আশুরার বিপ্লবে নারীদের গৌরবজ্জ্বোল ভুমিকা

1412
ইসলাম নারী ও পুরুষের সন্মিলিত ইতিহাস। ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যাক্তি ছিলেন একজন নারী তথা উন্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা (সা.আ.)। প্রায় একই সময়ে পরুষদের মধ্যে মাত্র দশ বছর বয়সে প্রথম ইসলামের সমর্থনে এগিয়ে আসেন হযরত আলী(আ.)। হযরত খাদিজা(সা.আ.) ছিলেন আরবের শীর্ষস্থানীয় ধনী ও সম্পদশালী। কিন্তু রাসুলের(সা.) স্ত্রী হবার পর তিনি তার সব সম্পদ বিলিয়ে দিয়েছিলেন ইসলামেরই উৎস্য মুলের জন্য। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রাসুল(সা.) যখনই হযরত খাদিজা(সা.আ.)এর নাম নিতেন তখনি তার পবিত্র চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে যেত। ইসলামের শহীদদের মধ্যে প্রথম শহীদও ছিলেন একজন নারী, হযরত সুমাইয়া(রা.)। তদ্রূপ কারবালার বীর শহীদানের মধ্যে নারীও ছিলেন। হযরত খাদিজা(সা.আ.) এর কন্যা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা(সা.আ.)কে বলা হত উম্মে আবিহা বা পিতার মা। পিতা বিশ্বনবী(সা.)এর জন্য অশেষ স্নেহ ভালবাসা ও সেবার কারণেই এই উপাধি পেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া মুসলমানদের সচেতন করার জন্যেও অনেক গুরুত্বপুর্ণ বক্তব্য ও হাদিস প্রচার করে গেছেন এই মহীয়সী নারী। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় কবি বলেছেন,
 
“বিশ্ব দুলালী নবী-নন্দনী,
খাতুনে জান্নাত ফাতিমা জননী,
হাসান হুসাইন তব উম্মত তরে মাগো,
কারবালা প্রান্তরে দিলে বলিদান।
বদলাতে তার রোজ হাশরে, চাহিবে মা মোর মত পাপীদের ত্রান।”
 
তাই এটা স্পষ্ট যে, ইসলামের সেবায় সেই প্রাথমিক যুগেও নারী রেখেছিল এমন এক গৌরব উজ্জ্বল ভূমিকা যা গুরুত্বের দিক থেকে পুরুষদের চেয়ে কমতো নয়ই বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ছিল অনেক বেশী গুরুত্বপুর্ণ, যুগান্তকারী, অনন্য ও ঐতিহাসিক। কারবালার মহাবিপ্লবও এর ব্যতিক্রম নয়। কারবালার অসম যুদ্ধে যারা ইমাম হুসাইনের পক্ষে তথা খাঁটি মুহাম্মাদী ইসলামকে রক্ষার লড়াইয়ে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছেন তাদের অনেকেই এই মহান সংগ্রামে যোগ দেয়ার ও এ পথে অবিচল থাকার প্রেরণা পেয়েছিলেন তাদের পুন্যবতী জননী বা স্ত্রীদের কাছ থেকে। নারীদের উপর জিহাদ ওয়াজিব না হওয়া সত্ত্বেও দুজন মুমিন নারী শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধের জন্য লড়াইয়ের ময়দানে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু ইমাম হুসাইন(আ.) তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরিয়ে আনেন। ইমাম হুসাইন(আ.)এর সঙ্গী-সাথীদের মধ্যে মাত্র তিন ব্যক্তি ছাড়া কেউই স্বীয় স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে নিয়ে জাননি। বস্তুত কোন ব্যক্তি যখন কোন বিপদজনক সফরে যায় তখন সে স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে নিয়ে যায় না। কিন্তু ইমাম হুসাইন(আঃ) তার স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে নিয়ে গেলেন। তবে এ চিন্তা থেকে তাদেরকে সাথে নিয়ে যাননি যে, আমি যখন যাচ্ছি তখন আমার স্ত্রী ও সন্তানদেরকে সাথে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় কি। বরং তিনি কেবল এ কারণে তাদেরকে সাথে নিয়ে যান যে, তাদেরকে একটি বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি এ কাজেই বিদ্যমান ছিল। শহীদানে কারবালার মধ্যে ইমাম হুসাইন(আ.)এর সঙ্গী সাথীর সংখ্যা ছিল এক শত জনেরও বেশী। যার মধ্যে ১৭ জন ছিলেন ইমাম হুসাইনের(আ.) পরিবারের সদস্য।
 
কারবালার বীরত্ব গাঁথার অপরিহার্য অংশ হলেন হযরত যয়নব(সা.আ.)। তাকে ছাড়া বিপ্লব হয়ে পড়ত অসম্পুর্ন। তিনি ছিলেন হযরত হুসাইন(আ.)এর বোন ও নবী নন্দিনী হযরত ফাতিমা(সা.আ.)এর কন্যা। তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন ৬ষ্ঠ হিজরীতে। হযরত যয়নব(সা.আ.) যদি কারবালার ঘটনাগুলো তুলে না ধরতেন এবং কুফায় এযিদের দরবারে ভাষন না দিতেন তাহলে হয়তো কারবালার প্রকৃত ঘটনা মানুষ কখনো জানতেই পারত না। আসলে তিনি ছিলেন এই বিপ্লবের গুরুত্বপুর্ণ পর্যায়ের অন্যতম প্রধান পরিচালক। হযরত যায়নুল আবেদিন(আ.) অসুস্থ ছিলেন বলে কারবালার জিহাদে অংশ নিতে পারেননি। আর অসুস্থ বলেই এযিদ সেনাদের কেউ কেউ ভেবেছিল, এ তো এমনিতে মরবে ওকে আর মারার দরকার নেই। বিশেষভাবে আশুরার দিন বিকালে হযরত যয়নব(সা.আ.) স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছিলেন। ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের পর শিমার হযরত যায়নুল আবেদীন(আ.)কে হত্যা করতে উদ্যত হলে হযরত যয়নব(সা.আ.) এসে তার উপর হাত বাড়িয়ে ধরায় ও ইবনে স্বাদ শিমারকে নিরস্ত করায় নবী বংশের শেষ চেরাগটি রক্ষা পান। কারবালার ঘটনার আগে ও পরে এই মহান ইমামের সেবায়ও গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা রেখেছিলেন ফুপু হযরত যয়নব(সা.আ.)।
 
হযরত ইমাম হুসাইন(আ.) ইসলামকে রক্ষা করার জন্য নিজেকে কুরবানি করতে রাজি হয়েছিলেন মহান আল্লাহর নির্দেশে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য। কিন্তু কেন তিনি এই মহাবিপজ্জনক সফরে নারীসহ পরিবার পরিজনকেও সঙ্গে নিয়েছিলেন? এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন যে, নিশ্চয় আল্লাহ চান যে, নবী পরিবারের নারীরাও বন্দীনী হবে। আসলে এরই মধ্যে ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি। মহান আল্লাহ ঈমানের পরীক্ষায় নারীদের উত্তীর্ন হতে দেখতে চেয়েছেন। হযরত যয়নব(সা.আ.) নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবাসতেন ভাই হুসাইন(আ.) ও ভাতিজাদেরকে। ইমামের জন্য হযরত যয়নব(সা.আ.)এর দুই তরুন বা শিশুপুত্র শহীদ হলে তিনি মোটেও ব্যথিত হননি। কিন্তু যখন ভাইপো আলী আকবার(আ.) শহীদ হন তখন তিনি তার লাশ জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এবং বিলাপ করতে থাকেন। এই আলী আকবার ছিলেন দেখতে অবিকল বিশ্বনবী(সা.)র মতো, তার আচারণও ছিল মহানবী(সাঃ)র অনুরূপ এবং এমনকি তার কন্ঠস্বরও ছিল হুবহু রাসুল(সা.)এর কন্ঠের মতো। এ কারণে নবী পরিবারের অনেকেরই প্রাণ যখন রাসুল(সাঃ)এর জন্য কাঁদত তখন তারা এই তরুণকে দেখে শান্ত হতেন।
 
ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সব পুরুষ সঙ্গী এবং আপনজনদের নির্মমভাবে শহীদ করার পর হুসাইন শিবিরে এযিদ সেনারা অগ্নিসংযোগ করেছিল এবং লুন্ঠন করেছিল সব মালপত্র। এছাড়াও নরপশু এযিদ সেনারা মস্তকবিহীন পবিত্র লাশগুলোর উপর ঘোড়া ছুটিয়ে ছিন্ন-ভিন্ন করেছিল পবিত্র লাশগুলো। এরপর ১২ই মহররম নবী পরিবারের নারী ও শিশুদের বন্দি অবস্থায় উটে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দামেস্কের দিকে। ৭২জন এজিদ সেনার বর্শার চুড়ায় বিদ্ধ ছিল নবী দুলালদের কর্তিত মস্তক। আপনজনদের দলিত ও বিকৃত লাশগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হযরত যয়নব যে ভাষায় বিলাপ করেছিলেন তা শত্রুদেরও অশ্রু সজল করে দিয়েছিল। একজন এযিদ সেনা বলেছিল, আমি কখনও সে মর্মাহত বেদনা ভুলতে পারব না যখন হুসাইনের বোন যয়নব তার ভাইয়ের ছিন্ন-ভিন্ন দেহের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন তিনি কেঁদে কেঁদে বলছিলেন, “হে মুহাম্মদ(সা.), আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা তোমার উপর দরুদ ও সালাম পাঠায়। আর এই তোমার আদরের হুসাইন, কি ভীষণভাবে লাঞ্চিত, অবহেলিত, রক্তাপ্লুত খণ্ডিত লাশ হয়ে পড়ে আছে। হে মুহাম্মদ(সা.), তোমার কন্যারা আজ বন্দিনী, তোমার জবাই করা পরিবার আজ অপেক্ষা করছে পূবের হাওয়ার জন্য কখন ধুলো এসে তঁদেরকে ঢেকে দেবে।”
 
উল্লেখ্য, নবী পরিবারের বন্দী নারীদের অনুরোধেই তাদেরকে ইমাম হুসাইন(আ.)র শাহাদাতস্থলের উপর দিয়ে দামেস্কের পথে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় যয়নব(সা.আ.) ইমামের মস্তকবিহীন লাশের পাশে যেসব বিলাপ করেন তাতে শত্রু-বন্ধু নির্বিশেষে সবাই কাঁদতে বাধ্য হয়। কিন্তু এ সময়ও তিনি ইমাম যায়নুল আবেদিনের অসুস্থতার কথা ভুলেননি। পিতা ও প্রিয়জনদের লাশ দেখে তরুন ও অসুস্থ ইমামের প্রাণ যেন দেহের খাঁচা ছেড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এ সময় যয়নাব(সা.আ.) রাসুল(সা.)এর একটি হাদিস শুনিয়ে ভাতিজাকে সান্তনা দেন। তিনি বলেন, “এখন যেখানে হুসাইনের লাশ দেখতে পাচ্ছ, সেখানে কাফন ছাড়াই তার লাশ দাফন করা হবে। এখানে হুসাইনের কবর যিয়ারতগাহে পরিণত হবে।” অর্থাৎ এরপর থেকে ইসলাম হবে আরো প্রানবন্ত, প্রজ্জলময়, আহালে বাইত হবে অমর।
কুফায় ইবনে যিয়াদের দরবারসহ নানা স্থানে এবং দামাস্কে এযিদের দরবারে বন্দী অবস্থায় হযরত যয়নব(সা.আ.) যেসব সাহসী বক্তব্য রেখেছিলেন তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। কুফায় তার ভাষন শ্রবনকারী একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিলেন, “আল্লাহর শপথ, এমন আর কোন লজ্জাশীলা নারীকে কখনও এমন ভাষন দিতে শুনেনি।” তার ভাষনে ছিল পিতা হযরত আলী(আ.)এর বাগ্মিতা ও নারীসুলভ লজ্জাশীলতা। কুফা নগরীর প্রবেশ দ্বারের কাছে মাত্র দশ-বারটি বাক্যে তিনি তাঁর ভাষন শেষ করেছিলেন। কুফাবাসীরা তাদের প্রতি হযরত যয়নব(সা.আ.)র যোক্তিক ও মর্মস্পর্শী তিরস্কার শুনে অনুশোচনা ও বিবেকের দংশনের তীব্রতায় নিজেদের আঙ্গুল মুখে ঢুকিয়ে কামড়াচ্ছিল। এখানে নারীসুলভ মর্যাদা বজায় রেখে সাহসী বীর নারী ইমাম হুসাইন(আ.)র কন্যা ফাতিমা একটি সংক্ষিপ্ত ভাষন দিয়েছিলেন। সে সময়ও সবাই অশ্রুসজল হয়ে পড়ে। হযরত যয়নব(সা.আ.) কুফাবাসীদেরকে তিরস্কার করে যেসব বক্তব্য রেখেছিলেন তাঁর একাংশে বলেছেন, “তোমরা নিজেদের জন্য চিরন্তন অপরাধ ও লজ্জা রেখে এসেছো এবং চিরন্তন লাঞ্ছনা খরিদ করেছো। তোমরা কোনদিনই এ লাঞ্ছনা দূর করতে সক্ষম হবে না। আর কোন পানি দিয়েই তা ধুয়ে ফেলতে পারবে না। কারণ তোমরা হত্যা করেছো হুসাইনকে, যিনি হচ্ছেন খাতামুন্নাবিয়্যিন(সা.)র কলিজার টুকরা, বেহেস্তে যুবকদের নেতা।”
 
হযরত যয়নব(সা.আ.)সহ নবী পরিবারের বন্দীদেরকে কুফায় ইবনে যিয়াদের দরবারে নিয়ে যাওয়া হলে সে যয়নব(সা.আ.)কে বিদ্রুপ করে বলেছিল, “সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তোমাদের লাঞ্ছিত করেছেন, তোমাদের পুরুষদের হত্যা করেছেন এবং তোমাদের বাগড়ম্বরকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন।” সঙ্গে সঙ্গে হযরত যয়নব(সা.আ.)জবাবে বলেছিলেন, “সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি নবী মুহাম্মদ(সা.)র বদৌলতে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন এবং আমাদেরকে সব অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করেছেন। অবশ্যই ফাসেক লাঞ্ছিত হবে এবং ফাজের বা পাপাচারী মিথ্যা বলেছে, যার বাগড়ম্বের কথা সে বলছে, সে ব্যক্তি আমরা ছাড়া অন্য কেউ নয়। তাই সব প্রশংসা আল্লাহর।”
 
