বিজয়ের চেতনায়

1375
আজ থেকে হাজার বছর পূর্বের ঘটনা। এক পিতার সম্মুখেই তাঁর যুবক পুত্রকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিলো। সেখানে পিতা ছিলেন অসহায়। যুবক পুত্রের মৃত্যু পরবর্তী প্রজন্মকে টিকে রাখার জন্য আবশ্যক।
যুবক পুত্র ধিরে ধিরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর বৃদ্ধ পিতা তাঁর পিছে পিছে চলছে। পুত্রের গতি যতো বাড়ে পিতার গতিও সেই সাথে বাড়তে থাকে। পুত্র তখন থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলঃ ‘কেন আপনি আমার পিছন পিছন আসছেন? আপনিই তো আমাকে এই পথে যাওার কথা বললেন!’
অসহায় পিতা চোখের জলে বুক ভাসিয়ে বললেনঃ ‘আহ! কিভাবে তোমাকে বুঝাব! যদি তোমার একটি যুবক পুত্র থাকতো, আর তুমি তাকে এভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখতে, তাহলে আজকের আমার কষ্ট বুঝতে।’
যাইহোক, আমি আর তোমার পিছে পিছে আসব না। তবে কথা দাও, কাংক্ষিত স্থানে পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তুমি আমার দিকে ফিরে ফিরে তাকাবে! তোমার মাঝে আমি আমার নানার চেহারা দেখি।’

নিষ্ঠুর ক্ষরতাপে তপ্ত দুপুরের বিসতৃর্ন বালির সমুদ্রের উপর দাঁড়িয়ে সে। চোখে মুখে অধরা বিজয়ের স্বপ্ন যেন মাতাল করে রেখেছে তার চেতনাকে। কোন কিছুই ভাবার সময় নেই। কারো ভবিষৎ নিয়ে পেরেশান হওয়ার তাড়া ভুলে থাকা এক প্রকার ছেলেখেলাই তার কাছে এখন।

এমন তো হওয়ার কথা নয়! ক্ষনিক পূর্বের পরিস্থিতি অন্তত তা বলে না।  বিষাক্ত দাঁতাল খুনিদের আচরন কোনভাবেই এ ধরনের মানসিক শক্তির লক্ষ্য নিয়ে রক্ত ঝরায়নি! অথচ লোকটি স্থির ও অবিচল; ক্ষন থেকে ক্ষন যেন তাঁর পদযুগল দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করছে।
দূর্দান্ত সাহসের উত্তাল ঊর্মি বুকের মধ্যে টগবগ করছে, অথচ গোলাপি অধরের কোনে মুচকি হাসি! চঞ্চল হাতদুটি কোমর বন্ধনি শক্ত করতে ব্যস্ত। স্ত্রী কিছুটা চিন্তিত, কিন্তু সদ্য বিবাহিত নারি তার আপন মানুষটির মনোবাসনা সম্পর্কে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তবুও প্রেমিকরূপি মানুষটির উৎসুক প্রস্তুতি তার দুশ্চিন্তার আকাশকে মুগ্ধতার ছোঁয়ায় ভুলিয়ে রেখেছে বলেই সমাগত সাইমুম সম্পর্কে তার কোন ধারনাই হয়নি।
