আবহাওয়ায় হুসাইনের শাহাদাত বরণের বিয়োগান্ত দৃশ্য কঠিনতম পাঠকের অন্তরেও সমবেদনার সঞ্চার করবে।
ইসলামের ইতিহাসে কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা একটি সুদূর প্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রায় ৬৩ বৎসর পর এটি উমাইয়া বংশের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে এনেছিল। কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইনের শাহাদাত বরণকে ঐতিহাসিক গিলমান স্বজাতির স্বার্থে আত্মত্যাগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেনঃ “ইমাম হুসাইনকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়।” বস্তুতঃ মুসলমানদের দৃষ্টিতে এ যুদ্ধ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ। কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইন পরাজিত হলেও ধর্মনিষ্ঠ মুসলমানদের দৃষ্টিতে এটি ছিল একটি আদর্শের জয়। কারবালার হত্যাকান্ড উমাইয়াদের দৃষ্টিতে ছিল হাশিম গোত্রের প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণ। তাই ৭৫০ খ্রীঃ যাবের যুদ্ধে উমাইয়ারা পরাজিত হলো এবং আব্বাসীয়রা এর প্রতিশোধ গ্রহণ করলো। তাই ঐতিহাসিক মূর বলেন, “কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনা কেবল খিলাফতের ভাগ্যই নির্ধারন করেনি, এটা খিলাফত ধ্বংসের অনেক পরেও মুসলিম জাহানের ভাগ্যও নির্ধারণ করেছিল।” এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, “কারবালার নির্মম হত্যাকান্ড ইসলামী দুনিয়ার সর্বত্র ত্রাসের শিহরণ জাগিয়ে তুলল। এ উদ্দীপনা পরবর্তীকালে উমাইয়াদের ধ্বংস সাধনে আব্বাসীয় বংশধরকে সহায়তা করে।” এটা পারস্যের পরাভূত জাতির মনে বিদ্রোহের নতুন বীজ বপন করেছিল। কারবালার ঘটনা মক্কা ও মদিনাবাসীকে কঠিনতম আঘাত করেছিল। তারা ইয়াযিদের নিকট হযরত আলীর বংশধরদের উপর কৃত অন্যায়ের প্রতিবাদ দাবি করল। এদিকে মক্কা ও মদিনাবাসী ইয়াযিদের বিরোদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করল। আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের নিজেকে খলিফা ঘোষনা করার পর মক্কা ও মদিনাবাসী তাকে সমর্থন করল। এ খবর পেয়ে ইয়াযিদ মক্কায় একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করে তাকে দামেস্কে আনয়নের চেষ্টা করল, কিন্তু আবদুল্লাহ খলিফার মতলব বুঝতে পেরে তা প্রত্যাখান ও দূতকে বন্দী করলেন। মদিনার বিদ্রোহ ইয়াযিদ কঠোর হস্তে দমন করল এবং তিন দিন ধরে শহরের জনগণের উপর জুলুম নির্যাতন চালিয়েছিল। খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মসজিদ ও অন্যান্য ইমারত নির্মিত হয়েছিল তা ধ্বংস হলো। এ প্রসঙ্গে ছৈয়দ আমীর আলী আরো বলেন, “যে শহর রাসুলে খোদাকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং যা তার জীবন ও কর্মকলাপের সংস্পর্শে পবিত্রতা লাভ করেছিল তা সম্পূর্নরূপে অপবিত্র হলো।” মদিনা ধ্বংসের পর ইয়াযিদ বাহিনী মক্কার দিকে অগ্রসর হলো। আবদুল্লাহ বিন যুবাইর সেখানে নিজেকে খলিফা বলে ঘোষনা করেছিলেন। ইয়াযিদের বাহিনীকে বাধা প্রদান করার মত শক্তি তার ছিল না, তবুও তিনি খারিজিদেরকে নিয়ে কা’বা ঘরের পবিত্রতা রক্ষা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শত্রু সেনারা দু’মাস ধরে মক্কা অবরোধ করে রাখে। এ সময় তারা কা’বাতে অগ্নি সংযোগ করে। অধ্যাপক হিট্রি বলেন, অবরোধের ফলে কা’বা গৃহ অগ্নি সংযোজিত হয়, পবিত্র কালো পাথর ত্রিখন্ডিত হয় এবং কা’বা গৃহ ক্রন্দনরতা রমনীর ভগ্ন হৃদয়ের রূপ লাভ করে। অবোরোধ চলাকালে ইয়াযিদের মৃত্যু সংবাদ মক্কায় পৌঁছালে সেনাবাহিনী দামেস্কে ফিরে গেল এবং মক্কা অধিকতর ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা পেল। ৬৩৮ খ্রীষ্টাব্দে ২৪ সেপ্টেম্বর ইয়াযিদ মৃত্যুবরণ করে। সে মাত্র সাড়ে তিন বৎসর রাজত্ব করেছিল। ঐতিহাসিক মূরের মতে, তাঁর রাজত্ব কালে ইসলামের কোন প্রসার ঘটেনি, উপরন্তু এ সময় উত্তর আফ্রিকায় চরম গোলোযোগ দেখা দেয়। তার সাড়ে তিন বৎসর রাজত্বকালে, প্রথম বৎসর সে ইমাম হুসাইনকে হত্যা করে। দ্বিতীয় বৎসর মদিনা আক্রমন করে ধ্বংস সাধন করে এবং তৃতীয় বৎসর কা’বা বিধ্বস্ত করে। ইমাম হুসাইন অন্যায়ের কাছে কোন দিন মাথা নত করেননি, তিনি জীবনের বিনিময়ে এই পৃথিবীতে সত্য প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন। ইমাম হুসাইনের শাহাদাত বরণ গোটা দুনিয়ার কাছে এক মহা শিক্ষার উৎস। তিনি ইয়াযিদের আনুগত্য স্বীকার করলেই নিজের এবং স্বজনদের জীবন রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তার নীতিতে অবিচল থেকে সত্যের জন্য নিজ জীবনকে কোরবানী দিয়েছেন। যা গোটা মুসলিম জাহানের জন্য এক মহান আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। এই পৃথিবী যত দিন থাকবে ততদিন নিশ্চয় ইসলামের জন্য ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
আসুন! আগত এই পবিত্র মহররম মাসে ইমাম হুসাইন এবং কারবালার প্রান্তে শাহাদাতপ্রাপ্তদের উসিলা ধরে আল্লাহর কাছে এই কামনাই করি, তিনি যেনো আমাদেরকে কারবালার শহীদানের আদর্শ, আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা এবং ইমামিয়া পাক দরবার শরীফ-এর মাধ্যমে হুসাইনী পতাকা বাংলার যমিনে উড্ডিন করার তৌফিক দান করেন।

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »