সূরা “আন্ নাজম”-এর অনুবাদ ও কিছু সামগ্রিক তথ্য

1012 0

🤲 بِسْمِ الّٰلهِ الرَّحْمٰنِ الرَحِيْمِ ✍️

▶(বলো! আমি) আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যিনি রহমান (পরম করুণাময় সকল সৃষ্টির জন্যে), যিনি রহিম (অসীম দয়াবান কিছু বিশেষ ব্যক্তির জন্যে)।

✅নক্ষত্রের কসম! যখন তা অস্তমিত হয়,(১)
✅ (হে মক্কাবাসী!) তোমাদের সাথী [=তোমাদের সাথে বসবাসকারী মুহাম্মাদ(সা.)] বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয়,(২)
✅এবং (জেনে রাখ!) তিঁনি নফসের তাড়নায় কোন কথা বলেন না।(৩)
✅ (তিঁনি যা বলেন) তা অহী ছাড়া অন্য কিছু নয়- যা (এই অহি) তাঁর প্রতি অবতীর্ণ করা হয়।(৪)
✅তাঁকে [=নবী মুহাম্মাদকে(সা.)] একজন শক্তিশালী (সত্ত্বা) শিক্ষা দিয়েছেন–(৫)
✅যিঁনি অত্যন্ত বিষ্ময়কর শক্তিমত্তার অধিকারী, যিঁনি পরিপূর্ণভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত।(৬)
✅তিঁনি রয়েছেন ঊর্ধ্ব দিগন্তে।(৭)
✅অতঃপর তিঁনি নিকট থেকে আরো নিকটবর্তী হলেন।(৮)
✅তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরো কম।(৯)
✅তখন তিঁনি তাঁর বান্দার উপর যা অহী করার ছিল তা অহী করলেন।(১০)
✅তিঁনি [=মুহাম্মাদ(সা.) যা দেখেছেন (সে ব্যাপারে) অন্তর অস্বীকার করেনি।(১১)
✅তিঁনি যা দেখেছেন সে বিষয়ে তোমরা কি তার সংঙ্গে বিতর্ক করবে?(১২)
✅নিশ্চয়ই তিঁনি [=মুহাম্মাদ(সা.)] তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন।(১৩)
✅দূর দিগন্তের সিদরা বৃক্ষের [=কুল বৃক্ষের] কাছে,(১৪)
✅যার নিকট অবস্থিত চির উপভোগ্য জান্নাত।(১৫)
✅যখন সিদরা বৃক্ষটি আচ্ছাদিত ছিল যেভাবে আচ্ছাদিত হবার কথা [=সেখানে ছিল শুধুই নূরের ঝলকানী] ,(১৬)
✅ (জেনে রাখ!) তাঁর [=মুহাম্মাদ(সা.)-এর] দৃষ্টিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যূতও হয়নি [=যা তিঁনি দেখেছেন তা বাস্তব সত্য]।(১৭)
✅নিশ্চয় তিঁনি তাঁর প্রতিপালকের মহানিদর্শনাবলী অবলোকন করেছিলেন।(১৮)
✅আচ্ছা, তোমরা কি লাত ও উয্যা-কে দেখেছো (যে, মানুষ নিজের হাতে বানানো এই মূর্তিগুলোর নাম রেখে তাদেরকে নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে?)(১৯)
✅এবং তৃতীয় আরেকটি (মূর্তি), যার নাম ‘মানাত’, (যাকে তোমরা আল্লার কন্যা বলে অভিহিত করো!!!)(২০)
✅তাহলে কী পুত্র সন্তান তোমাদের জন্যে আর কন্যা সন্তান আল্লাহর জন্যে?(২১)
✅এ ধরণের বন্টন তো অবিচারমূলক!(২২)
✅ (মনে রেখো!) এগুলো কিছুই না, এগুলো শুধুমাত্র (অহেতুক) কতগুলো নাম, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্ব-পুরুষরা ঐ মূর্তিগুলোর জন্যে রেখেছো, যাদের সত্যতার ব্যাপারে আল্লাহ কোন দলীল নাযিল করেননি। তারা [=ঐসব কাফেররা] শুধু ধারনা ও কুপ্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে। অথচ তাদের নিকট তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে পথনির্দেশ এসেছে।(২৩)
✅মানুষ যা আশা করে তাই কি পায়?(২৪)
✅বস্তুতঃ ইহকাল ও পরকাল আল্লাহরই হাতে [=তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কেউ কোন কিছু পেতে পারে না]।(২৫)
✅আসমানসমূহে এমন কত ফেরেশতা আছে, যাদের শাফায়াত কোন কাজে আসবে না। শুধুমাত্র আল্লাহর অনুমতির পর যাদের ব্যাপারে তিঁনি ইচ্ছে করবেন ও সন্তষ্ট থাকবেন (তাদের শাফায়াতই কাজে আসবে)।(২৬)
✅নিশ্চয় যারা আখেরাতের উপর বিশ্বাস করে না তারাই ফেরেশতাদেরকে নারীবাচক নামে আখ্যায়িত করে থাকে ।(২৭)
✅আর এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু অনুমানের উপর ভিত্তি করে চলে এবং (মনে রেখো!) সত্যের মুকাবিলায় অনুমানের কোন মূল্য নেই।(২৮)
✅অতএব যারা আমাদের যিকির থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং পার্থিব জীবন ছাড়া অন্য কিছু কামনা করে না তুমি তাদেরকে উপেক্ষা করে চলো।(২৯)
✅তাদের জ্ঞানের দৌড় এই পর্যন্তই। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখেন যে, কে তাঁর পথ হতে বিচ্যুত আর তিনিই ভাল জানেন কে হেদায়াত প্রাপ্ত।(৩০)
✅আসমানসমূহ ও ভুমন্ডলে যা কিছু আছে তার একচ্ছত্র আধিপত্য আল্লাহরই, যেন মন্দ কাজ সম্পাদনকারীদেরকে তিনি শাস্তি দিতে পারেন এবং নেক কাজ সম্পাদনকারীদেরকে দিতে পারেন পুরস্কার।(৩১)
✅যারা কবিরা গুনাহ ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকে, যদিও মঝে মধ্যে সগ্বিরা গুনাহ করে ফেলে, তারা (জেনে রাখুক!), তোমার প্রতিপালক অপরিসীম ক্ষমাশীল। তিঁনি [=আল্লাহ] তোমাদের সম্পর্কে বেশী ভাল জ্ঞান রাখেন, যখন তিনি তোমাদেরকে উথিত করেছিলেন যমিন হতে এবং যখন তোমরা মাতৃগর্ভে ভ্রুণরূপে অবস্থান করছিলে। অতএব, তোমরা আত্মপ্রশংসায় লিপ্ত হয়ো না, কেননা তিঁনি মুত্তাকী ব্যক্তিদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশী জানেন। (৩২)
✅ (হে নবী!) তুমি কি দেখেছো সেই ব্যক্তিকে, যে (সত্য থেকে) মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল?(৩৩)
✅সেই ব্যক্তি সামান্য দান করেই হাত গুটিয়ে নিয়েছিল (আর তার এই গুনাহর ভার অন্যের স্কন্ধে চাপিয়ে দিয়েছিল)।(৩৪)
✅তার কাছে কি অদৃশ্যের জ্ঞান আছে যে, সে দেখবে (যে, অন্যেরা তার গুনাহর বোঝা বহন করতে পারবে)?(৩৫)
✅তাকে মূসার সহিফাসমূহে অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি সম্পর্কে কী অবগত করা হয়নি?(৩৬)
✅ (তদ্রুপ) ইব্রাহীম (-এর সহিফাসমূহে অন্তর্ভুক্ত বিষয়াদি সম্পর্কে কী অবগত করা হয়নি?), যে [=ইব্রাহীম] তার দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করেছিল।(৩৭)
✅ (তারা যেন জেনে রাখে যে,) কোন (পাপী) ব্যক্তি অন্যের (পাপের) বোঝা বহন করবে না।(৩৮)
✅ (তারা আরো যেন জেনে রাখে যে,) মানুষ তার প্রচেষ্টার ফলাফল ছাড়া অন্য কিছু অর্জন করে না,(৩৯)
✅আর তার প্রচেষ্টার ফলাফল অচিরেই দেখানো হবে,(৪০)
✅অবশেষে তাকে পরিপূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে ।(৪১)
✅ (তারা যেন জেনে রাখে যে, হে মানুষ!) সব কিছু তোমার প্রতিপালকের কাছে গিয়েই পরিসমাপ্তি ঘটবে।(৪২)
✅ (তারা যেন জেনে রাখে যে,) তিঁনিই হাসান, তিঁনিই কাঁদান,(৪৩)
✅এবং তিঁনিই মৃত্যু দেন, তিঁনিই জীবিত করেন,(৪৪)
✅আর তিঁনিই সৃষ্টি করেন যুগল পুরুষ ও নারী –(৪৫)
✅শুক্র বিন্দু থেকে যখন তা (নারী গর্ভে) স্খলিত হয়,(৪৬)
✅আর (তারা যেন জেনে রাখে যে,) পুনরুত্থান ঘটানোর দায়িত্ব তাঁরই [=আল্লাহরই] উপর (যেন তিঁনি পরিপূর্ণভাবে ন্যায়বিচার প্রয়োগ করতে পারেন),(৪৭)
✅তিঁনিই তোমাদেরকে অভাবমুক্ত করেছেন এবং সঞ্চয় করার মত সম্পদ দান করেছেন।(৪৮)
✅আর (তারা যেন জেনে রাখে যে,) তিঁনি [=আল্লাহ] (বিশাল ও প্রচন্ড আলো বিকিরণকারী) ‘শি’রা নামক নক্ষত্রের প্রতিপালক,(৪৯)
✅এবং তিঁনিই পূর্ব ‘আদ জাতিকে (তাদের কৃত কর্মের শাস্তি স্বরূপ) ধ্বংস করে দিয়েছিলেন,(৫০)
✅আর সামূদ জাতিকেও (তাদের কৃত কর্মের শাস্তি স্বরূপ) এমনভাবে (নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন) যে, কাউকে তিনি অবশিষ্ট রাখেননি।(৫১)
✅আর তাদের পূর্বে নূহের সম্প্রদায়কেও (তাদের কৃত কর্মের শাস্তি স্বরূপ তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন)। কেননা, তারা ছিল অধিক মাত্রায় জালিম ও অবাধ্য।(৫২)
✅আর (লুত জাতির) আবাস ভূমিকে সমূলে উৎপাটন করে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন তিঁনি [=আল্লাহ]।(৫৩)
✅অতঃপর (আল্লাহর আযাব) তাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে।(৫৪)
✅তুমি তোমার প্রতিপালকের কোন্ অনুগ্রহ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করবে?(৫৫)
✅এই (নবীও) [=হযরত মুহাম্মদ (সা.)] অতীতের সতর্ককারীদের ন্যায় একজন সতর্ককারী।(৫৬)
✅ (কাফির মুশরিকরা জেনে রাখুক!) যা নিকটে আসার কথা তা নিকটে চলে এসেছে [=ক্বিয়ামত অত্যাসন্ন],(৫৭)
✅আল্লাহ ছাড়া কেউ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কষ্ট বিদুরিত করতে পারবে না।(৫৮)
✅তোমরা কি এই কথায় বিস্ময় বোধ করছো!(৫৯)
✅এবং হাসি- ঠাট্টা করছো! কাঁদছো না?(৬০)
✅ (কারণ,) তোমরা তো উদাসীনতা ও অবাধ্যতার মধ্যে ডুবে আছো।(৬১)
✅সুতরাং, (যদি মুক্তি চাও, তাহলে) তোমরা সবাই আল্লাহর জন্যে সেজদা করো এবং তাঁর ইবাদাত করো। [ফরজ সেজদা](৬২)