ঘরের এক কোনে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র খুঁটিটির চুরমার হয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি মুগ্ধ নয়নে দেখছে অসহ্য বেদনা সহ্য করে তাঁকে পেটে ধরা নারিটি। সন্তানের পরিনতি সম্পর্কে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত। পিপাসায় কলিজা যেন দীর্ঘ ক্ষরায় ফেটে চৌচির হওয়া ফসলের মাঠের প্রতিচ্ছবি। অথচ শুষ্ক ঠোটে হাসির কোন কমতি নেই। সন্তানের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া কোন মায়ের কাছে এতো মধুর হতে পারে, তা হয়তো এর পূর্বে মানবজাতির জানাই ছিলো না।
সে প্রস্তুত বিদায়ের জন্য। স্ত্রির কোমল মুখমন্ডলে হাতদুটি রেখে কপালে বিদায়ি চুমু দিলো। ‘আসি….!’ শব্দটি যেন তার কানে আচমকা বিরহের কাব্য শুনালো। অনিশ্চিত চাহনি, চোখে আবার ফিরে আসার ব্যকুল আকুতি; আথচ থর থর কাঁপানো ঝড় বইছে বুকে।
দীর্ঘশ্বাঃষ নিয়ে এগিয়ে আসলেন মা। এখন আর সত্য লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। বললেন: ‘শেষবারের মতো দেখে নাও নিজের প্রেমিককে।’ এখনও হাতের মেহদি বিবর্ণ হয়নি। একথা সহ্য হয়! স্ত্রীও জানি কেমন। স্বামি, শাশুড়ির সাথে প্রেমের বন্ধনই হয়তো তাকে এমন করেছে।
সে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছে ফেলে এসেছে, একটি বর্ণিল জিবনের আয়োজন। অথচ ভুলেও পিছন ফিরলো না। মাংশাসি অগনিত ক্ষুধার্ত হায়েনারা তার দিকে লোভের দৃষ্টি স্থির করে রেখেছে। পরিনতির দিকে তার অদম্য গতি ধূলিঝড় সৃষ্টি করে দিলো। কাছে আসতেই হায়েনারা ঝাপিয়ে পড়লো। সীমিত মাংশে কে কতোটুকু ক্ষুধা মিটাতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলতে লাগলো। দূরে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ মা আর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী তার সাহসিকতার সাক্ষি হচ্ছে।
হঠাৎ ধূলিঝড় সব কিছু ঢেকে দিলো। মা এবং স্ত্রী আর কিছু দেখতে পারছিলো না। এতক্ষনের সাহসের চোখদুটি কখন যেন অশ্রুসিক্ত হয়ে গেলো। পুত্রবধুকে সাথে নিয়ে ফিরে যাচ্ছে মা। হায়েনার হাসিতে পথ চলা থামিয়ে দিলেন বৃদ্ধা। ফিরে দাঁড়ালেন। রক্ত চোখে তাকালেন পুত্র খাদকের দিকে। দেখলেন, সন্তানের কাটা মাথা হায়েনার হাতে। মাথাটি মায়ের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো: এই নে! তোর ছেলে তোকে ফিরিয়ে দিলাম।
মায়ের ভাংগা হৃদয় তড়িৎ দ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো যেন। দৌড়ে আসলেন, সন্তানের ধূলিমাখা মাথা দরদি হাতে তুলে নিয়ে, মুখ থেকে ধূলোবালি ঝেড়ে দিলেন। রক্তমাখা চোখে মায়ের দিকে দুষ্ট হাসিতে তাকিয়ে আছে যেন সে। মা দুষ্টমি মাখা ঠোটে মাত্র একটি চুমু দিলেন। আগুন চোখে হায়েনাদের দিকে নাড়িচেরা সন্তানের মাথাটি ছুড়ে দিয়ে বললেন: ‘আমরা যা ত্যাগ করি, তা আর ফিরিয়ে নেই না।’
লোকটি দেখতে একেবারেই বিদগুটে। যেমন কালো, তেমনি বদসুরত। ঘামের দুর্গন্ধ মানুষকে তাঁর আশেপাশে ভিড়তেই দেয় না। এ নিয়ে তাঁর আক্ষেপেরও শেষ নেই। ফলে অধিকাংশ সময়ই মানুষের সঙ্গ এড়িয়ে চলতো সে। নিরবে নির্জনে জীবন যাপন এক প্রকার অভ্যাসে পরিনত হয়ে পড়েছিলো। দিনভর মালিকের সেবা করেই সময় কেটে যেতো। মালিকের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ভীষণ। মালিকও দুনিয়ার সবার থেকে বেমানান। দুনিয়ায় এত সুন্দর চেহারার মানুষ আশেপাশে থাকা স্বত্বেও বদসুরত এই লোকটির প্রতি তাঁর মায়া যেন দিনে দিনে সহ্য সীমার বাহিরেই চলে যাচ্ছে।
এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন। তাঁর জানা ছিল, একদিন লোভের পিঞ্জরে বন্ধি থাকা একদল হায়েনার মোকাবেলা তাঁকে করতে হবে। তাঁর মালিক তাঁকে বলেছে, হায়েনারা ভীষণ বিশাক্ত দাঁতের চোয়াল বিশিষ্ট। পূর্বেও তারা অনেক রক্ত পান করেছে। মাংসের ক্ষুধা দিনে দিনে তাদের অস্থির করে তুলেছে। রাস্তা, ঘর, বাজার, ইবাদতের স্থান কোন কিছুই তাদের নিষ্ঠুর থাবা থেকে রেহাই পায়নি। ক্ষুধা নিবারণে মায়ের গর্ভের সন্তান চিবিয়ে খেতেও তারা দ্বিধা করেনি এর পূর্বে।
মালিক তাঁকে বলেছে তুমিও একদিন তাদের আহার হবে! এ কথা শুনে তো তাঁর যেন খুশি আর ধরে না। ছোট্ট পাত্রে অবারিত ধারায় পানি দিলে যেমন ছল ছল করে, তেমনি তাঁর অন্তরেও খুশির জোয়ার ছল ছল করছে। শয়নে স্বপনে শুধু ঐ দিনটির অপেক্ষায় তাঁর যেন থেমে গেছে জিবনের গতি।
অবশেষে সেদিনটি চলেই আসলো। খুব ভোরে একটি ঢোলের শব্দে চেতনা ফিরল সকলের। অনিশ্চয়তা আর আহাজারি পূর্ণ রাত কাটিয়ে সবাই এখন হতভম্ব। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে মালিক। মালিকের চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর আর বুঝতে বাকি নেই, আজ তাঁর মালিকের সেই প্রতিশ্রুত দিন। আজকে তাঁর দেহের রঙ পরিবর্তনের দিন। এতদিনের কৃষ্ণ বর্ণ এবার রক্তিম হবেই!
আশ্চর্য! আশ্চর্য!! আশ্চর্য!!! কেউ হায়েনার খাবার হবে, এটা তাঁর জন্য আনন্দের সংবাদ! শক্ত নখের আচরে তাঁর চামড়া উঠে আসবে, সুচারু দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে এঁটে থাকবে তাঁর মাংস। এ দৃশ্য কি খুশির! তাঁর রক্তে হায়েনার ঠোঁট, জিহ্বা, দাঁতের মাড়ি রক্তিম হয়ে থাকবে, আর অবৈধ খাবারে ক্ষুধা নিবারন করতে পারা হায়েনাটি হাসতে থাকবে। উফ! কে পারে গৌরবে হাসতে তখন!!!
লোকটি অস্থির হয়ে ছুটে গেলো খোলা আকাশের নিচে। জিহ্বার অগ্রভাগ থেকে পাকস্থলীর নিম্নভাগ পর্যন্ত পিপাসায় শুষ্ক কাঠের ন্যায় হয়ে আছে। ভোরের রেখা ফুটতে শুরু করেছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই আলোকিত হয়ে উঠবে পৃথিবী। লোকেরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়বে কাজের সন্ধানে। মায়েরা সন্তানের জন্য খাবার তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে ক্ষানিক পরই। আর নাছোড় বান্দা শিশুরা তারস্মরে চিৎকার করে কান ঝাঝরা করে দিবে।
সবই চলবে আপন গতিতে। আবারও সূর্য উঠবে। মৃদু বাতাসে গাছেরা দুলবে। ছল ছল সুরে নদীর পানি দেশান্তরি হবে। নানান আবোল তাবোল চিন্তায় লোকটি ধিরে ধিরে যেন ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিলো। এরই মধ্যে তাদের ঘিরে রাখা হায়েনারা খাবার খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। সূর্যের তীব্র ক্ষোভে পরিবেশ তপ্ত হাঁড়ির ন্যায়। ফলে রক্ত যেন তখন হায়েনাদের কাছে কলিজা ঠাণ্ডা করা শরবতের মতো লাগছে। অসহ্য ক্ষুধার তাড়নায় মাংসের উপর লাফিয়ে পড়ছে তারা। একটা শেষ তো অপরটির দিকে ক্ষুধার দৃষ্টি; যেন দূর থেকেই গিলে খাবে সব।
হঠাৎ চেতনা ফিরে পেলো সে। দেখল অনেকেই ইতোমধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেছে। হতাশা যেন গ্রাস করে নিল তাঁকে। মনের মধ্যে প্রশ্নঃ ‘তাহলে আমার পালা কখন আসবে! প্রতিবারের মতো এবারও কি আমি নিরাশ হয়ে ফিরে যাবো!’ দৌড়ে গেলো মালিকের কাছে। মালিক মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন। কোন অনুনয় বিনয়ে কাজ হচ্ছে না। হাতে চুমু, পায়ে চুমু কিছুতেই হাকিম নড়ছেন না।
নিরাশায় ফিরে যাচ্ছিলো, হঠাৎ কি বুঝে যেন ফিরে দাঁড়ালো। বলতে লাগলোঃ ‘আমি দেখতে কুৎসিত! তাই বুঝি আপনি নিশ্চুপ? লোকে বলে আমার দেহ থেকে বিকট গন্ধ আসে! তাই বুঝি মুখ ঘুরিয়ে রেখেছেন!’ কথাগুলো মালিকের কানে তিরের মতো বিঁধ ছিল বলেই তড়িৎ দাঁড়িয়ে বলেনঃ ‘আমাকে কি তুমি পুড়িয়ে মারতে চাও!’
আর দেরি করলো না লোকটি। এক লাফে পায়ের কাছে এসে পড়লো। ‘মালিক তুমি কি দেখ না, এই হায়েনারা কত ক্ষুধার্ত! রক্তের পিপাসা তাদের প্রতিক্ষনেই আকাশচুম্বী হয়ে উঠছে। তোমার পূর্বেই আমাকে বিদায় দাও। আমার পক্ষে সম্ভব না, তোমার পরিনতি দেখা। আমায় ক্ষমা করো মালিক! আমায় ক্ষমা করো!’ এবারও হাকিম নির্বাক, তবে অশ্রু তাঁর অনুমতির জানান দিচ্ছে।
তপ্ত পথে পানির যেমন মরিচিকা হয়, শব্দেরও হয়। লোকটি পরনে থাকা পোশাক নিজ হাতে ছিঁড়তে ছিঁড়তে কি যেন বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছে হায়েনাদের ভিড়ে। তাঁর দ্রুত গতিও হায়েনাদের স্থির রাখতে পারেনি। তারাও দৌড়চ্ছে। বিপুল বাতাসে ধুলি চক্রের সৃষ্টি হল। মাংস ছেড়ার প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে লোকটিকে ছুঁড়ে দিল তারা। মালিক এসে মাথা তুলে নিলেন স্বীয় পাঁজরে। কারো মুখে কথা নেই। মালিক আর লোকটি তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে। পার্থক্য হচ্ছে লোকটি হাসছে, আর মালিকের চোখে অশ্রু বানের মতো হয়ে উঠেছে।
এবার মালিক মুখ খুললেনঃ ‘তোমার মতো সুন্দর আর কেউ নেই! বিশ্বাস করো, তোমার মতো সুগন্ধের উৎস আর হয় না। আজ মানুষের চোখে তা ধরা পড়ছে না, কেননা তাদের ঐ চোখ নেই। সেদিন সবাই তোমাকে অপরূপ দেখবে, যেদিন দৃষ্টির সকল সীমানাকে ছিঁড়ে ফেলা হবে।’
উফফ! আবারও অপেক্ষা! মালিক কথা বলেই যাচ্ছে, আর লোকটি ধিরে ধিরে পাড়ি জমাচ্ছে তাঁর অপেক্ষার নবজগতে…………

তপ্ত রোদে খোলা আকাশের নিচে সেই কবে থেকে বসে আছে মা, হিসেব মেলানো দুঃসাধ্য। কিই বা আর করবেন আর মা। এমন কচি খোকা ঘরে না ফিরলে মায়ের কি ঘুম হয়!

এমন প্রানের ধন বুক খালি করে চলে যেতে পারে, মায়ের জন্য বিশ্বাস করা অসম্ভব। তাই তো, মা বসে আছেন খোলা আকাশের নিচে। খোকা ফিরবেই! কাজল কালো চোখে তাকিয়ে থাকবে শুধু, বলতে তো পারবে না কিছুই। ওর আর বয়সই বা কতো। সবে তো মাস কয়েক।
আরও কতো এলোমেলো ভাবনা ঘুরে-ফিরে মায়ের মনে। বোধ ফিরে পেলেন একমাত্র অবলম্বনের ডাকে, যাকে দেখেই কতোনা না দেখার বেদনাকে দাবিয়ে রাখেন মা! নয়নের একমাত্র জ্যোতির দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাঁকালেন।
পুত্র বললেন: এবার একটু ছায়ায় এসো মা! একটু ঠান্ডা পানি মরূসম গলে একবার দাও মা!! আমাদের নয়নের মানিককে যে হায়েনারা খেয়ে ফেলেছিলো, তাকে শিকার করা হয়েছে। এবার তো একটু হাঁসো!!!
মা দির্ঘশ্বাঃস ছেড়ে দূরপ্রান্তের দিকে তাঁকিয়ে বললেন: তুমি পারবে বুকের ব্যাথায় হাঁটু গেড়ে বসা থেকে বিরত থাকতে? পারবে কি বলো! রক্ত অশ্রু বিসর্জন থামিয়ে দিতে!?!? পারবে কি বলো? ছোট মানিকের নাম ধরে নির্জনে বুক ভাসানো প্রতিনিয়ত বিলাপ থেকে ফিরে আসতে?!?! যেদিন পারবে, সেদিন আমাকে জানাবে। দুঃখি মায়ের অশ্রু সেদিন দেখবে না তুমি, খোদার কসম করে বলি…..

গভির রাতে চমকে উঠলো সে! আমার প্রাসাদে এমন আর্তনাদ! ‘উফফ! এত বিভোর ঘুম কিভাবে ভাঙ্গে? সন্ধ্যা থেকেই তো রোমীয় মদ গলা ডুবিয়ে খেয়েছিলাম! আজকের দিনটিও বেশ ছিল! কিন্তু বাচ্চা কণ্ঠের এই আর্তনাদ ঘুমাতে দিচ্ছে না আমায়!’ হাঁক ছেড়ে ডাকল পেয়াদাকে- ‘এই কে আছিস? এত চেচামেচি কিসের? কোথা থেকে আসছে এ বিলাপের শব্দ!’

পেয়াদা ভীত কণ্ঠে জবাব দিলোঃ ‘জনাব! যাকে হত্যা করা হয়েছে তাঁর তৃষ্ণার্ত শিশু কন্যা কাঁদছে?’
‘ওহহো! সে তো মরেই গেছে! আর কেদে কি লাভ! কাদলে কি ফিরে আসবে!! তাঁর কান্না আমার জীবনকে নরক বানিয়ে দিচ্ছে। কি চায় সে?’
‘তাঁর পিতার মাথা’
‘তাঁকে তা দিয়ে দাও! আর আমাকে ঘুমাতে দাও! যার যা চাই তা দিয়ে দাও! আমাকে ঘুমাতে দাও!’
কারাগারের অন্ধকার গলিতে হঠাৎ আলোর রেখা ফুটে উঠলো। তাহলে কি সবাইকে হত্যার নির্দেশ চলে এসেছে। ক্ষিন আলোর মশাল অন্ধকারের চাদর চিঁরে বেরিয়ে আসলো রক্ষি, হাতে নিয়ে বাবার কর্তিত মস্তক। তুলে দিল আর্তনাদরত মেয়েটির কোলে।
যেন প্রান ফিরে পেলো সে। চোখ মুছে বাবার ঠোঁটে চুমু দিচ্ছে। কচি হাতে মুছে দিচ্ছে চেহারায় লেগে থাকা রক্তের দাগ। ক্ষিন কণ্ঠে গুনগুন করছেঃ ‘বাবা! তুমি কোথায় গিয়েছিলে? তুমি জান না, তুমি না থাকলে আমার ঘুম হয় না। তোমার পাশে না শুয়ে থাকলে আমি চোখ বুঝতে পারি না।
আমার ভয় করে বাবা! তুমি কোথায় গেলে? জানো, ওরা আমাকে অনেক মেরেছে। আমাদের সবাইকে কতদুর থেকে হাঁটিয়ে নিয়ে এসেছে। আমি অনেক ক্লান্ত বাবা! আমার মাথায় তোমার আদরের হাত না বুলালে আমি ঘুমাতে পারি না।
তুমি কোথায় গেলে বাবা! তুমি কোথায়…… তুমি কোথায়………।’
রাজ্যের ঘুম যেন চেপে বসলো মেয়েটির চোখে। বিলাপের সুরে বাবার কর্তিত মস্তকের সাথে কথা বলতে বলতেই ঘুমিয়ে পড়লো। চিরনিদ্রায় শায়িত, বাবার মাথার সাথে……………

সকলে মিলে পশুটিকে টেনে হিঁচড়ে শোয়ালো। কসাই ছুরিতে শান দিচ্ছে। মুখে আল্লাহ খোদার নাম নিয়ে মাত্রই জবাই করতে যাবে, এমন সময় কাছের কোথাও থেকে একটি আওয়াজ আসলো: ‘দাঁড়াও’!

সবাই অবাক, কিছুটা বিরক্তও বটে। এমন একটি মহৎ কাজে কে বাধা দিলো। দেখলো একজন ব্যক্তি হেলে দুলে এগিয়ে আসছে। আশ্চর্য! আজকের দিনেও তার মুখে কোন হাঁসি নেই। চোখ দুটি ফুলে উঠেছে। চেহারায় অব্যক্ত বেদনার ছাপ স্পষ্ট।
জিজ্ঞেস করলো: ‘কি করছো তোমরা! পশুটিকে জবাই করার পূর্বে পানি দিয়েছিলে?!?’
সবাই এবারও বিরক্ত হলো। একজন সবার পক্ষ থেকে জবাব দিলো: ‘কি বলছেন আপনি!?! একটি পশুকে জবাই করার পূর্বে তাকে পানি দিবো না! এতো নিষ্ঠুর তো কোন মানুষ হতে পারে না!’
লোকটির চোখে এবার অশ্রুর বান বয়ে গেলো যেন। বললো: ‘অথচ আমার পিতাকে নির্মমভাবে জবাই করার পূর্বে একফোঁটা পানিও দেয়া হয়নি!’
এই বলেই লোকটি চলে যাচ্ছে। আর বাকিরা অপলক তার চলার পথে নিথর তাকিয়ে রইলো…..

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »