কারবালার করুণ শোকগাঁথা

1285 0

এক: কারবালা ইসলামী আন্দোলনের প্রশিক্ষণ মঞ্চ

প্রতিবছর মহররম মাস আসলে সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায় কারবালার শহীদদের শোকে মুহ্যমান হয়ে যান। চারিদিকে শোকের যে আবহ তৈরি হয়, তা মুসলমানদের অন্তরকে বিগলিত করে দেয়। আমরা এই মাসে শোকের নানান অনুষ্ঠান আয়োজন করি, দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণ করি, দশদিন ব্যপি মজলিস করে এই মাস থেকে ফজিলত হাসিলের আপ্রান চেষ্টা করে থাকি। আহলে বাইতের অনুসারী কতিপয় আলেম এসকল শোকসভায় কারবালার ঘটনা বর্ণনা করে মানুষের চোখের পানি ঝড়ানোর আয়োজন করেন। আর আমাদের মুসলমান ভাইয়েরা সেই সকল বীরদের সাহসিকতার কাহিনি শুনে আশ্রæপাতে বুক ভাসিয়ে দেন। চারপাশের এসকল আয়োজন দেখে আমার কাছে মনে হয়, ইমাম হুসাইন এবং তাঁর সেই সাহসী সন্তানেরা মানুষকে যুগ যুগ ধরে চোখের পানি ঝরানোর খোরাক দেয়ার উদ্দেশ্যেই একটি সংগ্রামের মঞ্চায়ন করেছেন। কিন্তু যখন কারবালার সংগ্রামের বহুমাত্রিকতার দিকে তাকাই, তখন এসকল শোকসভা, আশ্রæপাত কারবালার চাহিদার তুলনায় একেবারে নগন্য মনে হয়।

যে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইমাম হুসাইন উমাইয়্যা শাসক ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাতে কখনও এটা মনে করার কোন সুযোগ থাকে না যে, এই দশদিন শুধুমাত্র শোক পালনের মাধ্যমে কিছু অশ্রæপাতের জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি এমন হতো তবে এই ঘটনার প্রভাব যুগ যুগ ধরে মানবতার প্রতিটি শাখা উপশাখায় বিস্তার লাভ করতে পারতো না। শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে কারবালা নিপীড়িত নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর কাছে যে আহŸান রেখে চলেছে, তার আবেদন শুধু অশ্রæপাতের দ্বারা সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়। শুধু দশদিন শোকানুষ্ঠান উদযাপন করে, দরিদ্রদের মাঝে খাবার বিতরণ করে বা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতো দুটি রোজা পালন করে এই বহুমাত্রিক ঘটনার হক আদায় করা যায় না।

মহররম শোকের মাস, এতে কোন সন্দেহ নেই। এই মাসের আকস্মিকতা প্রতিটি মুসলমানের অন্তরে দাগ কাটবে এটাই স্বাভাবিক। যুগ যুগ ধরে আবালবৃদ্ধাবনিতা এই ঘটনা শোকের আবহে বয়ে বেড়াবে এতে আমার কোন দ্বিমত নেই। আমার দ্বিমত এর শিক্ষায়, আমার দ্বিমত এর আবেদনে, আমার দ্বিমত এর গুরুত্বে। কারবালা শোকের মাস, এতে আমি একমত। কিন্তু হায় হুসাইন! হায় হুসাইন! বলে এই মাসে বুক চাপড়িয়ে শরীর থেকে রক্ত ঝরিয়ে বা অঝোরে অশ্রæপাত করে বুক  ভাসাতে ভাসাতে এর থেকে ফজিলত হাসিল করবো, আর মহররম শেষে আবার পূর্বের ন্যায় আমি নিজেকে সমাজের অবক্ষয়ের প্রতি ভাসিয়ে নিয়ে যাবো, এর সাথে আমার দ্বিমত আছে। যারা এসকল আয়োজনের দ্বারা এই মাসকে কাটিয়ে দিয়ে তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করতে চান, তাদের কাছে কারবালা শুধু একটি বেলার ঘটনা মাত্র। যেখানে ইমাম হুসাইন ও তাঁর শতাধিক সঙ্গি জীবনের মায়া ত্যাগ করে ইমামের প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনার শুরু ও শেষ দিকের প্রতি তারা মোটেই দৃষ্টি প্রদান করেন না। ইমামের বিদ্রোহের ঘটনা, মদিনা থেকে তাঁর হিজরত, মক্কা থেকে কুফা’র দিকে আগমন, যাত্রা পথে তাঁর প্রদত্ত খুতবাগুলো, কারবালার প্রান্তরে অবস্থিত ইমামের আচরণ ও কর্মপদ্ধতি, আশুরা দিবসের ঘটনা, যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ এসবই কারবালার অংশ। যে ঘটনাটির মূল অংশ কারবালা নামক উষ্ণ মরুপ্রান্তরে হলেও এর শুরু এবং শেষ কিন্তু সেই ১০ই মহররমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইয়াজিদের ক্ষমতার মসনদে বসা থেকে শুরু করে, সিরিয়া রাজদরবারে আহলে বাইতের প্রতি অবমাননাকর আনন্দ আয়োজন এবং এর পরবর্তীতে অন্যান্য বিদ্রোহের ঘটনাগুলো কারবালারই অংশ। এই সকল ঘটনাগুলোকে সমন্বিত করেই আমাদেরকে কারবালা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আমরা ধিরে ধিরে কারবালার এই ঘটনাগুলো আলোচনা করেই এর থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করার চেষ্টা করবো।

যে সময়টিতে ইমাম হোসাইন বিদ্রোহ করেছিলেন, তা ছিল ইয়াজিদের শাসনভার গ্রহণ করার প্রারম্ভেই। এই বিরোধিতায় তিনি কোন প্রকার কৌশল অবলম্বন করেননি। এমনকি কোন সহযোগিতার অপেক্ষায় তিনি থাকেননি। যখন যেখানে তিনি আন্দোলনের জন্য সুবিধা মনে করেছেন সেদিকে ছুটেছেন। মদিনা থেকে মক্কা, মক্কা থেকে তাঁর কুফা দিকে চলা থেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তাঁর মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল না। কারণ কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্য এতটা উতলা হয়ে যাওয়া ব্যক্তি ইমাম হোসাইন নন। তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, এখন থেকে ইসলামের ইতিহাসের সাথে যুক্ত হবে রাজতন্ত্রের অভিশপ্ত ধারা, যা সম্পর্কে আল্লাহর রাসুল, ইমাম আলী এবং ইমাম হাসান তাঁদের বক্তব্য এবং নসিহতের মধ্যে সুস্পষ্ট করেছিলেন। তিনি দেখছিলেন, এমন এক ব্যক্তির হাতে মুসলমানদের ভাগ্য এবং ইসলামের রক্ষার দায়িত্ব চলে এসেছে, যার না আছে কোন ইসলামি অনুভ‚তি আর না আছে ইসলামের কোনরূপ জ্ঞান। এই ব্যক্তির হাতে দ্বীনের পরিচালনার দায়িত্ব চলে যাচ্ছে যার পূর্বপুরুষেরা কখনোই ইসলামের সাথে সৌহার্দ রাখেনি। ইয়াজিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট আমাদের সকলেরই জানা। তার অসভ্যতা যখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সস্তানের আনুগত্যের নিবেদন করল, তখন মাসুমিয়াতের সেই স্বত্বা অস্থির হয়ে পড়েন এবং বিদ্রোহের আগুনে নিজেকে পুড়িয়ে দ্বীনের ভিত্তি পুনঃস্থাপনে অধির হয়ে গেলেন। তাই, ইয়াযিদ কর্তৃক নিযুক্ত মদিনার গভর্নের কাছ থেকে ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত হওয়ার প্রস্তাব শুনেই ইমাম হুসাইন বলেছিলেন, “হুসাইনের মতো লোকেরা ইয়াজিদের মতো লোকদের হাতে বাইয়াত হতে পারে না।” (খাতিব খোরাযমী(মৃত্যু৫৬৮হি.), আল মাক্বতাল, খন্ড-১, পৃ. ১৮৪, কোম, ইরান; সাইয়্যেদ ইবনে তাউস(মৃত্যু ৬৭৩হি.), লুহুফ, পৃ. ১৯, তেহরান, ১৩২১ফারসী)।  ঐতিহসিকদের বর্ণনানুযায়ী তার পরের দিন প্রভাতে মদিনার রাজপথে ইমামের সাথে মারওয়ান বিন হাকামের সাক্ষাত হলে সে পুনরায় ইমামকে ইয়াযিদের হাতে বাইয়াতের প্রস্তাব দেয়। তখন ইমাম সেই প্রস্তাবের উত্তরে বলেছিলেন, “ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ইসলাম বিদায় লগ্নে উপনীত হয়েছে।” (খোরাযমী, খন্ড-১, পৃ. ১৮৪; সাইয়্যেদ ইবনে তাউস, পৃ. ২০)।

এখানে হুসাইন যেমন একটি প্রতীক তেমনি ইয়াজিদও একটি প্রতীক। অর্থাৎ, হুসাইন হচ্ছেন সারা দুনিয়ার সকল অধিকার বঞ্চিত ও নিপীড়িত জনতার প্রতীক, যারা সকল অবস্থায় অন্যায়ের সাথে আপোষহীন; আর অপরপক্ষে ইয়াজিদ হচ্ছে সেই সকল লোকদের প্রতীক, যারা জুলুম ও নিপীড়নের দ্বারা মানুষকে দাবিয়ে রাখতে চায় এবং তাদের অধিকার হরণের দ্বারা নিজের আখের গুছাতে চায়।

এই আন্দোলনের প্রতিটি ক্ষন আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। ইয়াযিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কোন সুযোগের অপেক্ষা না করে, কোন বিশাল সাহায্যের অপেক্ষা না করেই ইমাম তাঁর সংগ্রামী মঞ্চের মঞ্চায়নে নেমে পড়েন। সকলের চোখের সামনে দিয়েই তিনি তাঁর লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। মদিনা থেকে বের হওয়ার সময় তিনি কোন গোপন পথের সন্ধান না করে সকলের পরিচিত পথ দিয়ে চলা শুরু করেন। মক্কায় তিনি প্রকাশ্যেই সকলের সামনে ইয়াজিদের তিরস্কার করতে লাগলেন। মক্কা থেকে কুফার পথেও তিনি কোন গোপন পথের আশ্রয় নেননি। তাঁর পথ চলার এই নীতি থেকে আমাদের জন্য শিক্ষা হল, যখন জুলুমের বিরুদ্ধে মজলুম সংগ্রামে লিপ্ত হবে, তখন তার সকল কর্মপদ্ধতি হতে হবে সকলের বোধগম্য। কারণ, কোন আন্দোলনকে জনসাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্য করতে হলে, তা জনতার সামনে পরিষ্কার থাকতে হবে।

তিনি তাঁর চলার পথে বলেছিলেন: “আমার এই বিদ্রোহ ক্ষমতার মসনদ হাসিলের জন্য নয়। আমার এই বিদ্রোহ আমার নানার সুন্নতকে সমুন্নত করার জন্য।” (খোরাযমী, খন্ড-১, পৃ ১৮৮; আবদুল্লাহ ইবনে নুরুদ্দিন বাহরানী(হিজরী বার শতকের ঐতিহাসিক), মাক্বতাল আল আওয়ালিম, পৃ. ১৭৯, তেহরান, ইরান)।  তাঁর এই কথার দ্বারাই তাঁর এই সুমহান আন্দোলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা পরিষ্কার হতে পারি। এটা অধিকার আদায়ের সংগ্রামের আরেকটি বৈশিষ্ট। যে আন্দোলন আপামর জনতার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে চালিত হয়, তাঁর উদ্দেশ্য স¤পর্কে অবশ্যই জনতাকে স্পষ্ট থাকতে হবে। তাই অনুসারীদের নিকট তাঁর এই আন্দোলনের উদ্দেশ্যকে পরিষ্কার করা একজন বিচক্ষন নেতার পরিচয় বহন করে।

এবার তাকাব তাঁর কাফেলার দিকে। তাঁর এই বিদ্রোহী বহরে ছিলেন বনু হাশিমের সদস্যরা, তাঁর বোন, স্ত্রী, শিশু সস্তান এবং অন্যান্য সদস্যরা আর সামান্য কিছু অনুসারী। তাঁর কাফেলার দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারব, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া একজন নেতার আয়োজন কেমন হওয়া উচিত। যদি তাঁর সাথে আর কেউ না আসে, তবে তাঁর উচিত হাতের নিকট যা পাওয়া যাবে তাই নিয়ে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া। আর সেই কাজটিই করেছেন ইমাম হুসাইন। এর মাধ্যমে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, জুলুমের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে কখনও দুনিয়ার সরঞ্জাম ও সহায়-সম্বলের অপেক্ষা করে হয় না।

এরপর আমরা দেখব, মক্কা থেকে ইমামের কুফার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলোর দিকে। এই যাত্রা পথে তিনি তাঁর কাফেলার সদস্যদেরকে ইয়াহিয়া(আ.) শাহাদাতের ঘটনা বর্ণনা করে উৎসাহিত করতে থাকলেন। এ থেকে আমরা বুঝতে পারি, একজন নেতার দায়িত্ব হল, অনুসারীদেরকে তাঁর আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় আত্মিক রসদ যোগান দেওয়া। এই আত্মিক রসদ হবে ঈমানের উপাদানে পরিপূর্ণ, সাহসিকতার অফুরন্ত উৎস আর উদ্দীপনার ফোয়ারা। ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন ইমাম হুসাইন।

এরপর আমরা দেখব, কুফার সন্নিকটে হুর ইবনে ইয়াজিদের বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ ইমামের আচরণ। সেখানে উমাইয়্যা বাহিনির সৈন্যরা ছিল ক্লান্ত শ্রান্ত ও পিপাসার্ত। ইমাম তাদেরকে পানি দিলেন। তাদের সাথে সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার করলেন। তাদের সাথে সালাত আদায় করলেন। অবরুদ্ধতার এই সময়ে ইমামের একজন সঙ্গী শত্রæবাহিনীর উপর আক্রমণ করে তাদেরকে পরাস্থ করার পরামর্শ দিলে ইমাম তা নাকচ করে দেন এই বলে যে, “আমরা কখনই যুদ্ধ শুরু করবো না।” অর্থাৎ, অবরুদ্ধ ইমাম শত্রæদের সাথে কোনরূপ শত্রæতামূলক আচরণ প্রদর্শন করেননি। এর দ্বারা ইসলামি আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট জানা যায়। তাহলো ইসলামি আন্দোলনের নেতা হবেন সার্বিক দিক থেকে রহমদিল। তাঁর অনুসারীদের জন্য তিনি যেমন হবেন সহনশীল, তেমনি বিরোধীদের প্রতিও হবেন বিনম্র। ইসলামি আন্দোলনের নেতার সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা থাকবে, আন্দোলনের বিরোধীদেরকে বিপ্লবের সপক্ষে নিয়ে আসার। ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন ইমাম হুসাইন।

যুদ্ধের দিনের পূর্বের রাতের ঘটনা। ইমাম যখন উমাইয়্যা বাহিনীর যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন, তখন তিনি তাদের কাছে একরাতের সময় চেয়ে নিলেন। এই রাতে তিনি আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্ধারিত করেন। এখানেই ইসলামি আন্দোলনের মৌলিক শিক্ষা নিহিত। এর দ্বারা তিনি এটাই প্রমাণ করেছেন, একজন ইসলামি আন্দোলনের নেতার সাথে আল্লাহর নিবিড় সম্পর্কের ব্যাপারটি। কারণ ইসলামি আন্দোলন যদি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত না হয়, তাহলে সেটা দুনিয়ার জন্য লড়াইয়ে পরিণত হতে বাধ্য। এই আন্দোলনের নেতা কর্মীদেরকে হতে হবে সর্বাধিক তাকওয়াবান এবং ইবাদতের প্রতি একনিষ্ঠ। আল্লাহর ইবাদতই ইসলামি আন্দোলনের সারকথা। এখানেই নিহিত আছে এই সংগ্রামের গোপন রহস্য। সুকঠিন বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা এবং তাঁর থেকে নিজেদের অপরাধের ক্ষমা প্রার্থনাই ইসলামি আন্দোলনের মূল বিজয়। সুরা-নসর আমাদেরকে এই শিক্ষাই দিয়ে থাকে। এই সুন্নত আমরা রাসুল(সা.)-এর সময়কার প্রতিটি যুদ্ধে দেখেছি। এভাবেই ইমাম আলী এবং ইমাম হাসান ও তাঁদের সুকঠিন মুহূর্তগুলো আল্লাহর সান্নিধ্যে অশ্রæপাতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছিলেন।

আশুরার দিনে সকাল থেকে চলে আসা অসম এক যুদ্ধে যখন একের পর এক ইমামের সৈন্যরা শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করছিলেন, তখন ইমাম সুদৃঢ় ভঙ্গিতে ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাথীদের শাহাদাত তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যেও ময়দান থেকে চলে যাওয়ার জন্যে প্ররোচনা দেয়নি, যা আমরা অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে দেখতে পাই। সামান্য বাধার মুখে পতিত হয়ে তারা কর্মীদেরকে বিপদের সাগরে ডুবিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আর ইমাম ছিলেন অবিচল। আর তাঁর অনুসারীদের আচরণ ছিল একটা আদর্শিক আন্দোলনের পরিপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে কেউ একবারের জন্য পিছিয়ে যাওয়ার কথা কল্পনাও করেনি। শত্রæদের নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডে তারা প্রতি ধাপেই যেন সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। কাফেলার নারী-শিশুরা যেন সেদিন অনন্য এক উপমা সৃষ্টির নেশায় মত্ত হয়েছিল। সেই যুদ্ধের দৃশ্যগুলো আল কোরআনের “বুনিয়ানুম মারসুস”-এর প্রতিচ্ছবি আমাদের সামনে তুলে ধরেছিল। সেদিন শহিদ হওয়ার যে অমত্ত নেশা তাদেরকে পেয়ে বসেছিল, তা আজও পৃথিবীর কোন আন্দোলনের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। বদর, অহুদ, খন্দক, খায়বার, জঙ্গে জামাল, নাহারওয়ান, সিফফিন সকল দুর্জয় যুদ্ধের ইতিহাসকে সেদিন সেই বাহাত্তর জন সাহসী সস্তান হারিয়ে দিয়েছিল। এজন্যই ইমাম হুসাইন গর্ব করে বলেছিলেন- “আমার মতো এরকম সাহাবি আর কেউ পাননি।” সেদিনের সেই সাহসী সন্তানেরা পৃথিবীর বুকে যে উদাহরণের সৃষ্টি করেছিলেন, তাই আজ পর্যন্ত মুক্তিকামী মানুষের প্রেরনার অফুরন্ত উৎস হয়ে আছে।

এরপরে আসব আশুরা পরবর্তী আহলে বাইতের ভ‚মিকা নিয়ে। পৃথিবীর যে কোন যুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর, পরাজিত দলের অসহায়ের মতো আত্মসমর্পণ ব্যতীত অন্য কোন উদাহরণ আমাদের সামনে নেই। কিন্তু কারবালা ছিল তাঁর বিপরীত চিত্র। যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে আহলে বাইত যে হয়ে উঠেছিল আরও দুর্দান্ত। উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের দরবার থেকে শুরু করে সিরিয়া যাত্রা পথে এবং ইয়াজিদের দরবারে বিবি যয়নাবের ভ‚মিকা বিশ্ববাসীকে সত্যিই হতবাক করে দিয়েছিল। শত্রæরা ভেবেছিল, হুসাইনের হত্যার সাথে সাথে তাদের মসনদে আর কোন শঙ্কা থাকল না। তারা এখন নিশ্চিন্তে জনগণের সম্পদ ভক্ষন করে পার পেয়ে যাবে। কিন্তু, তর্ক যুদ্ধে ইমাম জয়নুল আবেদিন ও হযরত যয়নাবের সাথে শোচনীয় পরাজয়ের পর উমাইয়্যাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, তাদের পরাজয়ের যুদ্ধ সবে মাত্র শুরু হল।

মূলত: কারবালার যুদ্ধ শুরু-ই হয়েছিল, আশুরার পর থেকে। আহলে বাইতের দ্বারা এই হত্যাকান্ডের প্রচারই মানবজাতিকে এর স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত করেছিল। তাঁদের কথা, কর্ম, বক্তৃতা এবং মানুষের প্রতি নসিহত কারবালাকে আরও বেগবান করেছিল। কারবালা ছড়িয়ে পড়েছিল দিক বিদিক। এই ইতিহাস মানুষের আবেগকে আন্দোলিত করেছিল। আর এই আন্দোলনের ফসলই হল, আজকে আমাদের হুসাইনের শোকে একত্রিত হওয়া। এটাই ছিল কারবালার যুদ্ধ, যা আজও চলছে, আগামিতেও চলবে। যতদিন জাহেলিয়াতের বিচরণ সমাপ্ত হয়ে আলোকের সূর্য উদিত না হবে, ততদিন হুসাইনীরা বসে থাকবে না। বসে থাকার কোন সুযোগ তাদের নেই। এটাই কারবালার আবেদন। এটাই কারবালার হক- যা আমাদেরকে আদায় করতে হবে।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, হুসাইনের ত্যাগ আমাদের জন্য যে প্রেরণা সেই প্রেরণার হক তখনই আদায় হবে যখন হুসাইনের সস্তান ইমাম মুহাম্মদ আল-মাহ্দী(আ.)-এর আগমনের ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করা যাবে। হুসাইনী আন্দোলনের কর্মীদের এখন একটাই কাজ। তাহলো আরও একটি কারবালার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করা এবং সেই লক্ষ্য পানে অবিরাম এগিয়ে চলা।

দুই: কারবালা- ভালোবাসার অনন্য এক উদাহরণ

আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে, তার প্রতিটি আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের মধ্যে আত্মিক সম্পর্কের মাধ্যমেই কলেবরে বেড়ে উঠেছে। যেখানে নেতা কর্মীদের কাছে স্বচ্ছ হয়নি বা কর্মীরা নেতার প্রতি আস্থাশীল থাকতে পারেনি, সেখানে সকল আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।

নেতা এবং কর্মীদের মধ্যকার সম্পর্কের উপযুক্ত উদাহরণ আমরা দেখতে পাই কারবালার ময়দানে। ইমামের প্রতি ভালোবাসা ও আস্থার যে চিত্র সেদিন ঐ তপ্ত দুপুরে চিত্রিত হয়েছিল, তা পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য ও বিরল।

এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ শুধু যে কারবালার ময়দানেই ঘটেছিল তা নয়। ইয়ায়জিদের দরবার থেকে বাইয়াত গ্রহণের ফরমান আসার পর থেকেই ইমামের সাথীরা কারবালার হত্যাযজ্ঞ পর্যন্ত তাঁকে যেভাবে ভালবেসেছেন, তার নজির আর কোন ইতিহাসে দেখতে পাওয়া যায় না। মদিনা থেকে মক্কা এবং মক্কা থেকে কুফা পর্যন্ত ইমামতের বিশ্বাসীদের ভালোবাসার প্রকাশ আমাদেরকে সত্যিই হতবাক করে দেয়। আমরা এই বিরল ইতিহাসগুলো থেকে সামান্য কিছু উদাহরণ আপনাদের সামনে পেশ করবো, ইনশাল্লাহ।

এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে যে নামগুলো ঘুরে ফিরে আমাদের সামনে ভেসে আসে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম কিছু নাম ছিল মুসলিম ইবনে আকিল, কায়েস ইবনে মুসাহহার, সুলাইমান ইবনে খুর্দ খাজাই, হাবিব বিন মাযাহির, হুর ইবনে ইয়াজিদ, আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর।

আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর

তিনি ছিলেন বিবি যয়নাবের স্বামী। তার পিতা ছিলেন জা’ফার বিন আবু তালিব, ইমাম আলীরর ভাই এবং মু’তার প্রান্তরের শহীদ। যার শাহাদাতের ঘটনায় আল্লার রাসুল(সা.) এতটা মর্মাহত হয়েছিলেন যে, আরবের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী মাথায় বালি ছিটিয়ে শোক পালন করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ছিলেন মদিনার সম্পদশালীদের মধ্যে অন্যতম। কারবালার যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন অসুস্থ। তাই ইমামের সফরে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু তার ত্যাগ ছিল অপরিসীম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইব্রাহীম(আ.) থেকে যে কুরবানির কথা বলেছিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় সেই কুরবানি দিয়েছেন। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, বিবি যয়নাব যখন প্রাণপ্রিয় ভাই ইমাম হুসাইনের সাথে সফরে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করতে যান তখন আব্দুল্লাহ বলেন, “হে ফাতিমার কন্যা! আপনাকে আমি কখনও কিছুতেই বারন করিনি। আজ যদি আমি সুস্থ্য থাকতাম, তাহলে অবশ্যই হুসাইনের সাথে যেতাম। হায়! আমার সেই ভাগ্য হল না। আপনি তাঁর সঙ্গি হন। সাথে করে আমাদের দুই সন্তানকে নিয়ে যান। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে এদেও একজনকে আমার পক্ষ থেকে এবং অপরজনকে আপনার পক্ষ থেকে হুসাইনের জন্য কুরবান করে দেবেন।”

হাবিব বিন মাযাহির

শেষ রাতে ইমামের কাফেলা যখন ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্যে আবেগ-আপ্লুত রাত অতিবাহিত করছিল, সেই সময়ে ইমামের জন্য নিবেদিত প্রাণ কিছু সৈনিক আগামি দিনের কার্যক্রম নিয়ে পারস্পরিক আলোচনা করছিলেন। ইতিহাসে এসেছে সে রাতে বিবি যয়নাব প্রতিটি তাবু গিয়ে শুনছিলেন কাদের সাথে কি কথা চলছে। ঘুরতে ঘুরতে তিনি চলে আসলেন হাবিব বিন মাযাহিরের তাবুতে। তিনি তার গোত্রের লোকদেরকে নিয়ে আলোচনা করছেন, আগামি দিন ইমামরে পক্ষে তাদের ভ‚মিকা কি হবে। সেখানে হাবিব বিন মাযাহির বক্তব্য রাখছিলেন, “হে আমার বন্ধুরা! জেনে রেখো, আগামি কাল সকালেই আমরা এমন এক অসম যুদ্ধের মোকাবেলা করতে যাচ্ছি যার পরিণতি শাহাদাত ব্যতীত আর কিছুই নয়। এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়। মনে রেখো যদি ইমাম এবং তার পরিবার আমাদের পূর্বে শাহাদাতের পেয়ালা পান করে নেয়, তাহলে তোমাদের বেঁচে থাকার আর কোন অর্থ থাকতে পারেনা। আমাদের একজনের দেহেও প্রাণ থাকার পূর্বে, আমরা বনু হাশিমের একজনকেও ময়দানে নামতে দেব না। এসো! ওয়াদা করি। জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও আমরা ইমাম এবং আহলে বাইতের জীবন রক্ষা করে যাব। আর এই দায়িত্ব পালন করতে করতেই জান্নাতের দিকে এগিয়ে যাব।” ইতিহাসে এসেছে আশুরার পূর্বের রাতে হাবিব বিন মাযাহিরকে দারুন উল্লাসিত দেখাচ্ছিল। কারণ জানতে চাইলে তিনি জবাব দিতেন, “যার অভিনন্দনের জন্য জান্নাতে হুরেরা অপেক্ষা করছে, তার আমার দুঃখ কিসের!”

হুর ইবনে ইয়াযিদ আর-রিয়াহি

তিনি উমাইয়্যা বাহিনীর একজন সেনা অধিনায়ক। কুফার সন্নিকটে ইমামের কাফেলাকে অবরুদ্ধ করার নায়ক ছিল হুর। সে ছিল সাহসী, সৎ এবং আবেগী। যুদ্ধের আগের দিন তিনি উমার বিন স্বাদ কে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাল কি সত্যিই রাসুলের সন্তানের সাথে যুদ্ধ হবে? কোন ভাবেই কি এই যুদ্ধকে এড়িয়ে যাওয়া যায়না?” উমার বিন স্বাদ তাঁকে তিরস্কার করেন। ইমামের কাফেলাকে আটকে দিয়ে হুর ইবনে ইয়াজিদ শান্তিতে থাকতে পারেনি। উমার বিন সাদের নেতৃত্বে থাকা হুর বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। যে ব্যক্তি তাঁর সকল সৈন্যকে এবং ঘোরাগুলোকে পানি পান করিয়েছিল, তাঁর বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করতে হবে! তার উপর তিনি হলেন রাসুল(সা.)-এর আদরের নাতি, কলিজার টুকরা। কোন ভাবেই তিনি এটা মেনে নিতে পারছিলেন না। উমার বিন সাদের সাথে বিতর্ক শেষে তিনি স্বীয় তাবুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে ভাইয়ের সাথে সাক্ষাত হল। তার ভাই হুরকে দেখে বলল, “হে ভাই! আপনাকে আমি আরবের অন্যতম যোদ্ধা বলে জানতাম। কিন্তু আপনার বর্তমান অবস্থা আমাকে এ ব্যাপারে সন্দেহে ফেলে দিচ্ছে। আপনি এতো টালমাটাল অবস্থায় কেন?” খেতে যাওয়ার কথা বলতেই হুর বলে উঠলেন, “তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না, হুসাইনের তাবু থেকে তৃষ্ণার্ত শিশুদের আর্তচিৎকার! ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না কি তোমার কানে আসে না! এ অবস্থায় আমি কিভাবে খাবার গ্রহন করতে পারি? আল্লাহর কসম! আমি নিজেকে জান্নাত এবং জাহান্নামের মাঝখানে দেখতে পাচ্ছি। হায়, যদি আমি হুসাইনকে বাধা না দিতাম। হায়, যদি আমি হুসাইনের সাথে দূর্ব্যবহার না করতাম। আমি কাল সকালেই হুসাইনের পক্ষে যুদ্ধ করবো।” ভাই বলল, “এটাই কি ভালো নয় যে, আমরা রাতের আঁধারে হুসাইনের সাথে যোগ দিব?” তিনি বললেন, “না। আমি কাপুরুষ নই। সকলের সামনে দিয়েই আমি স্বর্গের পানে যাব।”

পরদিন সকালে যখন হুর, তার ছেলে এবং ভৃত্য, ইমামের কাফেলার দিকে রওনা হলেন তখন উমার বিন সাদ তাঁকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে হুর দ্রæতবেগে ঘোড়া দৌড়িয়ে যেতে যেতে বললেন কার এতো সাহস যে আমাকে বাধা দিবে? কিছুদুর এগিয়ে যাওয়ার পর হুর পিছু ফিরে তাকালে ছেলে জিজ্ঞাসা করল, “কি হল বাবা! আপনি পিছনে ফিরলেন যে!” হুর বললেন, “ইমামের সাথে আমি যে বেয়াদবি করেছি, তাতে ইমামের সামনে মুখ দেখানোর উপায় নেই। তোমরা আমার হাত এবং চোখ বেধে দাও। আমি ইমামের নিকট ক্ষমা চাইব।” তারা তিনজন এই অবস্থায় ইমামের সামনে হাজির হলেন, ক্ষমা চাইলেন এবং ইমাম তাদেরকে ক্ষমা করে দিলেন।

ইমামের ক্রীতদাস জুন

কারবালার শহীদদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন জুন। তিনি ছিলেন আবুযার আল-গিফারির ক্রীতদাস। আবুযার তাঁকে মুক্ত করে দিলে তিনি আহলে বাইতের খেদমতে থেকে যান। এই মহান ব্যক্তি কারবালার প্রান্তরে ইমাম(আ.)-এর কাফেলার সাথে ছিলেন এবং ইমামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। কারবালায় যুদ্ধ চলাকালীন এক পর্যায়ে এসে তিনি ইমামের কাছে যুদ্ধের অনুমতি চাইলে ইমাম তাঁকে অনুমতি দেননি। তখন জুন বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি মাওলা। কেন আপনি আমাকে যুদ্ধের অনুমতি দিচ্ছেন না। আমি কালো। আমার শরীর থেকে গন্ধ আসে। লোকেরা এমনটিই বলে। এই শাহদাত আমার ভাগ্যে কি আছে? আমি কোথায় আর এই মহান ব্যক্তিরা কোথায়। তাই আপনি আমাকে অনুমতি দিচ্ছেন না।” ইমাম দেখলেন এখন আর তাঁকে অনুমতি না দিয়ে পারা না।

তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। মুখে বিরত্বের কবিতা আবৃতি করতে করতে তিনি ময়দানের দিকে এগিয়ে গেলেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে জুন ভীষণ আহত হয়ে মাতিতে লুটিয়ে পড়লেন। ইমাম তার নিকট গেলেন এবং তাঁকে উরুর উপর রেখে তার অবস্থা জানতে চাইলেন। ক্ষতের কারণে জুনের চোখে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিল। ইমাম তার চোখ থেকে রক্ত সরিয়ে নিলে ইমামের পবিত্র চেহারা মোবারক দেখে জুন হাঁসতে থাকেন আর এই অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। ইমাম বেদনায় মুহ্য হয়ে তার জন্য দোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! তাঁকে তুমি আখেরাতে সাদা চামড়া দান কর। তাঁকে আরবদের সাথে শামিল করে উত্থিত কর।”

আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইর

ইমামের সাথে উমাইয়্যা খেলাফতের দন্ধের সময় তিনি কুফার বাইরে ছিলেন। কুফায় এসে তিনি শুনলেন ইমাম হুসাইনের সাথে কি যেন গন্ডগোল হয়েছে। সব শুনে তিনি ইমামের পক্ষে যুদ্ধে যাওয়ার সংকল্প করলেন। বাড়িতে ফিরে তিনি স্ত্রীর নিকট যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু স্ত্রী তাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছিল না। এমন সময় মা এসে আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইরকে স্ত্রীর কথায় কান না দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বললেন। স্ত্রী ও মাকে নিয়ে তিনি কারবালার পানে ছুটলেন।

যুদ্ধের ময়দানের ঘটনা। ইমাম থেকে যুদ্ধের অনুমতি নিয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উমাইর যুদ্ধের ময়দানে গেলেন। শত্রæর পানে ছুটে গেলেন ইবনে উমাইর এবং বীরবিক্রমে লড়তে থাকেন। কিছুক্ষন যুদ্ধের পর শত্রæর তরবারির আঘাতে তাঁর হাতের পাঁচটি আক্সগুল কাটা পড়ে যায়। আরেক হাতে তরবারি নিয়ে তিনি যুদ্ধে বিরতি দিয়ে তাবুতে মায়ের নিকট ফিরে আসলেন। বললেন, “মা! তোমার হুসাইনের জন্য আমি আমার হাতের পাঁচটি আঙুল বিসর্জন দিয়ে এসেছি। বল, আমার ত্যাগ কবুল হয়েছে কিনা।” স্ত্রী স্বামীর এমন অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। কিন্তু মা তাঁর এই ত্যাগে সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি রাগত স্বরে বলে উঠলেন, “আমি তোমাকে শুধু হাতের পাঁচটি আক্সগুল বিসর্জন দেয়ার জন্য যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রেরণ করিনি। ফিরে যাও যুদ্ধের দিকে। মনে রেখো! হুসাইনের জন্য জীবন বিসর্জন দেয়া ব্যতীত আর কোন ত্যাগ আজকে কবুল করা হবে না।”

মায়ের কথায় আব্দুল্লাহ্র দেহে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। অসীম সাহসিকতার সাথে আব্দুল্লাহ আবারও ময়দানে ফিরে আসলেন। একের পর এক শত্রæ সেনার বুহ্য ভেদ করে আব্দুল্লাহ এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য শাহাদাতের দিকে। তাঁর প্রবল আক্রমনে টিকতে না পেরে উমার বিন স্বাদ সৈন্যদেরকে সম্মিলিত আক্রমণের নির্দেশ দেয়। এমন পৈশাচিক ঘটনা ইতিহাসের পাতায় পুন: পুন: দেখা যায়। যখন সিংহের আক্রমনে নেকড়ে ময়দানে টিকতে পারে না, তখন চারপাশ থেকে তারা হামলা করে। এমন উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে অসংখ্য। সত্যের পতাকাতলে সেদিন যেই সিংহরা মিলিত হয়েছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল, তারা শের-এ-খোদার সন্তানের সঙ্গী হয়েছেন। জীবনের এই অমিয় সুধা যারাই পান করেছে, তাঁরা চিরদিনের জন্য তৃপ্ত হয়েছে। সেই অমিয় তৃপ্তি সেদিন ঐ শতাধিক জনকে মৃত্যুযন্ত্রণা যে বুঝতেই দেয়নি, সেই অনুভ‚তি আর কেউ বুঝতে পারবে কি? কোন নেশা সেদিন তাঁদের অন্তরে ছিল তা শুধু তাঁদের ইমাম জানেন আর জানেন তাঁরা। যাই হোক, শত্রæর আক্রমনে টিকতে না পেরে আব্দুল্লাহ নিহত হলেন।

শত্রæরা তাঁর দেহকে অবমানিত করলো। তাঁর মস্তক বিচ্ছিন্ন করে তাঁর মায়ের দিকে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “এই নে, তোর ছেলে তোকে ফিরিয়ে দিলাম।” কি হয়েছিল সেদিন! কি পাবার আশায় সেদিন হুসাইনের কাফেলার নারী পুরুষেরা মত্ত হয়েছিল? আসলে স্বর্গীয় নেশা যাকে পেয়ে বসে, তাঁর কী আর কোন কিছুর প্রয়োজন হয়? এমনই নেশায় মত্ত হয়েছিলেন আব্দুল্লাহ এবং তাঁর মা। কর্তিত মস্তকের নিকট গর্বিত মা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন শহিদ সন্তানের মাথার কাছে। মাটি থেকে সন্তানের মাথা তুলে নিয়ে ধুলো বালি ঝেড়ে ঠোঁটে চুমু খেলেন। অশ্রæ যেন তখন অহংকারের রূপ ধারন করছিল। কারন, তাঁর মতো ত্যাগ আর কে পারবে? জীবনের বৃদ্ধ বয়সের সম্বল সন্তান বিসর্জন করেছেন হুসাইনের জন্য। বিদ্রোহের আগুন যেন নতুন রূপে জেগে উঠলো। সন্তানের মস্তক শত্রæদের দিকে ছুঁড়ে বললেন,  “আমরা যা একবার আল্লাহর পথে দান করি, তা কখনও ফিরিয়ে নেই না।”

উমর ইবনে কোরযার

তার শাহাদাত যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে হয়নি। তার শাহাদাতের সময়টি ছিল ইমামের শেষ সালাতে তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে, নামাযের ওয়াক্ত হয়ে গেলে, উমর ইবনে কোরযা ইমামের নিকট এসে বললেন, “হে ইমাম! সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। মনে বড় স্বাদ, জীবনের শেষ নামাযটা যদি আপনার পিছনে পড়ার সৌভাগ্য হতো!” ইমাম বললেন, “তোমাকে ধন্যবাদ! আল্লাহ্ তোমাকে এর জন্য উত্তম প্রতিদান দিক। সালাতের ব্যবস্থা কর।”

সালাতের ব্যবস্থা হোল। কিন্তু উমর ইবনে কোরযা সালাতে অংশ গ্রহণ করতে পারলেন না। ইমাম ও তাঁর পিছনে দাঁড়ানো লোকদের নিরাপত্তার জন্য তিনি শত্রæদের মুখোমুখি প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হটাৎ শত্রæরা হামলা করলো। কিন্তু যাঁদের জীবনে ইমাম ব্যতীত আর কিছু থাকে না, যারা সকল কিছুর বিনিময় করতে রাজি শুধু ইমামের নিরাপত্তার জন্য তাঁদের বেষ্টনী অতিক্রম করা কি এতোই সহজ! এখানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। শত্রæদের সুযোগসন্ধানী হামলায় অনেকেই আহত হলেন, আর উমরের বক্ষ বর্শার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। আফসোস! যে নামাযের জন্য উমর তাগিদ দিল তাঁর শেষ নামায পড়া আর হোল না। কিন্তু উমরের কি আফসোস ছিল?

অবশ্যই না। কারণ সালাত হোল মিলন। যে মিলনে স্বাদ নেই, প্রেম নেই, তাকে কি আর মিলন বলা যায়? উমরের মিলন ছিল ইমামের সাথে। তাই আমরা দেখলাম, ইমাম যখন তাঁর আহত দেহ কোলে নিলেন, তখন উমর শান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। এর চাইতে উত্তম সালাত আর কি হতে পারে? ইমাম তাঁর জন্য দোয়া করে সৈন্যদের নিকট চলে গেলেন।

প্রকৃতপক্ষে আপনাদের সামনে আমি শোঁকের যে আবহ তৈরি করেছি, তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। আজকে আমি এমন কিছু অতিতকে তুলে ধরেছি, যেগুলো আমাদেরকে প্রেরনা যোগাবে। কারবালার সেই উত্তপ্ত ময়দানে ভালোবাসার যে তবাররুক বিতরন হয়েছিল তা আজ ঘুরে ফিরে আমাদের নিকট এসেছে। আমরা তা হাতে নিয়েছি। এখন খাবার পালা। যদি ভালোবাসার এই তবাররুক আমরা গ্রহণ না করি অথবা এর হক আদায় না করতে পারি তাহলে এই শোঁকের পরিবেশ ব্যর্থ হবে। তাঁরা তাঁদের কাজ করেছেন। জীবনের সকল কিছুর বিসর্জনে তাঁরা তাঁদের ইমামের প্রতি ভালোবাসা প্রমাণ করেছেন। এখন আমাদের পালা। আমাদেরকে আমাদের ইমামের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, কারবালা ভালোবাসার সেই ময়দান, যেখানে নিঃস্বার্থতা আদান প্রদান হয়েছে। আমাদেরকেও এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে।

 

তিন: কারবালা- অমর প্রেমের উপন্যাস

কারবালা এমন এক প্রেমের উপন্যাস যার চয়নেই বুঝা যায়, কিভাবে এই ময়দানে আশেক ও মাসুক তাঁদের প্রেম নিবেদন করেছিল। এই ঘটনার প্রতিটি পরতে জড়িয়ে আছে ভালোবাসার অমোঘ কাহিনী। এমন কোন শহীদ কারবালায় ছিলেন না যে প্রেম নিবেদন না করে যুদ্ধে গমন করেছিল। শুধু শহীদেরাই যে প্রেম নিবেদন করেছিল তা নয়। শহীদদের পরিবারের নারী শিশুরাও এর সাথে সমান তালে শামিল ছিলেন। কারবালার ঘটনা প্রবাহ দেখে মনে হয়, সবাই যেন প্রতিযোগিতায় নেমে ছিল কে ইমামকে কত বেশি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে পারে।

যতবার কারবালা নিয়ে আমি পড়েছি, অবাক হয়েছি। এখানে ভালোবাসা বেদনার ন্যায় এমন ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল যে, মিলনের পর পর বিচ্ছেদের এই ব্যতিক্রমি প্রেম পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও নেই। কারবালা প্রেমের এমন ক্ষেত্র ছিল যেখানে কোন লোক লজ্জার ভয় কাজ করেনি, কোন শঙ্কা বোধ ছিল না ইমামের কোন প্রেমিকদের মনে। তাঁদের এই নিবেদন ছিল প্রকাশ্য এবং সুউচ্চ কন্ঠে। আর তা কারবালার আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়েছিল।

কারবালায় শাহাদাত ও ইমাম প্রেমিক মানুষদের মধ্য থেকে আমরা এমন দুটি ভালোবাসার কাহিনী আপনাদের সামনে তুলে ধরব।

আবিস বিন আবি শাবিব

ঐতিহাসিকরা বলেছেন যে, আবিস বিন আবি শাবিব তাঁর আত্মীয় শওযিব-এর নিকট এসে বলল, “তোমার অন্তরের ইচ্ছা কি?” শওযিব বলল, “আমার ইচ্ছা হল রাসুল(সা.)-এর নাতির হেফাজতের সময় আমি যদি তোমার পাশে থেকে শহীদ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করতে পারতাম।” আবিস বলল, “আমিও তোমার মতোই ইচ্ছা পোষণ করি। চল, আমি তোমাকে ইমামের নিকট নিয়ে যাই এবং পরিচয় করিয়ে দেই, যাতে তিনি তোমাকে তাঁর সাহাবীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং তুমি তাঁর পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করতে পার। এখন যদি তুমি ব্যতীত আমার নিকটে আপন কেউ থাকতো, তাহলে আমি তাঁকে আমার পূর্বে যুদ্ধে পাঠাতাম, যেন আমি তাঁর শাহাদাতে শোক পালন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। মনে রেখো! এটাই আমাদের শেষ কথা। আজকের দিনের পর আমাদের আর কোন কাজ থাকবে না।” এরপর শওযিব এগিয়ে গিয়ে ইমাম-কে সালাম দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেলেন এবং বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করলেন।

এরপর আবিস বিন আবি শাবিব ইমাম-কে বললেন, “হে আবা আব্দুল্লাহ্! এই দুনিয়ায় আমার নিকটাঅত্মীয় ও আপনজন এমন কেউ নেই যে, সে আপনার চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয়। যদি আপনাকে সুরক্ষা করার জন্য এই জীবন ব্যতীত আমার নিকট আর অন্য কোন ক্ষমতা থাকতো তাহলে অবশ্যই আমি তা ব্যবহার করতাম। আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক হে আবা আব্দুল্লাহ! আল্লাহর কসম করে বলছি যে, আমি আপনার পিতা ও আপনার অনুসারী।” এই কথা বলেই তিনি তরবারি হাতে নিলেন এবং মাথার উপর তরবারি উঁচিয়ে শত্রæর পানে ছুটে গেলেন।

এমনই হবে প্রেমের নিবেদন। যেখানে আশেক তাঁর মাশুককে চিরদিনের জন্য আপন করে নিবে সেখানে আবেগের এমন বহিঃপ্রকাশ খুবই স্বাভাবিক। প্রেমের আবেদনই এমন। এ ধরনের আবেগের অতিসহ্য যদি না থাকে তবে প্রেম মেকি গন্য হয়। রাসুল(সা.) থেকে শুরু করে ইমাম হুসাইন পর্যন্ত খাঁটি প্রেমের রসায়নের পাশাপাশি অনেক মেকি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশও আমরা বহুবার দেখেছি। কারবালার শহীদদের এই উক্তিগুলো দেখে মনে পড়ে যায় বদরের সেই নিবেদিতপ্রান সাহাবীদের কথা। সেদিন তাঁদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ রাসুল(সা.)-কে বলেছিলেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ্! আমরা মুসার অনুসারীদের মতো আপনাকে বলব না যে আপনি এবং আপনার খোদা গিয়ে যুদ্ধ করুন। আমরা আপনার সাথে থাকবো এবং মরনপণ লড়াই চালিয়ে যাবো।” এর ব্যতিক্রম কারবালাতেও হয়নি।

আবিস বিন আবি শাবিবের বীরত্বের কথা উমাইয়্যা বাহিনির জানা ছিল এবং তাঁদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো, “হে লোকেরা! জেনে রেখো সে সিংহ দলের এক সিংহ। সে হল আবু শাবিবের পুত্র।” আবিস শত্রæদের দিকে হুংকার দিয়ে বললেন, “কে আছো আমার সাথে লড়াই করার সাহস রাখে?” উমার বিন স্বাদ একথা শুনে সবাইকে তাঁর দিকে পাথর ছুঁড়ে মারার নির্দেশ দিলে তাঁর দিকে পাথরের বৃষ্টি ঝরতে লাগলো। এটা দেখে তিনি ঢাল এবং যুদ্ধের টুপি পড়ে নিলেন। এরপর তিনি প্রবল বেগে আক্রমন শুরু করে দিলেন। ইতিহাসে এসেছে তিনি একাই দুইশত সৈন্যের মিলিত আক্রমণকে প্রতিহত করেছিলেন। তাঁর আক্রমনের সাথে না পেরে উমাইয়্যা বাহিনী সম্মিলিত হামলা করল। এতে তিনি ভীষণ আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যান এবং শাহাদাত বরণ করেন। শত্রæরা তাঁর দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। লানাতুল্লাহি আলাল কাওমিয যালেমিন।

বুরাইর হামদানি

মহররমের দশম দিবসে তৃষ্ণার যন্ত্রনা ইমাম হুসাইনের কাফেলার নারী ও শিশুদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। বিশেষ করে শিশুরা এই যন্ত্রনা কোনভাবেই সহ্য করতে পারছিল না। তাঁদের চিৎকার কারবালার আকাশ বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। শত্রæদের অন্তর তবু বিগলিত হয়নি। এমনটা আমরা তাঁদের কাছে আশাও করিনা। কারণ উমাইয়্যারা কখনও মানবিকতার কোন মূল্য দেয়নি। মানুষের প্রতি দয়া করার নীতিকে তারা জাহেলিয়াতের যুগ থেকেই দুপায়ে দলিত করে এসেছিল। এই নীতির পরিবর্তন তাদের অন্তরকে খান খান করে দিয়েছিল বলেই কারবালায় তারা রাসুল(সা.) ও হযরত আলী’র বংশের প্রদীপ শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইনের প্রতি এতটা নিষ্ঠুর হয়েছিল। আর নিষ্ঠুরতা উমাইয়্যাদের ঐতিহ্য। এতে তাঁরা উল্লাসিত হয়। এর প্রতিচ্ছবি পূর্ণ রূপেই কারবালায় প্রতিফলিত হয়েছিল।

যাই হোক, তৃষ্ণা যদি এক বেলার হয় তবে তা সহ্য করে নেয়া যায়। কিন্তু তিনদিনের তৃষ্ণা কিভাবে সহ্য হয়। কিভাবে সম্ভব মরুর উতপ্ত খড়ায় পানি ব্যতীত থাকা। শিশুদের চিৎকারও ধিরে ধিরে ক্ষীন হয়ে আসছিল। মরুর মরীচিকায় কোন আশার আলো যেন পাওয়া যাচ্ছিল না। নিরাশার দোলাচলে সেই অবুজ শিশুরা কি বুঝতে পারছিল কি হচ্ছে এখানে। কি ঘটছে তাঁদের জীবনে। পিতা, ভাইহারা এসকল শিশুরা কি ভাবছিল। কেন ফুফু যয়নব আমাদের পানি দিচ্ছেন না। কেন চাচা আব্বাস পানি আনবে বলেও আসলেন না?

শিশুদের যন্ত্রনা বুরাইর হামদানিকে কোনভাবেই স্বস্থি দিচ্ছিল না। শিশুদের আল-আতাশ! আল-আতাশ চিৎকার তাকে অস্থির করে তোলে। আশুরার পূর্ব রাতের ঘটনা এটি। তিনি একটি মশক হাতে নিয়ে ফোরাতের তীরে গেলেন। ফোরাতের তীর থেকে পানি সংগ্রহ করলেন। নিজে পানি পান করলেন না। ভাবলেন কিভাবে তৃষ্ণার্ত শিশুদের পানি  পান না করিয়ে তিনি পানি পান করবেন।

এর নাম ভালোবাসা। এর নাম প্রেম। মানুষ যখন প্রেমে পড়ে তখন শুধু মাশুকের চিন্তাই তাঁর থাকে না। মাশুকের চতুরপাশে থাকা সকল কিছুই তাঁর ভালোবাসার কেন্দ্র হয়ে যায়। নিঃস্বার্থ ভালবাসায় সে তখন নিজেকে ভাসিয়ে নেয়ার অনন্তর প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। কোন কিছু তাঁর কাছে বাধা মনে হয় না।

ইতিহাসে এমন অনেক কাহিনী আমরা দেখতে পাই। সিফফিন, জামাল, বদর, উহুদ সকল যুদ্ধেই ভালোবাসার অকৃত্রিম পরাকাষ্ঠা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। বুরাইর তাঁর ভালোবাসা প্রকাশের মোক্ষম সুযোগ পেয়ে পানি আনার অসম্ভব কাজটি করার সংকল্প করে বসলেন। সে মতেই এগিয়ে গেলেন। পানি নিয়ে যখন তাবুর দিকে ফিরে আসবেন, এমন সময় পথের মাঝে দুজন শত্রæ সেনা বাধা দিয়ে বললো: “এখান থেকে হুসাইনের তাবুতে কোন পানি নেয়া যাবে না।” তিনি তাঁদের বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তারাও তাঁকে প্রতিরোধ করতে চাইলে তাঁদের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। বুরাইর তাঁদের দুজনকেই হত্যা করেন। তিনি পানির মশক ইমামের তাবুতে নিয়ে আসতে সক্ষম হলেন।

হযরত ফিযযাকে ডেকে তিনি পানির মশক হাতে দিলেন এবং শিশুদেরকে পানি পান করানোর জন্য বললেন। সেখানে আনুমানিক পঞ্চাশের মতো শিশু ছিল। তাঁরা সকলেই ছিল তৃষ্ণার্ত। যেই মাত্র তাঁরা পানি আসার কথা শুনল, তাঁরা ছুটে গিয়ে পানির মশক নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে লাগলো। কাড়াকাড়ির এক পর্যায়ে পানির মশক মাটিতে পড়ে গেলে সব পানি বিক্ষিপ্তভাবে মরুর বালির সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। শিশুরা হতাশায় বিমর্ষ হয়ে পড়ে যাওয়া পানির দিকে চেয়ে রইলো।

এই ঘটনা দেখে বুরাইর এতটা বিমর্ষ হলেন এবং দুঃখ পেলেন যে, আল্লাহ দরবারে হাত তুলে আর্তনাদ করে উঠলেন, “হে আল্লাহ! আজ তোমার এই বান্দা আশা করেছিল, হুসাইনের বাচ্চাদের দুয়া অর্জন করবে। হায়! হামদানির পুত্র বুরাইর কতোই না অভাগা।” ইমাম এই আর্তনাদ শুনে বললেন, “হে আমার বন্ধু! তোমার সাহসী পদক্ষেপের জন্য তুমি ফাতিমার পুত্রের দোয়া অর্জন করেছ।”

আসুন আমরাও তাদের মতো হই, যারা ইমামের ভালোবাসায় নিজেদেরকে সেদিন উজাড় করে দিয়েছিলেন। তাঁদের সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু যেন ছিল সেদিন ইমাম ও তাঁর পরিবার। আমাদেরকেও আমাদের ইমামের প্রতি ভালোবাসার এমন নজির স্থাপন করতে হবে। এটাই কারবালার দাবী। আর আমাদেরকে সেই দাবী পূরণ করতেই হবে। কারণ, আমরা আহলে বাইতের উপর আরোপিত সকল অনাচারের প্রতিশোধ নেয়ার সংকল্প করেছি। আর তাই ইমাম-এ-যামানার পতাকাতলে নিজেদেরকে শামিল করেছি। এখন আর পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। আল্লাহ্ আমাদেরকে সেই সুদৃঢ় পথে অবিচল ও দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার তৌফিক দান করুন।