📚✳ সূরা “আন্ নাজম” সম্পর্কে সামগ্রিক কিছু তথ্য:
✅১। কোরআনের বর্তমান উসমানী মুসহাফ-এর ক্রমিক নম্বর অনুসারে এ সূরাটি তেপ্পান্নতম।
✅২। নাযিল হওয়ার ধারাবাহিকতা অনুসারে এ সূরাটি তেইশ নম্বরে অবস্থিত।
✅৩। নাযিলের স্থানটি হচ্ছে পবিত্র মক্কা নগরী। এ সূরার শেষের আয়াতের পর ফরজ সেজদা রয়েছে।
✅৪। আয়াতের সংখ্যা ৬২।
✅৫। এ সূরাটির অভ্যন্তরে অবস্থিত শব্দ সংখ্যা ৩০৮।
✅৬। এ সূরাটির অভ্যন্তরে মোট বর্ণ ব্যবহৃত হয়েছে ১৪০৫টি।
✅৭। এ সূরাটির অভ্যন্তরে “আল্ল-হ” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে মোট ০৬ বার।
✅৮। “আন্ নাজম”-এর অর্থ তারকা।
✅৯। সূরা “আন্ নাজম”-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এ সূরা ফরজ সেজদা সম্বলিত চারটি সূরার অন্যতম। সুতরাং এ সূরার ৬২ নং আয়াত তিলাওয়াতের পর অবশ্যই সেজদা করতে হয়।

✅১০। সামগ্রিকভাবে সূরা “আন্ নাজম”-এর আলোচ্য বিষয়ঃ
✍একঃ আল্লাহর রাসূলের(সা.) হাদিস ও কথা দলীল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
✍দু্ইঃ নবীজীর মি’রাজ ও আসমানী সফরে গমনের বর্ণনা।
✍তিনঃ আল্লাহর বিস্তৃত রহমত, ক্ষমা ও তাওবা থেকে মূর্তি পূজারকদের সকল আমল ও চিন্তা-ভাবনা বহুদূরে অবস্থিত।
✍চারঃ সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর জ্ঞানের আয়ত্বাধীন ।
✍পাঁচঃ সকল মানুষ তার নিজের পাপ নিজেই বহন করবে।।
✍ছয়ঃ অতিত গোত্র ও জাতিসমূহের ইতিহাসের শিক্ষণীয় অধ্যায়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত প্রদান ।

✅১১। সূরা “আন্ নাজম”-এ অন্তর্ভুক্ত বিষয়বস্তুসমূহঃ
✍একঃ সূরা “আন্ নাজম”-এর ১-২৪ নং আয়াতের বিষয়বস্তুঃ
এ সূরার শুরুতেই সম্মানিত রাসূল (সা.)-এর মাধ্যমে অহি গ্রহণ ও সেই বাণি পৌছানোর সত্যতা সমর্থিত হয়েছে এবং মিথ্যা বলা, সত্য থেকে বিচ্যুতি, প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলা ইত্যাদি বিষয়ের মত অপবাদসমূহ আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা(সা.)-এর কাছ থেকে যে বহুদূরে, আর এ ধরনের বিষয় থেকে তিঁনি যে সম্পূর্ণ পাক ও পবিত্র, তার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অতঃপর মি’রাজের প্রসঙ্গ টানা হয়েছে এবং মি’রাজের রাতে প্রদর্শিত সকল ঘটনাকে সমর্থন দেয়া হয়েছে। আর এরই মধ্যে মি’রাজের বিভিন্ন পর্যায়ে সংঘটিত বিভিন্ন বিষয়ের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। এর পরের আয়াতগুলোতে লাত, উযযা, মানাত প্রভৃতি আরবদের নিজ হাতে বানানো গুরুত্বপূর্ণ মূর্তিসমূহ ও তাদের বিভিন্ন পদবিকে সারবস্তুহীন ও মূল্যহীন বলে গণ্য করা হয়েছে। অতঃপর সমগ্র পৃথিবীর উপর আল্লাহর কর্তৃত্বের বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে এবং পৃথিবীসমূহ যে, আল্লাহর জ্ঞানের চাদরে আবৃত, সে ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর কণ্যা হিসেবে মুশরিকদের নিকৃষ্ট আক্বিদাকে তাদের হীন কল্পনা বলে বাতিল করে দেয়া হয়েছে।
✍দুইঃ সূরা “আন্ নাজম”-এর ২৪-৩২ নং আয়াতের বিষয়বস্তুঃ
উক্ত আয়াতসমূহে মূর্তিগুলোর পক্ষ থেকে শাফায়াতের ব্যাপারে মুশরিকদের বিশ্বাসকে বাতিল বলে ঘোষণা দিয়ে জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখেরাতের সব কিছু আল্লাহর করতলগত। অতঃপর বলা হয়েছে, এমনকি ফেরেস্তারা ও নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দারা পর্যন্ত আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত শাফায়াত করার সুযোগ পাবে না। এরপর ফেরেস্তাদের ব্যাপারে মুশরিকদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের দিকে ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। তারা ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর কণ্যা হিসেবে বিশ্বাস করতো। অবশেষে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেনো অসচেতন ও গাফিল ব্যক্তিদের কাছ থেকে দূরে থাকেন। পরবর্তি আয়াতগুলোতে আল্লাহর প্রতিদান, ক্ষমা এবং তাঁর জ্ঞান ও সৃষ্টি সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে।
✍তিনঃ সূরা “আন্ নাজম”-এর ৩৩-৬২ নং আয়াতের বিষয়বস্তুঃ
উক্ত আয়াতসমূহে প্রথমতঃ অল্প অনুদান ও নিজের গুনাহ অন্যের ঘাড়ে অর্পনের বিষয়টিকে তিরস্কার করা হয়েছে। অতঃপর ক্বিয়ামত প্রসঙ্গে হযরত ইব্রাহিম ও হযরত মুসার সুহুফদ্বয়ের বর্ণনা, নিজের গুনাহ অন্যের ঘাড়ে অর্পনের বিষয় এবং মানুষ যে, নিজের প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফলাফল অর্জন করে থাকে এবং তাওহীদসহ সকল কিছু আল্লাহর উপর ন্যস্ত হওয়ার ন্যায় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তি আয়াতসমূহে অতিত জাতিসমূহের ইতিহাস এবং পুনরুত্থান দিবসের ব্যাপারে মানুষের অসচেতনতার প্রতি তিরস্কার সম্বলিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।

🔷১২। সূরা “আন্ নাজম”-এর ৩২ ও ৩৩ নং আয়াতের শানে নুযুলঃ
হযরত আল্লামা আবুল কাসিম মাহমুদ ইবনে উমার যামাখশারী খরাযমী(রহঃ) (৪৬৭হিঃ/১০৭৫খৃঃ-৫৩৮হিঃ/১১৪৪খৃঃ) রচিত তাফসীরের কিতাব “আল কাশশাফ আন হাক্বায়িক্বিত্ তানযিল ওয়া উয়ুনিল আক্বিউইল ফি উজুহিত্ তাউইল”(সংক্ষেপে বলা হয় আল কাশশাফ)-এ সূরা “আন্ নাজম”-এর ৩২ ও ৩৩ নং আয়াতের তফসীর করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, উসমান ইবনে আফফান সর্বদা নিজ সম্পদ আল্লাহর রাহে দান করতো। একদা আব্দুল্লাহ ইবনে সা’দ ইবনে আবি সারাহ (তার দুধ ভাই) তাকে বলে, এভাবে দান করতে থাকলে তো নিঃস্ব হয়ে যাবেন। উসমান ইবনে আফফান বলেন, আমার অনেক ত্রুটি ও গুনাহ আছে। আমি এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে ক্ষমা পেতে চাই। তার দুধ ভাই ইবনে আবি সারাহ বলে, আপনি আপনার এই উষ্ট্রী ও তার উপর সংরক্ষিত মালামাল আমাকে দান করে দিন। আমি আপনার সকল গুনাহের বোঝা নিজ কাধে নিলাম। উসমান ইবনে আফফান তাই করলেন এবং এ কাজে কয়েকজনকে সাক্ষী রাখলেন। এরপর থেকে তিনি আল্লাহর রাহে আর কোন সম্পদ দান করেননি। এ উপলক্ষে উক্ত আয়াতদ্বয় অবতীর্ণ হয়।

🔷১৩। সূরা “আন্ নাজম”-এর ঘটনাঃ
ঐতিহাসিক ঘটনাঃ এ সূরাতে রাসূলে আকরামের মি’রাজের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আহলে সুন্নতের ধারায় কিছু বর্ণনায এসেছে যে, যখন রাসূলে আকরাম মি’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন তখন এ সূরা অবতীর্ণ হয়েছিল। যখন মি’রাজ থেকে প্রত্যাবর্তনের সংবাদ উতবা ইবনে আবি লাহাবের কানে পৌছলো তখন নবীজীর কাছে এসে সে নিজ স্ত্রী (নবীজীর কণ্যা)-কে তালাক দেয় এবং হযরতের মুখমণ্ডল মোবারকের দিকে থুথু নিক্ষেপ করে (নাউযুবিল্লাহ)। ঐ সময় উতবা নবীজীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলঃ “তারকার রবের কসম, হে মুহাম্মাদ! তুমি তারকার ব্যাপারে কাফের হয়ে গেছো।” আল্লাহর প্রিয় রাসূল(সা.) এ দৃশ্য দেখে উতবার উপর লানত করলেন। তিঁনি বললেনঃ “হে আল্লাহ! তুমি এই ব্যক্তির উপর বনের হিংস্র পশুর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে দাও।” এ ঘটনার কিছুদিন পর উতবা সিরিয়া সফরে গেলে কোন এক সরাইখানাতে রাত্রি যাপনকালে আল্লাহ তার অন্তরে ভয় ঢুকিয়ে দিলেন। সে তার সাথীদেরকে বলে, তারা যেনো রাতে তাকে মাঝখানে রেখে ঘুমায়। তারা এ কাজ করলেও কোন লাভ হলো না। মাঝ রাতে বনের সিংহ এসে উতবাকে ছিঁড়ে ফিরে খায়।