ইবনে ইয়াজিদ এবার বিদ্রুপ করে বললঃ “আল্লাহ্ তোমার ভাইয়ের সাথে যে আচরণ করলো তা কেমন দেখলে? সে খলিফা ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাই আল্লাহ্ তাকে হতাশ করলেন এবং ইয়াযিদকে সাহায্য করলেন।” জবাবে যয়নাব(সা.আ.) বলেছিলেন, “আমরা এতে উত্তম সৌন্দর্য ছাড়া অন্য কিছু দেখিনি। আল্লাহ্‌ আমার ভাইকে শাহাদাতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন, এটা তথা আল্লাহ্‌র রাস্তায় নিহত হওয়া সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। আল্লাহ্‌ তোমাকে এবং তুমি যাদের হত্যা করেছ তাঁদের সবাইকেই খুব শিগগিরই বিচারের জন্য নিজ দরবারে হাজির করবেন। সেদিনের জন্য প্রস্তুত হও তুমি, সেদিন কি জবাব দিবে তুমি, সেদিনের জন্য উদ্বিগ্ন হও। কে সেদিন বিজয়ী ও সফল হবে, হে যেনাকারিনীর পুত্র?” এরপর নেকড়ের মত ক্ষিপ্ত হয়ে নির্লজ্জের মত ইবনে যিয়াদ বলে, “আমি খুশী হয়েছি। কারণ যা চেয়েছি তা পেয়েছি।” জবাবে হযরত যয়নব(সা.আ.)বলেছিলেন, “তুমি দুনিয়ার মধ্যে নেশাগ্রস্থ, প্রতারিত ও ফিতনাগ্রস্থ। তুমি কি মনে করেছো হুসাইনের পরে তুমি আনন্দের সঙ্গে পৃথিবীতে চিরদিন টিকে থাকবে? স্বস্থিতে থাকবে? কখনও না, তুমি স্বস্তির মুখ দেখবে না। তুমি কখনও তোমার অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবে না। হে ইবনে যিয়াদ! তুমি নিজের হাতে নিজের উপর যে কলঙ্ক লেপন করেছো তা অনন্তকাল পর্যন্ত থেকে যাবে।”
 
এতে দিশেহারা অস্থির ও ক্ষিপ্ত হয়ে ইবনে যিয়াদ চিৎকার করে বলে, “আমাকে এ নারীর হাত থেকে মুক্তি দাও, ওদেরকে কারাগারে নিয়ে যাও।” মহাপাপিষ্ট ও নরাধম ইয়াযিদের দরবারে উপনীত হলে তার বেয়াদবীপূর্ন নানা কথা ও বিদ্রুপের জবাবেও হযরত যয়নব(সা.আ.) এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক ভাষন দিয়েছিলেন। সে ভাষনের একাংশে তিনি বলেছেন, “আমাদের শাসন কর্তৃত্ব তোমার হাতে পড়ায় তুমি মহিমান্নিত আল্লাহর সেই বানী ভুলে গিয়েছ? ‘কাফেররা যেন মনে না করে যে, আমরা তাদের যে অবকাশ দান করি তা নিজেদের জন্য কল্যাণকর। বরং আমরা তো তাদেরকে এ জন্যই অবকাশ দেই যাতে করে তাদের পাপগুলো বাড়তে থাকে এবং তাদের জন্য অপমান জনক শাস্তি অবধারিত’।” তিনি ইয়াযিদকে সে ব্যক্তির পুত্র যাকে তুলাকা অর্থাৎ বন্দি করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, বলেও সম্বোধন করেন। কারণ মুয়াবিয়া মক্কা বিজয়ের সময় বন্দী হয়েছিল মুসলমান বাহিনীর হাতে, ইসলাম গ্রহণের ঘোষণার পর তাকে মক্তি দেওয়া হয়।
 
হযরত যয়নব(সা.আ.) তাঁর ঐতিহাসিক সেই ভাষনে পবিত্র নবী বংশের, বিশেষ করে ইমাম হুসাইন(আ.)এর মর্যাদা তুলে ধরার পাশাপাশি ইয়াযিদ বাহিনীর জুলুম ও নৃশংসতাও তুলে ধরেছিলেন। তিনি ইমাম হুসাইনের সাথে ইয়াজিদের নানা বেয়াদবী এবং নবী বংশের উপর তার বাহিনীর নৃশংস জুলুম নির্যাতন চালানোসহ হত্যাযজ্ঞের জন্য তাকে খোদায়ী কঠোর শাস্তির সন্মুখীন হতে হবে বলে উল্লেখ করেন। হযরত যয়নব(সা.আ.) এক পর্যায়ে ইয়াযিদের দরবারেই তাকে বলেন, “যদিও ঘটনা চক্রে আমি তোমার সাথে কথা বলতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু তোমাকে খুবই তুচ্ছ ও নীচ বলে মনে করি এবং তোমাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করছি ও অনেক বেশী নিন্দা করছি। কিন্তু আমার ভাইয়ের হত্যার কারণে মুসলমানদের দৃষ্টিগুলো অশ্রুসজল আর হৃদয়গুলো কাবাবের মত দগ্ধিভুত। বিশ্বনবী(সা.)র আহলে বাইতের প্রতি উম্মতের ভালবাসা ও তাদের স্বরণ ইয়াযিদগোষ্ঠী কখনও বিলুপ্ত করতে পারবে না এবং আহলে বাইতের মার্যাদার ধারের কাছেও যে পৌছাতে পারবে না ইয়াযিদগোষ্ঠী, তাও তিনি ভবিষ্যতবাণী করেন। জালিমদের ওপর যে আল্লাহ্‌র লানত বর্ষিত হবে এবং ইহকালে তাদের পতন ও চরম লাঞ্ছনা এবং পরকালেও আরো কঠোর শাস্তি অপেক্ষা করছে হযরত যয়নব(সা.আ.) তাও উল্লেখ করেন এ ভাষনে। তাঁর সেই সব অবিস্মরণীয় ভাষন ও বক্তব্যগুলো দিকে দিক প্রচারিত হয়ে দামেস্কে ও কুফাসহ মুসলিম বিশ্বের জনগণের মধ্যে বিক্ষোভের আগুন প্রজ্জলিত করেছিল। গোটা আরব উপদ্বীপের চার লাখ মানুষ হুসাইন(আ.) হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য অভ্যুত্থান করে। ফলে খুব শিগগিরই কুফায় মুখতারের নেতৃত্বে নবী বংশের অবমাননাকারী ও ঘাতকরা লাঞ্ছনার শিকার এবং নির্মুল হয়। আর এ জন্যই নবী(সা.)র নাতনী হযরত যয়নব(সা.আ.)কে কারবালা বিপ্লবের অন্যতম সফল সংগঠক ও প্রধান পরিচালক বলা যায়।
 
হযরত যয়নব(সা.আ.) ইন্তেকাল করেছিলেন হিজরি ৬৫ সনের ১৫ই রজব। কারবালার মহাবিপ্লব হযরত যয়নব(সা.আ.)কে ছাড়া কেবলই যে অপুর্ন থাকত তা নয়, এ বিপ্লবের বার্তা ও প্রকৃত ইতিহাসও চিরতরে হারিয়ে যেত। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বিষাদ ও দুঃখ-ভরাক্রান্ত দিনগুলোতেও বিশেষ করে আশুরার অপরাহ্ণেও অশেষ ধৈর্য নিয়ে খোদায়ি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কিংবা আশুরার বিপ্লবের পরও জালিম শাসকের সামনে নির্ভিক চিত্তে সত্যের সুরক্ষা ও আহলে বাইতের মহত্ত্ব আর অসহায়ত্ব তুলে ধরার জন্য হযরত যয়নব(সা.আ.)র পবিত্র নাম প্রোজ্জ্বল তারকার মতই চির অম্লান হয়ে আছে।
 
এছাড়াও ইমাম হুসাইনের দুই স্ত্রী ও কন্যারাও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন যা নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ
উম্মে রাবাব ছিলেন ইমাম হুসেইনের স্ত্রী। তিনি ছিলেন আলী আসগার ও সকিনার মাতা। ৬০হিজরির ২৮শে রজব ইমাম হুসাইনের সাথে কুফার দিকে যাত্রা শুরু করেন। তিনি তাঁর কিশোরী কন্যা ও নবজাতক শিশু আলী আসগার যার সে সময় বয়স ছিল এক মাস মাত্র, তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে মদীনা থেকে কারবালা পর্যন্ত এক কঠিন যাত্রা করেন, যা ছিল খুবই কষ্টকর এবং আমাদের ধারনারও অতীত। শুধু মাত্র ইমামের স্বার্থে তিনি কোন আক্ষেপ করেননি। শিশু আসগরকে বুকের দুধ না খাওয়াতে পেরেও মুখ খুলেননি তিনি। বরং সে সময়ও তিনি ইমামের পাশে দাড়িয়েছিলেন। তাঁর ধৈর্য্য ও সহ্যের পরিচয় মেলে তখন, যখন তিনি সামান্য কিছু পানির আশায় কোন রকম কোন জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই ইমামের হাতে আলী আসগরকে সোপর্দ করেন জালিমদের সম্মুখে। আলী আসগর করুনভাবে শহীদ হবার পরেও তিনি ধৈর্যহারা হননি। এমন ছিল ইমামের প্রতি উম্মে রাবাবের দৃঢ় বিশ্বাস।
 
বিবি শাহার বানু ছিলেন ইমাম হুসাইনের আরেক স্ত্রী ও যায়নুল আবেদিনের মাতা। তিনিও কারবালার যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াযিদী বাহিনী ইমাম পরিবারের তাবুগুলো লুট করে ও তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। লুট করার সময় তারা ইমাম পরিবারের সদেস্যদের উপর চাবুক মারে। ইমাম হুসাইন(আ.)এর ছয় বছরের মেয়ে, শিশু সাকিনার কানের দুল কান থেকে ছিড়ে নেয় তারা এবং তা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। শিশুরা ভয়ে ও ব্যাথায় কাঁদতে থাকলে ইয়াযিদী বাহিনী তাদের গালে চর মারে এবং নারীদের মাথার চাদরও কেড়ে নেয়। ৭ই মহররম ইয়াযিদ বাহিনী পানি বন্ধ করে দেয়। এদিকে হুসাইনী তাবুতে পানির অভাবে শিশুরা কান্না-কাটি শুরু করলে সৈয়েদা সাকিনা নিজের কাছে থাকা সামান্য পানি দিয়ে সেই শিশুদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। খুব শীঘ্রই যখন পানি শেষ হয়ে গেল তখন শিশুরা আশার চোখ নিয়ে সাকিনার দিকে তাকিয়ে থাকল। সেই মুহুর্তে অবস্থা এতো খারাপ ছিল যে, সাকিনার ঠোট পানির অভাবে শুকিয়ে গিয়েছিল। তখন সাকিনা একটি খালি পানির মশকসহ ৪২জন শিশু, যাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে শুকনো পানির মশক ছিল তাদেরকে নিয়ে তাঁর চাচা আব্বাস এর কাছে যান। আর বলে, “চাচা! আমি তৃষ্ণনার্ত এবং এসব শিশুরা আমার কাছে পানি চাইতে এসেছে।” এরপর আব্বাস যখন পানি আনতে যান, তখন শিশুরা সাকিনার চারপাশে ছোট ছোট পেয়ালা হাতে নিয়ে পানির আশায় দাড়িয়ে থাকে। সাকিনাও পানি পাবার আশায় ইমামের পাশে দাড়িয়ে চাচার অপেক্ষায় দুই নয়নে তাকিয়ে থাকেন এবং শিশুদেরকে সান্তনা দেন ও বলেন যে, তাঁর চাচা পানি আনতে গেছেন এখুনি চলে আসবেন। আব্বাস পানির মশক ভরে নিলে শত্রুরা তাঁর দুই হাত তীর বিদ্ধ করে দেয়। তিনি পানির মশক মুখে তুলে নিলেন। সাকিনা আর এসব সহ্য করতে পারলেন না চিৎকার দিয়ে বললেন, “ইয়া আল্লাহ্, আমার চাচা আব্বাসকে মারতে দিওনা, আমি আর কখনও পানি চাবনা” এবং দৌড়ে তাবুতে তাঁর মায়ের কাছে চলে গেলেন। অতঃপর আব্বাসও শহীদ হয়ে গেলেন। যুদ্ধের পর বন্দী অবস্থায় যখন বন্দীদের জন্য পানি এসেছিল যয়নব(সা.আ.)এই পানি সাকিনাকে পান করতে দেন। সাকিনা জিজ্ঞাস করেন, আপনারা পানি খেয়েছেন? যয়নব মাথা নেড়ে না বললে সাকিনা বলেন, তাহলে আমাকে কেন খেতে বলছেন? জবাবে যয়নব বললেন, তুমি অনেক ছোট ও দীর্ঘ সময় ধরে তৃষ্ণার্ত। সাকিনা জবাবে বলেন, হে ফুপু! আমি না, ছোট ছিলতো আলী-আসগর। এত অল্প বয়সেও সাকিনার এমন বিচক্ষন জবাব ও আচরণ নারী হিসেবে কারবালার প্রান্তরে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। ইমাম হুসাইনের আরেক কন্যা ছিলেন রোকাইয়া। যার বয়স ছিল মাত্র ৪ বছর। এ ছোট্ট শিশু বন্দি অবস্থায় এক রাতে মোটেও ঘুমাচ্ছিলেন না। শুধু কান্নাকাটি করছিলেন। এদিকে বন্দি শিবিরের পাশেই ছিলো এযিদের প্রমোদখানা। নাচ গান আর মদ্যপানে মত্ত ইয়াযিদ হযরত রোকাইয়ার চিৎকারে ভীষণ বিরক্ত বোধ করে এবং লোক পাঠিয়ে শিশুকে থামানোর নির্দেশ জারি করে। কিন্তু মাসুম শিশুর কান্না কিছুতেই যে থামছে না। ইয়াযিদ কারণ জিজ্ঞেস করলে তাকে বলা হলো যে, এ শিশু তাঁর বাবা হুসাইনের ছিন্ন মস্তকটি চাচ্ছে, বাবার মস্তক কোলে নিয়ে সে ঘুমুতে চায়। ইয়াযিদ দেখলো এতো ভারী বিরক্তিকর কান্ড। সে রক্ষীদের নির্দেশ দিলো, “যাও, আপাতত: তার বাবার মাথাটি তার কাছে দিয়ে এসো। ঘুমিয়ে গেলে ফেরত এনে সংরক্ষন করবে।” ইয়াযিদের নির্দেশে ইমাম হুসাইনের পবিত্র মস্তক হযরত রোকাইয়ার কাছে দেয়া হলে তিনি অতি আদর করে মাথাটি চুমু খেতে থাকলেন এবং বুকের কাছে চেপে রাখলেন। দেখতে দেখতে শিশু রোকাইয়া ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু কে জানতো এ ঘুম তাঁর শেষ ঘুম। ক্বিয়ামত পর্যন্ত সে আর কাউকে বিরক্ত করবে না। বাবার মাথা কোলে নিয়ে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন রোকাইয়া। তাকে এর পর নবী পরিবারের বন্দি শিবিরের পাশেই দাফন করা হয়। বাবার জন্যে হযরত রোকাইয়ার কান্না সে রাতে থেমে গিয়েছিলো কিন্তু তিনি কাঁদিয়ে গেলেন নবীজীর উম্মতকে… এ কান্না যে শেষ হবার নয়।
কারবালায় আমরু বিন জুনাদেহ নামের এক যুবকও শত্রুর বিরুদ্ধে বীরত্বপুর্ন লড়াই করে শহীদ হন। পিতার শাহাদাতের পর পুত্রও যখন লড়াই করতে চেয়েছিলেন ইমাম তাকে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জানান, তাঁর মা বলেছেন, ইমামের জন্য যেন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করে শহীদ হই। শেষ পর্যন্ত সে শহীদ হয়। ইয়াযিদ সেনারা তাঁর কর্তিত মস্তক হুসাইন শিবিরের দিকে নিক্ষেপ করে। আমরুর মা ঐ মস্তক চেপে ধরে বলেছিল, সাব্বাস! আমার পুত্র সাব্বাস! তুমি আমার হৃদয়ের আনন্দ ও চোখের আলো। এরপর ঐ মা পুত্রের মস্তকটি শত্রু শিবিরের দিকে নিক্ষেপ করে বলেন, আমরা যা আল্লাহ্‌র পথে দান করি তা কখনও ফিরিয়ে নেই না। তারপর এই বীর নারী শত্রু সেনাদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের দুইজনকে হত্যা করেন। পরে ইমাম হুসাইন(আ.) নিজে গিয়ে তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ফিরিয়ে আনেন।
 
মায়ের নির্দেশে একই ধরনের বীরত্ব দেখিয়ে শহীদ হয়েছিলেন আব্দুল্লাহ বিন উমাইর বা ওয়াহাব বিন আব্দুল্লাহ নামের আরেক যুবক। একদল শত্রু সেনাকে নাস্তানাবুদ করার পর সে শিবিরে ফিরে এলে তাঁর মা তাকে জানায় যে, হুসাইনের(আ.)পথে শহীদ না হওয়া পর্যন্ত তিনি পুত্রের উপর সন্তুষ্ট হবেন না। পরে সে আবারও হামলা চালিয়ে উমর ইবনে সা’দের ২৪জন সেনাকে হত্যা করেন ও ১২জন অশ্বারোহীকে আহত করেন। ইয়াযিদের সেনাপতি ইবনে সা’দ ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে নির্মম ভাবে শহীদ করে। শত্রুরা আব্দুল্লাহর বিচ্ছিন্ন মাথাও নিক্ষেপ করেছিল তাঁর মায়ের দিকে। তাঁর মাও তা আবার শত্রুদের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী স্বামীর লাশের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, বেহেস্তে তুমি স্বাগতম। এ সাহসীনী নারী শত্রুদের ওপরে হামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) তাকে বোঝান যে, জিহাদ নারীর জন্য ওয়াজিব নয়। তিনি এবং তাঁর পুত্র বেহেস্তে রাসুল(সা.) এর সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য অর্জন করবেন বলেও তিনি ওই বীর নারীকে সুসংবাদ দিয়েছিলেন।
দাশতে নাইনাওয়ার আরেকজন শহীদের স্ত্রী ছিলেন দুলহান। যার স্বামীর নাম ছিল যুহাইর ইবনে কাইন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি বাহরুদের মরুভুমিতে একটি তাবুর মধ্যে জীবন-যাপন করেছিলেন। কারণ, তাঁর স্বামী তাকে ঐ স্থানে তালাক দেন এবং কারবালার যুদ্ধে যোগদান করেন। কেননা, তাঁর স্বামী চাননি যে, তিনি শহীদ হবার পরে শত্রুরা তাঁর স্ত্রীকে কষ্ট দিক বা বন্দী করুক। তাই তাঁর স্ত্রীও কসম খেয়েছিলেন এবং পন করেছিলেন যে, যতক্ষন পর্যন্ত ইয়াজিদের মৃত্যুর খবর না শুনবেন ততদিন পর্যন্ত তাবু থেকে নড়বেন না। কারণ, তিনি তাঁর স্বামীর দেয়া তালাকের বদলা চুকাতে চেয়েছিলেন। যুহাইর ইত্তমুল জিসমের যুদ্ধের একজন বীর যুদ্ধা ছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে তিনি যুদ্ধ ও হুকুমত থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। কারণ, তাঁর মতামত ছিল যে, দুই মুসলমান দলের মধ্যে যুদ্ধ রাসুলে খোদার রাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই, তিনি এইসব থেকে দূরে থেকে বছরের পর বছর ব্যাবসা-বানিজ্য করে প্রচুর সম্পত্তি অর্জন করেন। যুহাইর ও তাঁর স্ত্রী হজ্জ করে ফেরার পথে মক্কার খুব কাছে ইমাম হুসাইনের কাফেলা দেখতে পেলেন। কিছু দূর পর্যন্ত তাদের গন্তব্য স্থল একই ছিল। মাওলা হুসাইনের কাফেলার সাথে সফর করাটা যুহাইর চাচ্ছিলেন না। তাই নিজেরা ধীরে ধীরে ইমামের কাফেলার এক ধাপ এগিয়ে থাকলেন। কিন্তু ভাগ্য দুই কাফেলাকে এক করে দেয়। ইমাম হুসাইন(আ.) যুহাইরকে নিজের কাছে ডেকে পাঠালেন। যুহাইর যেতে চাচ্ছিলেন না কিন্তু স্ত্রী তাকে বললেন, নিশ্চয় কোন ওয়াজিব কাজের জন্য মাওলা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি গেলে মাওলা হুসাইন আমাকে তাঁর সাথে যুক্ত হওয়ার দাওয়াত দিবেন। তাঁর স্ত্রী বলেন, আল্লাহ্‌র কসম! ফারজান্দে রাসুল তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তুমি না গিয়ে নিজের উপরে জুলুম করছো। জবাবে তিনি বলেন, উম্মতে রাসুলের মধ্যে যখন থেকে ফেতনা ও যুদ্ধ শুরু হয়েছে আমি আমার তলোয়ারকে কখনও বের করিনি করবোও না। তাঁর স্ত্রী বলেন, যুদ্ধ না কর কিন্তু হুসেইনের ডাকে সাড়া না দিয়ে তুমি বেয়াদবি করতে পারো না।। তাঁর স্ত্রী অনেক বুঝানোর পর ইমাম হুসাইনের সাথে যুহাইর সাক্ষাৎ করলেন। সাক্ষাতের পর এসে তিনি তাঁর সব সম্পত্তি তাঁর স্ত্রীকে লিখে দেন ও তালাক দেন। তাঁর স্ত্রী কান্না-কাটি করেন এবং বলেন তুমিতো ইমামের সাথে দেখা করতে রাজি ছিলেনা। আমি তোমাকে বুঝিয়ে পাঠালাম আর এখন তুমি আমাকে একা ফেলে যেতে চাচ্ছো? জবাবে তিনি বলেন, যদি নারীদের উপর জিহাদ ফরজ হতো তাহলে আমরা এক সাথে মাওলা হুসাইনের রাহে যুদ্ধ করতাম। তিনি আরও বলেন, দুলহান! খোদা সাক্ষি থাকল, এ তালাক এক আশেকের তালাক। এছাড়া তুমি আর কিছু মনে করোনা। পরবর্তিতে তাঁর স্ত্রী একাই ইমামের কাফেলাতে যোগ দেন ও তাঁর স্বামীকে বীরত্বের সাথে শহীদ হতে দেখেন। তিনি নিজে ঐ তাবুতে ইয়াযিদের মৃত্যুর খবর শোনার অপেক্ষারত জীবনযাপন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন।
 
উম্মুল বানীন ছিলেন ইমাম আলী(আ.)এর স্ত্রী। উম্মুল বানীন ও তাঁর চার পুত্রের ঘটনা আমাদের অনেকেরই অজানা। আশুরার সময় উম্মুল বানীন কারবালায় ছিলেন না। তিনি তখন মদিনায় ছিলেন। যারা মদীনায় ছিলেন তারা কারবালার ঘটনার কোন খবরই রাখতেন না। চার পুত্র সন্তানের জননী এই মহিলার গোটা জীবন বলতে তাঁর এই পুত্রগণই ছিলেন। তাঁর নিকট খবর পৌছল যে, তাঁর চারটি সন্তানই কারবালায় শহীদ হয়েছেন। বস্তুতঃ তিনি ছিলেন একজন পুন্যবতী মহিলা। তিনি ছিলেন একজন বিধবা, যার একমাত্র সম্বল ছিল তাঁর এই পুত্রগণ। কিন্তু তাদের সকলেই কারবালায় শহীদ হয়ে গেলেন। তিনি অনেক সময় মদীনা থেকে কুফা অভিমুখী পথের পাশে বসে তাঁর সন্তানদের স্মরণে শোকগাথা গাইতেন। ইতিহাসে লিখা হয়েছে যে, এ মহিলা স্বয়ং বনি উমাইয়ার প্রশাসনের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রচার হিসাবে গণ্য হতো। যে কেউ এই পথ দিয়ে অতিক্রম করতো সেই থমকে যেতো এবং তাঁর শোকগাথা শুনে অশ্রু বিসর্জন করতো। এমনকি আহলে বাইতের ঘোরতর দুশমনদের অন্যতম মারওয়ান ইবনে হাকাম যখনই ঐ পথ দিয়ে অতিক্রান্ত করতো তখন উম্মুল বানীনের শোকগাথা শুনে নিজের মনের অজান্তেই বসে পড়ত এবং উম্মুল বানীনের বিলাপের সাথে সাথে ক্রন্দন করতো। এই মহিয়সী নারীর একটি শোকগাথা আমি আপনাদের সামনে আজ তুলে ধরছি। তিনি তাঁর শোকগাথায় বলেনঃ “আলীর অন্যান্য পুত্র তাঁর পিছনে দাড়িয়ে ছিল, তাঁরা সিংহের পিছনে সিংহের ন্যায় আব্বাসের পিছনে দাড়িয়ে ছিল। আফসোস! আমাকে জানানো হয়েছে, তোমার নরসিংহ পুত্রের শরীরে লৌহ শলাকা ঢুকানো হয়েছিল। আব্বাস! প্রাণপ্রিয় পুত্র আমার! আমি জানি তোমার শরীরে যদি হাত থাকতো তাহলে কেউ তোমার সামনে আসতে সাহসী হতো না।
 
উপসংহারঃ এই ছিল কারবালায় নারীদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। যে ধরনের ভূমিকা ইসলাম তাঁর কাছ থেকে আশা করে। লজ্জাশীলতা, সতীত্ব, পবিত্রতা ও নারী-পুরুষের মধ্যকার অলঙ্ঘনীয় সীমারেখার সংরক্ষন সহকারে এ ধরনের নারী ব্যক্তিত্বই ইসলামের কাম্য, যা আমরা কারবালার এই মহীসয়ী নারীদের ভুমিকার মাঝে দেখতে পাই। কারবালার ইতিহাস এ কারণে নারী-পুরুষের সম্মিলিত ইতিহাস, এ ইতিহাসের সৃষ্টিতে পুরুষ যেমন গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করেছেন তেমনি নারীরাও গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করেছিলেন। এভাবে এ ইতিহাস নারী ও পুরুষ উভয়ের হাতে গড়ে উঠে। পরিশেষে আমি বলতে চাই যে, কারবালার বীর নারীরা মুসলিম নারী সমাজকে শিখিয়ে গেছেন কিভাবে বীরত্ব দেখানোর পাশাপাশি সতীত্ব, হিজাব ও লজ্জাশীলতা বজায় রেখে সত্য ঘটনাকে ইসলামের শ্বার্থে প্রচার করতে হয়।
 

“আল্লা-হুম্মা সাল্লি আ’লা মুহাম্মাদ ওয়া আলে মুহাম্মাদ”

__নুসরাত শামস

Related Post

Leave a comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Translate »