চার: কারবালা- যেখানে ইব্রাহীম(আ.) এর কুরবানি পরিপূর্ণ হয়েছিল

কারবালা এমন একটি অধ্যায়ের নাম যে অধ্যায় মানবাজতির মুক্তির বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখলে এটা বলা স্বাভাবিক যে, এই যুদ্ধটি ছিল ইসলামের পুনঃজাগরণের যুদ্ধ। কিন্তু, সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং এই অবস্থায় বনু হাশিম ও ইমাম হুসাইনের অনুসারীদের ক্ষুদ্র সেই দলটির অমিয় বাণির দিকে তাকালে আমরা দেখব এটি ছিল মানবতার মুক্তি আন্দোলন। ইমাম হুসাইনের বক্তব্য এবং সেই ময়দানের শহীদদের কার্যকলাপের বিচক্ষনতার সাথে লক্ষ্য করলেই আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, তাঁরা বিশ্বমানবতার জন্য স্বাধীনতার এক বিরল কাব্য রচনা করেছিলেন। সেই মহা কাব্যে আল­াহর নির্দেশকে যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা ইসলামের আর কোন ঘটনার মধ্যে এতো সূক্ষভাবে পাওয়া যায় না।

কারবালা এমন এক মহাকাব্যের নাম, যা থেকে পৃথিবীর বুকে হাজার মহাকাব্য রচিত হয়েছে। এ মহাকাব্যের মূল উপাখ্যান ছিল ইমামের প্রতি আনুগত্য। সেদিনের সেই ছোট্ট কাফেলাটি তাঁদের ইমামের প্রতি আনুগত্যের যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, তা ছিল অনন্য, অসাধারণ এবং অনতিক্রম্য। আনুগত্যের আর কোন প্রকৃষ্ট উদাহরণ মানবসমাজে আমরা দেখি না। আমরা প্রায় সময়ই বলে থাকি, কারবালা হল আল কোরআনের ব্যবহারিক ময়দান। অর্থাৎ, এই ময়দানে কোরআনের সকল নির্দেশগুলো সু¯পষ্ট হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, পুরো কোরআন সেখানে বাস্তবিক আকারে মানুষের সামনে প্রতিফলিত হয়েছিল। মুসলিম ইবনে উজ্জাহ নামের ইমামের এক সাথী বললেন, “আমাকে যদি একবার হত্যা করে পুনরায় জীবিত করা হয় এবং ৭০ বার এ প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হয়, তবুও আমি আপনাকে ছেড়ে যাবো না। আমি নিজের জীবন দিয়ে আপনাকে রক্ষার চেষ্টা করবো, যাতে কেয়ামতের ময়দানে বিশ্বনবী(সা.)-কে বলতে পারি, নিজের অস্তিত্ব দিয়ে আমি আপনার আহলে বাইতকে রক্ষার চেষ্টা করেছি।”

যাই হোক, বাহ্যিক দৃষ্টিতে কারবালা পরাজয়ের একটি উপন্যাস হলেও, এই কারবালা হাজারও জয়ের ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। কারবালা শুধু কুফার নিকটবর্তী সেই স্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর বিস্তৃৃতি ঘটেছে মুসলিম সম্রাজ্য বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে। যেখানেই মুসলমানদের শাসন অনুপ্রবেশ করেছে, সেখানেই কারবালা প্রবেশ করেছে। মানুষের অন্তরে কারবালা এমন এক প্রভাব বিস্তাার করেছিল যে, উমাইয়্যা বাহিনির সৈনিকেরাও কারবালার স্মৃতি বয়ে নিয়ে গেছে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে। একটা ঘটনা কিভাবে এতটা শক্তিশালি হতে পারে? কিভাবে একটি পরাজিত যুদ্ধ এতগুলো হৃদয়ে বিজয়ের আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে? আসলে এটাই কারবালার রহস্য। এখানেই কারবালার মৌলিক বিজয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর কোন যুদ্ধের অবতারণা হয়নি, যার ধ্বংসযজ্ঞ মানুষের অন্তরে বিজয়ের আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করতে পারে। কারবালার বিজয় ছিল এটাই যে এ বিপ্লব নির্যাতিত মানুষের অন্তরে মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছিল। এ ইতিহাস মানুষকে শিখিয়েছে কিভাবে স্বাধীনতা, গৌরব এবং আত্মমর্যাদার জন্য ব্যাকুল হওয়া যায়। কিভাবে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে মুক্তির জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়।

কারবালার এ ধরনের গৌরবগাঁথার আরেকটি দিক হল যে, এটা ছিল ইব্রাহীম(আ.)-এর সেই অপূর্ণ কুরবানির পূর্ণতার ইতিহাস। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন তার হাবিব ইব্রাহীমকে স্বপ্নের মাধ্যমে কুরবানির তাগিদ দিলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁকে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কিছু কুরবানি করতে হবে। আর সবচেয়ে প্রিয় তাঁর কাছে তখন ইসমাইল ব্যতীত আর কেউ ছিল না। কারণ, ইসমাইল ছিল তার দীর্ঘ সাধনার ফসল। আমরা সকলেই জানি, ইব্রাহীম(আ.) তাঁর একেবারে বৃদ্ধ বয়সে পুত্র সন্তানের জনক হয়েছিলেন। তিনি তাঁর সেই প্রিয় জিনিসের কুরবানির জন্য প্রস্তুত হলেন এবং কুরবানির স্থানে ইসমাইলকে নিয়ে গেলেন। কুরবানির ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আল্লাহ্ তাঁর এই কুরবানিকে রহিত করলেন। যার জন্য কোরআনে বলা হয়েছে, “আমি তাঁর কুরবানিকে আরেকটি কুরবানির দ্বারা রহিত করলাম”। আমাদের আলেম সমাজ যদিও এর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, আসলে সেই বদলি কুরবানি ঈদ উল আযহার কুরবানি ছিল না। এটা ছিল হুসাইনের কুরবানি। আমাদের এই দাবির পিছনে অত্যন্ত শক্ত যুক্তি রয়েছে। কারন, হুসাইন এবং বনু হাশিম ইসমাইলেরই সন্তান। তথা ইব্রাহীমের সন্তান। যার ধারায় পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সন্তনগুলো এসেছিল। যদি আমরা বনু হাশিমের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব সর্বদাই তাঁরা শাহাদাতের প্রতিযোগিতায় নেতৃত্বের অবস্থানে ছিলেন। বদরে উবায়দুল্লাহ, অহুদে হামযা, মুতার প্রান্তরে জাফর ইবনে আবু তালিব, কুফায় আলী ইবনে আবু তালিব। ইসলামের সকল ঘটনাতেই বনু হাশিম ছিল ইসলাম ও শত্রæর মাঝখানে ঢাল স্বরূপ। শত্রæরা বনু হাশিমকে অতিক্রম করা ব্যতীত ইসলামের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতে পারেনি কখনও।

কারবালাতেও এর বিপরিত হয়নি। সেজন্যই আমি একে ইব্রাহীমের সেই বদলি কুরবানি বলে থাকি। কারণ আল্লাহ্ যে কুরবানি ইব্রাহীমের কাছে চেয়েছিলেন, সেই কুরবানি ইব্রাহীমের সন্তানেরা কারবালার প্রান্তরে দিয়েছিলেন।

হজরত কাশিম ছিলেন ইমাম হাসানের সন্তান। ইমাম হুসাইনের কাছে তিনি ছিলেন ভাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ। কাশিমকে দেখেই ইমাম তাঁর প্রাণপ্রিয় ভাইয়ের কথা স্মরণ করতেন। যুদ্ধের দিন কাশিমের মা তাঁকে ডেকে বললেন, “বাবা! সকলেই ইমামের জন্য তাদের সন্তান, ভাই, ভাতিজা নজরানা হিসেবে কুরবান করছে। আমার নিকট তুমি ব্যতীত আর কেউ নেই। তোমার চাচার কাছে যাও এবং যুদ্ধের অনুমতি নিয়ে আস।” কাশিম চাচার কাছে যুদ্ধের অনুমতি চাইতে গেলে ইমাম হুসাইন বলেন, “হায়! আমার ভাইয়ের স্মৃতি। তোমাকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া যাবে না। তোমার পিতার বিয়োগই তোমার মায়ের জন্য যথেষ্ট।”

কাশিম মায়ের কাছে ফিরে এলে মা কাশিমের হাতে থাকা তাবিজের ভিতর থেকে একটি চিঠি বের করে ইমামের নিকট পাঠালেন। এই চিঠিটি ইমাম হাসান তাঁর ভাই ইমাম হুসাইনের জন্য লিখে রেখেছিলেন, যা কাশিমের মায়ের জিম্মায় ছিল। সেখানে লিখা ছিল, “ভাই আমার! তোমার সেই দুর্দিনে আমি থাকব না। আমার পক্ষ থেকে এই হাদিয়াটি কবুল করে নিও।” ইমাম চিঠিটি পরে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন এবং কাশিমের কপালে চুমু খেয়ে যুদ্ধের অনুমতি দিলেন। ইতিহাসে এসেছে, কাশিম এতো ছোট ছিলেন যে, কারবালায় ইমাম হুসাইনের দলের পতাকাবাহী আব্বাস বিন আলী তাঁকে কোলে করে ঘোড়ায় চড়িয়ে দিয়েছিলেন। কারবালার সেই সাহসী বীর দৃঢ়তার সাথে ময়াদানে আসলেন। উমার বিন স্বাদ ‘আরজখ’ নামক তার সৈন্যকে কাশিমের মোকাবেলা করতে বললে, সে সেনাপতিকে তিরস্কার করে বলল, “এতো একটা বাচ্চা ছেলে! এর জন্য আমার ছেলেরাই যথেষ্ট।” সে তার এক ছেলেকে কাশিমের মুকাবেলায় পাঠাল। সে ধরাশায়ী হলে সে তার পরবর্তী ছেলেকে পাঠাল। সেও কাশিমের কাছে পরাস্থ হল। এতে আরজখ ক্ষেপে গিয়ে নিজেই ময়দানে নেমে আসলো। হজরত কাশিম তাঁকে দেখে বললেন, “পুত্র হারানোর শোক তোমাকে এতটাই বিমর্ষ করে দিয়েছে যে, তুমি ঘোড়ার জিন লাগাতে ভুলে গেছ?” সে তার ঘোড়ার দিকে তাকাতেই কাশিম তাঁকে এমন সজোরে আঘাত করে যে, আরজখ দ্বিখন্ডিত হয়ে যায়। এতে ইয়াজিদি বাহিনির মধ্যে আতংক শুরু হয়ে যায়।

আমরা এমনটা সব সময়ই দেখেছি, যখনই রাসুলের আহলে বাইতের সন্তানদের মধ্যে কোন সদস্য যুদ্ধের ময়দানে নেমেছে তখনি শত্রæদের পায়ের তলার মাটি সরে যেত। ইতিহাসের সকল উপাখ্যানেই বনু হাশিম ছিল অপ্রতিরোধ্য। তাঁদের সাহসিকতা বিরোধী শক্তির হৃদয়ে এমন কম্পন সৃষ্টি করতো যে, প্রায় সময়ই আমরা তাদের হাত থেকে তরবারী পড়ে যেতে দেখেছি। আমরা সিফফিনের যুদ্ধে ইমাম আলীর  যুলফিকারের মুখোমুখি হয়ে আমর ইবনুল আসকে উলঙ্গ অবস্থায় পালিয়ে যেতে দেখেছি।

ইয়াজিদি বাহিনী কাশিমের মুকাবেলায় সম্মিলিত হামলা চালালো। চারদিক থেকে পঙ্গপালের ন্যায় শকুনের দল ইয়াযিদ বাহিনী কাশিমের কিশোর দেহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করে ফেলে কাশিমের দেহ। ক্ষত বিক্ষত দেহ নিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার সময় কাশিম চিৎকার করে বলে উঠল, “মা! আমি পড়ে যাচ্ছি।” চিৎকার শুনে চাচা হুসাইন যুদ্ধের ময়দানে কাশিমের দিকে দৌড়ে আসলেন। ততক্ষনে ভাতিজা কাশিমের দেহ ঘোড়ার পায়ের আঘাতে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিল। ইমাম হুসাইন তাঁর ভাইয়ের স্মৃতি কাশিমের ছিন্নভিন্ন দেহকে একটি কাপরে জড়িয়ে তাবুর দিকে নিয়ে আসলেন।

আউন ও মুহাম্মদ নামে হযরত যয়নবের দুই সাহসী পুত্র এবং ইমাম হুসাইনের প্রাণপ্রিয় ভাগিনা সেদিন কারবালার প্রান্তরে উপস্থিত ছিলেন। বিবি যয়নাব যখন মদিনা ছেড়ে ভাইয়ের সাথে চলে আসবেন তখন তাঁর অসুস্থ স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনে জাফরের কাছে এই পুত্রদ্বয়কে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অনুমতি চাইতে গিয়েছিলেন। তখন তাঁর স্বামী বলেন, “হে ফাতিমার কন্যা! আমি কখনও তোমাকে কোন কিছুতে বাধা দেইনি। তুমি হুসাইনের সাথে যাও। আর সাথে করে আমাদের এই দুই পুত্রকেও নিয়ে যান। যদি প্রয়োজন হয়, একজনকে তোমার পক্ষ থেকে আর অপরজনকে আমার পক্ষ থেকে হুসাইনের জন্য কুরবান করে দিও।”

আউন ও মুহাম্মদ আশুরার পূর্ব রাতে মায়ের কাছে এসে বললেন: “আগামীকাল সকাল হতে দিন এবং আমাদের জন্য মামার কাছ থেকে যুদ্ধের অনুমতি এনে দিন। তারপর দেখবেন, আমরা কিভাবে যুদ্ধ করি।” পরদিন সকালে তাঁরা ইমামের নিকট যুদ্ধের অনুমতি চাইলে ইমাম(আ.) তাদের বয়সের সল্পতার দরুন অনুমতি দিতে চাননি। বোন যয়নব এবং ভাগিনাদের পীড়াপীড়িতে তিনি অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন। তাঁরা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। একজনকে আব্বাস এবং অপরজনকে ইমাম নিজে ঘোড়ায় তুলে দিলেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাওয়ার পূর্বে মা যয়নব বললেন, “ময়দানে যদি কেউ তোমাদের পরিচয় জানতে চায়, খবরদার আমার নাম বলবে না। বলবে আমরা হুসাইনের দাসীর পুত্র”। ময়দানে তাঁরা উমার বিন স্বাদকে যুদ্ধের আহŸান জানালে সে তার সকল সৈন্যকে একত্রে হামলা করার নির্দেশ দেয়। দুই ভাই অগনিত সৈন্যের ভিড়ে একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। বীর বিক্রমে লড়াইয়ে আহত হয়ে তাঁরা ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার সময় ইমামের প্রতি তাঁদের শেষ সালাম পেশ করেন।

ইমাম এবং আব্বাস তাঁদের দিকে ছুটে আসেন। দুই ভাইয়ের দেহকে ইমাম ও আব্বাস বিন আলী তাবুতে নিয়ে আসেন। বিবি যয়নব দুই সন্তানের দেহের পাশে শুয়ে পড়েন এবং তাঁদের বুকের উপর হাত রেখে বলতে লাগলেন, “তোমাদেরকে ধন্যবাদ। তোমরা আমার মুখ রক্ষা করেছ। তোমাদের উপর আমি সন্তুষ্ট হয়েছি।” এরপর তিনি আল্লাহর দরবারে হাত তুলে বললেন, “হে আল্লাহ! তুমি আমার এই কুরবানি কবুল করেছ, সে জন্য তোমার শুকরিয়া। কেয়ামতের দিন যেন আমি মা ফাতিমাকে বলতে পারি, আমি তোমার হুসাইনের জন্য আমার দুই সন্তানকে উৎসর্গ করেছি।”

একে একে ইমামের সকল সাথীরা শহীদ হয়ে গেলেন। এরপর ছিলো বনু হাশিমের পালা। তারাও একের পর এক ইমামের পদতলে শাহাদাতের অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক নজরানা পেশ করতে লাগলেন। এবার ইমামের ছেলে আলী আকবর পিতার নিকট যুদ্ধের অনুমতি নিতে আসলেন। ইমাম বললেন, “তোমার অনুমতি আমার কাছে নয়, তোমার ফুফুর কাছ থেকে নিতে হবে। কারণ, তোমার লালন পালনে তিনি অগ্রগামী ছিলেন।” ফুফুর কাছ থেকে অনেক কষ্ট করে অনুমতি নিয়ে আলী আকবর আবার বাবার নিকট ফিরে আসলেন। ইমাম তাঁকে বিদায় জানালেন।

আলী আকবর ময়দানের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলেন। তিনি ছিলেন হুবুহু রাসুল(সা.)-এর মতো দেখতে। তিনি যখন ময়দানের দিকে যাচ্ছিলেন তখন ইমাম হুসাইন তাঁর পিছু পিছু আসতে লাগলেন। আলী আকবর চলা থামিয়ে দিয়ে পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি না আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিলেন? তাহলে কেন আমার পিছু পিছু আসছেন?” ইমাম বললেন, “আমার স্থলে তুমি থাকলে বুঝতে। ঠিক আছে আমি আর তোমার পিছনে আসব না। তবে ওয়াদা কর, যতক্ষন ময়দানে না পৌঁছবে, এভাবে বার বার আমার দিকে ফিরে তাকাবে।” ইমাম অশ্রæ নয়নে দু’হাত আসমানের দিকে তুলে ধরে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বললেন, “হে আল্লাহ! আমি আমার সেই সন্তানকে যুদ্ধে পাঠালাম যার অবয়ব এবং কণ্ঠস্বর তোমার হাবিবের মত।”

আলী আকবর রনাঙ্গনে গেলেন এবং অবিচল আস্থার সাথে অনেকক্ষন লড়াই করলেন। উমাইয়্যা বাহিনীর বিশাল ক্ষতি সাধনের পর ক্লান্ত হয়ে তিনি তাবুতে ফিরে আসলেন। ইমাম ফিরে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন যে, তৃষ্ণায় তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছে। ইমাম স্বীয় জিহŸা পুত্রের মুখে দিলেন এবং হাত থেকে আংটি খুলে মুখে দিয়ে বললেন, “এটা সাথে রাখ, স্বস্তি পাবে”।

আলী আকবর পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে ফিরে গেলেন। যাদের রক্তে বিরত্বের কাব্যগাথা রচিত হয়, তাদের সাথে কোন বাহিনীরই তুলনা হয় না। ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে, সিফফিনের যুদ্ধে আবুল ফযল আব্বাস বিন আলীর বিরত্বের সামনে শত্রæদের পরাস্থ হওয়ার কাহিনী। মুসলিম ইবনে আকিলের বিরত্বও উবায়দুল্লাহ্ বিন যিয়াদের সৈন্যদেরকে সম্মিলিত হামলা করতে বাধ্য করেছিল। জাফর বিন আবু তালিবের বীরত্ব রোমানদেরকে বিচলিত করে দিয়েছিল। আলী আকবর তাঁদেরই সন্তান। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ইয়াযিদী বাহিনী সম্মিলিত আক্রমন করল। আহত অবস্থায় ক্ষত বিক্ষত দেহ নিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যাওয়ার সময় আলী আকবর পিতার সাহায্য কামনা করলেন। ইমাম ছুটে চললেন আলী আকবরের দিকে। বেশি দূর যেতে পারেননি। তিনি পড়ে গেলেন। বাকি পথ হামাগুড়ি দিয়ে আলী আকবরের কাছে গেলেন। দেখলেন, আলী আকবর বুক চেপে ধরে আছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি বুক থেকে হাত সরাচ্ছ না কেন?” আলী আকবর বললেন, “বাবা, আমি এখানে তিব্র ব্যথা অনুভব করছি।” হাত সরিয়ে ইমাম দেখলেন তাঁর বুকে বর্শার অগ্রভাগ সমূলে গেঁথে গিয়েছে। সন্তানের বুকের উপর থেকে তিনি বর্শা বের করে নিয়ে আসলেন। আর এতে ছিন্ন হয়ে যায় আলী আকবরের বুকের খাঁচা। ইমাম দেখলেন সন্তানের লাশ একা বহন করা সম্ভব নয়। তাই তিনি তাঁর দলের পতাকাবাহী, তাঁর ভাই আবুল ফযল আব্বাসকে সাহায্যের জন্য ডাকলেন। দুইজন মিলে আলী আকবরের দেহ তাবুতে নিয়ে আসলেন। আলী আকবরের শাহাদাত ইমামের কাফেলায় শোকের মাতমের জন্ম দিল। অসহ্য বেদনায় কাফেলার নারী শিশুরা আর্তনাদ করে উঠলো।

হায়! এ জমিন কেন ভেঙ্গে পড়ে না। এ ব্যথার তিব্রতা সহ্য করি কিভাবে। কিভাবে এ বিরহ মেনে নিতে পারি। নবি পরিবরের নারী-পুরুষ ও শিশুদের আহাজারিতে সেদিন কারবালার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে গিয়েছিল।

কারবালার করুন ইতিহাসের বর্ণনা একটি দাবীর ভিত্তিতেই পেশ করা হচ্ছে। আর তা হল, নিজেদেরকে আবারও আরেকটি কারবালার জন্য তৈরি করে নেয়ার আহŸান জানানোর জন্য। আজকের আলোচনা তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা নিজেদেরকে ইমাম-এ-জামানার আগমন ও আনুগত্যের জন্য প্রস্তুত করতে পারবো। মনে রাখবেন, এই জীবনে যতো ঋণ রয়ে গেছে তার সবটুকু তাঁদেরই, যারা আমাদেরকে হেদায়েতের জন্য নিজেদেরকে কুরবান করে নজির সৃষ্টি করে গেছেন। তাঁদের সেই আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ছিল একটি। আর তা হল, আগামী দিনের লোকেরা যেন তাঁদের ইমামের জন্য এভাবেই অকাতরে নিজেদেরকে বিলিয়ে দিতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে সেই পথে চলার তৌফিক দান করুন। আমীন।

 

পাঁচ: কারবালা- চিরসবুজ আন্দোলনের উন্মুক্ত দুয়ার

কারবালা এমন এক মহাকাব্য যার চয়নে রয়েছে মুক্তির অমৃত সুধা। আর এর রচয়িতা ছিলেন ইমাম হুসাইন, যিনি এমন এক রচয়িতা যার তুলনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কখনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি কারবালাকে কেউ বিশ্লেষণ করতে চায়, তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় সে বিচলিত হবে। কারণ, কারবালা এমন বহুমাত্রিক একটি অধ্যায়ের নাম, যার অবদান মানবতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানব জাতির জীবনে এমন কোন দিক নেই যা কারবালায় পদচারনা ঘটেনি। কারবালার এই দিকগুলোকে জানতে হলে অবশ্যই ব্যক্তির বিচক্ষন ক্ষমতা প্রবল থাকতে হবে।

কারবালা বিরত্ব, প্রেম, ত্যাগের এমন এক নজির স্থাপন করেছে, যা কিয়ামত পর্যন্ত সত্যপন্থিদের আলোকবর্তিকা হিসেবে পথ দেখিয়ে যাবে। ইমামের প্রতি ভালোবাসা, তাঁর প্রতি আনুগত্য এবং দ্বীনের ভিত্তি মজবুত করার ক্ষেত্রে সেই শহীদদের তুলনা তাঁরা নিজেই।

ফোরাতের তীরে অবস্থান নেয়া ইমামের কাফেলা চাইলেই সেখানে অবস্থান করতে পারতো। যখন উমাইয়্যা বাহিনী সেখান থেকে ইমামের কাফেলাকে সরিয়ে দিতে চাইছিল তখন মহাবীর আবুল ফযল আব্বাস হুংকার দিয়ে উঠেছিলেন- “কার এত বড় সাহস যে আমাদেরকে এখান থেকে সরাতে চায়?” কিন্তু ইমাম তাঁকে শান্ত করেন এবং বলেন- “আমাদের তাঁবুগুলো সরিয়ে নাও আব্বাস। আগামি দিনের ইতিহাস যেন এটা না বলে যে, কারবালার যুদ্ধ পানির জন্য সংগঠিত হয়েছিল।” আবুল ফযল আব্বাস জানতেন, একবার এখান থেকে সরে গেলে পানির উৎস ইমামের বাহিনীর জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু, এটাই ইসলামি আন্দোলনের বাস্তবতা। ইসলামি আন্দোলন হচ্ছে এমন এক ক্ষেত্র যেখানে নিজেকে বিসর্জন দিতে হয়। যেখানে সুবিধার বিপরীতে অসুবিধাগুলো আপন করে নিয়ে পথ চলতে হয়। এরই নাম আনুগত্য। যদি আব্বাস ইমামের নির্দেশ না মানতেন, তাহলে হয়তো ইমামের বাহিনী এতো চরম পানি সংকটে পড়তো না বা যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনাও থেকে যেতে পারতো। কিন্তু, তাতে লাভ কি হতো? যে বিজয়ে ইমামের আনুগত্য নেই সে বিজয় তো দুনিয়ার অন্যান্য অর্জনের ন্যায় ক্ষণস্থায়ী। আর কারবালার প্রান্তরের সবাই সেদিন ছিলেন পরকালের চিন্তায় ব্যস্ত। কিভাবে ইমামের আনুগত্যে নিজেকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তাঁরা সেদিন।

শিমর বিন জুলজওশানের অকথ্য ভাষায় গালাগালির পর প্রতিশোধ হিসেবে ইমামের এক সৈন্য যুদ্ধ শুরুর অনুমতি চাইলেও ইমাম তাঁকে এই বলে বারণ করেন যে, “আমরা কখনোই যুদ্ধ শুরু করবো না।” তিনি তা মেনে নেন। এরকমই হতে হবে আমাদের। ইমামের নির্দেশই আমাদের পাথেয়। ইমামের খুশিই আমাদের খুশি। যতদিন পর্যন্ত আমরা এই লক্ষ্যকে স্থির করতে না পারবো, ততদিন কারবালাকে সার্থকতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবো না।

আর প্রেমের কথা যদি বলি, তাহলে কারবালার সেই ছোট্ট কাফেলাটি ছিল প্রেমের উত্তাল সমুদ্রের ন্যায়। সমুদ্রে যেমন একটার পর একটা ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়ে, তেমনি সবাই একের পর এক নজরানা দিয়ে ইমামের খুশি অর্জন করার আপ্রান চেষ্টা করেছিলেন সেদিন। কেউ স্বামী, কেউ সন্তান, কেউ ভাই, কেউ পিতা, কেউ নিজেকে উৎসর্গের মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের প্রেম প্রকাশ করছিল। আমরা যখনই কারবালার কথা বলি তখনই জীবন উৎসর্গের কথা বলি। আসলে এছাড়া কারবালায় আর কিই বা ছিল। মানুষের সবচাইতে দামি স¤পদ হল তাঁর জীবন। এর চাইতে প্রিয়, এর চাইতে মুল্যবান আর কিছুই মানুষের কাছে নেই। আর তাঁরা সেটাই উৎসর্গ করেছিলেন সেদিন। তাঁদের এই উৎসর্গ করাটা কিন্তু বাধ্যবাধকতা ছিল না। শুধুমাত্র প্রেমের কারণেই ছিল। কারণ, বাধ্য তাঁরা মোটেই ছিলেন না। আশুরার পূর্ব রাতেই ইমাম তাদেরকে তাঁর বাইয়াত থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। ইমামের সামনে দিয়ে যেতে লজ্জা পাবে ভেবে ইমাম বাতি নিভিয়ে দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেনঃ “ওরা শুধু আমাকে চায়। তোমাদের সাথে ওদের কোন কাজ নেই। তোমরা এই রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে এখান থেকে চলে যেতে পার। আমি আমার বাইয়াত তুলে নিলাম এবং আমার আনুগত্য থেকে তোমাদেরকে মুক্ত করে দিলাম।” কিন্তু আশুরার দিনে উপস্থিত কেউ ইমাম-কে একা ফেলে পালিয়ে যায়নি। বরং ইমামের এই কথা শুনে তাঁরা যেন আরও আবেগপ্রবন হয়ে উঠলো। একটার পর একটা ঘোষণা সেদিন ইমামের চোখে পানি এনে দিয়েছিল এবং তিনি বলেছিলেন, “আমার মতো সাহাবী আর কেউ পায় নি।”

কতোই না সুমহান সেই নেতা আর কতোই না ত্যাগী ছিলেন সেই সাহাবীরা। ইতিহাসে আমরা পাই, তারেক বিন যিয়াদ স্পেন আক্রমনের সময় বাহিনীর সকল নৌযান পুড়িয়ে ফেলেছিল এবং মাত্র একদিনের খাবার রেখে সকল খাবার সমুদ্রে ফেলে দিয়েছিল। তখন সৈন্যদের আর যুদ্ধ করা ব্যতীত কোন উপায় ছিল না। বাধ্য হয়েই শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে সেদিন তারা লড়েছিল। কিন্তু কারবালার সেই অসীম সাহসী যোদ্ধারা, তাঁদের বীরত্বের যে নজির স্থাপন করেছিলেন তা ছিল স¤পূর্ণ ভিন্ন। যে যুদ্ধে জয়ের বিন্দুমাত্র কোন আশা নেই, মৃত্যু যেখানে অলিখিত ভাগ্য হিসেবে পরিণতির জন্য অপেক্ষা করছে, এমন একটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া কোন সাধারণ কথা নয়। তাঁরা সেদিন বেঁচে থাকা বা জয়ের জন্য লড়েননি, তাঁরা লড়েছিলেন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ইমামের আনুগত্য, প্রেম ও তাঁদের ঐকান্তিকতা প্রমাণ করার জন্য। আর তাঁরা তা সম্পন্ন করেছিলেন কোন প্রকার বিচ্যুতি ব্যতীরকে।

ইমাম থেকে ক্ষমা পাবার পর হুর বলেছিলেন, “মওলা! আপনাকে অবরুদ্ধ করার সময়, একজন নারির কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিলাম, আমি তাঁর কাছেও ক্ষমা চাইব।” ইমাম তাঁকে সেখানে বিবি যয়নবের নিকট নিয়ে গেলেন। তিনি যয়নবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। বিবি যয়নব বললেন, “আমি তোমাকে ক্ষমা করলাম। হায়! আজ আমাদের কাছে কিছুই নেই যে তোমাকে আপ্যায়ন করাবো।”

হুর ইমামের কাছ থেকে যুদ্ধের অনুমতি নিলেন। পিতা এবং পুত্র যুদ্ধের ময়দানে চলে গেলেন। হুরের ছেলে বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে লাগল আর হুর কাছ থেকে সন্তানকে সাহস যোগাচ্ছিলেন। পিতার উৎসাহের কথা শুনে সে আরও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করতে লাগল। এক পর্যায়ে শত্রæরা একযোগে হামলা করলে সে পরাস্থ হয় এবং আহত হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় পিতাকে সাহায্যের জন্য আহবান করে। পুত্রের আহত চিৎকার শুনে হুর সিংহের ন্যায় ময়দানে ছুটে গেলেন। এসে দেখলেন তাঁর পূর্বেই ইমাম তাঁর পুত্রের মাথা পাঁজরে নিয়ে বসে আছেন। ইমাম-কে দেখে হুর লজ্জিত হয়ে বলল, “মওলা! আপনি কেন আসলেন?” ইমাম বললেন, “হায় হুর! যদি আমি না আসতাম তাহলে কিভাবে তুমি সন্তানের লাশ বয়ে নিয়ে যেতে? একজন পিতার পক্ষে কিভাবে সম্ভব পুত্র হারানোর বেদনা সহ্য করা!”

সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে তাবুতে এসে হুর নিজের জন্য যুদ্ধের অনুমতি চাইলেন। ইমাম তাঁকে যেতে দিতে না চাইলে সে বলল, “আপনি কি আমাকে জান্নাতি এই কাফেলা থেকে দূরে রাখতে চান? দেখছেন না কিভাবে শকুনের দল রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠেছে? এই ময়দান আজ খুন চায়। আজ প্রয়োজন ত্যাগের আর আপনি আমাকে তা থেকে ফিরিয়ে রাখবেন।” অগত্যা ইমাম তাঁকে অনুমতি দিলেন এবং আরবের শ্রেষ্ঠ বীর হুর ইবনে ইয়াযিদ ময়দানে ছুটে গেলেন। বীরত্বের সাথে যুদ্ধে হুর উমাইয়্যা বাহিনীর অনেক ক্ষতি সাধন করলেন। এক পর্যায়ে আহত হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় হুর চিৎকার করে ইমাম-কে তাঁর শেষ সালাম পেশ করলে ইমাম তাঁর নিকট ছুটে যান। দেখলেন হুরের কপাল থেকে ফিনকি দিয়ে অঝোরে রক্ত ঝরছে। তিনি জামার আস্তিন থেকে ফাতিমা’র রুমাল বেঁধে দিলেন তাঁর মাথায়। সাথে সাথে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে গেল। ইমাম তাঁর কপালে চুমু দিয়ে বললেন, “তোমার মা তোমার নাম যথার্থই রেখেছেন হুর। তুমি দুনিয়াতেও স্বাধীন আখেরাতেও স্বাধীন।” এরপর ইমাম তাঁর লাশ নিয়ে তাবুতে ফেরত আসলেন।

এরাই প্রকৃত বীর। যাদের বীরত্ব পৃথিবীতে জুলুম শোষণের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে রয়েছে, তাঁরা এমনই। তাঁদের সৌন্দর্য অতুলনীয়। তাঁদের মৃত্যু নেই। তাঁরা অমর হয়ে থাকে। আর তাঁদের সৌন্দর্যের উপর পৃথিবীর জীবিত মানুষেরা অহংকার করতে পারে।

সেদিন কারো মনে কোন ভীতির রেখা ছিল না। সকলেই একে অন্যের থেকে ত্যাগের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টির নেশায় যেন মত্ত হয়েছিল। আর একজনের শাহাদাত আরেকজনের অন্তরে যেন শাহাদাতের আকাক্সক্ষাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করছিল। আর এর প্রমাণ আমরা প্রতিটি শহীদের মধ্যেই দেখেছি।

এমনি একজন মুসলিম ইবনে আওসাজাহ। তিনি হাবিব ইবনে মাযাহির এর ভাই। ইমাম থেকে যুদ্ধের অনুমতি নিয়ে তিনি রনাঙ্গনে গেলেন। বীরত্বের সাথে লড়াইয়ের এক পর্যায়ে আহত হয়ে পড়ে গেলে ইমাম হাবিব বিন মাযাহিরকে সাথে নিয়ে তার নিকট গেলেন। হাবিব মুসলিমের নিকট গেলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন তার কোন অসিয়ত আছে কিনা। জবাবে মুসলিম বললেন, “হাবিব! আমার ভাই। আমার অসিয়ত স্ত্রী সন্তানদের জন্য নয়। আমার অসিয়ত তোমার জন্য। সাবধান! এমন যেন না হয় যে, তোমার আগেই ইমাম ময়দানে চলে এসেছেন। তুমি জীবিত থাকতে যেন ইমামের গায়ে একটি আঁচড়ও না লাগে।” এই অসিয়ত করেই মুসলিম শাহাদাত বরণ করলেন।

এরি মধ্যে হটাৎ ইমাম দেখলেন ৯/১০ বছরের একটি বাচ্চা ছেলে তরবারী হাতে রনক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইমাম হাবিবকে নির্দেশ দিলেন বাচ্চাটিকে তাঁর নিকট নিয়ে আসতে। হাবিব তাঁকে ইমামের নিকট নিয়ে আসলেন। ইমাম জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কে? কার সন্তান? তোমাকে যুদ্ধে যেতে কে বলেছে?” জবাবে শিশুটি দু হাত জোড় করে বলল, “মাওলা! আপনি যে শহীদের লাশের পাশে বসে আছেন আমি তাঁর সন্তান।” ইমাম বললেন, “তোমার মায়ের জন্য তোমার বাবার বিয়োগই যথেষ্ট। এখন তুমিই তার সহায়। ফিরে যাও, যাতে তুমি তোমার মায়ের সহায় হতে পার।”

শিশুটি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর বলল, “আমি কী করে ফিরে যাই। এই যে আমার কোমরে যে তরবারি দেখছেন, এটা আমার মা আমার কোমরে বেঁধে দিয়েছেন।” এই পর্যায়ে তাবুর ভেতর থেকে শিশুটির মা বলে উঠলেন, “মাওলা! মুসলিম শাহাদাত বরণ করেছে। তার প্রতিদান সে পাবে। আমি নারী, তাই আমার উপর জিহাদ নিষিদ্ধ। সুতরাং আমার পক্ষ থেকে এই উপহারটি গ্রহণ করুন।”

যুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে স্বাদের বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হল শহিদানের লাশের উপর ঘোড়া দাবড়ানোর জন্য। সৈন্যরা কিছুদুর এগিয়ে গিয়ে যুহাইর ইবনে কায়েনের লাশ দেখতে পেল। তখন তার গোত্রের লোকেরা বলল যদি যুহাইরের লাশ বিনষ্ট করা হয়, তবে আমরা তোমাদের বিপরীতে তরবারি ধারন করবো। স্বাদ তার লাশকে সরিয়ে রাখার নির্দেশ দিল। কিছুদূর গিয়ে পাওয়া গেল মুসলিম ইবনে আসওয়াজার লাশ। তার গোত্রের লোকেরাও এর প্রতিবাদ করলে তার লাশকেও সরিয়ে রাখা হল। এরপর তাঁরা পেল হাবিব ইবনে মাযাহিরের লাশ। তার গোত্রের লোকেরা বলল আমাদের কোন গোত্রের লোকের লাশ অপমানিত হলে আমারা তা মেনে নিব না। যদিও সে হুসাইনের সাথে যুদ্ধ করেছিল, তবুও আমরা এই অপমান সহ্য করবো না। এর পর তার লাশও সরিয়ে নেয়া হল। এভাবে একে একে সকল শহীদদের লাশ তার গোত্রের লোকেরা সরিয়ে নিয়ে গেল। বাকি থাকল শুধু ইমাম হুসাইন এবং বনু হাশিমের লাশগুলো। সেখানে এমন আর কেউ ছিল না যে বলবে এরা আমাদের গোত্রের লোক, তাঁদের অপমান সহ্য করবো না। যে জাহেলিয়াতকে ইমাম হুসাইনের নানা বিতাড়িত করেছিলেন, আজ সেই জাহেলিয়াত হযরত মুহাম্মদের পরিবারের লাশের উপর কার্যকর হল। অথচ সকলে মুসলমান হওয়া সত্বেও কোন প্রতিবাদ করেনি। পাষান উমাইয়্যারা সেদিন শহীদদের নেতা ইমাম হুসাইন ও বনু হাশিমের শহীদদের দেহের উপর ঘোড়া চালিয়ে মানবিকতার চরম অপমান করল। হায় মুহাম্মদ! আজ তুমি কোথায়? কোথায় তোমার শিক্ষা?

এই ত্যাগ শুধু শোকের নয়। এই ত্যাগ নতুন দিনের আশা নিয়ে হতাশ মানবতাকে আশ্রয়ের বার্তা শুনানোর জন্য দেয়া হয়েছিল। ইমাম হুসাইন এবং তার শহীদেরা সেদিন মুক্তি আন্দোলনের দুয়ার খুলে দিয়েছিলেন। মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান এবং তার পূর্বসূরি খলিফাদের তৈরি করা ভীতির পিঞ্জরকে তাঁরা ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিলেন। তাঁরা শিখিয়েছিলেন কিভাবে ভয়ের শৃঙ্খল ভেঙ্গে আলোর প্রদীপ জালাতে হয়। কিভাবে সংগ্রামের আগুনে জ্বলে ইমানকে খাঁটি করতে হয়। কিভাবে ইমামের আনুগত্য করতে হয়। আমাদেরকে সেই পথেই হাঁটতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইমাম হুসাইন সেই মহাকাব্যের নাম যার কাছ থেকে আনুগত্য, প্রেম এবং ত্যাগের মহিমা শিখা যায়। আল্লাহ আমাদেরকে সেই পথে দৃঢ়তার সাথে চলার তৌফিক দিন। আমিন।

 

ছয়: ৯ই মহররম- আন্দোলনের জন্য আত্মত্যাগের প্রস্তুতি

আজ মহররম মাসের নবম দিন তথা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের দিন। অন্য কথায় আমরা বলতে পারি এ দিনটি ছিল ইমাম হুসাইনের সাথীদের আত্মত্যাগের প্রস্তুতির দিন। সে জন্য আমাদের আলোচনার শিরনাম নেয়া হয়েছে- “৯ই মহররম- আন্দোলনের জন্য আত্মত্যাগের প্রস্তুতি।”

একটা আন্দোলন যখন তার পরিণতিতে পৌঁছে, তখন সময় আসে এগিয়ে চলার। আর এগিয়ে চলার এই পথে কর্মীদেরকে হতে হয় অবিচল। অবিচলতা আসে ত্যাগের সংকল্পে। আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে যদি ত্যাগের সংকল্প না থাকে তাহলে আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়বে।

আমরা যখন কারবালার দিকে তাকাই, তখন দেখি কারবালার ময়দানের কর্মীদের মধ্যে ত্যাগের সংকল্প ছিল সুদৃঢ়। তাঁরা তাঁদের পরিণতি সম্পর্কে ছিলেন সুনিশ্চিত। আর এই সুনিশ্চিত পরিণতির জন্য তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কিভাবে ত্যাগের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে হয়, তাঁরা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। সেদিনের ঐ বীর সেনানীদের কথা এবং ইমামের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশেই আমরা এর প্রমাণ পেয়ে যাই। ধিরে ধিরে আমরা আমাদের আলোচনা সে দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাবো।

ত্যাগের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি রয়েছে। কারবালায় ত্যাগের সেই প্রকাশভঙ্গিগুলো ছিল আবেগপ্রবন কিন্তু সুস্পষ্ট এবং দ্ব্যর্থহীন। এখন আমরা জানবো কারবালার ময়দানে নির্ভীক সেই শহীদদের ত্যাগের প্রস্তুতি কেমন ছিল।

নিজের অবস্থানের ঘোষণা দেয়া

বিপ্লব যখন পরিণতিতে পৌঁছায় তখন বিপ্লবের কর্মীকে অবশ্যই তার পক্ষ স্বীকার করতেই হবে। যদি মতাদর্শের এই স্বীকারোক্তি না দেয়া হয়, তাহলে বিপ্লবের পক্ষে তার অবস্থান সন্দেহে পতিত হয়। যার কাছ থেকে স্বীকৃতি আসে না, তাকে বিশ্বাসী বলা যায় না। সুতরাং, কোন আন্দোলনের জন্য ত্যাগী ব্যক্তি সেই হতে পারে, যে তার আদর্শের পক্ষে ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণা আমরা বার বার কারবালার ময়দানে ইমামের সৈনিকদের মধ্যে দেখেছি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে তারা নানান সময়ে শত্রæ বাহিনীর সামনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। যেগুলোতে ইমামের পক্ষে তাঁদের অবস্থানের পরিষ্কার ঘোষণা এসেছিল।

৬১ হিজরির ৯বম মহররম। আশুরার হত্যাকান্ডের পূর্ব দিন। সকাল থেকেই উমার বিন স্বাদের বাহিনীতে একে একে সৈন্যদল আসতে শুরু করলো। উমার বিন স্বাদ তখন তার তাবুর সামনে বসে তরবারিতে ধার দিচ্ছিল। এমন সময় সে হঠাৎ সৈন্যদেরকে ইমাম হুসাইনের কাফেলার উপর হামলা পরিচালনার আদেশ দিলো। সবকিছু দেখে ইমাম হুসাইন তাঁর বাহিনীর পতাকাবাহী আবুল ফযল আব্বাসকে বললেন, “তাদের নিকট যাও এবং তারা কেন এসেছে এর কারণ জিজ্ঞাসা কর।” আব্বাস, যুহাইর ও হাবিব-এর সাথে বিশজন ঘোড় সাওয়ারী নিয়ে উমাইয়্যা বাহিনীর নিকট গেলেন এবং তাঁদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। উত্তরে তারা বলল, “আমাদের আমীরের নিকট থেকে নির্দেশ এসেছে, আমরা যেন হয় তোমাদেরকে তার নিকট আত্মসমর্পণে বাধ্য করি নতুবা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি।” আব্বাস বাকি সবাইকে সেই স্থানে রেখে ইমামের নিকট এ ব্যাপারে জানাতে চলে গেলেন। হাবিব বিন মাযাহির উমাইয়্যাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আল্লাহর কসম! আল্লাাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোকগুলো আগামীকাল তাঁর মুখোমুখি হবে, যারা তাঁর রাসুলের পরিবার, বংশ ও আহলে বাইতকে হত্যা করেছে, যারা এই জমিনে সিজদাহকারী এবং রাতের একটি অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করে ও সর্বদা আল্লাহর স্মরণে থাকেন।” এই শুনে ইযরাহ ইবনে কায়েস বলে উঠলো, “তুমি ইচ্ছে করলে যতক্ষন খুশি চিৎকার করতে পার।”

হাবিব বলল, “হে ইযরাহ! ইতিমধ্যেই প্রশংসিত আল্লাহ আমাকে পথ দেখিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর ইযরাহ। আর তাঁদের সমর্থন করো না যারা পথভ্রষ্টটায় নিমজ্জিত হয়ে মাসুমিয়াতকে হত্যায় কেরতে চায়। আল্লাহর কসম! আমি তাঁকে কোন পত্র লিখিনি, তাঁর নিকট কোন দূত প্রেরণ করিনি, এমনকি তাঁকে সমর্থনের কোন প্রতিশ্রæতিও করিনি। আমার যাত্রাপথে তাঁর সাথে দেখা হয়ে যায় এবং তাঁর চেহারা দেখে আমার রাসুল(সা.)-এর কথা মনে পড়ে যায়। তিনি আমার নিকটে আসলেন এবং শত্রæদের কৃতকর্মের ব্যাপারে আমাকে বিস্তারিত জানিয়ে দিলেন। তখনি আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাঁর সাহায্য করার, তাঁর সাথে শামিল হওয়ার এবং তাঁর সুরক্ষা করার; কারণ তোমরা ওয়াদা করেও রাসুল(সা.)-এর শিখানো দায়িত্ব থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়েছ।”

হাবিবের এই বক্তব্য থেকেই বুঝা যাচ্ছিল, কিভাবে কুফুরিয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে ঈমানের প্রমাণ দিতে হয়। কিভাবে নিশ্চিত পরিণতির মুখোমুখি হয়ে নিজের দৃঢ়তাকে প্রকাশ করতে হয়।

আব্বাস ইমামের নিকট ফিরে এসে বিন যিয়াদের বাহিনীর ইচ্ছা স¤পর্কে জানালেন। সব শুনে ইমাম বললেন, “তাদের নিকট যাও এবং অবকাশ হিসেবে তাদের থেকে আজ রাত চেয়ে নাও, যাতে আমরা আল্লাহর ইবাদতে শেষ রাতটি অতিবাহিত করতে পারি, তার দরবারে মুনাজাত করতে পারি এবং তার কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারি, কেননা একমাত্র তিনি জানেন তাঁর ইবাদত, তাঁর নিকট মুনাজাত, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা এবং তাঁর ক্ষমা প্রার্থনাকে আমি কতোটা ভালোবাসি।”

এটাই একটি আদর্শিক আন্দোলনের নেতার বৈশিষ্ট্য। ইমাম যখন শত্রæদের ইচ্ছা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেলেন, তখন তিনি তার প্রভুর নিকট অভিযোগের সিদ্ধান্ত নিলেন। আল্লাহর সান্নিধ্যে রাত অতিবাহিত করে তিনি প্রমাণ করেছেন সুকঠিন মুহূর্তে কিভাবে আল্লাহর উপর আস্থা রেখে এগিয়ে চলতে হয়, যা ছিল তার নানা রাসুল(সা.), পিতা ইমাম আলী ও ভাই ইমাম হাসানের সুন্নত।

আব্বাস আলামদার উমাইয়্যা বাহিনীর নিকট গেলেন এবং ইমামের পক্ষ থেকে তাদেরকে এক রাতের সময় দেয়ার প্রস্তাব করলেন। উমার ইবনে স্বাদ তার সেনা অধিনায়কদের সাথে পরামর্শ করার জন্য উঠে গেলো। আমর বিন আল হাজ্জাজ বলল, “তারা যদি আরবের বাহিরের হতো এবং আমাদেরকে কোন বিষয়ে অনুরোধ করতো, তাহলেও আমরা তাঁদের অনুরোধ রাখতাম।” কায়েস বিন আল-আশআস বলল, “আমার জীবনের পরিবর্তে হলেও তাঁদের প্রস্তাব মেনে নেয়া হোক। তিনি তোমাদের সাথে আগামীকাল যুদ্ধ করবেন।”

কিন্তু মুনাফিক উমার বিন স্বাদ তা বিশ্বাস করতে পারেনি। সে ভেবেছিল হুসাইন যুদ্ধ থেকে বাঁচার জন্য টালবাহানা করছে। তাই সে বলল, “আল্লাহর কসম! আমি যদি নিশ্চিত না হতাম কাল সে যুদ্ধ করবে, তাহলে আমি এই যুদ্ধকে আগামীকাল পর্যন্ত স্থগিত করতাম না।” এরপর সে এই দাবি মেনে নিয়ে ইমামের নিকট বার্তা পাঠাল, “আমরা তোমার সাথে যুদ্ধকে আগামীকাল পর্যন্ত স্থগিত করলাম। যদি তুমি আত্মসমর্পন কর, তবে আমরা তোমাকে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের নিকট প্রেরণ করবো। কিন্তু যদি তুমি অস্বীকার করো, তাহলে তোমাকে জীবিত ছেড়ে দেব না।”

কিন্তু যার ভিতরে খোদার ইমান থাকে না সে ইবাদতের আকর্ষণ সম্পর্কে কি জানে। এ সকল লোকদের উপর আল্লাহর অবতীর্ণ আযাবের মধ্যে অন্যতম আযাব হল, আল্লাহ এ ধরনের লোকদের থেকে তাঁর ইবাদতের স্বাদ তুলে নেন। এরপর তারা ইবাদত করে ঠিকই, কিন্তু সেটা সামাজিক রীতি মানা ব্যতীত আর কিছুই হয় না। তাই তো আমরা সমাজের মধ্যে এমন লোক প্রতিনিয়ত দেখতে পাই, যারা ওয়াক্তি নামাজ আদায় করে, রোজা রাখে, হজ্জ করে কিন্তু দুনিয়ার কোন খারাপ কাজ থেকে বিরত হয় না। যাই হোক, ইবনে স্বাদ ইমামের ইবাদতের অবকাশ চাওয়াকে যুদ্ধ থেকে বেঁচে থাকার অজুহাত হিসেবে ধরে নিয়েছিল।

কিন্তু খোদার ইবাদত যার ব্রত, যার জন্ম হয়েছে কোরআন নাযিলের ঘরে, যার বেড়ে উঠা থেকে শুরু করে শিক্ষাগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে সৃষ্টি জগতের নেতা রাসুলের কোলে-পিঠে এবং যাকে স্বয়ং আল্লাাহ পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন, তাঁর ইবাদতের আগ্রহ সম্পর্কে একমাত্র কাফের ব্যতীত আর কারো সন্দেহ থাকতে পারে না। আর যার পিতা ছিলেন শের-এ-খোদা, যিনি যুদ্ধ বিগ্রহের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন, দেখেছেন পিতা ও ভাইদের বীরত্ব, তাকে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে থাকার ব্যপারে সন্দেহ করা যায় না।

যাই হোক, দিনের সকল কাজ শেষে রাত নেমে আসলো। এই রাত আহলে বাইতের জন্য বিষাদের যাত্রা নিয়ে আসলো। ইমাম’ও তাঁর অনুসারীরা আগামীকালকের একটি অসম যুদ্ধের জন্য অধির অপেক্ষা করছে। তাঁদের এই অপেক্ষা একটি অবিস্মরণীয় ত্যাগের উদাহরণ সৃষ্টির জন্য। তারা জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে। তাঁদের সকলেরই জানা আগামীকাল সকাল সম্পর্কে। কি হবে তা বুঝতে আর কারো বাকি নেই। কারণ, মক্কা থেকে কারবালা পর্যন্ত ইমাম তাঁর বক্তব্যগুলোতে তাঁর অনুসারী ও পরিবারকে এই পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করেছেন। তাই তারা সকলেই মানসিক ভাবে প্রস্তুত। তাঁদের এই মানসিক প্রস্তুতির বিষয় লক্ষ্য করা যায় হাবিব বিন মাযাহিরের কথা থেকেই। তিনি সেই রাতে ছিলেন ভীষণ আনন্দিত। তাকে এই আনন্দের ব্যপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “যার জন্য জান্নাতের হুরেরা অপেক্ষা করে আছে, তাঁর আবার কিসের দুঃখ?” কতোটা সুনিশ্চিত হলে একজন ব্যক্তির পক্ষে এমন উক্তি করা সম্ভব! কেউ কি ভাবতে পারে, এই লোকগুলো সেদিন কোন নেশায় মত্ত হয়েছিল?

আশুরার এই রাতটি ছিল আহলে বাইতের জন্য বেদনার এর অসহ্য কাব্যগাথার ন্যায়। সকলেই প্রিয় স্বজনদের সন্নিকটে থেকে বেদনাবিধুর এই রাতটিকে স্বর্গীয় চেতনায় উপভোগ করছিলেন।

ইমাম তাঁর সকল সাহাবী এবং বনু হাশিমের সদস্যদেরকে তাঁর তাবুতে ডেকে নিয়ে আসলেন। সকলে জড় হলে ইমাম তাদেরকে নসিহতের জন্য বক্তব্য দিলেন। তিনি বলেন, “আল্লাাহর প্রতি সৃষ্টির সমসংখ্যক শুকরিয়া জানাই। প্রশংসা তাঁর, কেননা তিনি আমাদেরকে নবুওত দ্বারা সম্মানিত করেছেন, আমাদেরকে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং আমাদেরকে দ্বীনের ভিত্তি হিসেবে মনোনীত করেছেন। এভাবে তিনি আমাদেরকে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদের মধ্যে শামিল করেছেন। তোমাদের মতো বিশ্বস্ত ও অনুগত সাহাবী আমি ব্যতীত আর কেউ পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর আমার পরিবারের মতো বিশ্বস্ত, অনুগত, সাহায্যকারী ও আত্মত্যাগী পরিবার আর কারো ছিল কিনা আমি জানি না। আল্লাাহ তোমাদেরকে এর উত্তম প্রতিদান দিক। শত্রæরা আমাকে ব্যতীত আর কাউকে চায় না। তোমাদের সাথে তাঁদের কোন কাজ নেই। আমি তোমাদের থেকে আমার বাইয়াত তুলে নিলাম। রাতের এই অন্ধকার তোমাদেরকে আড়াল করে দেবে। তোমরা এই অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে এখান থেকে চলে যেতে পার। তোমরা যদি চাও, তবে আমার পরিবারের সদস্যদের একেক জনের  হাত ধরে নিয়ে যেতে পার। যদি তোমরা এখানে আমার সাথে থেকে যাও তবে তোমরা কেউ এখান থেকে জীবিত ফিরে যেতে পারবে না।”

ইমামের এই বক্তব্যের দিকে তাকালেই আমরা তাঁর আগামীকালের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে পারি। তিনি শত্রæ বাহিনীর অভিপ্রায় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই এমন কথা বলেছেন। আর তিনি চাইছিলেন, যাতে আগামি দিনের ইতিহাস তাকে এই দোষে দুষি করতে না পারে যে, তিনি তাঁর আন্দোলনের জন্য তাঁর অনুসারী ও স্বজনদেরকে বাধ্য করেছেন। বক্তব্যের শেষে তিনি আলো নিভিয়ে ফেলেন এবং সবাইকে তাঁর কাফেলা থেকে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।

এই কথা শুনার সাথে সাথে আহলে বাইতের সদস্যরা আবেগের অতিসহ্যে কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, “আপনাকে ছেড়ে আমরা এখান থেকে কেন চলে যাব? তা কি এজন্য যে, আমরা আপনার পরও বেঁচে থাকব? তাহলে এমন জীবনকে ধিক। আল্লাহ আমাদের সাথে এমনটা না করুক।”

এরপর ইমাম হুসাইন আকিল ইবনে আবু তালিবের সন্তানদের দিকে ফিরে বললেন, “মুসলিমের কুরবানি তোমাদের জন্য যথেষ্ট। তোমরা ইচ্ছা করলে চলে যেতে পার।”

তারা সকলে জবাব দিল, “আল্লাহ না করুক। লোকেরা কি বলবে? তারা এই বলবে যে, আমাদের ভাই শত্রæদের তরবারির আঘাতে জর্জরিত হয়েছে আর আমাদের জীবন থাকতে আমরা এর কোন প্রতিবাদ বা প্রতিহত করিনি। তাঁর বিপদের সময় তাঁর পাশে থাকিনি, যে ছিল আমাদের শ্রেষ্ঠ ভাই! আল্লাহর কসম আমরা এমনটা কখনও করবো না। অবশ্যই আমরা আমাদের পরিবার, সম্পদ এবং জীবন আপনার জন্য কুরবান করতে প্রস্তুত। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা আপনার পাশে থেকে আপনার সুরক্ষা করে যাব। আপনি ব্যতীত বেঁচে থাকা কতোই না মন্দ।”

মুসলিম ইবনে আওসাজাহ

“আপনি আমাদেরকে আপনাকে ত্যাগ করে চলে যেতে বলছেন? আর এই অবস্থায় আল্লাহর সামনে হাজির হতে বলছেন? এরপরে আর কোন মুখ নিয়ে আল্লাাহর সামনে দাঁড়াবো? আপনার অধিকারের ব্যাপারে যখন তিনি আমাদেরকে প্রশ্ন করবেন তখন আমরা তাকে কি জবাব দিব? আল্লাহর কসম আমরা কখনও আপনার পক্ষ থেকে আমাদের হাত সরিয়ে নিবো না। আমি শত্রæদেরকে ব্যাপক আক্রমন করবো। আমার তরবারি দ্বারা তাদেরকে আঘাত করবো। যতক্ষন এই হাতে তরবারি থাকবে ততক্ষন আপনার সুরক্ষার দায়িত্ব থেকে আমি নিবৃত হব না। আল্লাাহর কসম! যদি আমাকে হত্যা করা হয় এবং এরপর জীবিত করা হয় এবং এভাবে আমাকে সত্তরবার জীবন দেয়া হয়, তবুও আমি কোন জীবনের বিনিময়ে আপনার পক্ষ ত্যাগ করবো না।”

যুহায়ের বিন কাইন উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “আল্লাহর কসম! যদি আমাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হাজার বার জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন তবুও আমি আপনার পাশে থাকা থেকে বিরত হবো না। আমি জানি না আপনার থেকে  প্রিয় এই মুহূর্তে আমার জীবনে আর কেউ আছে কিনা।”

এরপর সকলেই সমস্বরে ইমামের সঙ্গ ত্যাগ না করার প্রতিজ্ঞা করে বক্তব্য দিতে থাকে। তাঁদের মধ্যে একজন বলল, “হে আমার মাওলা! যদি আপনি আমাকে আপনার থেকে দূরে ঠেলেও দেন তবুও আমি আপনার কাছ থেকে সরে যাবো না। ঘুরে ঘুরে আপনার দুয়ারেই ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে আসবো। যদি এ অন্তর থেকে আপনার ভালোবাসা মুছে ফেলি তবে আর কার হৃদয়ে আশ্রয় নেব, আর কাকে ভালবাসবো। আমরা আপনার পাশে থেকে যুদ্ধ করবো এবং আপনার আদর্শের জন্য লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে যাবো।”

সকলের আবেগপূর্ণ কথা শুনে ইমাম তাঁর আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। অশ্রæ সজল নয়নে তিনি বললেন, “নিশ্চই আমি আগামীকাল শহীদ হব এবং তোমাদের মধ্যে কেউ আগামীকাল জীবিত থাকবে না।”

এরপর ইমাম শত্রæদের আকস্মাৎ আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য প্রত্যেক তাবুর সামনে একজনকে পাহারায় বসালেন। এরপর তিনি বোন যয়নবের তাবুতে প্রবেশ করলেন। বিবি যয়নাব  ইমামকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপনি কি আপনার সাহাবীদের ইচ্ছা সম্পর্কে জেনেছেন? আমার ভয় হয় যদি তারা আক্রমনের শুরুতে আপনাকে পরিত্যাগ করে তখন কি হবে।” ইমাম বললেন, “আল্লাাহর কসম! আমি তা জেনেছি এবং তাদেরকে সাহসী এবং নির্ভীক হিসেবে পেয়েছি। তারা শাহাদাতের জন্য আমার চাইতেও অধিক আগ্রহী।”

ইমাম তাঁর বোন যয়নাবকে সান্তনা দিয়ে বললেন, “বোন আমার! আগামীকাল আমাদের শাহাদাতের দিন। কাল তোমাকে ধৈর্যের চরম পরীক্ষা দিতে হবে। মনে রেখো! আমার পর তুমি থাকবে বনু হাশিমের সহায়। তুমি হিম্মত হারাবে না। আমার শোকে নিজের মৃত্যু কামনা করবে না। সবাইকে এক সাথে রাখতে চেষ্টা করবে। সকল মুসিবতে নিজেকে সামলে রাখার প্রচেষ্টা করবে। মনে রেখো! আমরা সকলেই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি এবং তারই দিকে ফিরে যাবো। সকলকে একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। শয়তান যাতে তোমাকে পথভ্রষ্ট করতে না পারে। আল্লাহর সাহায্য থেকে বিস্মৃত হয়ো না।”

এরপর ইমাম হুসাইন ইবাদতে মশগুল হয়ে গেলেন। বিবি যয়নব কোনভাবেই স্বস্তি পাচ্ছিলেন না। ভাইয়ের দুশ্চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলল। তিনি সকলের তাবুর কাছে গিয়ে আড়ালে শুনছিলেন তাঁদের কথা-বার্তা। প্রথমে তিনি গেলেন হাবিব বিন মাযাহিরের তাবুতে। সেখানে তিনি তাঁর গোত্রের লোকদের নিয়ে আলোচনা করছেন কিভাবে আগামীকাল তাঁর ইমামকে সাহায্য করবে। হাবিব বিন মাযাহির তাদেকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আমরা সবাই ইমামকে শত্রদের থেকে সুরক্ষা করার শপথ করেছি। মনে রেখো! এ থেকে আমরা মোটেই বিচ্যুত হতে পারবো না। যেন আমাদের পূর্বে বনু হাশিম ময়দানে না নামে। আমাদের একজনও বেঁচে থাকতে যদি বনু হাশিমের কেউ যুদ্ধে নেমে আসে তাহলে আগামীদিনের ইতিহাস আমাদেরকে এই বলে দায়ী করবে যে, আমরা মৃত্যু ভয়ে বনু হাশিমদেরকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছি।”

সকলেই তখন হাবিব বিন মাযাহিরকে নিশ্চিত করে বলল, “আপনি নিশ্চিত থাকুন হে হাবিব! আমরা আমাদের মাওলার সুরক্ষা থেকে এক পাও পিছিয়ে থাকবো না। আমাদের দেহে এক বিন্দু রক্ত থাকতেও হুসাইন ও তাঁর পরিবারকে যুদ্ধে নামতে দেবো না।”

এরপর বিবি যয়নব মুসলিম ইবনে আকিলের পরিবারের তাবুর কাছে গেলেন। তিনি শুনলেন সেখানে তারা সকলে বলছে, “আমরা হুসাইনের জন্য মুসলিমের কুরবানিকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছি। এখন আমাদেরকেও মুসলিমের পথে হাঁটতে হবে। আগামীকালের যুদ্ধে আমরা আপ্রাণ হুসাইনকে সুরক্ষা করে যাবো। আমাদের মধ্যে একজনও বেঁচে থাকতে আমরা হুসাইনকে ময়দানে নামতে দেবো না।”

এতে বিবি যয়নব আশ্বস্ত হলেন এবং বুঝতে পারলেন যে, আগামীকাল এদের মধ্যে কেউ ইমামকে একা রেখে পালিয়ে যাবে না।

এরি নাম প্রস্তুতি। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এই প্রস্তুতি যদি না থাকে তাহলে ময়দানে বিপ্লবের কর্মীরা পরাজিত হবেই। আমরা বিংশ শতাব্দীর একটি বিপ্লব সম্পর্কে জানি। যে বিপ্লবে কুরবানির অনুপম উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিপ্লবেও কোন কর্মী পিছিয়ে পড়েনি। সমুদ্রের ঢেউ যেমন একটার উপর আরেকটি ঝাঁপিয়ে পড়ে তেমনি ইরানেও সেদিন কেউ পালিয়ে যায়নি। জালিম শাহের গোলাবারুদের মুখোমুখি হয়ে তারা অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছিল। কারবালায় আমরা এমন ঘটনাই দেখেছি। তাঁদের প্রস্তুতি ছিল পরিপূর্ণ। তারা তাঁদের পরিণতি সম্পর্কে ছিল নিশ্চিত। আর ইমামের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা ছিল অদম্য এবং আন্দোলনের সাথে তারা ছিলেন একান্ত। তাই তারা শহীদ হয়েও সফল। কারবালার যুদ্ধে আমরা কোন গাজীর উদাহরণ পাই না। কিন্তু তাঁরা শহীদ হয়েও লক্ষ লক্ষ গাজির জন্ম দিয়েছে। একটি পরাজয় ইতিহাসে হাজারও জয়ের ইতিহাস রচনা করেছে।

সুতরাং, আমাদের প্রস্তুতি হতে হবে তাঁদের মতো। আমাদেরকে তাঁদের মতো আমাদের লক্ষ্য স্থির করে নিতে হবে এবং সেই লক্ষ্য পানে আপ্রাণ এগিয়ে যেতে হবে। কারণ, যদি কোন লক্ষ্য না থাকে তাহলে ইমাম-এ-জামানের পথে এগিয়ে চলা সম্ভব নয়। ইমাম-এ-জামানার লক্ষ্যের সাথে নিজের লক্ষ্যকে একাকার করে নিজেকে বিলীন করে দিতে হবে। তবেই আমরা কারবালার সেই পরাজিত যুদ্ধ থেকে হুসাইনের হারিয়ে যাওয়া বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবো।

আজ আমাদের সামনে উমাইয়্যারা নেই। কিন্তু সেই একদল পাপাচারি উমাইয়্যা আজ লক্ষ কোটি উমাইয়্যার জন্ম দিয়েছে। সেই উমাইয়্যাদেরকে পরাজিত করেই আমরা ছিনিয়ে আনবো নবীর আহলে বাইতের বিজয়। কারণ, ইমাম-এ-জামান তাঁর প্রতীক্ষায় সেই দৃঢ় সংকল্পের কর্মীর অপেক্ষায় ১১৭৯ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। আরও কতো কাল তিনি আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে থাকবেন, তা আমাদের জানা নেই। শুধু এতটুকু জানি, আমাদেরকে কারবালার অনুসরণের সেই পথে ইমামের আগমনের ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করতে হবে। এর দ্বারাই কারবালার সাথে যুক্ত হবে আরেকটি রক্তিম বিজয়। সেই অনাগত বিজয়ের মিছিলে ইমামকে অভিবাদন জানিয়ে এ লেখা শেষ করছি।

সাত: কারবালার সতন্ত্র অধ্যায় যায়নাব বিনতে আলী

যয়নাব ইমামতের ধারার সেই ফুলের নাম, যার স্মরন তাঁর ভক্তদেরকে তৃপ্ত করে। এই নামটির সাথে জড়িয়ে আছে, আমাদের আবেগ ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের সবচাইতে মুল্যবান অধ্যায়গুলো। যতবারই আহলে বাইতের সদস্যদের জীবন বিশ্লেষণ করতে গিয়েছি, আমরা অবাক হয়ে দেখেছি তাঁরা প্রত্যেকেই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আরেকটি পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা তাঁদের কথায় শোভন অথচ দৃঢ়। চরিত্রে সুমধুর অথচ জুলুমের বির”দ্ধে সোচ্চার। এরা প্রত্যেকেই যেন একটি জাতির সমতুল্য। আর এই মহান পরিবারের আরেকটি অমুল্য মনি হলেন হজরত জয়নাব বিনতে আলি।

যয়নাব বিনতে আলির সাথে কারবালার অমর গাঁথা এমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে যে, তাঁর থেকে কারবালাকে আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ আমাদের নেই। কারবালার যুদ্ধ যয়নাব বিনতে আলির জীবনে এমন প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, যা তিনি বয়ে চলেছিলেন জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত। কারবালার সেই মর্মন্তুদ হত্যাকান্ড তাঁকে এতটা দুর্বল করে দিয়েছিল যে, আশুরার দিন সন্ধ্যায় তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে পারেননি। ইমাম জয়নুল আবেদিন বর্ণনা করেছেন যে, “আমার ফুফু যয়নাব তাঁর সকল সালাত দাঁড়িয়ে আদায় করতেন। কিন্তু আশুরার দ্বীন সন্ধ্যায় তাঁকে আমি বসে বসে সালাত আদায় করতে দেখেছি।”

কারবালার সেই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় বিবি যয়নাব ছিলেন সকল কিছুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তিনি শত্রæদের চরম নিষ্ঠুরতা নিজের চোখে দেখেছেন। কারবালার যতটুকু ইতিহাস আমাদের সামনে আজ আছে তার শতভাগ অবদান এই মহীয়সী নারীর। সেখানে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন প্রিয় ভাইয়ের সাহাবীদের হত্যাকান্ড, আহলে বাইতের সদস্যদের হত্যাকান্ড এবং যুদ্ধ শেষে আতংকিত নারী শিশুদের দিক বিধিক ছুটে চলা। সেই দুঃসহনিয় পরিস্থিতিতে তিনি আহলে বাইতের নারী ও শিশুদেরকে আগলে রেখেছেন, যেমন ভাবে সন্তানের বিপদে মা আগলে রাখেন। অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন তিনি সেদিন। আমরা তাঁর সেই সাহসী ভুমিকার কিছু ঘটনা বর্ণনা করবো।

যায়নাব আহলে বাইতের সেই অংশ যার তুলনা শুধুমাত্র মা খাদিজা, মা ফাতিমার সাথেই করা যায়। তাঁর মায়েদের ইসলামের রক্ষায় যে ভ‚মিকা ছিল তিনিও ঠিক সেই ভুমিয়াই পালন করেছিলেন। কারবালা যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বিবি যায়নাব মায়ের মমতা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন ইমামের পরিবারকে। তাঁর উপস্থিতি আহলে বাইতের অবশিষ্ট সদস্যদেরকে অন্ধকারে আলো দেখিয়েছিল। এমনটা আমরা সবসময় দেখেছি। যখনই যালিমেরা ইসলামেরা মৌলিক ভিত্তির উপর প্রবল আক্রমণ চালিয়েছে তখনই মা খাদিজা এবং মা ফাতিমা তাঁদের সর্বশক্তি দিয়ে ইসলাম রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বিবি যায়নাব তাঁদের ব্যতিক্রম করেননি।

কারবালার ইতিহাস আলোচনার পূর্বে আমি আপনাদের সামনে বিবি যায়নাবের সংক্ষিপ্ত জীবনী আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করছি। তাঁর জীবনে অতিবাহিত করা বেদনাগুলো জীবনের প্রারম্ভ থেকেই হযরত যয়নাব দুর্ভাগ্যেও বিপরীতে নিজেকে অবিচল রেখেছেন। প্রথমেই তিনি হারিয়েছেন তাঁর নানা রাসূল(সা.)-কে যিনি তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। এরপর তিনি দেখেছেন, রাসূল(সা.)-এর ওফাতের তৎপরবর্তী ভয়ংকর ঘটনা, যা তাঁর পিতামাতাকে হতবাক করেছিলো। তাঁর পিতাকে সেই অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিলো, যা আল্লাহ এবং রাসূল(সা.) তাঁর জন্য নির্ধারন করেছিলেন। লোকেরা তাঁর মায়ের সাথে কঠোর ব্যবহার করেছিলো, যার দর”ন তিনি অশালেই মৃত্যুবরন করেন। এরপর তিনি তাঁর ভাই ইমাম আল-হাসানের সাথে কুফার জনগনের ধোঁকাবাজি দেখেছেন, যা তাঁকে ইসলাম ও আহলে বাইতের চিরশক্র মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধিচুক্তি করতে বাধ্য করেছিলো।

এর কিছু বছর পরই, তাঁর ভাইকে বিষপ্রয়োগে খুন হতে দেখেছেন। তিনি তাঁর ভাই ইমাম আল-হাসানকে রক্ত বোমী করে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন।

৬১ হিজরি, ১০ই মহরম, তিনি প্রতক্ষ করেছেন, তিক্ততর দুর্ঘটনা। তিনি তাঁর ভাই ইমাম আল-হোসাইনকে সকল সমর্থক ও সাহায্যকারী হারিয়ে অসহায় অবস্থায় দেখেছেন। হীনমন্য সৈন্যদের তরবারী সেদিন যুবক, শিশুদেরকেও রেহাই দেয়নি। এসকল অসহ্য যন্ত্রনার সামনে হযরত যায়নাব অনঢ় পর্বতের ন্যায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। সহিষ্ণতার অস্ত্র দিয়ে তিনি এসব কিছুর মোকাবেলা করেছিলেন এবং দৃঢ় প্রত্যয়ে সব ঘটনা প্রতিহত করেছিলেন। তখন তিনি শুধু এই আয়াত তেলাওয়াত করেছিলেন:

“আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না। তাঁর জন্যই আসমানসমূহে যা রয়েছে তা এবং যমীনে যা আছে তা। কে সে, যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি জানেন যা আছে তাদের সামনে এবং যা আছে তাদের পেছনে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের সামান্য পরিমাণও আয়ত্ব করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও যমীন পরিব্যাপ্ত করে আছে এবং এ দু’টোর সংরক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান। দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই। নিশ্চয় হিদায়াত স্পষ্ট হয়েছে ভ্রষ্টতা থেকে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের বন্ধু, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী করে, তাদের অভিভাবক হল তাগূত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যায়। তারা আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” (সূরা বাকারা, ২:২৫৫-২৫৭)

আল্লাহর শক্রদের সামনে দৃঢ়তা ও সহিষ্ণতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি রাসূল(সা.)-এর নাতনীর যথার্থতা প্রকাশ করেছিলেন।

এবার আমরা ফিরে যাব কারবালার প্রান্তরে, যেখানে আহলে বাইত এবং তাঁদের অনুসারীরা অকাতরে তাঁদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল, আর যায়নাব বিনতে আলী এসকল যন্ত্রনার সাক্ষী হিসেবে প্রত্যক্ষ করছিলেন। অসীম সাহসিকতা আর ধৈর্যের পাহাড় বুকে বেঁধে বিবি যায়নাব এসকল হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য অবলোকন করছিলেন। আমরা বিবি যয়নাব বিনতে আলীর সাহসী সেই ভ‚মিকাগুলোর কথা তুলে ধরবো। সেখানে স্বীয় ভাইদের শাহাদাত, তৃষ্ণার্ত নারি-শিশুদের আর্তনাদ, হায়েনাদের আকস্মাত আক্রমনে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া আহলে বাইতের সকলের এদিক সেদিক ছুটোছুটি, প্রজ্বলিত তাবুর মধ্যে ভীতসন্ত্রস্ত শিশুদের তাঁকে আড়াল করে দাঁড়ানো। এসকল ঘটনাগুলো তিনি দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করেছেন এবং আহলে বাইতের মায়ের ভ‚মিকা পালন করে অবশিষ্ট পরিবারকে আগলে রেখেছেন।

ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে, উমাইয়্যা বাহিনী ইমাম-কে হত্যার পর গনিমতের মাল সংগ্রহের জন্য যখন ইমামের তাবুর প্রতি হামলা করে এবং ইমাম যয়নুল আবেদিন-কে হত্যার জন্য উদ্যত হয়, তখন বিবি যায়নাব ভাইয়ের স্মৃতিকে বাঁচানোর জন্য তরবারির সামনে এসে দাঁড়িয়ে যান। একটু ভেবে দেখুন, পরাজিত দলের সদস্যরা কতোটাই বা সাহসি হতে পারে! বীজিতদের চোখের দিকে তাকিয়ে হুংকার দেয়ার মতো সাহস কোন পরাজিত দল রাখতে পারে? কিন্তু কারবালার প্রান্তরের সেই পরাজিত দলটি কিন্তু এই স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীত ছিল। এই নির্মম হত্যাকান্ড তাঁদের অন্তরে মোটেই ভীতির সঞ্চার করেনি। প্রতিটি শাহাদাত তাদেরকে যেন করে দিয়েছিল আরও দুর্জয়। বিদ্রোহের বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারে ভেসে চলেছিল সেদিন আহলে বাইতের সকলেই। কারণ, এটা সেই পরিবার যাঁদের কাছে আল্লাহ্র ঐশী বাণী এসেছিল। এই পরিবার বহন করে চলছে রাসুল(সা.)-এর রক্ত। ফাতিমা ও ইমাম আলী’র ইমানি চেতনা যে পরিবারের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত রয়েছে, তাঁদের সাহসিকতার সামনে পৃথিবীর সকল সাহসিকতাই ¤¬ান হয়ে যায়। সেই সাহসিকতার পূর্ণ উদাহরণ ছিলেন বিবি যয়নাব। শিমর-এর তরবারির সামনে দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলেছিলেন: “খবর্দার! তাঁকে হত্যা করার পূর্বে তোমাদের আমাকে হত্যা করতে হবে। বিবি যায়নাবের রক্ত চক্ষুর দিকে তাকিয়ে শিমর নিবৃত হয়। ইমামতের অনুসারীরা শুধু এই কারনেই বিবি যয়নাবের প্রতি আজীবন ঋণী হয়ে থাকবে। তাঁর সেদিনের অসীম সাহসিকতা ইমামতের ধারাকে প্রবাহিত করেছিল। শোষণের মূলোৎপাটনের সংকল্প নিয়ে আজ যে আমরা একত্রীত হয়েছি, তা শুধু বিবি যয়নাবের সেদিনের সাহসিকতারই অবদান।

আশুরার পূর্ব রাতের ঘটনা

সেই রাতে, নারীরাও ছিলো সম্পূর্নরুপে আতক্কিত ও বেদনার্ত। তারা এক মুহূর্ত ও স্থির হতে পারলো না। কারন, তাদের নেতা ইমাম আল-হোসাইন, রক্ষক আবুল ফজল আব্বাস ও পরিবারের পুরুষদের হত্যার পর তাদের উপর বয়ে যাওয়া যন্ত্রনাদায়ক পরিস্থিতির ব্যাপারে তাঁরা ধারনা করতে পারছিলেন। অথচ, কান্না ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা ব্যতীত তাদের কাছে আর কোন অস্ত্র নেই।

তাদের মধ্যে সবচাইতে ব্যতিথ ছিলেন তাদের নেত্রী হযরত যয়নাব, যিনি সকলকে মনোযোগের সাথে দেখাশুনা করছেন এবং তিনি জেনেছেন যে, সকল দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। তিনি আরো জানেন যে, আগামী কালের কলংকিত দিনে, তাঁর পরিবারের কোন পুরুষই জানেন যে, আগামী রাতে তিনি ভাইয়ের সাহাবী ও হাশেমী গোত্রের তাবুগুলোর মাঝে গেলেন। ভাই আবুল ফজল আব্বাসের তাবুর পাশে গিয়ে শুনতে পেলেন। ভাই হাশেমী গোত্রের যোদ্ধাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন।

আল-আব্বাস বললেন, “ভাই, ভাতিজা ও চাচাতো ভাইয়েরা! কাল সকালে তোমরা কি করবে?”

“আপনি আদেশ দিন, আমরা তা পালন করবো”, তারা বললো।

আল-আব্বাস বললেন, “আমাদের অনুসারী ও সমর্থকেরা আমাদের আত্তীয় নয়, তাই আমাদেরকেই এই বোঝা বহন করতে হবে। আগামী সকালে, আমরা প্রথমে যুদ্ধ করবো এবং আমাদের অনুসারীদের পূর্বে শহীদ হবো, যাতে লোকেরা আমাদেরকে দায়ী করতে না পারে।”

সকলে একসাথে বলে উঠলো, “আমরা আপনার সাথে একমত।”

হযরত যায়নাব আশ্বস্ত হলেন এবং সাহাবীদের তাবুর কাছে গেলেন। তারা সকলে হাবীব বিন মুযাহিরের তাবুতে একত্রিত হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “হে সাথীরা! আগামীকাল সকালে তোমরা কি করবে?”

তারা বললো, “আপনি আদেশ করুন, আমরা পালন করবো।”

হাবীব বললেন, “আগামী সকালে, আমরা প্রথমে যুদ্ধ করবো এবং মৃত্যুতে হাশেমীদের অগ্রবর্তী হবো। কোন হাশেমীকে রক্তাক্ত দেখা, আমাদের উচিত হবে না। অন্যথায়, লোকেরা আমাদেরকে দায়ী করবে এবং বলবে যে, আমরা আমাদের প্রান বাঁচাবার জন্য, হাশেমীদেরকে আমাদের পূর্বে যুদ্ধ করতে দিয়েছি।”

সকলে বললো, “হাবীব, আমরা তোমার সাথে একমত।”

হযরত যয়নাব বুঝতে পারলেন যে, সাহাবীরা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত ইমামকে পরাজিত হতে দেবে না। তিনি তখন ইমাম আল-হোসাইনের তাবুতে গেলেন এবং তাঁকে এ বিষয়ে জানালেন। ইমাম তাঁদেরকে এজন্য ধন্যবাদ দিলেন এবং হযরত যয়নাবকে বললেন যে, তাদেরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কবুল করেছেন।

ইমামের শাহাদাত ও তৎপরবর্তী ঘটনা

একে একে সকল সাহাবি ও পরিবারের সদস্যরা শহিদ হয়ে গেলেন। পতাকাবাহি আব্বাস শহিদ হলেন। সন্তান, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, অনুসারী সকলেই ইমামের প্রতি ভালোবাসার নজরানা হিসেবে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। এখন শুধু তিনিই বেঁচে আছেন। একা নিঃসঙ্গ ইমাম ধূসর মরুপ্রান্তরের সেই নিষ্ঠুর ময়দানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চোখে মুখে খোদার ও প্রিয় নানার সান্নিধ্যের অমিয় আকাংক্ষা নিয়ে ইমাম যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

স্বীয় সৌর্য ও অভূতপূর্ব দৃঢ়তা নিয়ে, ইমাম আল-হোসাইন যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যস্থানে, সম্পূর্ন একাকী, চারপাশে শক্রদ্ধারা ঘেরাও হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বর্বর শক্রদলের মধ্যে প্রায় সকলেই তাঁর সাহসীকতায় অবাক হয়েগিয়েছিলো, যাদের মধ্যে অনেকেই তাদের বিস্ময় চাপিয়ে রাখতে পারেনি। এতোকিছু স্বত্তেও, ইমাম শক্রদেরকে আক্রমন করলেন এবং অনেককে হত্যা করলেন।

এরপর তিনি শেষ বিদায় নেয়ার জন্য এবং নারীদেরকে দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য তাবুতে ফিরে আসলেন। তিনি ধৈর্য্য ও দৃঢ়তায় আল্লাহর উপর ভরসা করার নির্দেশ দেন। এরপর, তিনি বোন হযরত যয়নাব এর দিকে ফিরলেন এবং ধৈর্য্য ধারন আর অশ্রæ ও উত্তেজনাকে দমন করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার নির্দেশনা দেন। অবশেষে, তিনি হযরত যয়নাবকে নারী ও শিশুদের নেতৃত্ব গ্রহনের নির্দেশ দেন।

যুদ্ধ ময়দানে যাওয়ার প্রক্কালে, ইমামের পরিবারের নারীও শিশুরা অশ্রæ সজল নয়ন ও ব্যতিথ হৃদয়ে তাঁকে ঘিরে খরলো। ভীষনভাবে অসুস্থ, আলী যয়নুল আবেদীন ফুফু হযরত যয়নাবকে একটি লাঠি ও তরবারী দেয়ার অনুরোধ করেন, লাঠি সোজা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য আর তরবারী স্বীয় পিতাকে রক্ষা করার জন্য। তাঁর এহেন অবস্থা দেখে, ইমাম আল-হোসাইন ইমাম যয়নুল আবেদীন-কে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার থেকে নিবৃত করার জন্য বোনকে অনুরোধ করেন। হযরত যয়নাব ইমাম যয়নুল আবেদীন-কে জোরপূর্বক যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া থেকে নিবৃত করেন।

পরিবারের প্রতি সর্বশেষ ওসিয়ত

কষ্ট সত্যের পোশাক পরিধান কর, দুর্ভোগ মোকাবেলায় নিজেদেরকে প্রস্তুুত রাখ এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি সম্পূর্ন আতœসমার্পন কার পরিবারের প্রতি ইমামের সর্বশেষ কথাগুলো ছিলো, “আসন্ন দূর্ভাগ্যের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুুত কর। তোমাদের জন্য উচিত যে, আল্লাহ তোমাদেরকে শক্রর অমঙ্গল থেকে হেফাজত ও রক্ষা করবেন, তিনি তোমাদেরকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করবেন, তোমাদের শক্রদেরকে ভয়ংকর শাস্তি প্রদান করবেন, এই ত্যাগের জন্য তাঁর অপরিসীম অনুগ্রহ ও রহমতের দ্বারা তোমাদেরকে পুরস্কৃত করবেন। তাই, তোমাদের মানহানী হয় এমন কোন অভিযোগ বা দাবী করে বসবেনা।”

এরপর ইমাম আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করে তাঁর আসন্ন দুর্ভাগ্যের ব্যাপারে প্রভুর নিকট অভিযোগ করলেন। তিনি বললেন: “হে খোদা, আমি তোমার ইচ্ছার উপর ধের্য্য ধারন করেছি। তুমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। তুমি অসহায়ের ও যাহায্য প্রার্থীর আশ্রয়। তুমি ব্যতীত আমার কোন প্রভু নেই। তোমার বিধানের প্রতি আমি ধৈর্য্য অবলম্বন করেছি। তুমি আশ্রয়হীনের সাহায্যকারী। তুমি চিরস্থায়ী স্বত্তা। তুমি সকল জীবনের প্রত্যেক অর্জনের দ্রষ্টা। আমাদের মধ্যে ফয়সালা কর, আর তুমি সর্বোতকৃষ্ট ফয়সালাকারী।

সকল দিক থেকে, পাপাচারী, অপবিত্র উমাইয়্যা বাহিনী ইমাম আল-হোসাইনের উপর আক্রমন করলো, তারা তরবারী ও বর্ষার আঘাতে ইমামের পবিত্র দেহ বিদীর্ন করে ছিলো।

যখন তিনি নিথর হয়ে মাটিতে পড়েছিলেন, তখন উমাইয়্যাদের মধ্য থেকে এক পাপিষ্ট তাঁকে হত্যা করলো। ফলে তিনি সেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।

এই অবস্থা দেখে, হযরত যয়নাব তাঁর তাবুর সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে আর্তনাদ করতে লাগলেন। তিনি চিৎকার করতে লাগলো, “শোক, আমার ভাইয়ের জন্য! শোক, আমার নেতার জন্য, শোক, আমার অবশিষ্ঠ পরিবারের জন্য ! যদি জমিনে আমার নাযিল হতো! যদি আল্লাহর পাহাড়গুলো টুকরো টুকরো হয়ে সমতল ভূমি হয়ে যেতো।”

এরপর উমার বিন সা’দের প্রতি চিৎকার করে বলেন, “কিভাবে তুমি আবু আব্দুল্লাহকে নিহত হতে দেখতে পারলে?”

প্রতি উত্তর হিসেবে অভিশপ্ত উমার হযরত যয়নাব থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। এই অবস্থা বেশিক্ষন সহ্য করতে না পেরে, হযরত যয়নাব নারী ও শিশুদেরকে স্বান্তনা দেয়ার জন্য তাবুতে ফিরে গেলেন। কারন, তারা এখন সহায়হীন হয়ে গেছে।

এরপর উমার বিন সা’দ ইমাম-কে গত্যার আদেশ দিলে শিমর ব্যতীত আর কেউ রাজী হলো না। সে ইমামের নিথর দেহের দিকে এগিয়ে গেলো এবং ইমাম-কে শির:চ্ছেদ করলো।

ইমামের ঘোড়া (দুলদুল) গগন বিদারী হ্রেসা ধ্বনি করতে লাগলো এবং লাথি মেওে শক্রকে মরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলো। তার মুখে ইমামের রক্তে মাখামাখি হয়ে গেলো এবং ঘোড়াটা তাবুর দিকে ফিরে গেলো।

হযরত যয়নাব ইমামের পবিত্র দেহের দিকে দৌড়ে গেলেন এবং দেখলেন কিভাবে পথভ্রষ্ট পাপিদের তরবারী ও বর্ষা তাঁর দেহকে ছিন্ন-বিচিন্ন করেছে। শক্রদের ঘেরাও থাকা স্বত্তেও তিনি মর্যাদা ও সন্মানের সাথে ইমামের দেহের সামনে দাঁড়ালেন এবং এমন ভাবোক্তি করলেন যা পবিত্র ইমানী চেতনা ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি মনোযোগের থেকে নি:সরিত হয়ে থাকে। তিনি বলেন, “হে খোদা! আমাদের এই কোরবানী কবুল করুন।”

হযরত যয়নাব এই দূর্ভাগ্যকে সহিষ্ণুতার মাধ্যমে গ্রহন করেছেন, কারন, এটা ছিলো আল্লাহ্র জন্য এবং দ্বীনকে তার পবিত্র ও আসল রুপে অটুট রাখার জন্য, যেমনটা তা স্বর্গ থেকে নাযিল হয়েছিলো। এই কথাচির দ্বারা, তিনি নবুওতী উত্তরাধিকারের প্রকৃত অর্থ প্রকাশ করেছেন এবং পিতার ওসীয়ত অনুযায়ী অধ্যবসায়ের বহি:প্রকাশ করেছিলেন।

ইমাম-কে হত্যা করার পর, উমাইয়্যা বাহিনীর পাপিষ্ট সৈন্যরা সেনাপতির আদেশ অনুযায়ী মশাল তলে নিলো এবং ইমাম কাফেলায় আগুন জ্বালানোর জন্য এগিয়ে গেলো।

তাবুগুলোতে আগুন জ্বালানোর পর, নারী শিশুরা অসহায়ের মতো তাবু থেকে বেরিয়ে আসতে লাগলো। রাসূল(সা.)-এর পরিবারের হতবিহবল নারীরা এক তাবু থেকে আরেক তাবুতে ছুটোছুটি করতে লাগলেন। আর ভীত সন্ত্রস্ত শিশুরা তাদের অবিভাবক হযরত যয়নাবকে আড়াল করে লুকানোর চেষ্টা করছিলো। অনেকেই উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক সেদিক দৌড়াতে লাগলো।

এই সময়গুলো ছিলো নবী পরিবারের অতিক্রান্ত দূর্ভাগ্যগুলোর মধ্যে নিষ্ঠুরতম। তাই, ইমাম যয়নুল আবেদীন তাঁর সারাজীবন এই সময়গুলো ভুলতে পারেননি: বেদনাভরা উক্তিতে তিনি এই সময়গুলো স্মরন করতেন, “যখনই আমি আমার ফুফু ও বোনদের দিকে তাকাই, আমার চোখ দিয়ে অশ্রæ বয়ে যায়। আমার মনে পড়ে যায়, শক্রদের চিৎকার শুনে তারা এক তাবু থেকে আরেক তাবুতে ছুটো ছুটি করছে, “বিদ্রোহীদের গৃহ আগুন দ্বারা পুড়িয়ে দাও।’

রাত নামলো, আর এটি ছিলো রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতের জন্য নিষ্ঠুরতায় পূর্ন এক রাত। এত কিছুর পরও, হযরত যয়নাব নারী পরিবারের অসহায় নারী ও শিশুদের নেতৃত্ব গ্রহন করলেন এবং শিশুদেরকে জনমানবহীন বিরান মরুভূমিতে একত্রিত করলেন। নানান কথার দ্বারা তিনি তাদেরকে স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন; অথচ তখনও তাদের পিতা ও ভাইদের লাশ সে স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো আর শক্র বাহিনী নারী ও শিশুদেরকে ঘিরে রেখেছিলো। এই নিষ্ঠুর রাতে, হযরত যয়নাব সকল শক্তি একত্রিত করে প্রাপ্ত যন্ত্রনা ও দুর্ভোগের জন্য আল্লাহর দরবারে শোকরানা নামাজ আদায় করলেন। আহলে বাইতের এই কোরবানী কবুল করার জন্য তিনি আল্লাহর নিকট সবিনয় প্রার্থনা করলেন।

পরদিন, উমাইয়্যা সৈন্যরা নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করে কুফায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। নারীরা সৈন্যদের কাছে ইমাম ও অন্যান্য শহীদদের মৃতদেহের পাশ দিয়ে তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করলো। ইমাম আল-হোসাইনের ক্ষত বিক্ষত দেহের প্রতি দৃষ্টি পড়ার সাথে সাথেই, হযরত যয়নাব দু:খ পিড়িত কন্ঠে বলে উঠেন :

“ও মুহাম্মদ! স্বর্গের মালিক তোমার প্রতি রহম করুন! এই হলো হোসাইন! সে স্বীয় রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এবং তাঁর অঙ্গ প্রতঙ্গ ছিন্ন করা হয়েছে। আর এই হলো তোমার কন্যারা। তাদেরকে বন্দী করা হয়েছে। এই অভিযোগ আল্লাহর নিকট, আলী আল মুর্তাজার নিকট, ফাতিমা আল-যাহরারর নিকট আর শহীদদেও নেতা হামযা’র নিকট। হোসাইন এমন বিরাম মরুভূমিতে! ও মুহাম্মদের সাতীরা! এরা হলো আল্লাহর নবী আল-মুস্তাফার বংশধর, যাদেরকে আজ বন্দীর ন্যায় তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পিতা ও অন্যান্য শহীদদের বিক্ষিপ্ত লাশ দেখে, একমাত্র জীবিত পুরুষ ইমাম যয়রাব আবেদীন নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। হযরত যয়নাব ভাইপোর অস্থিরতা লক্ষ করছিলেন এবং তাঁর নিকট গিয়ে বললেন: “হে আমার নানা, পিতা ও ভাইয়ের উত্তরসূরী, আমি তোমাকে মৃত্যু কামনা করতে কেন দেখছি? যা কিছু তুমি দেখেছ, তার জন্য দু:খ করো না। এটা তোমার পিতা ও দাদার প্রতি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কিছু লোককে নির্ধারন করবেন, যারা এই জমিনে জালিম হিসেবে নয়, জান্নাতের উত্তরাধিকার হিসেবে সুপরিচিত হবে, আর তারা ছিন্নভিন্ন অঙ্গগুলো ও রক্তাক্ত দেহগুলোকে একত্রিত করে দাফন করবে। তারা আত-তাফের এই মাটিতে তোমার পিতা শহীদদের নেতার রক্তজ্যায় পতাকা উত্তোলন করবে। দিন থেকে যুগ অতিবাহিত হবে, কখন ও এই রক্তজ্যা বিরান হবে না আর এই ঘরের বাসিন্দা কলঞ্চিত হবে না। জাহেলিয়াতের প্রধান ও ফেতনার প্রচারকেরা তাদের সকল প্রচেষ্টা স্বত্তে ও এর মর্যাদা উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পেতে খাতবে।”

এই কথাগুলোর দ্ধারা, হযরত যয়নাব তাঁর দিশেহারা ভাইপোকে স্বান্তনা দিলেন। তিনি নিশ্চত করলেন যে, এই দেহগুলো দফন করা হবে এবং এদের রক্তজা আদর্শ রক্ষার ও দ্বীনের জন্য ত্যাগের প্রতীক হিসেবে টিকে থাকবে।

রাসূল(সা.)-এর বন্দী পরিবার

দড়ি দিয়ে বাধা, জীনহীন শীর্ন উটের পিঠে রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতের নারী ও এতিম শিশুদেরকে বন্দী করে কুফায় নিয়ে যাওয়া হলো। কাফেলা আতংকিত হয়ে গেলো, জিহাদের ডাক থেমে গেলো এবং পতাকা গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন আমরা প্রতক্ষ্য সাক্ষীদের বর্ননা জানবো:

আস্তর দেয়া মুসলিমের বর্ননা-

যখন আমি কুফার গভর্নরের প্রাসাদের দরজায় পলিশ করছিলাম, চারপাশ থেকে আমার কানে কলরবের শব্দ আসছিলো। আমি প্রাসাদের একজন ভূত্যের কাছে প্রশ্ন করলাম, “শুফা আজ এতো কলরব করছে কেন?” ভূত্য জবাব দিলো, ‘ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের মাথা শহরে প্রবেশ করছে।’ আমি প্রশ্ন করলাম, ‘এই বিদ্রোহী কে?’ “ভূত্য জবাব দিলো, “সে হলো হোসাইন ইবনে আলী।”

এই উত্তর আমাকে বিদ্যুতের মতো আঘাত করলো। আমি এতে জোরে আমার মুখে আঘাত করতে লাগলাম যে, চোখে ব্যাথা পেলাম। আমি কাজ ফেলে যতদ্রæত সম্ভব, প্রধান সড়কের দিকে গেলাম। লোকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থেকে আমি দেখলাম, চল্লিশটি উট নারী ও শিশুদেরকে বহন করে নিয়ে আসছে। আমি আলী ইবনে হোসাইনকে দেখলাম একটি জিনহীন উটের পিঠে; শিকলের বারনে তাঁর গলদেশের দুইপাশে রক্ত ঝরছে আর তাঁর হাত বাঁধা। তিনি কাঁদছেন আর বলছেন, “হে পথভ্রষ্ট জাতি! লানত তোমাদের উপর। আমাদের পিতামহের পক্ষ হয়ে তোমরা আমাদের দিকে দৃষ্টি দাওনি। শেষ বিচারের দিন, যখন আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল(সা.)-এর সাথে একত্রিত করবেন, তখন তোমরা কি বলবে? যেন আমরা তোমাদেরকে দ্বীন সম্পর্কে শিক্ষা দেইনি; আজ তোমরা আমাদেরকে জোর পূর্বক উলঙ্গ উটের পিঠে করে টেনে নিয়ে যাচ্ছো।

এই ভয়ংকর অবস্থা দেখে, কুফার নারীরা আর্তনাদ ও কান্না করতে লাগলো। তাদের মধ্যে একজন বন্দী কাফেলার নিকট এসে প্রশ্ন করলো, “তোমরা কার বংশধর?”

তাকে বলা হলো, “আমরা নবী(সা.)-এর আহলে বাইত।”

এই বিস্মিত উত্তর শুনার সাথে সাথে, কুফার এই নারী তার সাথে থাকা অন্যান্য নারীদের সাথে তীব্র স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো এবং দৌড়ে ঘরে গিয়ে চাদর নিয়ে আসলেন এবং বন্দী নারীদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন, যাতে লোকেরা তাদেরকে দেখতে না পায়। আরেক নারী কিছু খাবার ও খেজুর এনে ক্ষুধার্ত শিশুদের দিকে ছুঁড়ে দিলেন; তবে হযরত উম্মে কুলসুম তাদের প্রতি চিৎকার করে বলেন, “কোন প্রকার সদকা আমাদের আহলে বাইতের জন্য হারাম।” এই কথা শুনার সাথে সাথে ক্ষুধার্ত শিশুরা তাঁদের হাতে ও মুখে থাকা খাবার ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

হযরত যায়নাবের প্রথম খুতবা

কাফেলার চারপাশে কুফার সড়কে জনতার উপচে পড়া ভীড় দেখে, হযরত যয়নাব ইমাম হোসাইন-কে হত্যা করে ইসলামী উম্মাহর প্রতি উমাইয়্যা বাহিনীদের চাপিয়ে দেয়া দুর্ভাগ্য ও এ অপরাধের সাথে কুফাবাসীকে জড়িত করার বিষয় তুলে ধরে, জনতার চেতনায় ঐক্য আনয়নের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারন, এরাই হলো তারা, যারা ইমাম হোসাইনের সমর্থন ও প্রতিরক্ষার ওয়াদা করেও ভঙ্গ করেছিলো।

হযরত যয়নাব সবাইকে চুপ হতে বললেন; এরপর স্থির ও সাহসীকতার সাথে বলতে লাগলেন: “সকল প্রশংসা আল্লাহর। খোদার রহমত আমার নানা রাসূল(সা.) এবং তাঁর পবিত্র ও ন্যায়পরায়ন আহলে বাইতের প্রতি।

হে কুফাবাসী! হে প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক জনতা! তোমরা কাঁদছো? তোমাদের এ অশ্রæপাত কখনো ক্ষান্ত না হোক এবং অনুতাপের এই অবস্থা কখনো থেমে না যাক। তোমাদের তুলনা সেই নারীর মতো, যে তার সেলাই খুলে ফেলেছে, শক্ত করে সেলাই করার পর তা টুকরো টুকরো করে ফেলে। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে, যে সেই বিষয়ে অহংকার করে না, যা তার কাছে নেই, ভোগলালসার অভিযোগকারী, অহংকারী মিথ্যাবাদী, কোন যাচাই ছাড়াই অমান্য করে; ক্রীতদাসের মতো অনুগত; শক্রর সামনে নিস্তেজ, ধ্বংসাবশেষের ঘাসের ন্যায় অথবা কবরের নোংরা পোশাদের টুকরার ন্যায়? সত্যি, তোমাদের অন্তর যা সম্পন্ন করেছে তা মন্দ। তোমরা আল্লাহর ক্রোধের সীমা কেটে অনন্তকালের শাস্তি অর্জন করে নিয়েছো।

তোমরা কি সত্যিই কাঁদছো? আল্লাহ্র কসম, এরপর তোমরা আরো অধিক কাঁদবে এবং সামান্যই হাঁসবে, আর বিনিময়ে পাবে লজ্জা ও কুখ্যাতি আর কখনো তোমরা তা ধুয়ে ফেলতে পারবেনা। তোমরা কিভাবে তা পারবে? শেষ কিতাবের বাহকের উত্তরাধিকার, ওহীর মূল, জান্নাতের যুবকদের নেতা, ন্যায়ের সংগ্রামে তোমাদের আশ্রয়, তোমাদেরকে দুর্দশা থেকে মুক্ত করতে চাওয়া একজন, তোমাদের পথপ্রদর্শক, এবং তোমাদের ঐতিহ্যের ধারককে হত্যা করা হয়েছে। আহ, কতো ভয়ংকর দৃশ্যকে যে তোমরা সহ্য করেছো।

তোমরা দূর হও এবং ধ্বংস হও। প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে, আমার উপস্থিত হয়েছে, চুক্তি হারিয়ে গেছে, আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল(সা.) থেকে ক্রোধ ব্যতীত আর কিছুই অর্জন করনি। তোমরা দাসত্ব ও অবমাননার দ্বারা ধ্বংষ হয়ে গেছো।

শোক. তোমাদের প্রতি, হে কুফাবাসী! তোমরা কি জান, তোমরা কার অন্তর পুড়িয়েছ, কি কৃতিত্বকে হারিয়েছো, কার রক্ত ও মর্যাদাকে তোমরা ক্ষন্ন করেছো? তোমরা একটি পৈশাচিক কাজ আঞ্জাম দিয়েছো; সে সবের জন্য দুনিয়া ও জান্নাত ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে, পাহাড় ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। তোমরা এমন এক অস্বাভাবিক, বিকৃত, অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ভয়ংকরতম কাজ করেছো, যা জমিন ও আকাশকে পূর্ন করে দিয়েছে। তোমরা ভাবতে পারো, কেন আকাশে রক্তবৃষ্টি হচ্ছে? নিশ্চয়ই, পরকালের নিদারুন যন্ত্রনা অত্যন্ত ভয়ংকর এবং তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।”

পরিবেশ, তাঁর ফুফুর বক্তব্য সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে দেখে, ইমাম যয়নুল আবেদীন হযরত যয়নাবকে থাসিয়ে দিয়ে বললেন: “এতটুকু যথেষ্ট, ফুফু। আল্লাহর শুকরিয়া, আপনি এমন এক জ্ঞানী যাকে কেউ শিক্ষা দেয়নি, আর কোন কিছু সম্পন্ন করা ছাড়াই আপনি উপলদ্ধি করতে পারেন।”

উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের সামনে

পাপাচারিনী মারজানার অবৈধ সন্তান উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ রাসূল(সা.)-এর আপলে বাইতের নারী ও শিশুদের কে বন্দী করে, গভর্নর প্রাসাদের সিংহাসনে বসলো। বন্দীত্বের অমানবিকতায়, তাঁরা সকলেই আতংকিত সময় পারকরছিলেন। আর অপরদিকে, দুস্কৃতিকারীরা বিন যিয়াদকে তার বিজয়ের অভিনন্দন জানাচ্ছিলো এবং কারবালার অপরাধের বর্ননা দিচ্ছিলো, আর আনন্দ ও ঔদ্ধত্যেও সাথে উবায়দুল্লাহ সেগুলো শুনছিলো। হাতে থাকা ছড়ি দ্বারা অভিসপ্ত বিন যিয়াদ ইমাম আল-হোসাইনের পবিত্র মন্তকে আঘাত করতে লাগলে দরবারে বসে থাকা রাসুল(সা.)-এর খাদেম আনাস ইবনে মালিক সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে উঠলো, “খবর্দার বিন যিয়াদ! আমি আল্লাহর রাসুল-কে অসংখ্যবার ঐ মুখে চুমু দিতে দেখেছি।”

রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতকে ধ্বংস করার তৃষ্ণা রিবারনের পর, উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ বন্দীদের দিকে মনোযোগ দিলেন। সেখানে একজন নারী নিজেকে দূরবর্তী স্থানে আড়াল করার চেষ্টা করতে লাগলেন। এই নারীর পরিচয় জানতে চাইলে, তাকে বলা হলো, “এ হচ্ছে রাসূল(সা.)-এর কন্যা ফাতিমা যাহরা’র সন্তান বিবি যয়নাব।” আহলে বাইতের উপর তার মিথ্যা অহংকার জাহির করার জন্য সে বললো: “প্রশংসা আল্লাহর যিনি তোমাদের আন্দোলনকে পরাজিত করেছেন।”

প্রতিউত্তরে হযরত যয়নাব বলেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদেরকে নবুওত দ্বারা সন্মানিত করেছেন এবং অধমাদেরকে সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করেছেন। শুধুমাত্র লম্পটদের মুখোশই উন্মোচিত হয়েছে আর চরিত্রহীনেরাই পরাজিত হয়েছে। আমরা এদুটির একটি ও নই। সত্যিই, এই দুটির একটিও আমরা নই, ইবনে মারজানা।”

এই আকস্মিক জবাব শুনে উবায়দুল্লাহ কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে গেলো। তাই তার পরাজয় ও প্রতিউত্তরের অক্ষমতা আড়াল করার জন্য যে প্রতিহিংসা মূলক কথা বললো, “তুমি কি দেখনি, আল্লাহ তোমার ভাইয়ের সাথে কি করেছেন?”

সাহসীকতা ও দৃঢ়তার সাথে বিজয়ীকন্ঠে হযরত যয়নাব জবাব দিলেন, “এটা কল্যান ব্যতীত আর কিছুই নয়। এরা ছিলেন সেই লোক, যাদের হত্যার ব্যাপারে আল্লাহ জানেন। তাই, তারা সেখানেই এসেছিলেন, সেখানেই তাদেরকে হত্যা করা হবে। আল্লাহ তোমাকে তাদের সামনে বিচার ও শাস্তির জন্য উপস্থিত করবেন। দেখ, সেদিন কে বিজয়ী হয়। সেদিন শোক হবে তোমার জন্য ইবনে মারজানা।”

পরাজয় ও অপমানের এই প্রতিউত্তর পিতৃ পরিচয়হীন উবায়দুল্লাহকে এমন মাত্রায় উত্তেজিত করেছিলো যে, সে দাঁড়িয়ে গেলো এবং হযরত যয়নাবকে আঘাত করতে উদ্যত হলে, আমর বিন হুরাইস তাকে সাবধান করে দেয়, “সে একজন নারীমাত্র, আর কোন নারীর কথা গ্রহন যোগ্য নয়।”

এরপরও উবায়দুল্লাহ আহলে বাইতের দূর্ভাগ্যের প্রতি উপহাস করে হযরত যয়নাবকে বলে, “আল্লাহ আমার অন্তরকে হেফাজত করেছেন এবং তোমাদের জালিম নেতা থেকে আমার মাধ্যমে প্রতিশোধ নিয়েছেন আর তোমাদের অবাধ্য বিদ্রোহকে দমন করেছেন।”

এই কথাগুলো হযরত যয়নাবের স্মৃতিপটে তাঁর স্বজনদের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরলো এবং অন্তর বেদনা ও দুঃখে পূর্ন হয়ে গেলে তিনি বলেন, “আমি আমার জীবনের কসম করে বলছি, তুমি আমার রক্ষকদেরকে হত্যা করেছো, আমার শাখাগুলো ভেঙ্গে দিয়েছো, এবং আমার শিকড় উপড়ে ফেলেছো। তাই, এটা যদি তোমাকে বিজয়ী করে, তাহলে তুমি সত্যিই বিজয়ী।”

নিয়ন্ত্রন অযোগ্য ক্রোধে উবায়দুল্লাহ বললো, “সে একজন তর্কবিদ। আমি কসম করে বলছি, তার পিতাও ছিলো একজন তর্কবিদ ও কবি।”

রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতের নারী ও শিশুদেরকে বন্দী অবস্থায় কুফার মসজিদে অবস্থান করতে দেয়া হলো। খাবার হিসেবে তাদের সবাইকে সারাদিনের জন্য একটি করে রুটি দেয়া হলে, হযরত যয়নাব সবার মাঝে তা বন্টন করে দেন। এমনকি তিনি নিজের অংশও শিশুদের মাঝে ভাগ করে দেন। সারাদিনের অভূক্ত থাকা তাঁকে এমনভাবে দুর্বল করে ছিলো যে, তিনি সালাতে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এই অবস্থা লক্ষ্য করে ইমাম যয়নল আবেদীন ফুফুর কাছে বেদনার বহিপ্রকাশ করলে হযরত যয়নাব তাঁকে এই কারন জানাতে বাধ্য হন।

সারা ইসলামী রাষ্ট্রে হযরত যয়নাবের আকর্ষনীয় সুখ্যাতির জন্য কুফা’র নারীরা তাঁর সাথে সাক্ষাত করার জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলো; তবে তিনি কারো সাথে দেখা করতে অসম্মতি জানান এবং বলেন, “একমাত্র ক্রীতদাসেরা ব্যতীত আর কারো আমাদের সাথে সাক্ষাতের প্রয়োজন নেই; এটা এ জন্য যে, তাদেরকে যেভাবে বন্দী করা হয়, আমাদেরকে ও সেভাবে আনা হয়েছে।”

প্রশাসক কর্তৃপক্ষ বন্দীদের ব্যাপারে জালিম ইয়াযিদের হুকুমের অপেক্ষা করছিলো; আর কিছুদিন পর, তারা বন্দীদেরকে দামেস্কে প্রেরনের আদেশ পেলো।

বন্দী কাফেলার মাঝে, কারবালার শহীদদের পবিত্র মাথাও বর্ষার মাথায় গেঁথে বহন করা হয়েছিলো: যাতে কুফার লোকদের মতো সিরিয়ার লোকেরাও সেগুলো দেখে এবয় জালিম শাহীরা এতে আনন্দিত হয়।

দামেস্কে বন্দী কাফেলা

দড়িতে বাঁধা, রুগ্ন ও দুর্বল উটের পিঠে করে, অমানবিকতার সর্বোচ্চ অবস্থায় রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতের নারী ও শিশুদেরকে বন্দী করে সিরিয়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। সফরের সারাপথে তাঁরা কাফেলার চালকের সাথে না কোন কথা বললেন আর না কোন কিছুর আবেদন করলেন। সিরিয়ার নিকটবর্তী হয়ে, কাফেলা কে কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দেয়া হলো, যাতে তোরন নির্মান করে শহরকে সাহানো যায় এবং মিথ্যা বিজয়ের সাক্ষী করার জন্য লোকের সমাগম করতে যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়।

ইয়াযিদের আত্মতৃপ্তিঃ

বন্দী কাফেলার পৌঁছানোর খবর শুনে অভিশপ্ত ইয়াযিদ আনন্দ ও সংকীর্ন আতœতৃপ্তির দোলাচলে দুলতে থাকলো। শিসর বিন যুল-জাওশান এবং মাখাফান বিন সা’লাবাহ তার সামনে ইমাম আল-হোসাইনের পবিত্র সাথা প্রদর্শন করলে সে দামেস্কও হীনমন্য লোকদেরকে আহলে বাইতের বিরুদ্ধে তার মিথ্যা বিজয়ের সাধুবাদ গ্রহনের জন্য একত্রিত করলো।

জালিমের সামনে পবিত্র মাথাগুলো প্রদর্শন করা হলে সে তার হাতে থাকা লাঠি দ্বারা সেগুলোতে আঘাত করতে লাগলো। এরপর সে ইমাম, আহলে বাইত ও আল-কোরআনের প্রতি তার সীমাহিন বিদ্ধেষ প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে লাগলো, যাতে কোরআন নাযিলে তার পূর্ব পুরুষদের প্রতিরোধের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সাক্ষী মিলছিলো।

এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে, আবু বারায়াহ আল-আসলামী নিজেকে সামলাতে পারেননি; তাই তিনি ইয়াযিদকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আল-হোসাইনের মুখে লাঠি দ্বারা আঘাত করার সাহস তোমার হলো কি করে? আমি কসম করে বলছি, আমি অসংখ্যবার রাসূল(সা.)-কে ঐ মখে চমু খেতে দেখেছি। যাইহোক, শেষ বিচারের দিন উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ হবে তোমার মধ্যস্থতাকারী; সেখানে আল-হোসাইনের মধ্যস্থাতাকারী হবেন মুহাম্মদ(সা.)।”

ইয়াযিদেও অপবিত্র সৈন্যরা ইমাম যয়নাল আবেদীন থেকে শুরু করে হযরত যয়নাব পর্যন্ত সকল বন্দীকে এমনকি শিশুদেরকে পর্যন্ত একই দড়িতে বেঁধেছিলো। তারা তাদেরকে এক লাইনে হাঁটতে বাধ্য করলো এবং যখনই কেউ হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতো, তারা তাঁকে চাবুক দিয়ে সজোওে আঘাত করতো। এই লজ্জাজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বন্দীদেরকে জালিম ইয়াযিদের সামনে হাজির করা হয়েছিলো।

হযরত যায়নাবের দ্বিতীয় খুতবা

ইয়াযিদের পূর্ব পুরুষেরা আল-হোসাইনের পিতামহের সাথে যুদ্ধাভিযান পরিচালিত করে নাস্তানাবুদ হওয়ার তিক্ত স্মৃতি তার দৃশ্যপটে ছিলো। তাই, যখন সে রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতকে দৃশ্যত পরাজিত করলো এবং ইমাম হুসাইনের মাথা তার সামনে পেশ করা হলো, তখন সে দারুন উচ্ছ¦সিত ছিলো। সে তখন একটি কবিতা আবৃতি করলো।

“আজ যদি আমার বদরের পূর্ব পুরুষেরা দেখতেন

যাদের খাযরাজেরা কন্ঠিক যন্ত্রনা দিয়েছিলো,

তবে তারা উচ্ছ¦সিত হতেন

আর বলতেন-‘তোমার হাত কখনো অবস না হোক ইয়াযিদ!’

আমরা গেন প্রধানের নেতাদের হত্যা করেছি

সত্যিই এটা বদরের বদলা

যদিও আসমান থেকে না এসেছে কোন সংবাদ আর না নাযিল হয়েছে ওহী

আমি খন্দক অস্বীকার করতাম

যদি আহসদের সন্তানদের থেকে এর প্রতিশোধ না নিতাম।”

এই স্বীকারোক্তি শুনার সাথে সাথে হযরত যায়নাব জালিমের প্রতি চিৎকার করে বলে উঠেন: সব প্রশংসা জগতসমুহের প্রতিপালকের জন্য এবং শাস্তি বর্ষিত হোক তাঁর রাসূল এবং তাঁর বংশধরদের সবার ওপর। কত সত্যই না আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন:

ثُمَّ كَانَ عَاقِبَةَ ٱلَّذِينَ أَسَاءُواْ ٱلسُّوۤءَىٰ أَن كَذَّبُواْ بِآيَاتِ ٱللَّهِ وَكَانُواْ بِهَا يَسْتَهْزِئُونَ

তারপর যারা মন্দ কাজ করেছিল তাদের পরিণাম মন্দ হয়েছিল। কারণ তারা আল্লাহর আয়াতগুলোকে অস্বীকার করেছিল এবং সেগুলো নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রƒ করত।” (সূরা রুম, ৩০:১০)

হে ইয়াযিদ! এখন যেহেতু তুমি পৃথিবীর পথ আকাশের দিগন্তকে আমাদের ওপর বন্ধ করে দিয়েছো এবং আমাদেরকে কয়েদীদের মত তাড়িয়ে এনেছো। তুমি কি মনে করো যে তুমি আমাদের আল্লাহর কাছে বেইযযতি করেছো এবং তোমাকে প্রিয় করেছো? আর তুমি এর কারণে আল্লাহর কাছে সন্মান উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছো? আর তাই তুমি আমাদেরকে নীচু মনে করে তাকাচ্ছো এবং অহংকারী, আনন্দিত উচ্ছসিত হচ্ছো যে পৃথিবী তোমার দিকে ফিরে এসেছে? তুমি মনে করেছো যে তোমার কাজ গোছানো, আর সার্বভৌমিত্ব রাজ্য তোমার জন্য প্রীতিকর? মনে হচ্ছে তুমি ধীরে ধীরে সর্বশক্তিমান পবিত্র আল্লাহর কথাগুলো ভুলে গেছো, “যারা অবিশ্বাসী তারা যেন মনে না করে যে তাদেরকে আমরা যে দিচ্ছি তা তাদের জন্য কল্যাণকর; আমরা তাদের শুধু সময় দেই এজন্য যে তারা যেন গুনাহতে বৃদ্ধি পায়, আর তাদের জন্য আছে অপমানকর শাস্তি।এটিই কি ন্যায়বিজারের সংস্কৃতি যে তুমি তোমার পরিবারের নারীদের এবং নারী গৃহকর্মীদের পর্দার আড়ালে বসাবে আর রাসূলুল্লাহ(সা.)-এর কন্যাদের বন্দী করবে, তাদেরকে প্রদর্শনী বানাবে? তািম তাদের বোরখা ছিনিয়ে নিবে আর তাদেরকে বেআব্রæ করে রাখবে, আর তাদের শক্ররা তাদেরকে অন্যদের সামনে প্রদর্শন করে বেড়াবে এক শহর থেকে আরেক শহরে এবং প্রত্যেক নদী শহরের অধিবাসীরা তাদেরকে এক নজর দেখবে? এবং তাদের দিকে তাকাবে প্রত্যেক ঘনিষ্ট অঘনিষ্ট মানুষ, নীচে সম্মানিত লোকেরাও, যখন তাদের সাথে থাকবে না পুরুষ অথবা নির্ভরযোগ্য কোন ব্যক্তি? কী তাকুওয়া আমরা তাদের কাছ থেকে আশা করতে পারি যারা পরহেযগারদের (মুত্তাকীদের) কলিজা খেয়েছে এবং যাদের গায়ে মাংস গজিয়েছে শহীদদের রক্ত (পান) থেকে? কীভাবে সে আমাদের প্রতি তার ঈর্ষা কমাবে, যে আমাদের আহলুল বাইতের দিকে তাকায় দাম্ভিকতা, শক্রতা এবং ঘৃণার দৃষ্টিতে? এবং সে বীরত্বের সাথে ঘোষনা করে যে, তারা আমাকে উচ্ছকন্ঠে অভিনন্দন জানাতো এবং বলতো: হে ইয়াযীদ! তোমার হাত দুটো যেন অলস না হয়ে যায়, এরপর তুমি আবু আব্দুল্লাহ, যিনি জান্নাতের সর্দার, তার দাঁতের দিকে মনোযোগ দিয়েছো এবং এতে আঘাত করেছো তোমার হাতের কঞ্চি দিয়ে? তাই এরকম কেনইবা তুমি বলবে না? তুমি আঘাতকে এর গভীরতম তলায় পৌঁছে দিয়েছো এবং আদি উৎসকে উপড়ে ফেলেছো রাসূলুল্লাহ(সা.)-এর সন্তান আব্দুল মোত্তালিবের বংশ থেকে পৃথিবীর নক্ষত্রদের একজনের রক্ত ঝরানোরন মাধ্যমে। এরপর তুমি উচ্চকন্ঠে তোমার পূর্বপুরুষদের সম্বোধন করেছো এবং মোদার অনুমানে তাদেরকে ডেকে আনছো? খুব শীগ্রই তুমিও তাদের শেষ পরিনতির সম্মুখীন হবে। আর তখন তুমি বলবে হায় যদি তুমি অবশ হতে এবং বোবা হতে তাহলেতো একথাগুলো বলতে হতো না এবং এমন চরিত্র তোমার হতো না।

হে আল্লাহ! আমাদের অধিকারকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিন এবং আমাদের ওপর যারা অত্যাচার করেছে তাদের ওপর প্রতিশোধ নিন এবং আপনার গযব পাঠান তাদের ওপর যারা আমাদের রক্ত ঝরিয়েছে এবং আমাদের সাহায্যকারীদের হত্যা করেছে। আল্লাহর শপথ, তুমি তোমার নিজের চামড়া ছিঁড়েছো এবং তোমার নিজের মাংস টেনে ছিঁড়েছো এবং তুমি রাসূলল্লাহ্(সা.)-এর সন্তানের রক্ত ঝরানোর এবং তার পরিবার অনুসারীদের পবিত্রতা লঙ্গনের বিরাট বোঝা নিয়ে তার সামনে যাবে, এমন জায়গায় যেখানে আল্লাহ জড়ো করবেন তাদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়াদের এবং সংখ্যা বুদ্ধি করবেন তাদের মধ্যে যারা ছড়িছিল, আর তাদের কাছে তাদের অধিকার উপহার দিবেন।

 

وَلاَ تَحْسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمْوَاتاً بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ

আর যারা আল¬াহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত। তাদেরকে রিয্ক দেয়া হয়।” (আলে ইমরান, ৩: ১৬৯)

আল্লাহ তোমার ওপর বিচারক হিসাবে যথেস্ট এবং রাসূল্লাহ হবেন তোমার শত্রæ এবং তিনি জীবরাঈলের সমর্থন পাবেন। খুব শীগ্রই তোমার বাবা, যে, তোমাকে রাজ্য প্রস্তুত করে দিয়ে গেছে এবং তোমাদের মুসলমানদের ঘাড়ে বসিয়ে গেছে, বুঝতে পারবে অত্যাচারীদের জন্য কত খারাপ এক জায়গা অপেক্ষা করছে।

কি খারাপ স্থানই না তুমি অর্জন করেছো এবং কী দুর্বল সামরিক বাহিনীইনা তোমার। যা হোক, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছে তোমার সাথে কথা বলতে, যখন আমি মনে করি তোমার স্থান অত্যন্ত নিচে এবং তোমার তিরস্কার খুবই বড় এবং এ ও চাই যে তোমাকে অনেক তাচ্ছিল্য করি। কিন্তু চোখগুলো ফুটে উঠেছে এবং হৃদয়গুলো ছিটকে বেরিয়ে যেতে চায়। সাবধান, এটি আশ্চর্য যে আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান ব্যক্তিদের দলটিকে হত্যা করবে মুক্তদের সেনাবাহিনী, যারা শয়তান। এ হাতগুলোই আমাদের রক্ত মুঠোয় চেপে ধরেছে এবং এ চোয়ালগুলোই আমাদের মাংস গোগ্রাসে খেয়েছে। আর এগুলো হলো পবিত্র ও জ্যেতির্ময় লাশসমূহ যেগুলোকে এখন পাহারা দিচ্ছে নেকড়েরা এবং হায়েগুলো বার বার বালি ছিটিয়ে দিচ্ছে তাদের দেহের ওপর। আর এখন তুমি মনে করছো আমরা তোমার গনিমত।

ذٰلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ يَدَاكَ وَأَنَّ ٱللَّهَ لَيْسَ بِظَلاَّمٍ لِّلعَبِيدِ

“(সেদিন তাকে বলা হবে), ‘এটি তোমার দুহাত যা পূর্বে প্রেরণ করেছে তার কারণে। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের প্রতি যুল্মকারী নন” (হাজ্ব, ২২ : ১০)

আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করি এবং শুধু তাঁর ওপরেই নির্ভর কার। এরপর তুমি তোমার যে কোন ফাঁদ পাততে পারো এবং তোমার ইচ্ছানুযায়ী যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারো এবং চেষ্টা করে যাও যত চাও। আল্লাহ শপথ, তুমি কখনোই আমাদের কথা মুছেফেলতে পারবে না এবং ওহীকে আমাদের মাঝ থেকে উৎখাত করতে পারবে না, না তুমি এ ঘটনার লজ্জাকে মুছে ফেলতে পারবে। তোমার অভিমত ভ্রান্তিপুর্ণ এবং তোমার দিনগুলো কম। আর তোমার দল ছত্রভঙ্গ থাকবে যেদিন আহবানকারী আহবান করবে: জেনে রাখো।

وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ ٱفْتَرَىٰ عَلَى ٱللَّهِ كَذِباً أُوْلَـٰئِكَ يُعْرَضُونَ عَلَىٰ رَبِّهِمْ وَيَقُولُ ٱلأَشْهَادُ هَـٰؤُلاۤءِ ٱلَّذِينَ كَذَبُواْ عَلَىٰ رَبِّهِمْ أَلاَ لَعْنَةُ ٱللَّهِ عَلَى ٱلظَّالِمِينَ

 

যারা আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা রটনা করে, তাদের চেয়ে অধিক যালিম কে? তাদেরকে তাদের রবের সামনে উপস্থিত করা হবে এবং সাক্ষীগণ বলবে, ‘এরাই তাদের রবের ব্যাপারে মিথ্যারোপ করেছিল। সাবধান, যালিমদের উপর আল্লাহর লানত।” (হুদ, ১১ : ১৮)

মদীনায় ফিরে যাওয়া

ইমাম যয়নাল আবেদীন ও হযরত যয়নাবের বক্তব্যের প্রভাব দেখে, ইয়াযিদ তার রাজধানীতে বিদ্রোহের সম্ভাবনা দেখতে পেলো। তাই, সে রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতকে দামেস্কে না রেখে মদীনায় পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। তখন সে সবাইকে তার প্রাসাদে একত্রিক করলো এবং ইমাম আল-হোসাইন তাঁর পরিবার ও অনুসারীদের রক্তপাতের পন হিসেবে প্রচুর অর্থ একটি রেশমি কাপড়ে মুড়িয়ে দিলো। এই ঘটনা নারীদেরকে এমন ভয়ংকর ক্রোধান্বিত করে তারা সবাই প্রতিবাদ করতে লাগলো। হযরত যয়নাব বলেন: সত্যিই তুমি নির্লজ্জ ও দাম্ভিক! তুমি আমার ভাই ও আমার পরিবারকে হত্যা করেছো, আর এখন তুমি চাচ্ছো যে, আমি ক্ষতিপূরনের অর্থগ্রহন করবো।এবং তোমার মতো এমন পাপাচারপূর্ন কাফের ও নাস্তিক আর কখনো দেখিনি …।

এই জালিম ভেবেছিলো যে, আহলে বাইত হয়তোবা অর্থ অথবা ক্ষনস্থায়ী কোন সম্পদে বাগে আসবে এবং আহলে বাইতকে বশে আনতে ব্যর্থ হয়েছে; কারণ সে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ঐ বিশ্বাস করতে পারেনি।

إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُـمُ ٱلرِّجْسَ أَهْلَ ٱلْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيــراً . . .

হে নবী পরিবার, আল্লাহ মনস্থ করেন তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” (আহযাব, ৩৩ : ৩৩)

এরপর সে আল-নুমান ইবনে বশিরকে মদীনার যাত্রাপখে রাসূল(সা.)-এর আহলে বাইতকে সঙ্গ দেয়ার এবং যাত্রাপথে তাঁদের সেবা যতেœর নির্দেশ দেন। এ যাত্রা সে রাতে আরম্ভ করার নির্দেশও দিয়েছিলো, যাতে সকল প্রকার বিশৃংঙ্খলা ও বিদ্রোহ এড়ানো যায়।

আব্দুল মালিক আল-সালামি, উসার বিন সাদের নির্দেশে ইমাম আল-হোসাইনের শাহাদাতের খবর বন্দী কাফেলা মদীনা পৌঁছার পূর্বেই সেখানে পৌঁছে দিলো। এই খবর মদীনার প্রশাসকদেরকে যেমন আনন্দিত করেছিলো, তেমনি সারা শহর জুড়ে ব্যতিথ লোকদের কান্না ও আহজারিতে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠলো। মদীনার গভর্নর মসজিদে নববীর মিম্ভারে বসলো এবং তার আনন্দ প্রকাশ করে ইমাম ও তাঁর দলের উপর অর্জিত বিজয়ের ঘোষনা দিলো। আব্দুল্লাহ ইবনে আল-সাইব গভর্নরকে তিরস্কার করে বলেন, “আজ যদি ফাতেমা এখানে থাকতো, তবে পুত্রের জন্য আহাজারি করতো।গভর্নর তখন অর্থহীন কথা বলে তার প্রতি হুংকার দিয়ে উঠলো।

গোত্র প্রধানের শাহাদাতে বনু হাশিমের লোকেরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো এবং এ উপলক্ষে শোক পালনের আয়োজন করলো। হযরত যয়নাবের স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর এই দুর্ভাগ্যের জন্য লোকদের থেকে স্বান্তনা পেতে লাগলেন।

এরপর ইয়াযিদ লোকেদের মধ্যে আতংক সৃষ্টির জন্য ইমাম হোসাইনের মাথা মদীনায় প্রেরন করলো। মদীনার হভর্নর এ কাজকে প্রত্যাখ্যান করলে ও মারওয়ান ইবনে হাকাস একে স্বাগত জানায় এবং রাসূল(সা.) ও তাঁর দ্বীনের প্রতি তার বিদ্বেষ প্রকাশ করে। ইমামের চেহারা মোবারকের দিকে তাকাতেই, তার মনে পড়ে যায় পূর্বপুরুষদের কথা, যারা ইমামের পিতা ও পিতামহের হাতে নিহত হয়েছিলো। সে তখন রাসূল(সা.)-এর রওজার দিকে চোখ ঘুরিয়ে বললো, “মুহাম্মদ! এটা সেই বদরের দিনের প্রতিশোধ।

মদীনার যাত্রাপথে আহলে বাইতের সদস্যরা কাফেলার সহযোগীদেরকে কারবালার দিকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করলে, তারা তাই করলো। সেখানে পৌঁছালে নারীরা কান্না ও আর্তনাদের দ্বারা ইমামের রওজাকে জড়িয়ে ধরলো। তাঁর সেখানে তিনদিন অবস্থান করেছিলো আর সেখানে অবিরাম অশ্রæপাত করেছিলো।

ইমাম যয়নাল আবেদীন তাঁর ফুফুকে মৃত্যু শষ্যায় দেখে এবং অন্যান্য নারীদেরকে বেদনার অতিমজ্যা দেখে তাঁদেরকে পুনরায় মদীনার পথে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। তাঁরা অশ্রæসজল নয়নে এবং ভাঙ্গা কন্ঠে কারবালা ত্যাগ করেন। মদীনা শোকের কালো পোশাকে আবৃত হয়ে গেলো যখন রাসূল(সা.)-এর স্ত্রী উম্মে সালামাহ মৃত্যুবরন করেন; যিনি ইমাম হোসাইন(আ.)-এর শাহাদাতের বেদনায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে একমায়ের মাথায় মৃত্যুবরন করেন।৬ মদীনা থেকে কিছু ফারসাখ দূরে এসে ইমাম যয়নাল আবেদীন বিশ্রামের জন্য অবস্থান নিলেন। তিনি বিশ্র বিন হিযলিম কে একটি কবিতা রচনা করার অনুরোধ করেন, যাতে যে মদীনায় অগ্রবর্তী হয়ে শোকার্ত কন্ঠে ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের ঘোষনা দেন। লোকটি শহরে প্রবেশ করে, মসজিদে নববীর সামনে দাঁড়িয়ে শোকের ছন্দে ইমামের শাহাদাতের ঘোষনা দেন।

লোকেরা অন্যদের ভাগ্য জানার জন্য তার নিকট জড়ো হলো। বিশ্র তাদেরকে ইমাম যয়নাল আবেদীন সহ আহলে বাইতের নারীদের কাফেলাকে স্বাগত জানানোর জন্য শহরের উপকন্ঠে জড়ো হলো। যখন কাফেলা মদীনায় পৌঁছলো, তখন শোকার্ত জনতা কাফেলাকে ঘিরে ধরলো: সেই দিনটির অবস্থা ছিলো তেমন, যেমনটা ছিলো রাসূল(সা.)-এর ওফাতের দিনে।

ভয়ানক সেই ভীড়ের মধ্যখানে, ইমাম যয়নাল আবেদীন একটি বক্তব্য প্রদান করেন, যাতে তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর দুর্ভাগ্যের বর্ননা দেন। তিনি তাঁর ফুফু ও বোনদেরকে সাথে নিয়ে, জনতার ভীড়ের মধ্যে সমজিদ এ নব্বীতে প্রবেশ করেন। হযরত যয়নাব মসজিদের প্রবেশ দ্বারের চৌকাঠ ধরে চিৎকার করে উঠেন, “ও নানা! আমি আমার ভাই আল-হোসাইনের শাহাদাতের খবর নিয়ে তোমার কাছে এসেছি।

সেইদিন থেকে, হযরত যয়নাবের একমাত্র কাজ ছিলো শহীদ স্বজনদের জন্য অশ্রæপাত করা এবং ইমাম আল-হোসাইনের অনন্ত বার্তাকে অব্যহত রাখার প্রচেষ্টা করা। মৃত্যুর কোলে মাথা রাখার পূর্বপর্যন্ত যখনই ভাইপো ইমাম যয়নাল আবেদীনের প্রতি তাঁর নজন পড়তো, তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন।

 

আট: কারবালা- দ্রোহের আগুনে পোড়া সংগ্রামী ময়দান

আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত ইমামতকে অস্বীকার করে মুসলমানেরা যে নতুন রাষ্ট্রনায়ক নির্বাচনের পদ্ধতি বেছে নিয়েছিল, তা ইসলামের মৌলিক ভিত্তিকে এমনভাবে পদদলিত করেছিল যে, একটি আদর্শ রাষ্ট্রের কোন বিভাগেই সততা, ন্যায়পরায়নতা, নিষ্ঠা, দয়া নামক বিষয়গুলোর কোন অস্তিত্ব বাকি রইল না। খেলাফতের প্ররাম্ভিক পচিশ বছরে স্বার্থপরতা এবং মিথ্যাচারের যে সুন্নত প্রচলিত হয়েছিল তা আরবের পূর্বের সংস্কৃতিকে জাগ্রত করে দিয়েছিল। এসকল অনাচার এক পর্যায়ে এসে তৃতীয় খলীফা উসমানের হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে অরাজকতার সৃষ্টি করে দেয়। যা পরবর্তীতে ইমাম আলীকে শহীদ করার মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণতায় পৌঁছায়। সেই পরিনতিই পরবর্তীতে কারবালা নামক বেদনাবিধুর এক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিল।

আল্লাহর রাসুল(সা.) তাঁর দীর্ঘ তেইশ বছরের সংগ্রামী জীবনে আল্লাহর বিধান কায়েম করে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। এই সংগ্রামী জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে তিনি তাঁর আহলে বাইতকে তাঁর উত্তরসুরি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বারংবার তিনি তাঁর বক্তব্য এবং কার্যক্রমের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে চোখে আক্সগুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন এরা ইসলামের সীমানা, যাদের থেকে অগ্রগামি হওয়া যাবে না। এমনকি তাঁদের থেকে পিছিয়ে পড়লেও নিশ্চিত পথভ্রষ্টটায় পর্যবসিত হতে হবে। রাসুল(সা.)-এর জীবদ্দশাতেই এটা সকলে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, আহলে বাইত আল্লাহর রাসুলের সুবিশাল কর্ম জীবনের সারকথা। যার ব্যপারে নির্দেশ হিসেবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘গাদিরে খুমে’ ঘোষনা এসেছিল।

সেদিন মুসলমানেরা এর ব্যাপারে কোনরূপ ভিন্নমত না প্রকাশ করলেও ষড়যন্ত্রের সুত্রপাত শুরু হয়েছিল সেদিন থেকেই। আস্তিনের নিচে লুকিয়ে থাকা মুনাফিকতার আসল চেহারা একটু একটু করে প্রকাশ পেতে থাকে। যার ফলশ্রæতিতে বনু সাকিফা, উমরের খলীফা মনোনয়ন এবং শূরা দ্বারা উসমানের নির্বাচন সেই লুকিয়ে থাকা মুনাফিকিরই বহি:প্রকাশ। আর ফলশ্রæতিতে ঘটলো ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক হত্যাকান্ড। কারবালায় ইমাম হুসাইনকে তাঁর পরিবারসহ হত্যার মাধ্যমে সেদিন বনু সাকিফার ষড়যন্ত্রের মূল ফলাফল কার্যকর হয়েছিল।

মদিনা রাষ্ট্র কায়েমের ষাট বছর অতিক্রান্ত হওয়ার মধ্যে ঘটে গেছে অনেক অনাকংখিত ঘটনা। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠিত সকল ঐতিহ্য বিনষ্ট হয়েছে। রাসুল(সা.)-এর তৈরি করা আদর্শ রাষ্ট্রের সকল নীতিগুলো অবশেষে তুলে নেয়া হয় উমাইয়্যাদের বর্শার মাথায়। সেদিনও মুসলমানেরা তাঁদের অজ্ঞতার প্রমাণ দিয়ে জীবন্ত কোরআন আলীর বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিল।

এরপর মুয়াবিয়ার খেলাফতে ইমাম আলী’ও তাঁর পরিবারের প্রতি গালিগালাজ এবং অভিসম্পাতের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে রাজতন্ত্রের সময়গুলো। চারিদিকের অবস্থা দেখে বলে দেয়া যায়, রাসুল(সা.)-এর আদর্শের জন্য না রইলো কোন প্রবক্তা, না কোন মিম্বার আর না রইলো কোন মঞ্চ। সকল কিছুই ইমাম হুসাইন ধৈর্যের সাথে অবলোকন করছিলেন এবং মানুষকে এসব কুফুরিয়াতের আকিদার স্বরূপ চিনিয়ে তাঁর সংস্কার বিপ্লব চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর ইয়াজিদকে খেলাফতের মসনদ হস্তান্তর করলে তিনি তাঁর নিরব বিপ্লবের নীতি থেকে সরে আসলেন।

কোনভাবেই তিনি কুফুরিয়াতের এই নিকৃষ্ট রীতিকে মেনে নিতে পারেননি। ইয়াজিদের মতো লম্পটের শাসন ইসলামকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে এই ব্যপারে সুনিশ্চিত ছিলেন বলেই তিনি দ্রোহের আগুনে নিজেকে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

শুধু তিনি একাই এই অসম আন্দোলনে উপনিত হননি। সংগ্রামের এই অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তিনি তাঁর অনুসারী ও স্বজনদের নিয়ে এমন এক ক্ষেত্রে চলে আসলেন যেখানে ত্যাগের বিনিময়ে মানুষকে ইসলামের মৌলিকত্ব শিক্ষা দেয়ার প্রচেষ্টায় নেমে পড়েন।

তাঁর এই সংগ্রাম কোন খেলাফত প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে ছিল না। কারণ, ইমামত কখনও শাসন ক্ষমতার অপেক্ষা করে না। যারা মানুষকে খোদার বিধান শিক্ষা দেয়ার জন্য আল্লাহ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত তাদের জন্য দুনিয়ার শাসন একেবারেই নগন্য। সেজন্য আমরা ইমাম আলীর মুখে সেই উক্তি শুনতে পাই- “মনে রেখো! তোমাদের এই দুনিয়া আমার কাছে ছাগলের হাঁচির চাইতেও নিকৃষ্ট।”

একই কথা আমরা শুনতে পাই ইমাম হুসাইনের কণ্ঠে। মদিনা থেকে মক্কার দিকে গমনের সময় ইমাম বলেছিলেন, “মনে রেখো! আমি কোন খেলাফতের জন্য কিয়াম করিনি। আমি কিয়াম করেছি রাসুল(সা.)-এর সুন্নতকে সমুন্নত করার জন্য। তোমরা কি দেখতে পাও না যে, সুন্নতের উপর আমল করা হচ্ছে না। হালালকে হারাম করা হচ্ছে এবং হারামকে করা হচ্ছে হালাল।” এটাই ইমামতের কথা। যে নেতৃত্ব দুনিয়া চায় না, সে নেতৃত্ব মানুষের দিকনির্দেশনার জন্য শাসন ক্ষমতাকে মোটেই মূল্য দেয় না।

কিন্তু সেদিনের মুসলমানেরা কি বুঝতে পেরেছিল তাঁদের এই ঘোষণা। তাঁরা কি বুঝতো যে, কেন ইমাম হজ্জ শেষ না করে ইহরাম খুলে ফেলেছিলেন? কেন তিনি হজ্জের মাঝামাঝিতে মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়লেন? এটা তারা বুঝেনি বলেই সেদিন ইমামের মক্কা থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে লক্ষ্য করতে পারেনি। তাঁর উদ্দেশ্যকে মূল্যায়ন করতে পারেনি।

আমরা তাদের সেই অজ্ঞতা ও অবজ্ঞাকে ঘৃণা করি। ঘৃণা করাই স্বাভাবিক। কিন্তু কখনও কি খেয়াল করেছি যে, আমরা কি করছি? আমরা কি একবারের জন্যও ভেবে দেখেছি যে, আমরাও কি তাদের পথেই হাঁটছি না? কারণ, সেদিন ঐ কুফাবাসী যা বুঝতে পারেনি, আমরা যে আজ তা বুঝতে পেরেছি তা কি নিশ্চিত? আমরা এখানে হুসাইনের শোকে মুহ্যমান হয়ে আছি। চোখের পানিতে একাকার হয়ে আহলে বাইতের প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রমাণ করতে চাইছি। এর কতোটুকু সত্যতা আছে, তা চিন্তার বিষয়।

একটা বিষয় খেয়াল করে দেখুন, আব্বাসীয় খেলাফতের সেই সময়টির কথা। ইমাম হাসান আল-আসকারি’র শাহাদাতের পর ইমাম-এ-জামান গায়বাতে চলে গেলেন। এরপর আর তিনি প্রকাশিত হননি। ১১৭৯ বছর বয়স ধরে ইমাম তাঁর প্রকাশের অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। আমরাও তাঁর আগমনের জন্য উতলা। কণ্ঠে কণ্ঠে তাঁর আগমনের আহŸান আমাদের বাতাসে ভেসে আসছে। পৃথিবীর এমন কোন ভ‚মি নেই, যেখানে তাঁর আগমনের আহŸান ধ্বনিত হচ্ছে না। তাহলে কেন তিনি আসছেন না। এই না আসার পিছনে কি কারণ থাকতে পারে, তাকি আমরা ভেবেছি?

আমাদের ধারনা, তিনি আসলে জাহেলিয়াতের এই অন্ধকার শৃঙ্খল থেকে বিশ্বমানবতাকে উদ্ধার করবেন। তাহলে কেন তিনি প্রকাশিত হচ্ছেন না। তাঁর প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথেই আমরা আমাদের সকল সম্পদ তাঁর পদতলে ঢেলে দিয়ে তাঁর নির্দেশে বিপ্লবের ঝান্ডা তুলে তাঁর সংগ্রামে একান্ত হবো- এটা আমাদের আকাংখা। একটু ভেবে দেখুন তো, আমাদের এই আকাংখার সাথে কুফাবাসীর আহŸানের কোন সাদৃশ্যতা আছে কিনা?

আমরা এখন এর কিছু মিল তুলে ধরার চেষ্টা করবো। এরপর আমরা আমাদের নির্ধারিত আলোচনার দিকে ফিরে যাবো। সেদিন কুফাবাসী ইমাম হুসাইনকে এতো বেশি চিঠি দিয়েছিল যে, অবস্থায় মনে হচ্ছিল ইমামতের সোনালী যুগের আর বোধহয় বেশী দেরী নেই। আমরাও সারা বিশ্বময় জামানার ইমামকে অনবরত আহŸান করছি। কিন্তু এর সত্যতা কতটুকু? কি নিশ্চয়তা দিতে পারবো যে, ইমামের আগমন আমাদেরকে কুফাবাসীর মতো করে দেবে না? কারণ, তাগুত সেই সময় শুধু একটি রূপে প্রকাশিত ছিল। এখন কিন্তু তাগুতের রূপ বিভিন্ন। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সামাজিকতাবোধ সকল কিছুতেই তাগুত এখন প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য। বুঝার কোন উপায় নেই যে, কোনটা তাগুত আর কোনটা সঠিক পথ। সুতরাং, যারা ইমামের আদর্শের সৈনিক হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন, তাদেরকে সতর্ক হতে হবে, চৌকস হতে হবে শত্রæ মিত্র চেনার ক্ষেত্রে। কারণ, ইমাম সেই স্বত্বার নাম যিনি সামান্যতম অপবিত্রতা সহ্য করবেন না। সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত স্বত্বা কখনও কোন অপবিত্রতাকে মেনে নিতে পারেন না। এটা তাঁদের সুন্নতে নেই।

এখন কারবালা প্রান্তরে ফিরে যাব। আজকে আমরা আলী আজগর ও আবুল ফযল আব্বাসের মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনা জানবো। কারবালা প্রান্তরে ইমাম হুসাইন যে বিসর্জন দিয়েছেন, সেটা সম্পর্কে কোন মন্তব্য করা অসম্ভব। তাঁর সীমাহীন ত্যাগ সেদিন ইসলামের পতিত ঝান্ডাকে তুলে ধরেছিল। তাঁর এই ত্যাগের প্রতিদান আমরা কবে শোধ করতে পারবো, সেটা আজও অজানা। তাইতো আমার ইমাম-এ-জামানার আগমনের অপেক্ষায় আছি।

ইমামের ছয় মাসের শিশু সন্তান আলী আসগার

আশুরার দিন দুপুরে ইমাম শত্রæবাহিনীর মুখোমুখি এসে ঘোষণা করলেন- “কে আছো? আমাকে সাহায্য করবে। কে আছো, আমার এই সংগ্রামে মিলিত হবে?” বক্তব্যের এক পর্যায়ে তাবু থেকে নারী শিশুদের চিৎকার ইমামের কানে ভেসে আসলো। ইমাম মনে করলেন পানির অভাবে হয়তো কোন শিশু মৃত্যুবরন করেছে। তাই তিনি ছুটে গেলেন তাবুর দিকে। তাবুতে প্রবেশ করে দেখলেন, আলী আজগরকে ঘিরে সবাই কাঁদছে। ইমামের কারণ জানতে চাইলে হযরত যয়নব বললেন- “কোন বাচ্চা মারা যায়নি। আপনার সাহায্যের আহŸান শুনে আলী আজগর নিজেকে দোলনা থেকে ফেলে দিয়েছে।” এটা শুনে ইমাম আলী আজগরকে কোলে তুলে নিলেন। তাঁকে নিয়ে ইমাম শত্রæদের সামনে আসলেন। শত্রæদের মুখোমুখি হয়ে তিনি উমাইয়্যাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি না হয়, তোমাদের খলীফার বাইয়াত না নিয়ে অপরাধ করেছি। কিন্তু এই দুধের শিশু তো কোন অপরাধ করেনি। তিনদিন ধরে এই শিশু পানি থেকে বঞ্চিত।”

৭ই মহররম থেকে ইমামের তাবুতে কোন পানি ছিল না। পানি না পান করার কারণে মায়ের স্তনে দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। ইমাম আবার বললেন, “তোমরা হয়তো ভাবছো, আমি শিশুর বাহানায়, নিজের জন্য পানি চাইছি। আসলে তা নয়।” ইমামের আহŸানের প্রতি শত্রæরা কোন কর্ণপাত করল না। তাদের থেকে কোন প্রতিত্তোর না পেয়ে ইমাম আলী আসগরকে বললেন, “বাবা এরা আমার কথা বিশ্বাস করছে না। তুমি তাদেরকে তোমার তৃষ্ণার কথা জানাও।” ছয় মাসের শিশু আলী আসগর উমাইয়্যাদের দিকে তাঁর জিহŸা বের করে তাঁর তৃষ্ণার কথা জানালো। এতেও তারা বিগলিত হল না। বরং এতে তারা নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দিয়ে উমার বিন স্বাদ তাঁর হুরমুলাকে তীর নিক্ষেপের আদেশ দিল। সে তার ধনুকে তীর টানতে গেলে, তীর পড়ে যাচ্ছিল। বার বার এমনটা হওয়ায় স্বাদ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি হল তীর নিক্ষেপ করছিস না কেন? সে বলল, “জানি না কেন তীর ছুটে পড়ে যাচ্ছে”। তৃতীয়বার একটি তীর এসে আলী আসগরের গলায় বিদ্ধ হয়ে তিরের ফলা ইমামের বাহুতে আটকে গেল। ইমাম আলী আসগরকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন। আলী আসগর ইমামের কোলেই শাহাদাত বরণ করলেন। অসহায় ইমাম বেদনায় মুষড়ে পড়লেন। কিভাবে তিনি আলী আসগরকে তাবুতে নিয়ে যাবেন। তিনি একবার এগিয়ে সাতবার পিছিয়ে পড়েন। তিনি যে, তাঁকে পানি পান করানোর জন্য নিয়ে এসেছিলেন। এখন তাঁর মায়ের কাছে গিয়ে তিনি কি জবাব দেবেন। বুকে ব্যথার পাহাড় নিয়ে তিনি তাবুতে ফিরে গেলেন।

আলী আসগরের শাহদাত ইমামের তাবুতে শোকের মাতম এনে দিল। বেদনা সবাইকে এমন আচ্ছন্ন করে দিল যে, এই আঘাত সহ্য করা অসম্ভব ছিল। সবাই আর্তনাদ করে বলতে লাগলো, “হায়! মানুষ তো ছয় মাসের পশুকেও হত্যা করে না। আর এই পশুরা দুধের শিশুকে হত্যা করলো?!”

আবুল ফযল আব্বাসের শাহাদাত

ইমাম হুসাইনের সাথে আবুল ফযল আব্বাসের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। ভালোবাসার এক অমোঘ রসায়ন ছিল সেখানে। তাঁদের এই ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করে দিয়েছিলেন খোদ ইমাম আলী। ৪০ হিজরীর ২১শে রমজানের রাত। ইমাম আলী ভীষণ আহত অবস্থায় বিছানায় শুয়ে ছিলেন। তখন তিনি আবুল ফযল আব্বাসের হাত ইমাম হুসাইনের হাতে দিয়ে বলেন, “হুসাইন! আমি একে তোমার জন্য নিয়োগ করছি। সে তোমার সেই চরম ত্যাগের দিনে আমার প্রতিনিধিত্ব করবে এবং তোমাকে ও তোমার প্রিয়জনদের রক্ষা করার জন্য তার জীবন বিলিয়ে দেবে, ঠিক যেভাবে আমি থাকলে করতাম।”

এরপর ইমাম আলী আব্বাস আলামদারের দিকে ফিরে বললেন, “আব্বাস! হে আমার পুত্র, হুসাইনের জন্য তোমার অকৃত্রিম ভালোবাসা সম্পর্কে আমি জানি। যদিও তুমি বয়সে অনেক ছোট, তবুও তোমাকে বলি। যখন সেই দিন চলে আসবে,  হুসাইন এবং তার সস্তানদের জন্য কোন কুরবানিকে যথেষ্ট মনে করবে না।”  সেই দিনটির কথা মনে করে আবুল ফযল মুচকি হাসলেন। কারণ, তিনি যে পিতার প্রতিশ্রæতিকে রক্ষা করেছেন। জীবন থাকতে তিনি হুসাইনের গায়ে ফুলের আঁচড়’ও পরতে দেননি।

এই মহাবীরের ভাগ্যে কারবালার যুদ্ধে অংশ নেয়া হয় নি। সারাদিন সতীর্থদের শাহাদাত তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। নিজ পরিবারের সদস্যদের শাহাদাতের অব্যক্ত বেদনাকে তিনি সহ্য করেছেন। সকল সৈনিক শহীদ হয়েছেন। ভাই, ভাতিজা কেউ আর বাকি নেই। এখন কারবালার প্রান্তরে রয়ে গেছে শহীদদের স্বজনদের আহাজারি আর তৃষ্ণার্ত শিশুদের আর্তনাদ ব্যতীত কারবালার সেনাপতির কাছে আর কিছু নেই।

কি ভাবছিলেন ইমাম তখন। কোন প্রেমের মূর্ছনায় হুসাইন তখন বিভোর। আল্লাহর সান্নিধ্য যার ব্রত সেই পবিত্র স্বত্বা এখন কিসের অপেক্ষায় রয়েছেন তা তিনি ছাড়া আর কে বলতে পারে? আব্বাস আসলেন ইমামের নিকট। বললেন, “মওলা! আর তো কেউ নেই। এখন আমাকে বিদায় দিন। সকলের পথ ধরে পরপারে আপনার অপেক্ষার সময় হয়েছে।” ইমাম বললেন, “আব্বাস! তুমি তো আমার সেনাপতি।” মুচকি হেসে আব্বাস বললেন, “আমি সেই সেনাপতি, যার কোন সৈন্য নেই।” ইমাম বললেন, “তুমি যুদ্ধ না করে, যদি পার নারী শিশুদের জন্য পানি নিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো।”

আব্বাস পানির মশক হাতে নিয়ে ফুরাতের পানে ছুটলেন। শত্রæ সেনার বুহ্য ভেদ করে ফুরাতের তীরে পৌঁছলেন। দেখলেন স্বচ্ছ টলমলে পানি ফোরাতের তীর বয়ে চলছে। পানি হাতে নিলেন। তিনি নিজেও যে ভীষণ তৃষ্ণার্ত। তিনদিন ধরে হুসাইনের কাফেলায় এক ফোঁটা পানি নেই। পানির অভাবে তৃষ্ণার্ত শিশুদের আর্তচিৎকার কারবালার আকাশ বাতাসকে ভারি করে তুলেছিল। আব্বাস পানি হাতে নিয়ে পান করতে যাবেন এমন সময় মনে পড়ে গেল- আমার মাওলা এখনও পানি পান করেন নি। কাফেলার নারী শিশুরা এখনও তৃষ্ণার্ত। তাঁদের ব্যতীত আমি কিভাবে পানি পান করি! মশকে পানি পূর্ণ করে আব্বাস ছুটলেন হুসাইনের দিকে। কিন্তু শত্রæরা কোনভাবেই যে পানি নিতে দেবে না। তারা আব্বাসকে আক্রমন করলো। আব্বাস তরবারি বের করেননি। কারণ তিনি যুদ্ধ করতে আসেননি। তিনি এসেছেন পানি নিতে। যদি যুদ্ধ করেন তাহলে পানি নেয়া হবে না। তাই তিনি প্রতিরোধের কৌশল নিলেন। কোনভাবে শিশু ও ইমামের কাছে পানি পৌঁছাতে হবে। শত্রæদের আঘাতে আব্বাসের ডান হাত কাঁটা পড়লো। আব্বাস পানির মশক বাম হাতে ধরে তাবুর দিকে ছুটলেন। শত্রæরা আবারও তাকে আঘাত করলে আব্বাসের বাম হাতও কাঁটা পড়ে যায়। দাঁত দ্বারা মশক চেপে ধরে আব্বাস আবারও তাবুর দিকে এগিয়ে গেলেন। হটাত একটা তীর এসে মশকে ছিদ্র করে দিল। সবগুলো পানি মশক থেকে পড়ে গেল। আব্বাসের যেন পা ভেঙ্গে গেল। তিনি হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেলেন। বিষাদের কালো মেঘ যেন আব্বাসের সামনের আকাশে আঁধারে ঢেকে দিল। অসহায়ের মতো ভাবতে লাগলেন সাকিনা, রুকাইয়্যা পানির জন্য চাচার অপেক্ষা করছে। তিনি কি জবাব দেবেন সাকিনার কাছে? কোন মুখে দাঁড়াবেন তৃষ্ণার্ত শিশুদের সামনে। তিনি আবার ছুটলেন ফোরাতের দিকে। এমন সময় এক পাষাণ নিরস্ত্র আব্বাসকে আক্রমন করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত অবস্থায় আব্বাস ইমামের প্রতি সালাম প্রেরণ করলেন। আব্বাসের সালামের আওয়াজ শুনে ইমাম ছুটে গেলেন তাঁর দিকে। দেখেন আব্বাসের দুই হাত কাঁটা, সারা দেহ ক্ষতের চিহ্নে ভরা। রক্তাক্ত আব্বাসের দেহ কোলে নিয়ে ইমাম কাঁদতে লাগলেন। হায়! আমার ভাই। আজ যেন আমার কোমড় ভেঙ্গে গেল। আমার যেন সব শেষ হয়ে গেল।

আব্বাস ইমামকে বললেন, “মওলা! মায়ের কাছ থেকে শুনেছি, আমি জন্মের পর প্রথম যাকে দেখেছি তিনি ছিলেন আপনি। আজ আমার জীবন শেষ পরিণতির প্রান্তরে। চোখে রক্তের জমাট বাধার কারণে আপনাকে দেখতে পারছি না। যদি রক্ত সরিয়ে দিতেন তাহলে জীবনের শেষ বেলাতেও আপনাকে দেখার ভাগ্য আমার হতো।” ইমাম চোখ থেকে রক্ত সরিয়ে নিলেন, আর আব্বাস প্রিয় ইমামকে দেখে হাঁসতে লাগলেন। ইমাম বললেন, “তোমার নিকট আমার একটি আবদার ছিল।” আব্বাস বললেন, “বলুন।” ইমাম বললেন, “তুমি সারা জীবন আমাকে ইমাম, মাওলা বলে ডেকেছ। কখনও ভাই বলে ডাকনি। এই জীবনের বড় স্বাদ একবার তোমার মুখে ভাই ডাকটি শুনি।” আব্বাস ভাই বলে ডাকতেই ইমাম তাঁকে বুকের সাথে চেপে ধরে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। এই অবস্থায় আব্বাস আলামদার শাহাদাতবরণ করলেন। ইমাম ব্যাথায় মুষড়ে পড়লেন। বেদনার ভারে তিনি যেন দাঁড়াতে পারছিলেন না। আব্বাসের পবিত্র দেহ নিয়ে ইমাম তাবুতে ফিরে আসলেন। আব্বাসের মৃত দেহ হুসাইনের কাফেলায় মাতমের ঢেউ তুলে দিল। নারী শিশুরা আব্বাসের বুকের উপরে আছড়ে পড়লো। আর্তনাদ আর আহাজারি কারবালার আকাশ বাতাসকে ভারি করে দিয়েছিল। কাফেলার তৃষ্ণার্ত শিশুরা চিৎকার করে বলতে লাগলো, “আমাদের পানি লাগবে না। আমাদের চাচাকে আমাদের নিকট ফিরিয়ে দাও।”

এরকম ত্যাগগুলোই যুগে যুগে আমাদেরেকে সংগ্রামের আগুনে পুড়ে খাঁটি হতে শিখিয়েছে। সেদিন কারবালার প্রান্তরে শহীদেরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে আমাদেরকে শিখিয়েছেন, কিভাবে প্রাণের ধন বিসর্জন দিয়ে রাজপথে বিদ্রোহের স্বাক্ষর আঁকা যায়। কারবালা প্রান্তরের সেই সাহসী মানুষগুলো সেদিন মিথ্যার স্বরূপ চিনেছিল। তাঁর দেখেছে, শুনেছে এবং বুঝেছে কিভাবে সত্য থেকে মিথ্যাকে পার্থক্য করতে হয়। কিভাবে সত্যের প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে মিথ্যার বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই চালিয়ে যেতে হয়।

আমাদেরকে এখন সে পথেই চলতে হবে। মনে রাখা দরকার, আমাদের জন্য আরেকটি কারবালা অপেক্ষা করছে। যার নেতৃত্বে থাকবেন ইমাম হুসাইনের সন্তান ইমাম আল-মাহ্দি(আ.)। নিজেদেরকে কারবালার সেই সাহসী সন্তানদের মতো গড়ে তুলতে হবে, যাতে প্রয়োজনের সময় আমরা ইমাম-এ-জামান থেকে পিছিয়ে না পড়ি। জ্ঞান, ভালোবাসা, মানুষের প্রতি দাওয়াত এ সকল কিছু দ্বারা আমাদেরকে কারবালার সেই ভ‚লুণ্ঠিত পতাকা তুলে ধরতে হবে।

তাই, কারবালার এই শিক্ষাকে বুকে ধারন করেই আমাদেরকে ইমামে জামানার পথে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁর সংগ্রামের সাথে একাত্ম হয়ে প্রমাণ করতে হবে আমরা কুফাবাসী নই। তবেই ইমাম তাঁর গায়বাত থেকে ফিরে আসবেন এবং লাঞ্ছিত মানবতাকে তাগুতের হাত থেকে উদ্ধার করবেন। আসুন! আমরা সেই সংগ্রামী যুগের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করি।

__মোস্তাফা কামাল সুমন

 

Related Post

কালো রাতের মুসাফির

Posted by - August 6, 2019 0
কালো রাতের মুসাফির __মোস্তফা কামাল সুমন একটি বিদঘুটে কালো রাত দির্ঘ প্রহর নিয়ে যেন এসেছে, পেঁচাদের লোমহর্ষক প্রতিধ্বনিত ডাক, আর…

লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল

Posted by - November 15, 2019 0
লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মদ রাসুল। এই কালেমা পড়রে আমার পরান বুলবুল। বল আল্লাহ ছাড়া দোসরা আর মাবুদ…

শোকাবহ ৯ই মহররম

Posted by - September 9, 2019 0
হুসাইন(আ:) কে? (পর্ব-৬) – নূরে আলম মুহাম্মাদী। হুসাইন(আ:) কে? তা কি জানো? তাহলে বলি শোন। হুসাইন!!! শুনেছি ইউসুফ নবীর সৌন্দর্যের…

হুসাইন(আ:) কে? (পর্ব-৫)

Posted by - September 7, 2019 0
হুসাইন(আ:) কে? (পর্ব-৫) – নূরে আলম মুহাম্মাদী। হুসাইন(আ:) কে? তা কি জানো? তাহলে বলি শোন। হুসাইন!!! যে নবী মুহাম্মাদের(সা.) মহব্বতে…

স‌ত্যের নী‌লিমায় তু‌মি !!!

Posted by - September 10, 2019 0
আ‌জো সদা জাগ্রত তু‌মি চির আকা‌শের নীল, ঐ নী‌লিমায় ছুঁ‌য়ে আছো জা‌নি সদা জাগ্রত হে বীর! দিন যায় মাস আসে…

There are 1 comments

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Translate »