🔷১৪। সূরা “আন্ নাজম”-এর ফজিলতঃ
🌴• হযরত রাসূল(সা.): “যে ব্যক্তি সূরা “আন্ নাজম” তিলাওয়াত করবে, সে আল্লাহর রাসূলকে সত্য বলে গ্রহণকারী ও তাঁকে অস্বীকারকারীদের সংখ্যার দশগুণ সমান সাওয়াব প্রাপ্ত হবে।” (মাজমাউল বায়ান, খণ্ড ৯, পৃঃ নং ২৭০)।
🌴• হযরত ইমাম জাফার ইবনে মুহাম্মাদ আস সাদিক্ব আলাইহিস সালামঃ “যদি কেউ অব্যাহতভাবে প্রতিদিন সূরা “আন্ নাজম” তিলাওয়াত করে তাহলে সে ব্যক্তি জনগণের মধ্যে বসবাস করার পরও তার উচ্চ প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ থাকবে, আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দিবেন এবং মানুষ তাকে ভালবাসবে।”
(সাওয়াবুল আ’মাল, পৃঃ নং ১১৬)।

🔷১৫। সূরা “আন্ নাজম”-এর মাধ্যমে তদবীর:
🌴• একঃ অন্তরের শক্তি বৃদ্ধির তদবীর
রাসূল(সা.)-এর কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেনঃ “যদি কেউ সূরা “আন্ নাজম” কোন পশুর চামড়ার উপর লিখে নিজের সঙ্গে বহন করে তাহলে সে যে কোন রাষ্ট্রের যে কোন নেতার সামনে অন্তরের দিক থেকে শক্তি ও সাহসের সাথে অবস্থান নিতে পারবে এবং সে-ই নেতা তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।” (আল বুরহান ফি তাফসিরিল ক্বুরআন, খণ্ড ৫, পৃঃ নং ১৮৫)।
🌴• দুইঃ শিশুর কান্না বন্ধের তদবীর
সূরা “আন্ নাজম”-এর ৫৯নং আয়াত থেকে ৬১নং আয়াত লিখে তাবিজ করে কোন শিশুর গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয় তাহলে সেই শিশুর কান্না বন্ধ হয়ে যাবে।” (আল মিসবাহ লি কাফহামী, পৃঃ নং ৪৫৮)।
🌴• তিনঃ হাজত পূরণের অব্যর্থ তদবীর
“হাজত পূরণের লক্ষ্যে সূরা “আন্ নাজম” ২১ বার এক বৈঠকে তিলাওয়াত করলে ফলাফল পেয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। “ (দারমন ব কোরআন, পৃঃ নং ১০৫)।
↯↻↯↻↯

Related Post

হিজামার পরিচয়

Posted by - June 25, 2020 2
হিজামা হল এমন একটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি, যাতে মানুষের সকল প্রকার শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক সুস্থতার নিশ্চয়তা রয়েছে। হিজামা চিকিৎসার…

সূরা আল কাফিরুন

Posted by - August 15, 2020 0
সূরা “আল কাফিরুন” সম্পর্কে সামগ্রিক কিছু তথ্য ১। কোরআনের বর্তমান উসমানী মুসহাফ এর ক্রমিক নম্বর অনুসারে এ সূরাটি একশত নয়তম।…

সূরা আবাসা-র অনুবাদ

Posted by - September 16, 2019 0
(আমি) আল্লাহর নামে (শুরু করছি), যিনি রাহমান [=পরম করুণাময় সকল সৃষ্টির জন্যে], যিনি রাহিম [=অসীম দয়াবান কিছু বিশেষ ব্যক্তিদের জন্যে]।…

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »